Tuesday, May 13, 2014

সৌদিতে ফার্নিচার কারখানায় আগুনে মারা গেল ১০ বাংলাদেশী ॥ পুড়ে অঙ্গার স্বজনদের বাড়িতে মাতম

সৌদিতে ফার্নিচার কারখানায় আগুনে মারা গেল ১০ বাংলাদেশী ॥ পুড়ে অঙ্গার
স্বজনদের বাড়িতে মাতম
http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2014-05-14&ni=172717
নাজিম মাহমুদ ॥ সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে ১০ বাংলাদেশী মারা গেছেন। রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নূর মোহাম্মদ মাসুম নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সোমবার সৌদি সময় রাত ১০টার দিকে শহরটির শিখা সানাইয়া এলাকায় এ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে বলে এনডিটিভি, এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক ও ইন্দো এশিয়ান নিউজ সার্ভিসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ফার্নিচার কারখানায় আগুনে মোট ১২ শ্রমিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশী আর বাকি দুজন ভারতীয় নাগরিক। তবে দুই ভারতীয় নাগরিকের নাম আপাতত জানা যায়নি।
নিহত বাংলাদেশীদের মধ্যে ৭ জনের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তাঁরা হলেন- মোঃ জালাল, আব্দুল গাফফার, বাহাউদ্দিন, শাহআলম, নাজির হোসেন, মতিউর রহমান ও সেলিম। নিহত অপর দুইজন আফতাব হোসেন খান ও জাকির হোসেন। আফতাবের বাড়ি মাদারীপুর ও জাকির হোসেনের বাড়ি ফেনীতে। তবে নিহত একজনের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। রিয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোঃ শহিদুল ইসলাম জানান, এদের শরীর আগুনে একেবারে ঝলছে গেছে। তাদের কাউকেই চেনা যাচ্ছে না। ওই কারাখানাটিতে মোট ১৫ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এদের মধ্যে ১৩ জনই বাংলাদেশী। এ ঘটনা শোনার পর পরই নিহতদের স্বজনদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
মীর শাহ আলম কুমিল্লা থেকে ও শামীম রায়হান দাউদকান্দি থেকে জানান, সৌদি আরবে ফার্নিচার তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত কুমিল্লার ৭ শ্রমিকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। জেলার নিহত ৭ জনের মধ্যে ৩ জনের গ্রামের বাড়ি হোমনা, ৩ জনের তিতাস ও ১ জনের মেঘনা উপজেলায়।
সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ৭ জনের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। নিহতরা হচ্ছেন- জেলার হোমনা উপজেলার চাঁন্দেরচর ইউনিয়নের চাঁন্দেরচর গ্রামের রমজান বেপারির পুত্র সেলিম মিয়া (৩৫), একই গ্রামের ইসমাইল হোসেনের পুত্র বাহাউদ্দিন (২৬), আছাদপুর ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামের আবদুল করিমের পুত্র মতিউর রহমান (৩৫), জেলার তিতাস উপজেলার ভিটিকান্দি ইউনিয়নের দুলারামপুর গ্রামের রুস্তম আলীর পুত্র জালাল (৩৫), কালীপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের পুত্র শাহ আলম (২৬), নারান্দিয়া ইউনিয়নের নারান্দিয়া গ্রামের জমসের আহম্মদের পুত্র নাজির আহমেদ (২৫) এবং মেঘনা উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামের নুরুল ইসলামের পুত্র আবদুল গাফ্ফার (২৫)। মঙ্গলবার ভোর থেকে গণমাধ্যমে এ অগ্নিকা-ে নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে যোগাযোগ করে তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ভোর থেকে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে আত্মীয়-স্বজনসহ শত শত
মানুষ ছুটে আসেন অসহায় পরিবারগুলোর পাশে। স্বজনদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে।
পরিশোধ করা হলো না নাজিরের ঋণের টাকা ॥ অসহায় পরিবারের পিতাহারা ব্যথাটা কাটিয়ে উঠে যখন আলোর মুখ দেখেছিল তিতাস উপজেলার দক্ষিণ নারান্দিয়া চকেরবাড়ির মৃত জমসের আলীর পরিবার। কিন্তু সেই আলো আর বেশিদিন স্থায়ী হলো না, পরিশোধ করা হলো না ঋণের টাকা।
জন্মের পর বাবার মুখ দেখেনি ৫ বছরের ঝুমুর ॥ তিতাস উপজেলার দুলারামপুর চাঁনপুর গ্রামের হাজী রোস্তম আলীর ছেলে জালাল নিহত হওয়ায় দুই সন্তানকে নিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী সখিনা বেগম। স্বামী হারানো ব্যথা তাঁকে যে কুরেকুরে খাচ্ছে চোখ দেখলেই তা ভেসে আসে। ৮ বছরের ছেলে সাজ্জাদ ও ৫ বছরের মেয়ে ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে বার বার কেঁদে ফেলেন। সাংবাদিকদের দেখে সখিনা বেগম কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এবং জন্মের পর ঝুমুর তার বাবার মুখ দেখেনি বলে জানান। তিনি আরও জানান, সোমবার রাতে ঝুমুর তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছে, বাবাকে বলেছে এ ঈদে বাড়ি আসতে। বাবাও মেয়ের বায়নাকে ফেলে দেয়নি বলেছিল আসবে।
সংসার সাজানো হলো না রুমির ॥ তিতাসের কালীপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে শাহআলম আড়াই মাস হয়েছে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। শাহআলম বিদেশ যাওয়ার একমাস পূর্বে বিয়ে করেন পার্শ্ববর্তী কাশিপুর গ্রামের রুমি আক্তারকে। সোমবার রাতে স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনে মেনে নিতে পারছেন না তাঁর স্বামী মারা গেছেন। লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরবেন। বোবাকান্না বুকে বেঁধে ছলছল চোখে সবার দিকে তাকিয়ে থাকেন আর বলতে থাকেন সাজানো হলো না আমার সংসার।
একমাত্র সন্তানকে দেখা হলো না বাহাউদ্দিনের ॥ নিহত বাহাউদ্দিনের ভাতিজা নূরে আলম বাবু হাউমাউ করে কেঁদে জানান, পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে বিয়ের ২ মাস পর ১৬ মাস আগে সৌদি আরব যান তাঁর চাচা বাহাউদ্দিন। বিদেশে যাওয়ার পর একমাত্র পুত্রসন্তান আবদুল্লাহ (১৪ মাস) জন্মগ্রহণ করে। তাকে দেখার জন্য কয়েকবার দেশে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর আর দেশে আসা হয়নি। সর্বশেষ গত ২ দিন আগে স্ত্রী শাহেনা বেগমের নিকট ছেলেকে দেখার আঁকুতি জানিয়ে ২ মাস পর দেশে আসার কথা জানালেও এখন তাঁকে ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে। ৪ ভাই ৩ বোন ও মা-বাবাসহ এ পরিবারটিতে লাশের অপেক্ষায় ঝড়ছে শুধুই চোখের পানি। স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় মূর্ছা যান নিহত সেলিমের স্ত্রী তাসলিমা, সেলিমের স্ত্রী দুই সন্তান শাশুড়ি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
সুবল বিশ্বাস মাদারীপুর থেকে জানান, রিয়াদে অগ্নিকা-ে নিহত আফতাব হোসেন খানের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। কয়েক বছর আগে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার উত্তর বহেরাতলা ইউনিয়নের স্যানেরপাড় গ্রামের দলিল উদ্দিন খানের ছেলে ভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিল সুদূর সৌদি আরবের রিয়াদে।
নিহত আফতাব ৮ ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয়। বিবাহিত জীবনে দুই সন্তানের জনক। স্ত্রী জাহানার বেগম, বড় মেয়ে লাবনী আক্তার ও ছেলে জাকির হোসেন- এই নিয়ে তাদের সংসার। দরিদ্র পরিবার হলেও ২০১২ সালে সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান আফতাব। স্ত্রী জাহানারা বেগম গার্মেন্টসকর্মী। বড় মেয়ে লাবনী আক্তারের (২০) বিয়ে হয়েছে কিছু দিন আগে। ছোট ছেলে জাকির খান (১৪) মাদ্রাসায় পড়ে।
এ ব্যাপারে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইকবাল হোসাইন জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আফতাবের মৃতদেহ আনার ব্যাপারে ইতোমধ্যে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

No comments:

Post a Comment