একুশের চেতনা :: ভাষা ও জাতিসত্তার আন্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রসঙ্গে
তারিখ: ২১ ফেব্রু ২০১৪
http://www.mongoldhoni.net/spirit-of-21-right-of-language-and-nationalities-to-self-determination/
লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত
মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। সামাজিক,রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক অবস্থান ও কাল ভেদে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভাষার গঠন, প্রকৃতি, ছন্দের পার্থক্য ও সাদৃশ্য উভয়ই বিদ্যমান। ভাষা যেমনটা আমরা আজ প্রত্যক্ষ করছি, তা হাজার বছর ধরে এমনটিই ছিল না। আবার বহু বছর পর তা এমনটা নাও থাকতে পারে। তা পরিবর্তনশীল। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে তার স্বরূপ পরিবর্তিত হয়। ভাষা সাহিত্য-সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ, তাই ভাষার পরিবর্তনের সাথে সাথে সাথে পরিবর্তন আসে সাহিত্য-সংস্কৃতি,জীবন আচারেও। আবার সংস্কৃতি বা জীবনাচারের পরিবর্তনেও ভাষার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, যেখানেই মানুষ আছে, সেখানেই ভাষা আছে; আদিম ভাষা বলে কিছু নেই, সব মনুষ্য ভাষাই সমান জটিল এবং মহাবিশ্বের যেকোন ধারণা প্রকাশে সমভাবে সক্ষম; যেকোন ভাষার শব্দভাণ্ডারকে নতুন ধারণা প্রকাশের সুবিধার্থে যৌক্তিক উপায়ে নতুন শব্দ গ্রহণ করিয়ে সমৃদ্ধ করা সম্ভব; সব ভাষাই সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয; মানুষের ভাষায় ভাষায় যে পার্থক্য,তার কোন জৈবিক কারণ নেই; যেকোন সুস্থ স্বাভাবিক মানব সন্তান পৃথিবীর যেকোন ভৌগলিক, সামাজিক, জাতিগত বা অর্থনৈতিক পরিবেশে যেকোন ভাষা শিখতে সক্ষম।
ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তার সৃষ্টিশীলতা। ভাষাকে আমরা বলতে পারি সাহিত্য-সংস্কৃতির একক। কারন ভাষা ব্যতিত সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক বিকাশের কথা কল্পনাও করা সম্ভব নয়। আর তাই সংস্কৃতির বিকাশের জন্য প্রয়োজন মাতৃভাষা চর্চার বিকাশ ঘটানো। শিশুদের মধ্যে সে ভাষার প্রভাবটাই লক্ষ্যণীয় যে ভাষায় তার আশেপাশের মানুষজন কথা বলে। আর তারা সেই ভাষাই শেখে সর্বপ্রথমে।
২
যদিও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তৃতভাবেই লেখা দরকার, কিন্তু মোটা দাগে কিছু কথা বলাটাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নামে এখানে যা চলছে, তা সর্বোতই কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিরূপ। সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস পড়ানো হয়, মার্কিন মুল্লুকের ইতিহাস পড়ানো হয়, কখনো বা অস্ট্রেলিয়া আর ইরানের ইতিহাস পড়ানো হয়, কিন্তু সেখানে বাচ্চাদের এ ভূখণ্ডের ইতিহাস পড়ানো হয় খুব সামান্যই। এমনকি মাতৃভাষার চর্চার সুযোগটা কেবলই দিবসকেন্দ্রিক, যেমন - কোন কর্পোরেট কোম্পানির সৌজন্যে পালিত একুশে ফেব্রুয়ারি, যদিও এই দিবসের ইতিহাস। তার তাৎপর্য তাদের শতকরা ৯৯ ভাগেরই অজানা। তাদের পাঠক্রমে মাতৃভাষার শিক্ষা চরমভাবে বর্জনীয়। আর ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তির বিকাশ যে পূর্ণতা পায় না, তা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত।
এবার প্রশ্ন হলো, এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় পাঠক্রমটা কেমন?
এখানে চলমান রয়েছে শিক্ষার একাধিক মাধ্যম। বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমের পাঠক্রম একই, কেবল ভাষার পার্থক্য। এছাড়াও রয়েছে কারিগরি শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। এই মাধ্যমগুলোর কোন পাঠক্রমই জাতীয় চিন্তার জায়গা থেকে তৈরী করা হয়নি কখনোই। তাতে সর্বদাই প্রাধান্য পেয়েছে ভোট ব্যাংকের স্বার্থ আর কর্পোরেট-সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ। যে কারনে এখানে যেমন বাড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা, তেমনি বাড়ছে হতাশা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা, ভোগবাদীতা। কারণ এই শিক্ষা কেবলই পরীক্ষা নির্ভর, এখানে মানবিক সম্পর্ক তৈরী করা শেখায় না, এই শিক্ষা মুক্তির দিশা দেখায় না। একে কোনোভাবেই মানুষ বানানোর মেশিন বলা যায় না, বড়জোর বলা যায় টাকা কামানোর মেশিন, আর সেটাও অবশ্যই সবার জন্য নয়।
প্রচলিত শিক্ষার এই মাধ্যমসমূহে বাচ্চাদের মনন জগতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চেতনাকেই বিকশিত করা হয়, যেন তাদের মননজগৎ সামষ্টিক চিন্তায় ভাবিত না হয়ে কেবল আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় ব্যাপ্ত থাকে। অর্থাৎ বাল্যকাল থেকেই তাদের শিক্ষা দেওয়া হয় -কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের, নয়াউপনিবেশবাদের অধীনস্ততা মেনে সে অনুযায়ী নিজের আখের গোছানোর জন্য তৈরী হতে। বাল্যকাল থেকেই শুরু হয় এই চিন্তার দাসত্ব।
উল্লেখ্য যে, কওমি মাদ্রাসা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রাণাধীন নয়। সেখানে মূলতঃ অসহায় সুবিধাবঞ্চিতদেরই স্থান হয়, যারা এই রাষ্ট্রের নিকট অনেকাংশেই অবাঞ্ছিত। তাদের অর্থের যোগান আসে মূলতঃ জনগণের দান করা অর্থের মাধ্যমে। কিন্তু এই মানব সন্তানদের যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তা কোনোভাবেই তাদের ধর্মের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সঃ) যেখানে বলেছেন, জ্ঞান আহরণের জন্য সুদূর চীন দেশ পর্যন্ত যেতে, সেখানে তাদের শিক্ষকেরা তাদের যে শিক্ষা দান করেছেন, তা তাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানকেও অস্বীকার করতে শেখায়। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় তারা কেবল কিছু সংখ্যাক কিতাব মুখস্থ করাটাকেই শিক্ষা বলে প্রচার করছেন। কিন্তু মুখস্থ করা আর জ্ঞান আহরণ করা যে এক জিনিস নয়, সে পার্থক্য করার ক্ষমতাটুকুও ঐ শিক্ষার্থীদের যেন অর্জিত না হয়, সেদিকে ঐ মাদ্রাসা শিক্ষকেরা সদা সচেষ্ট। কারণ তা না হলে তো আর ঐ শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সাথে দাস সুলভ ব্যবহার করতে পারবেন না, আবার নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়েও এদের ব্যবহার করতে পারবেন না।
৩
এ যুগে মিডিয়া বুর্জোয়া প্রপাগান্ডার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে এখন যোগাযোগ মাধ্যম বা মিডিয়া আগের চেয়ে অনেক সহজলভ্য। আর এর ফায়দাটা শাসকশ্রেণী ও কর্পোরেটদেরই, যারা এই মিডিয়াগুলো নিয়ন্ত্রকশক্তি। আর এর সাহায্যে তারা যেমন তাদের পণ্যের বাজার তৈরী করছে, ক্ষমতায় টিকে থাকাকে পোক্ত করছে, তেমনি তা ব্যক্তির সমাজ ভাবনা,সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে, ভাষার ক্ষেত্রেও তার গভীর প্রভাব বিদ্যমান।
হিন্দী স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের প্রভাবে এখনকার নগরাঞ্চল, শহরাঞ্চল, এমনকি গ্রামাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে, কখনোবা বয়োজ্যেষ্ঠদের মাঝেও হিন্দী ভাষার উৎকট ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বাচ্চাদের আকৃষ্ট করে ডরিমন-এর মতো কার্টুনের হিন্দী ডাবিং। আর বড়দের জন্য রয়েছে ডেইলি সোপ। এমন অবস্থায় বাচ্চারা বাংলার আগে হিন্দী ভাষাটাই রপ্ত করবে খুব স্বাভাবিক কারণেই। আবার কোন কোন উচ্চ শ্রেণীর (upper class) পরিবারে কেবল ইংরেজীতেই কথা বলতেই দেখা যায়, যাকে তারা নিজেদের “স্ট্যাটাস” রক্ষা করার মাধ্যম বলে মনে করেন। সে সব পরিবারের বাচ্চারা জাতিগতভাবে, বাঙালি হলেও বাংলায় কথা বলাটাও তাদের জন্য বেজায় কষ্টকর!
শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্যই প্রয়োজন সুস্থ সাংস্কৃতিক-সামাজিক পরিবেশ আর সেই সাথে মাতৃভাষায় পাঠদানের চর্চা। ‘ভাষা আন্দোলন’এর মতো আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবীতে এমন একটি আন্দোলন এই ভূখণ্ডে হওয়া সত্ত্বেও এখানে সবার জন্য শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্বকে শাসকগোষ্ঠি এড়িয়ে গিয়েছে। কারণ চারিত্রিকভাবে তারাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং পাকিস্তানী স্বৈরাচারেরই ঔরসজাত। উর্দুভাষী জনগোষ্ঠি এবং অন্যান্য জাতিসত্তাসমূহের শিশুদের এখানে শিক্ষার প্রথম পাঠ নিতে হচ্ছে বাংলায়, যা তাদের মাতৃভাষা নয়। আর অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন এই বিষয়ে কথা বলারও কেউ আর এই রাষ্ট্রে অবশিষ্ট নাই!পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী জনগণের শত্রু, এ ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধী হওয়ার কারণে যে কাজ তারা করেনি; সেই কাজ যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রেও হচ্ছে না এ বিষয়টি লঘুভাবে দেখার অবকাশ নেই। কারণ মাতৃভাষার ব্যবহার নিজের মাতৃভূমি, নিজের সংস্কৃতির প্রতি টান বাড়ায় এবং জনগণের দাবী আদায় ও মুক্তি-সংগ্রামে একাত্ম হতে শেখায়।
৪
৫২-এর ভাষা আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রভাষার দাবীতে আন্দোলন ছিল না। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। এর ফলে এখানকার মুসলমানদের চিন্তা জগতে ব্যাপকভাবে নাড়া পড়ে। যারা এক সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিল, তারাই এবার শোষক পাকিস্তানী শাসকের বিরুদ্ধে সরব হতে থাকে। তাদের জাতিসত্তার পরিচয় গড়ে ওঠতে থাকে। হিন্দুদের ক্ষেত্রে এই উপলব্ধি আগেই ঘটেছিল, ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে টিকে থাকার মধ্য দিয়ে। এ আন্দোলন পরিণত হয় বাঙালির জাতীয় আন্দোলনে, আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলনে।
‘একুশ’ নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই, অথচ আমরা অনেকেই জানি না, বা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই ‘ভাষা আন্দোলন’এর অন্তর্নিহিত ভিত্তিকে। যার মূলে ছিল সকল ভাষা ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। বাংলার সাথে উর্দু সহ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য ভাষাগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাষা আন্দোলনের ঘোষণা ও প্রচারের মধ্যেই ছিল। অথচ এখন ‘ভাষা আন্দোলন’কে স্মরণ করা হয় বাংলা ভাষাকে অন্য ভাষার উপরে স্থান দেওয়ার নিমিত্তে; এক প্রতিক্রিয়াশীল,সাম্প্রদায়িক, ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে এই উগ্র জাতীয়তাবাদ ধারণ করে সুবিধাভোগী দালাল বুর্জোয়া শ্রেণী আর তা নিয়ন্ত্রণ করে এই শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী শাসকেরা। এই শাসকশ্রেণী নিজের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে নানান রাজনৈতিক মেরুকরণ করে, তারা কখনো ভাষাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, কখনো দেখায় উগ্র জাতীয়তাবাদের আস্ফালন, আবার কখনো রাজনীতির সঙ্গী করে ধর্মকে। এই চক্র উগ্র জাতীয়তাবাদের শুরুর দিক থেকেই ইতিহাস বিকৃত করে আসছে, যার মূলে রয়েছে ভবিষ্যত প্রজন্মকে দিকভ্রান্ত করার দূরভিসন্ধি; আর এ ক্ষেত্রে তারা অনেকাংশেই সফল।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্রগত বিশ্লেষণের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, সর্বোতভাবে এটি একটি নয়াঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। যেখানে জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, সংবিধান, সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় অখণ্ডতার মতো শব্দসমূহ কেবল ব্যবহৃত হয় গণনিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে, মার্কিনের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেটদের স্বার্থে। যে কারণে আমরা দেখতে পাই, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বরে কর্পোরেটদের সৌজন্যে হরেক রঙের বাহারি অনুষ্ঠান আর তাদের দরদ উথলে ওঠা “দেশপ্রেম”। কর্পোরেটদের এ সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে তাদের পণ্যায়ন আর কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার। মোটা দাগে এখানকার শ্রেণীসমূহকে দুইভাবে ভাগ করা সম্ভব। একদিকে গণনিপীড়ক শ্রেণী হলো, এখানকার দালাল বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী, যারা আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজির ধারক, সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় সহযোগী এবং তাদের দোসরেরা। যারা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ছলে, বলে,কৌশলে কাজ করে যাচ্ছে। অপরদিকে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের অন্তর্গত শ্রেণীসমূহ, শ্রমিক, কৃষক, বিভিন্ন পেশাজীবি, মধ্যশ্রেণী ইত্যাদি। যারা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
৫
শাসকশ্রেণীর ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় অংশ, রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং প্রশাসনের উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মের ব্যবহারে এক অভূতপূর্ব ঐক্য আমরা প্রত্যক্ষ করি পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য জাতিসত্তার ওপর নিপীড়ন, উচ্ছেদ ও দখলীকরণের ক্ষেত্রে। তারা কখনো উসকানি দেয় ধর্মের নামে, কখনো না বাঙালিত্বের নামে! এমন গণনিপীড়নের ক্ষেত্রে এদের মাঝে কোনো বিরোধ নাই। এ ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। কারণ তারা সকলেই এই নিপীড়ন ব্যবস্থার অংশীদার। জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তো দূরের কথা এই রাষ্ট্রব্যবস্থা সুকৌশলে করে চলেছে “এথনিক ক্লিনজিং” বা জাতিসত্তাগত নির্মূলীকরণ। নারী নির্যাতন, খুন, গুম,অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ; এমন কোন উপকরণ নাই যা ব্যবহৃত হচ্ছে না। আর এসবই হচ্ছে সুকৌশলে গণতন্ত্রের লেবাসে! যেখানে নিপীড়িতের বিরুদ্ধে সকল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জায়েজ, সে বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, যে জাতিসত্তারই হোক না কেন।
আর এমন সময়ে ২১শে ফেব্রুয়ারির চেতনা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ সকল ভাষার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সাথে যুক্ত জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামে বিজয় যে খুব সহজে আসবে না, তা বলাই বাহুল্য। এজন্য দরকার নিপীড়িত শ্রেণী ও জাতিসত্তাসমূহের ঐক্যবদ্ধ তীব্র লড়াই-সংগ্রাম। যার অনুপস্থিতিই এই শোষনকে তীব্রতর করছে।।
No comments:
Post a Comment