শ্রমিকের প্রতি রাষ্ট্রের ও সুদখোর ইউনুসের দরদ কতখানি??
তারিখ: ১৫ মে ২০১৩
ট্যাগসমূহ: কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিক, ড. ইউনুস, বন্ধু বাংলা, বিজিএমইএ, মালিক শ্রেণী, মেহনতি মানুষ, রাষ্ট্র, শ্রম আইন, শ্রম নীতিমালা, শ্রমজীবী মানুষ, শ্রমিক, শ্রমিক গণহত্যা, শ্রমিক শ্রেণী, সুদখোর ইউনুস, সুশীল
http://www.mongoldhoni.net/workers-right-state-mechanism-and-profit-seeker-yunus/
লিখেছেন: বন্ধু বাংলা
সাভারে শ্রমিক গণহত্যায় সুদূর ভ্যাটিকান সিটির পোপ থেকে শুরু করে দেশের সরকার, সুদখোর ইউনুস, মালিক শ্রেণী সবাই যেন নড়েচড়ে বসেছে, মন্তব্যের ফুলঝুরি নিয়ে হাজির হচ্ছেন। গত কয়েক দিনে গন মাধ্যমে প্রকাশিত সুদী কারবারি ইউনুসের সাম্প্রতিক একটি লেখা ও রাষ্ট্রের নতুন শ্রম আইন ও মুজুরি বোর্ড গঠনের বেশ কয়েকটি সংবাদ বিশ্লেষণ করতে গিয়েই এ লেখার অবতারণা।
(১) লেখার শুরুতেই ইউনুস সাহেবের প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তার “সাভার ট্র্যাজেডি, পোশাক শিল্প ও বাংলাদেশ” নামক নিবন্ধটি (http://www.samakal.net/opinion-/2013/05/08/2927)পড়লাম এবং নিবন্ধে এই সুদী ভদ্রলোক গার্মেন্টস রক্ষায় সরকার, মালিকপক্ষ, বিদেশি সংগঠন,এনজিও, নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে ‘সিটিজেন্স অ্যাকশন গ্রুপ ফর প্রটেক্টিং গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি‘ এবং ‘নাগরিক ওয়াচ ডগ প্রতিষ্ঠান’ ইত্যাদি গঠনের কথা বলেছেন, কিন্তু তার নিবন্ধের কোথাও শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা উঠে আসে নি বরং এড়িয়ে গিয়েছেন। তবে তিনি দুটি প্রস্তাবের মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সেটাও মালিকের কাছে থেকে নয়, পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি মূল্য ছিনিয়ে নেয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ মালিক বর্তমানে যা লাভ করে সেখান থেকে মজুরি বাড়ানো যায় না, তার লেখায় ভাল কথার আচ্ছাদনে এই বিষয়টি ফুটে উঠেছে যা সহজেই ধরা পড়েছে।
ইউনুস সাহেবের ১ম প্রস্তাবটি ছিল -আন্তর্জাতিক মানের মজুরি কাঠামোর আওতায় মজুরি নির্ধারণ করে বিদেশী পাইকারি ক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা। কিন্তু এই প্রস্তাবের ফলে যে উচ্চ মুল্যের (৫০ সেন্ট/ ঘণ্টা) শ্রমবাজার সৃষ্টি হবে, তার বিপরীতে যে লোকসান ও অর্থ দণ্ড মালিক শ্রেণী ও ক্রেতাকে গুনতে হবে; সেটা পুষিয়ে দিতে হবে ঐ শ্রমিককেই। কিভাবে? শ্রমিক তার উৎপাদনশীলতা ও কর্ম দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ আস্থা অর্জন এবং কোনোরূপ বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে না-হয় তার নিশ্চয়তা দেয়ার মাধ্যমে।
ইউনুস সাহেব ভাল করেই জানেন পণ্যের উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ১ম শর্তই হচ্ছে মালিকের সর্বোচ্চ পুঁজির বিনিয়োগ,সে অনুযায়ী যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং কর্মী ব্যবস্থাপনা। এসবই নির্ভর করে মালিক শ্রেণীর মর্জির উপর। যেখানে এ দেশের অধিকাংশ মালিকের কারখানায় পুরানো মেশিনের জন্য ঘণ্টায় ঘণ্টায় সুই ভাঙ্গে এবং অদক্ষতা ও অনুৎপাদনশীলতার নামে সমস্ত ভাঙ্গা সুইয়ের টাকা সেই শ্রমিকের মজুরি থেকে কেটে নেয়া হয়, সেখানে উৎপাদনশীলতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির দায় এবং কোনোরূপ বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে না হয় সেই মুচলেকার ভার ইউনুস সাহেব চাপালেন শ্রমিক শ্রেণীর উপর! শ্রমিক শ্রেণীর সাথে সম্পর্কহীন এই সুদী মানুষটি তাই একদিকে যেমন শ্রমিক শ্রেণীর জন্য মজুরি ৫০ সেন্ট করতে বলেছেন তেমনি এই ৫০ সেন্টের জন্য যে অর্থদণ্ড বিদেশী খুচরা ক্রেতাকে গুনতে হবে সেটা পুষিয়ে দেয়ার দায়ও শ্রমিক শ্রেণীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
ওনার ২য় প্রস্তাবটি ছিল, পণ্যের খুচরা বিক্রয় মূল্য ৫০ সেন্ট বাড়িয়ে, খুচরা ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি মূল্য ছিনিয়ে নিয়ে মজুরি আকারে মালিকের মাধ্যমে পরিশোধ করা। ক্রেতা কেন বাড়তি মূল্যে কিনবে? ওনার যুক্তি From the Happy Workers of Bangladesh, with Pleasure. Workers’ wellbeing being Managed by GrameenঅথবাBRACইত্যাদি সুন্দর সুন্দর একটা লোগো ট্যাগ করা থাকলেই বিদেশি খুচরা ক্রেতা বাড়তি মূল্যে পোশাক ক্রয় করবে। বাহ: কি সুন্দর প্রস্তাব!! যে প্রস্তাবে মালিক ও বিদেশি পাইকারি ক্রেতারা নিরাপদ। আবার সূদের ব্যবসা থেকে আন্তর্জাতিক দর্জির ব্যবসায় আগমন করে নিজেদের ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির স্বপ্ন! স্বপ্ন দেখা ভাল, কিন্তু এই প্রস্তাবের বিপরীতে প্রশ্নও থাকে এভাবে বাড়তি দামে যদি খুচরা ক্রেতারা পোশাক ক্রয় করলেও, এই বাড়তি মূল্য যে শ্রমিকের পকেটে আসবে এর নিশ্চয়তা কি? এই অর্থ মালিক কেড়ে নিয়ে তার ভোগ বিলাসে ব্যয় করবে না তার নিশ্চয়তা কি? আসলে সমস্যাটা কি ঐ ৫০ সেন্ট বাড়তি দামে? কারণ খুচরা বিক্রয় মূল্যে প্রতিটি গার্মেন্টস পোশাক ৫০ সেন্ট নয় কয়েক ডলার বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। এই কয়েক ডলার বাড়তি দামে বিক্রয় হওয়ার পরও লাভ যা হয় সেটা ঐ মালিক শ্রেণী ও বিদেশি পাইকারি ক্রেতার ভাগেই থেকে যাচ্ছে, সেখানে আরও ৫০ সেন্ট কেন ৫০ ডলারও যদি বাড়তি দাম দেয়া হয় সেটা ঐ মালিক শ্রেণীরই থেকে যাবে।
তবে এই দুটি প্রস্তাবের বিপরীতে আসল যে প্রশ্ন, সেটা হল বর্তমানে যে বারগেইনিং প্রাইসে পোশাক রপ্তানির চুক্তি হচ্ছে; এর সাথে কত সেন্ট যোগ করলে শ্রমিকের মজুরী দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ বিষয়ে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের দ্য ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের(টিইউসি) তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন) এর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের পোশাকর্মীদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ করতে যুক্তরাজ্যে প্রতিটি পোশাকের দাম বাড়তে পারে মাত্র তিন সেন্ট(http://www.samakal.net/economics/2013/05/11/3077)।
ইউনুস সাহেব মালিকদের উদ্দেশ্যে নিশ্চয় বলবেন না, আপনারা মালিকেরা রপ্তানি চুক্তি সম্পাদনের সময় মাত্র ৩ সেন্ট যোগ করে নিন বা আপনার লাভের অর্থ থেকে ৩ সেন্ট ছেড়ে দিন এবং শ্রমিকের মজুরী দ্বিগুণ করে দিন। সাম্রাজ্যবাদ ও মালিক শ্রেণীর দালাল ইউনুস সাহেব ৩ সেন্টের বিপরীতে অবাস্তব নানা প্রস্তাবে নানা মায়া কান্নায় শ্রমিক শ্রেণীর শুভাকাঙ্খী রূপে নিজেকে জাহির করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ সামনে ইলেকশন!! নিবন্ধের শুরুতে আছে সেই সুর, তিনি বলেছেন “সাভার আমাদের অপরাজনীতির সৃষ্টি। অপরাজনীতি যে আমাদেরকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে”। আপাত দৃষ্টিতে তার কথা সত্য মনে হলেও এই কথার মাঝে লুকিয়ে আছে তার বাসনা- রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। সে ইচ্ছা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু শুধুই সাভার কি আমাদের অপরাজনীতির সৃষ্টি? এনজিও কি আমাদের অপরাজনীতির সৃষ্টি নয়? জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায়, রাষ্ট্রের অপরাজনীতি আজ এই দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে এনজিও এর উপর। আমরা দেখি এই অপরাজনীতিকে আরও নেতিবাচক ধারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনীতিতে এন জি ও র ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাছে। যার ফলশ্রুতিতে এর আগে আমরা দেখেছি আবদুল জলিলীয় ৩০ সে এপ্রিলের থিওরি ও আল্টিমেটামের সাথে প্রশিকার সংশ্লিষ্টতা। তারই ধারাবাহিকতায় এখন আবার দেখা যাচ্ছে ইউনুস সাহেবের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কথা বার্তা ও রাজনীতিতে আগমনী পদধ্বনি। অপরাজনীতিই তাকে সুদী কারবারি রূপে স্থায়িত্ব দিয়েছে, অপঃরাজনিতিই তাকে রাজনীতিতে আগমনকে উৎসাহিত করছে; কিন্তু ওনার রাজনীতি আগমন রাজনীতিতে কোন উৎকর্ষতা নিয়ে আসবে এটা তার সাম্রাজ্যবাদী দালালীর নমুনা দেখেই আন্দাজ করা যায়।
২। এবারে আসি রাষ্ট্রের কথায়। সাভারে শ্রমিক গণহত্যা এবং এর পর পরই সংগঠিত সংঘবদ্ধ অসন্তোষের পরিপেক্ষিতে রাষ্ট্র একটি মজুরী বোর্ড ও সংশোধিত শ্রমনীতি নিয়ে হাজির হয়েছে। যদিও পুর্নাঙ্গ শ্রমনীতি এখনও হাতে আসেনি কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে তাই নিয়েই কিছু বলা।
গতকাল (১২-৫-২০১৩) সরকার একটি ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই বোর্ড পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করবে। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, যখনই মজুরি নির্ধারণ করা হোক না কেন, শ্রমিকদের জন্য মজুরি কার্যকর হবে ১ মে থেকে। অন্যদিকে, বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম ও বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান জানান, ১ মে থেকে মজুরি কার্যকরের বিষয়টি আমরা মেনে নিচ্ছি না। উল্লেখ্য যে সর্বশেষ ২০১০ সালের ২৭ জুলাই মজুরি বোর্ডের সুপারিশে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এখানে যা লক্ষণীয় সেটা হল মালিক শ্রেণীর বিরোধিতা। হ্যাঁ যারা মাসের পর মাস শ্রমিকের বেতন ঠিক মত দেয় না, বরং বেতন চাইতে গেলে নানা রকম নির্যাতন নিপীড়ন সহ শ্রমিকের পেটে লাত্থি দিয়ে ছাঁটাই করতে অভ্যস্ত; সেই সব মালিক শ্রেণীর সংগঠন এর বিরোধিতা করতে গিয়ে কোন রূপ ভণিতার আশ্রয় না নিয়ে যা বলেছেন তাতে তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। ধরে নিলাম ৫ মাস পরে নতুন মজুরী কাঠামো বাস্তবায়নের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসা গেল, কিন্তু কথা হল, যারা বেতন দেয় না ঠিক মত; তারা ৫ মাসের বকেয়া বাড়তি টাকা সহ মজুরী পরিশোধ করবেন সে নিশ্চয়তা কোথায়? কোন শ্রমিক যদি এটা নিয়ে চাপ প্রয়োগ করে তবে সেটা ‘অসদাচরণ’ ট্যাগ লাগিয়ে মালিক তাকে ছাঁটাই করবে না – এমন নিশ্চয়তা কি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের মন্ত্রী দিতে পারবে? না পারবে না কিন্তু শ্রমিকের সাথে সখ্যতা তৈরিতে তারা অনেক মনভোলানো সুন্দর কথাই বলে থাকেন। তবে এখানে পূর্বে উল্লেখিত সিএনএনের ৩ সেন্টের সংবাদটি ও বারগেনিং প্রাইজ ৩ সেন্ট বাড়ানোর প্রসঙ্গটি এসে যায়। বারগেনিং প্রাইজে ৩ সেন্ট যোগ করে মজুরি দ্বিগুণ বৃদ্ধির যে সুযোগ আছে এ বিষয়ে রাষ্ট্র চাপ দিয়ে মজুরি দ্বিগুণ করে দিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র মালিক শ্রেণীকে রেয়াত দেয়, ঋণ দেয়, কর মওকুফ করে দেয়; কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে মালিক শ্রেণীকে কোন চাপ দেয় না। শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্রের এই মজুরী বৃদ্ধির পদক্ষেপে নিজেকে কতটুকু সন্তুষ্ট রাখতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।
অপরদিকে সোমবার (১৩-৫-২০১৩) মন্ত্রীসভার বৈঠকে “বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন), ২০১৩” এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনে বীমা নিষ্পত্তি সংক্রান্তে বলা হচ্ছে, শ্রমিকের বীমা দাবির টাকা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজ উদ্যোগে আদায় করবে। কোনো কারণে শ্রমিক যদি মারা যায় বা তার মৃত্যু হয় তাহলে তার পোষ্যদের বীমার টাকা মালিকদের আদায় করে দিতে হবে। প্রশ্ন হল, শ্রম আদালত বা সরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ব্যাংক বা এদের সমন্বয়ে অন্য কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি টাকা প্রদান করার বিধান রাখা হল না কেন? রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতায় কিছু দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিকতা সৃষ্টি হলেও টাকাটা পোষ্যরা যতটুকু যেভাবে পেত এখন সেই টাকা পাওয়া আরও কঠিন হবে। বিষয়টা অনেকটা সেই রকম “শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেয়া”।
নতুন শ্রমনীতি অনুযায়ী কোনো শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ ১২ বছর হলে এক মাসের মজুরির সমান এবং ১২ বছরের বেশি হলে দেড় মাসের মজুরির সমান গ্রাচুইটি পাবেন। সুন্দর আইন!!! কিন্তু আমরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন শ্রমিকের পক্ষে কোন মালিকের অধীনে চাকরি ২ মাস, ৪ মাস, ৬ মাস, বড়জোর এক বা দুই বছরের বেশি করা হয়ে উঠে না। বিশেষ করে যখন একজন শ্রমিকের চাকরি স্থায়ী করন বা অন্যান্য সুবিধার প্রশ্ন চলে আসে, ঠিক তখনই তাকে ছাটাই করার নানা চেষ্টা করা যায়। ছাটাই সম্ভব না হলে নিপীড়ন নির্যাতন চলে। তখন সেই শ্রমিকের জন্য অবস্থাটা হয় ‘ছেড়ে দে মা কেন্দে বাঁচি’। তখন ঐ শ্রমিক চলে যায় অন্যত্র এবং মালিক তার স্থলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ করে; এতে মালিকের কিছু টাকা বেঁচে যায়।
সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নেই, সেখানে এই ইউনিয়ন গঠন না হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক(পার্টিসিপেটরি) কমিটিই ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে গণ্য হবে। এই ইউনিয়নই যৌথ দর-কষাকষি কার্যক্রম (সিবিএ) পরিচালনা করতে পারবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার কোন বাধ্যবাধকতা নাই। ফলে অংশগ্রহণমূলক(পার্টিসিপেটরি) কমিটি বা এরূপ মালিক ও মালিকের আস্থাভাজন শ্রমিকের সমন্বয়ে যে অংশগ্রহণমূলক (পার্টিসিপেটরি) কমিটি রয়ে যাবে বৈধ ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প রূপে। ট্রেড ইউনিয়ন আর গড়ে তোলা হবে না।
নতুন শ্রম নীতিতে বিভিন্ন শতাংশ হারে নানা ধরনের কল্যাণ তহবিলের কথা হয়েছে কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন না থাকলে এসব সুবিধা যে শ্রমিকের পক্ষে যাবে না, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
ক্ষতিপূরণের আইন অনুযায়ী, যদি কোনো শ্রমিক কোনো মালিকের অধীনে দুই বছরের বেশি কাজ করেন এবং চাকরিরত অবস্থায় মারা যান, তাহলে মালিক মৃত শ্রমিকের মনোনীত ব্যক্তি বা মনোনীত ব্যক্তির অবর্তমানে তাঁর কোনো পোষ্যকে ক্ষতিপূরণ দেবেন। এ ক্ষেত্রে এক বছর বা ছয় মাসের বেশি সময় কাজের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ দিনের এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় অথবা কর্মকালীন দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুর জন্য ৪৫ দিনের মজুরি অথবা গ্র্যাচুইটি (যা টাকার অঙ্কে বেশি আসবে) দিতে হবে। এই টাকা মৃত শ্রমিক চাকরি থেকে অবসর নিলে অবসরের যে সুবিধা পেতেন, তার অতিরিক্ত হিসেবে পাবেন। এখন একটু অংক করা যাক,মাসিক ৩ হাজার টাকা যে শ্রমিকের মজুরী আসে; সে যদি কর্মকালীন দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরন করে, তবে ৪৫ দিনের মজুরি হিসাবে তার ক্ষতি পূরণ আসে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার টাকা!! রাষ্ট্রের কাছে কত সস্তা শ্রমিকের মৃত্যু ও মৃত্যু জনিত ক্ষতিপূরণ!! অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ৩০৯ ধারা অনুযায়ী, মালিকের অবহেলা বা আইন লঙ্ঘনের কারণে যদি কারও প্রাণহানি হয়, তাহলে সর্বোচ্চ শাস্তি চার বছর কারাদণ্ড। মালিকের অবহেলায় শত শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটলেও এটাই সর্বোচ্চ শাস্তি। তবে বাস্তবতা হল,বাংলাদেশের কোনো কারখানার কর্তৃপক্ষ এই শাস্তি এখনও পায়নি।
অপসারণ আইন অনুযায়ী কোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলে তাঁকে ১৫ দিনের মজুরি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ এক বছর হতে হবে। তবে অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত হলে তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাবেন না। কিন্তু এর বিপরীতে মালিকদের জন্য আইন আছে, যে কোন মালিক শ্রমিকদের দাবী দাওয়ার মুখে যে কোন সময়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দিতে পারবে। এই আইনের আওতায় বর্তমানে গাজীপূরে মালিক শ্রেণী বিনা নোটিশে শ‘ খানেক কারখানা বন্ধ রেখেছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটির আইনটি শ্রমিক শ্রেণীর বিশেষ করে নারী শ্রমিকের জন্য আরও বেশি অবমাননাকর। সরকারি ও আধা সরকারি সেক্টরে কর্মজীবী নারীর মাতৃত্ব কালীন ছুটি ৬ মাস। বিজিএমই এর মতে যদি গার্মেন্টস সেক্টরে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করা হয় তবে দেশে জন্ম হার বেড়ে যাবে। রাষ্ট্র দরজিওয়ালাদের এই অদ্ভুত অপমানকর যুক্তিতে সায় দিয়ে ৪ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির আইন করেছে। এখানে দুঃখজনক ভাবে যা লক্ষণীয় সেটা হল, শ্রমিক শ্রেণীর মা বোন নিয়ে এই দরজিওয়ালাদের এই স্পর্শকাতর ও ন্যক্কারজনক মন্তব্য এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় আইন শ্রমিক শ্রেণিকে মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
৮০ দশকের শেষের দিকে যে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা তাকে রাষ্ট্র, এই মালিক শ্রেণী কখনই শিল্পের মর্যাদা দেয়নি। বরং এই শিল্প,শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি শোষণ নিপীড়নকে এক দিকে যেমন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে; তেমনি দর্জি-গিরি করে কিছু লোক রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে। এদের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিক শ্রেণীর জীবনের কোন দাম নেই, শ্রমের কোন দাম নেই। রাষ্ট্রের ভূমিকা ও গার্মেন্টস শ্রমিকের অসংগঠিত রূপ এই শোষণ নিপীড়নকে আরও উৎসাহিত করেছে। ফলে জন্ম নিয়েছে নানা সংকট ও সমস্যা। কিন্তু সমস্ত দায় যেন ঐ শ্রমিক শ্রেণীর। আগুনের ধোঁয়ায় মালিক মারা গেলে হয় নাশকতা আর অব্যবস্থাপনায় শ্রমিক মরলে হয় দুর্ঘটনা। আমরা এই নাশকতা আর দুর্ঘটনার গল্প শুনে আসছি বহুকাল ধরেই। সর্বশেষ যে রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ল,এখানেও আমরা দেখছি শুধু মাত্র রানাকে একক ব্যক্তি রূপে দোষী সাব্যস্ত করার রাষ্ট্র যন্ত্রের এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র যন্ত্রের হাতে এমন রানা অনেক আছে, এমন অনেক রানা তৈরি করা যাবে কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রগত কারণেই রাষ্ট্রকে ‘মালিক’ শ্রেণীকে বিপদমুক্ত রাখতে হয়। এরাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, এরাই দলের অর্থ ও চাঁদার জোগান দাতা। ভেবেছিলাম, এবারে ১লা মে তে শ্রমিক শ্রেণী অনেক বেশি জঙ্গি রূপ ধারণ করবে, দরজিওয়ালাদের অবৈধ ভবন বিজিএমই গুড়িয়ে দেয়া না হোক অন্তত বাইরের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলবে।কিন্তু এই দরজিওয়ালা ও রাষ্ট্রের ভাগ্য ভাল যে শ্রমিক শ্রেণী সেরূপ কোন জঙ্গি রুপে আবির্ভূত হয় নি। এতে যে জিনিসটি বুঝা যায় তা হল এখন গার্মেন্টস শ্রমিকেরা সংগঠিত রূপে আসতে পারে নি, নেতৃত্ব নির্বাচনে দ্বিধাবিভক্ত এবং শ্রমিক রূপে সত্যিকার শ্রমিক শ্রেণী হয়ে উঠতে পারে নি। কিন্তু যেভাবে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে তাতে এসকল সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লবী চরিত্র ধারণ করতেই হবে। সেটা যত তাড়াতাড়ি ঘটে শ্রমিক শ্রেণীর জন্য ততই মঙ্গল। জেগে উঠতে হবে তাঁদের!সমাজ পরিবর্তনের নেতা হয়ে উঠতে হবে তাঁদেরই!
জয় হোক এ দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের।।
No comments:
Post a Comment