“গণতান্ত্রিক” ভারত এবং আম আদমি পার্টি
তারিখ: ৩০ ডিসে ২০১৩
http://www.mongoldhoni.net/an-analysis-on-indian-state-and-aam-aadmi-party/
লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত
অনলাইনে বা ফেসবুকে বন্ধুতালিকার অনেককেই দেখলাম ভারতের রাজধানী দিল্লীতে নতুন আত্মপ্রকাশ করা আম আদমি পার্টির রাজ্য সরকার গঠন করাকে কেন্দ্র করে ভীষণ রকম উল্লোসিত, কারো কারো মাঝে সেই পার্টির পক্ষে প্রচারণা চালাতেও লক্ষ্য করলাম। আর তাই এ প্রসঙ্গে দুয়েকটা কথা বলাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। প্রথমেই দুটো প্রশ্ন করছি,আপনার কাছে, আপনাদের কাছে, সেই সাথে আমার নিজের কাছে - গণতন্ত্র বলতে আমরা আদতে কি বুঝি? আর ভারতের রাষ্ট্রব্যস্থাটাই বা কেমন? আমি আমার উত্তরখানা দিচ্ছি,আপনার বা আপনাদেরটা মিলিয়ে নিতে পারেন ইচ্ছে হলে। আর এর মাঝেই খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই আসবে আম আদমি পার্টি সম্পর্কে মূল্যায়ন। উল্লেখ্য যে, এখানে যাই বলছি সবই যে বিশদ বিশ্লেষণ করে বলা তা নয়, বরং সাধারণভাবে কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি এই লেখার মাধ্যমে। পরবর্তীতে হয়তো আমরা এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে সমর্থ হবো।
ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র
কোন রাষ্ট্র যখন ঔপনিবেশিক কাঠামোয় গড়ে উঠা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে (যেমন - সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী,প্রশাসন) প্রায় অপরিবর্তিত রেখে নিজেকে স্বাধীন-সার্বভৌম বলে ঘোষণা করে, অখণ্ডতার বুলিতে জাতীয়তাবাদের গান শোনায়,তখন সেটি গণতন্ত্রের লেবাস ধরলেও, তা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারে না। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো তেমনি নির্বাচন সর্বস্ব পোষাকী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাতে জনগণের নাম ভাঙিয়ে শাসক শ্রেণীর গণ-নিপীড়ন বলবৎ থাকলেও জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ণ থাকে সুদূর পরাহত।
চরিত্রগতভাবে ভারত সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে পরিচালিত হলেও ভারতের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই তার এক বিশেষ চরিত্র; তা হলো -ভারতের সম্প্রসারণবাদী চরিত্র। ভারতের শাসক শ্রেণী ব্রিটিশ ভারতের সময়কালেই ক্ষমতা কাঠামোর নৈকট্যে থাকার ফলে দখলদারিত্বের বিদ্যাটা তাদের বেশ ভালোই জানা ছিল - ডিভাইড এন্ড রুল। তাই ভারত বিভাগের পর পরই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করাটাই তাদের আরাধ্য হয়ে উঠে। সম্প্রসারণবাদী নীতিকে সামনে রেখেই ভারতের শাসক শ্রেণী ভারত রাষ্ট্রের জন্মলগ্নেই দখল করে নেয় কাশ্মির, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য (সেভেন সিস্টারস); আশেপাশের অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে সামরিক-বেসামরিক আগ্রাসন চালিয়ে ভারতের করদ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র তখনই শুরু হয়। যা এখনো চলমান।
এখানে দেশে-দেশে চলমান সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন সম্পর্কেও কিছু কথা বলাটা বাঞ্ছনীয়। কারণ সাম্রাজ্যবাদের এই রূপে গত কয়েক দশকে কিছু মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, আর তাই পরিবর্তন এসেছে তার আগ্রাসনের মাঝে, তার মার্কেট দখলের মাঝেও। বর্তমানে যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন আমাদের সামনে আবির্ভুত হয়েছে, তা হলো “কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ”। কর্পোরেটদের অস্ত্র,প্রাকৃতিক সম্পদ আর জল-জমি, তথা মার্কেট দখলের জন্যই চলছে যুদ্ধ, কখনো গণতন্ত্রের নামে, কখনো বা সন্ত্রাস নির্মূলের নামে। এই আগ্রাসনে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে মেরিন সেনাদের হত্যাযজ্ঞে পাঠালেও,অযাচিত গোয়ান্দাবৃত্তির খড়গ পোড়ালেও, সেই আগ্রাসন কিন্তু হয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে, বিশ্বায়নের বুলি আওড়ে বিশ্বব্যাপী বাজার দখল করাটাই যার প্রধান লক্ষ্য।
ভারত নিজেই সাম্রাজ্যবাদ পীড়িত, এর শাসক শ্রেণী সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেই চলতে হয় ভারতের শাসক শ্রেণীকে। তারা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে করছে বিবিধ গোপন চুক্তি, আর এর ফলশ্রুতিতে কর্পোরেটদের হাতে জল, জঙ্গল, জমি, প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দিচ্ছে অকাতরে। গড়ছে “স্পেশ্যাল ইকোনমিক জোন”। কৃষকেরা না খেয়ে আত্মহত্যা করলেও তারা ঝোলায় জিডিপির মূলা! জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডও এখন পরিণত হচ্ছে কর্পোরেটের সামাজিক ব্যবসায়। অপরদিকে, জনগণের আন্দোলন সংগ্রামকে ধ্বংস করতে তারা তৈরী করে নিত্য নতুন গণ-বিরোধী আইন। এই আইন আবার শতভাগ সংবিধান সম্মত। আর এ থেকে সংবিধানের স্বৈরতান্ত্রিক চেতনা বেশ ভালোই আঁচ করা সম্ভব। একে তারা বলছে গণতন্ত্র! হ্যাঁ, এটিই সম্ভবতঃ সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত গণতন্ত্রের নমুনা!
ভারতের শাসক শ্রেণীকে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতে হলেও আঞ্চলিক বিষয়াদিতে তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্যতম সহযোগী। সম্প্রসারণবাদী নীতির কারণেই বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলো উপর রয়েছে তাদের বিশেষ প্রভাব। তাই ওই সকল রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভারতের শাসকেরা সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম সহযোগী শক্তি। ভারত সামরিক, বেসামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দাবৃত্তির আগ্রাসী ভূমিকা জন্মলগ্ন থেকেই জারি রেখেছে পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর উপর। যা ভারতের সম্প্রসারণবাদী নীতিরই প্রতিফলন।
ভারত বিভিন্ন সময়ে তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, কখনো বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছে; যা সর্বোতভাবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। ১৯৫০ সালে নেপালের সাথে শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি (Treaty of Peace and Friendship),২০০১ সালে শ্রীলঙ্কার সাথে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement),১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সাথে স্বাক্ষরিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি (Indo-Bangladeshi Treaty of Friendship, Cooperation and Peace), বা ২০১০ সালে হাসিন-মনমোহন চুক্তি, অথবা ১৯৪৯ সালে ভূটানের সাথে স্বাক্ষরিত গোপন পররাষ্ট্র চুক্তি, এসবই ভারত রাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী চরিত্রের পরিচায়ক। সাফটা (South Asian Free Trade Area or SAFTA)বাস্তবায়নের জন্য ভারতের তোড়জোরে কমতি নেই, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (সেজ) গঠন, এরই ধারাবাহিকতা। উন্মুক্ত মার্কেটে বড় পুঁজি ছোট পুঁজি গিলে ফেলবে, এটাই স্বাভাবিক। আর এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মার্কেটে কর্পোরেট পণ্যের সয়লাব ঘটাতে চাইছে তারা। মুক্ত বাণিজ্যের নামে কর্পোরেটদের মার্কেট ধরিয়ে দেওয়াটাই ভারতীয় শাসকদের মূল কাজ।
ভারতীয় সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান পিস কিপিং ফোর্স) ১৯৮৭ শ্রীলঙ্কায় আগ্রাসন চালায়। তারা শান্তির নামে লিবারেশন টাইগারস অফ তামিল ইলম নিয়ন্ত্রিত জাফনা উপদ্বীপে সামরিক আগ্রাসন চালালে ৩বছরব্যাপী তামিল টাইগারদের প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্মুখীন হয়ে ১৯৯০ সালে সেখান থেকে ফিরে আসে।
ভূটানের সেনাবাহিনী সর্বোতভাবে ভারতের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রাণাধীন, ভূটানের কোন নৌ ও বিমান বাহিনী নাই, প্রয়োজনে ভারতীয় বিমান বাহিনীই সেখানে অপারেশন পরিচালনা করে থাকে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং সর্বোপরি কর্পোরেট সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ব্যাপকভাবে বিরাজমান। সেখানে বিভিন্ন সময়ে রাজতন্ত্র উৎখাতের উদ্দেশ্যে গড়ে উঠা আন্দোলন-সংগ্রামকে হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নের মাধ্যমে দমন করার ইতিহাস ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে।
নেপালে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের আধিপত্য বিরাজমান রয়েছে। রাজতন্ত্রের সময়কালে রাজ পরিবারের সাথে ছিল ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক। তবে মাওবাদীদের সাথে রাজা বীরেন্দ্র’র শান্তি আলোচনাকে ভারত স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালে রাজা বীরেন্দ্রসহ রাজ পরিবারের হত্যাকাণ্ডেও ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর হাত রয়েছে। পরবর্তীতে, প্রচণ্ড, বাবুরাওদের মতো, যে মাওবাদীদের নিয়ে এতো চিন্তিত ছিল ভারত, সেই মাওবাদী প্রধান নেতাদের কিনে নেয় ভারত, এখানে মূল ভূমিকা ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী ‘র’ এবং ওই নেতাদের আপোষকামী, সুবিধাবাদী, ভোগবাদী চরিত্র। বর্তমানে মাওবাদী নামধারীরা নেপালের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন, কিন্তু তা যেন ভারতপন্থী, বা ভারতেরই কোন পুতুল সরকারের অনুরূপ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই সেখানে ভারতের আধিপত্যের যুগ শুরু হয়, আর মূলত এ লক্ষ্যেই ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে সহায়তা করেছিল, প্রায় ১ কোটি আশ্রয়হীন (রিফিউজি) মানুষকে যুদ্ধের নয় মাস আশ্রয় দিয়েছিল। সমর্থন দিয়েছিল বাংলাদেশের উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণীর দল আওয়ামী লীগকে। আর এর ফলস্বরূপ ১৯৭২ সালেই স্বাক্ষরিত হয় দাসখতের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি, ফারাক্কা চুক্তি। সাম্প্রতিক ট্রানজিটের নামে করিডোর চুক্তি বা টেলিকরিডোর চুক্তি, বন্দী-বিনিময় চুক্তি, সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অথবা সীমান্তহত্যা, সীমান্তে কাটাতার, এসবই ভারতের সম্প্রসারণবাদী নীতির অনুসরণ। এখানে উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে মাত্র তিনটি রাষ্ট্রই তাদের সীমান্তে কাটাতার স্থাপন করেছে -মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যকার সীমান্ত, ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যকার সীমান্ত এবং ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্ত। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বরে এ সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য মতে, ভারত সীমান্তে কাটাতার স্থাপনের জন্য ৫২০৫.৪৫ কোটি রুপি অর্থ বরাদ্দ করেছে এবং সর্বমোট ৩৪৩৬.৫৯ কিলোমিটার সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেওয়া হবে।
তবে ট্রানজিট বা করিডোর, টেলিকরিডোর ও বন্দী-বিনিময় চুক্তি বিশেষ গুরুত্ববহ, কারণ এর সাথে জড়িত রয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের মুক্তিকামী জনগণের চলমান সংগ্রাম। অর্থনীতির লেবাসে বলা হলেও, ট্রানজিট নামের করিডোর বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে দখলে রাখার জন্য করিডোর ভারতের জন্য অপরিহার্য। বছরের পর বছর প্রবল সামরিক নিপীড়নে পিষ্ট উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের জনগণ অতীষ্ট। সশস্ত্র বিদ্রোহী দলগুলার উপর রাজনৈতিক-সামরিক চাপ প্রয়োগ ও সমঝোতায় বাধ্য করার ক্ষেত্রে এই করিডোর তাদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত দলগুলোর প্রতি ভারতের নতুন মনোভাব এবং করণীয় করিডোরের বাস্তবায়নের সাথে জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোর বেসামরিক খাত থেকে অনেক বেশি ব্যবহৃত হবে সামরিক খাতে। অর্থাৎ, সেভেন সিস্টারস-এ সামরিক বাহিনীর জন্য রসদ ও ভারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে করিডোর ব্যবহার করা হবে। অপরদিকে, টেলিকরিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে টেলিকম ও ইন্টারনেটে নজরদারী করার জন্যে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে আইসিটি অ্যাক্ট হয়েছে, সন্ত্রাস বিরোধী আইন সংশোধিত হয়েছে। আর বাংলাদেশের সাথে বন্দী বিনিময় চুক্তি না থাকায় আসামের বিদ্রোহী সংগঠন উলফা’র নেতা অনুপ চেটিয়াকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যেতে পারছিল না ভারত সরকার। বন্দী বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে বন্দী হস্তান্তর নিয়ে আর কোন জটিলতা থাকছে না। অর্থাৎ, এ চুক্তির ফলে, কোন বিদ্রোহী সংগঠনের সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে বাংলাদেশ তাকে ভারতের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবে।
উপরোক্ত আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করতে পারলেও ভারত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতো নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। মূলতঃ ভারত সাম্রাজ্যবাদের অনুচর রাষ্ট্র, আর এমন চরিত্রের রাষ্ট্রকেই আমরা অভিহিত করছি -সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে।
ভারতের শাসক শ্রেণী
ভারত একটি সাম্রাজ্যবাদ পীড়িত অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, নয়া-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, যার আবার রয়েছে সম্প্রসারণবাদী চরিত্র।আর এই রাষ্ট্রের স্টেকহোল্ডার বা মালিক শ্রেণী হলো সাম্রাজ্যবাদের সাথে যুক্ত দালাল বুর্জোয়া শ্রেণী বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। অনেকে ওই দালাল পুঁজির মাঝে জাতীয় চরিত্র বা জাতীয় বুর্জোয়ার খোঁজকরে থাকতে পারেন, কিন্তু তার সঙ্গে আমি পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করি। আমার মতে, ওই দালাল মুত্সুদ্দি পুঁজির মাঝে জাতীয় চরিত্র খোঁজার মানে অরণ্যে রোদন ভিন্ন কিছু নয়, অথবা তা রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা। বৃটিশ সাম্রাজ্যাবাদ তাদের এই উপনিবেশে সামন্তীয় রাজা/জমিদারদের উৎখাত করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নামে এখানে এক নব্য-জমিদারী ব্যবস্থা কায়েম করে। যার মানেই হলো - এই নব্য-জমিদারদের কাছ থেকে একটা বড় অংশের খাজনা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঘরে বরাদ্দ রাখা। উল্লেখ্য যে, এখানে যে জাতীয় চরিত্রের বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে উঠতে পারতো, তারাই মূলত এই নব্য-জমিদারী ব্যবসায় নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে। যে কারণে এখানে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে উঠেনি। পরবর্তী ভারতীয় উপমহাদেশে এক ব্যবসায়ী/লগ্নিপুঁজির কারবারীর উত্থান ঘটে। কিন্তু সেই পুঁজিও সরাসরি জড়িত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে, যে কারণে এই শ্রেণীর দালাল বুর্জোয়াদের জাতীয় চরিত্রের বিকাশ ঘটা সম্ভব হয়নি, বা সুকৌশলে উপনিবেশবাদীরা জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটতে দেয়নি। বরং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বিনিয়োগের মাঝেই জাতীয়তাবাদের নামে প্রচারণা চালিয়ে নিজেদের দখলদারিত্ব কায়েম রেখেছে।পরবর্তীতে, এই দালাল বুর্জোয়াদেরই দুইটি রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে। তাদের একটি হল কংগ্রেস অপরটি মুসলিমলীগ। এরই ধারাবাহিকতায় যে রাষ্ট্র এখানে গড়ে উঠে তা আপাত দৃষ্টে স্বাধীন মনে হলেও, তা কখনোই প্রকৃতভাবে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেনি।
এই ব্যবস্থার মাঝে কালে কালে নানান কিসিমের সংস্কারবাদী কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করাটাই এখানকার শাসক শ্রেণীররাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এমনি এক সংস্কারবাদী, যিনি এই ঘুণে ধরা স্বৈরব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে পুনঃনবায়নকরার রাজনীতি করেন, তিনি হলেন একজন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, বা একজন আনা হাজারে; নরেন্দ্র মোদী বা রাহুল গান্ধীর সাথে যাদের মূলগতভাবে কোনো পার্থক্য অবর্তমান। আদতে তারা আরো বেশি ধ্বংসাত্মক, কারণ তারা শোষকের লেবাসে থাকে না, তারা মিঠা মিঠা কথা বলাতেও সিদ্ধহস্ত। মোদী যেখানে দেখাচ্ছে গুজরাটের অর্থনীতির রমরমা অবস্থা, রাহুলের সামনে রয়েছে তার দলের রাজনৈতিক ইতিহাস আর জিডিপির খোমা, তেমনি কেজরীয়ওয়ালেরসামনে রয়েছে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের ঝাঁটা। অথচ মোদী যেমন গোপন করে গুজরাটের অর্থনীতি ভাসছে গণহত্যার রক্তে,রাহুল যেমন এড়িয়ে যায় দুর্নীতি আর লুটপাটের জিডিপি, কৃষক হত্যার উন্নয়ন; ঠিক তেমনি অরবিন্দ কেজরিওয়াল তার কর্পোরেটের অর্থে কর্পোরেটের দালালি লুকিয়ে রাখে হরেক ঢঙের স্ট্যান্টবাজির মাধ্যমে। আন্না গং দুর্নীতির কথা বলে, কিন্তু কখনো কি তারা এই দুর্নীতির জন্ম কোথায়, সেদিকে খেয়াল করেছে? একটা রাষ্ট্র যখন ঔপনিবেধিক আইন-কানুন আর অর্থনীতির উপর ভর করে জন্ম নেয়, আর সেভাবেই বেড়ে উঠে; তখন তা নিশ্চিতভাবেই তার অগণতান্ত্রিক চেতনাকে উর্ধ্বে তুলে ধরবে। আরএমতাবস্থায় রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমেই কেবলগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন সম্ভব, অথচ তারা এর বদলে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার বা দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের নামে অনশনের স্ট্যান্টবাজি আর কর্পোরেটদের অর্থে “সুশিলতার” রাজনীতিকেই বেছে নেয়। উল্লেখ্য যে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল পরিচালিত এনজিও “কবীর”কে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ২০০৫ সালে ১,৭৫,০০০ ডলার এবং ২০০৮ সালে ১,৯৭,০০০ ডলার অনুদান হিসেবে দেওয়ার কথা জানিয়েছে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ভারত শাখার মুখপাত্র স্টিভেন সোলনিক। এমনই কর্পোরেটদের অর্থের পাহাড়ে গড়ে উঠে “দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন” আর পূর্বপরিকল্পনামাফিক নির্বাচনের আগ মুহূর্তে গড়ে উঠে “আম আদমি পার্টি”। (এই লেখার নিচে কিছু লিঙ্ক দেওয়া আছে, সেখান থেকে আম আদমি পার্টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন)
কর্পোরেট মিডিয়ার পাবলিসিটিতে তারা খুব সহজে শহুরে মধ্য শ্রেণী নিকটে পৌঁছে যান। ইরোম শর্মিলা চানু ১৩ বছর ধরে রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক আইনের বিরুদ্ধে অনশনরত থাকলেও তার কর্পোরেট মিডিয়ায় বরাদ্দ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের খবর, এটাই তো স্বাভাবিক! তো আর আন্না হাজারে নন, কিংবা বাবা রামদেবও নন, কিংবা এনজিওবাদী স্ট্যান্টবাজ মুখ্যমন্ত্রীও নন যে, তাকে মাথায় তুলে নাচতে হবে! অর্থাৎ, কর্পোরেট মিডিয়ার পণ্যে পরিণত না হলে তাকে কেনই বা সেই মিডিয়াতে প্রচার করবে! আর এখনকার মধ্য শ্রেণী শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত হন। তাই এই মিডিয়ার প্রভাবে প্রভাবিত জনগণের একটা বড় অংশ, যারা আবার বিকল্প খুঁজছেন, তারাই মূলতঃ এই আম আদমি পার্টি দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন।
সংস্কার আর পরিবর্তনের মাঝে কিন্তু মোটা দাগের পার্থক্য রয়েছে। সংস্কার মানে সেই ব্যবস্থাকেই নতুন রূপে পুনঃনবায়ন করা,আর পরিবর্তন মানে নতুন ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা। যদিও চেঞ্জ বা পরিবর্তনের কথা বলেই শাসক শ্রেণীর তোষক দলগুলো জনগণকে নির্বাচনের নামে ধোঁকা দিয়ে থাকে দিনের পর দিন, কিন্তু আদতে এই ব্যবস্থার পুনঃনবায়নই তাদের আরাধ্য কর্ম! আর এজন্য কিছু গৎবাঁধা বুলি দেওয়া হয় সার্বভৌমত্বের নামে, অখণ্ডতার নামে, ধর্মের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে। যেই ব্যবস্থা স্বয়ং নিপীড়ক, স্বৈরাচারী, গণবিরোধী; তার গায়ে হাজারো তেল মালিশ করলে, হাজার রঙে রাঙালেও তার কোন গুণগত পরিবর্তন সম্ভব হবে না। আর এ কারণেই কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তনের কথা বলার মানেই হলো - শাসক শ্রেণীর দালালীর অন্যনাম। সাধারণ জনগণের এর মাধ্যমে কোনো ফায়দা হবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নাই। আম আদমি পার্টি একটা বিষয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, শাসক শ্রেণীর নিপীড়নে ত্যক্ত-বিরক্ত জনগণ বিকল্প খুঁজছে, এটাই এর মূল উপজীব্য। আর এখানেই প্রাসঙ্গিক যে, জনগণের সামনে সমাজ পরিবর্তনের, জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি সামনে তুলে ধরার এখনি সময়, যা এই কথিত আম আদমিদের কাজ নয়।
সাম্রাজ্যবাদপীড়িত নয়া-ঔপনিবেশিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান ব্যতিত গণতান্ত্রিক বা জাতীয়তাবাদী অবস্থানও অসম্ভব। আর এ কারণেই কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীদের অনুদানপ্রাপ্ত এনজিওবাদীদের পক্ষে গণতান্ত্রিক বা জাতীয়তাবাদী থাকাটাও সম্ভব নয়। তবে সাম্রাজ্যবাদ প্রদর্শিত শুয়োরের খামার সর্বস্ব গণতন্ত্রের লেবাসে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের সেবাদাস বানানোটাই যদি হয়ে থাকে গণতন্ত্রের মানে, তবে তো ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ “গণতান্ত্রিক” রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে! আর ওই এনজিওবাদীরাও বিশাল বড় “বিপ্লবী”!
অপরদিকে, শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্রও সবার জন্য সমান হয় না। যেমন, ভারত রাষ্ট্রের বর্তমান ব্যবস্থায় দালাল বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বে শাসক শ্রেণীর অন্যান্য অংশ এই রাষ্ট্রের মালিকানা ভোগ করে, বা ব্যাপক নিপীড়িত জনগণকে শোষণ করে থাকে। এর বিপরীতে আমাদের কাছে জনগণের মানে হলো - ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, শাসক শ্রেণী ও তার সহযোগীদের বাইরে যাদের অবস্থান। আর গণতন্ত্রের মানেই হলো - শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণের একনায়কত্ব। সেই গণতন্ত্রের ক্ষমতা চর্চায় দালালদের কোন স্থান নেই। এটাই নয়া-গণতন্ত্র।
ওই দালাল বুর্জোয়া বা তাদের প্রতিনিধিদের দ্বারা ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের জীবন-জীবিকার যে কোন উন্নয়ন সম্ভব নয়, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। তার পরেও যারা ওই দালাল বুর্জোয়া শ্রেণীর মাঝেই মন্দের ভালো খুঁজতে যান, আর সেই মন্দের ভালোতে নিজের মুক্তি খুঁজে বেড়ান, তারা সর্বোতভাবেই বিভ্রান্ত। তারা গড্ডালিকা প্রবাহে চলে ধাক্কা খেয়েই শিখবে বলে আশা রাখি। তবে ফেসবুকের কোন কোন রাজনৈতিকভাবে সচেতন বন্ধু তাদের স্ট্যাটাসে কি করে এনজিওবাদী দালালদের সাথে কোন বিপ্লবীকে তুলনা করতে পারে, তা আদতেই মেলাতে পারলাম না। একজন দালালের সাথে একজন বিপ্লবীকে তুলনা করাটা হয় স্ট্যাটাসদাতার নির্বুদ্ধিতা, অথবা তার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচায়ক। আশা করি, তারা অচিরেই নিজেদের বোধ-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সঠিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পালনে ব্রতী হবেন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে অবদান রাখবেন।।
আরো কিছু সহায়ক লিঙ্ক
No comments:
Post a Comment