Tuesday, May 13, 2014

কেমন আছেন একাত্তরের রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধা তারামন বিবি

কেমন আছেন একাত্তরের রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধা তারামন বিবি
http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2014-05-14&ni=172722
আবু জাফর সাবু, গাইবান্ধা ॥ এখন কেমন আছেন একাত্তরের কিংবদন্তিতূল্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক তারামন বিবি। এটা জানতেই আমরা গাইবান্ধা থেকে কয়েক সাংবাদিক গিয়েছিলাম ব্রহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে বালাসীঘাট হয়ে কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে। রাজিবপুর উপজেলা সদরের কাচারী পাড়ায় নিজ বাড়িতে থাকেন তারামন বিবি। টিনশেড বাড়ি। দেয়ালে হলুদ রং করা। ঘরটি পূর্ব পশ্চিম বরাবর লম্বা আর মাঝখানে ভেতরে ঢোকার একটি গেট। রাস্তার পাশের গেট দিয়ে ঢুকেই ভেতর বাড়িতে ঢোকার মুখেই দেয়ালে দেখা যায় তারামন বিবির রাইফেলসহ একটি বড় আকার ছবি আঁকা। ছবির নিচে লেখা ‘তারামন বিবি বীর প্রতীক।’ জন্ম স্থান শংকর মাধবপুর গ্রাম। আমরা ঘরে ঢুকেই দেখলাম তারামন বিবি বিছানায় বসে আছেন। বেশ অসুস্থ। কারণ নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত তিনি এখন।
উল্লেখ্য, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গণউন্নয়ন কেন্দ্র তারামন বিবির নামে একটি আনন্দলোক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে গাইবান্ধা সদর উপজেলার মালিবাড়ী গ্রামে। তারামন বিবি নিজে ২০০৮ সালের মার্চ মাসে বিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তখন আমরা গাইবান্ধায় তাঁকে দেখেছিলাম। সে সময় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত উজ্জ্বল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেই তারামন বিবি এখন জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো বুবু এখন আপনি কেমন আছেন? তার উত্তরে কণ্ঠে হতাশার উচ্চারণে তাঁর আঞ্চলিক ভাষায় বললেন,- ‘ভাইরে এখন আর ভাল নেই। দীর্ঘদিন টিবি রোগে ভুগে একটা ফুসফুস একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে বইলা ডাক্তাররা কইছে। সেই জন্য শ্বাসকষ্ট প্রতিদিন অক্সিজেন নিতে হয়। তার ওপর কোমরের হাড় ক্ষয় হওয়ায় ঠিকমতো হাঁটতে পারি না, ব্যথা বেদনায় বইসা শুইয়াও থাকতে পারি না ঠিকমতো।’
তিনি জানালেন, চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা এখন তার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন, হাসপাতালের বেডের মতো একটি রিভলভিং বেড তাঁর এখন বিশেষ প্রয়োজন। কারণ নিয়মিত অক্সিজেন দেয়া এবং তার শুয়ে বসে থাকার সুবিধার্থে এ ধরনের বেড প্রয়োজন। কিন্তু অর্থাভাবে তিনি তা সংগ্রহ করতে পারছেন না।
তারামন বিবির সঙ্গে ছিল তার একমাত্র ছেলে আবু তাহের, ছেলে বউ ও স্বামী। তার মেয়ে মাজেদা খাতুনের বিয়ে হয়েছে পার্শ্ববর্তী গ্রামে। ছেলে রাজিবপুর হাসপাতালে ওয়ার্ড বয়ের চাকরি করে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রদত্ত ৬ হাজার টাকা সরকারী মাসিক ভাতা এবং ২শ’ টাকায় পুলিশ বিভাগ প্রদত্ত রেশনের চাল, ডাল, তেল, চিনির ওপর নির্ভর করেই চলে এখন তার দিনকাল। রেশন আনতে হয় কুড়িগ্রাম থেকে, এটাই তার বড় সমস্যা। তার একমাত্র ছেলে যা আয় করেন তা দিয়ে তার নিজের প্রয়োজনই মেটে না। তাঁর পক্ষে মাকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া সম্ভব হয় না।
তারামন বিবির ঘরের শো’কেসে দেখলাম সাজানো তার নানা পদক ও সনদপত্র। আমাদের অনুরোধে তিনি ঘরের বাইরে এসে ছবি তুলতে রাজি হলেন। দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পিছিয়ে পড়া এলাকা রাজিবপুরের স্বল্প শিক্ষিত একজন অতি সাধারণ এই নারী কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসী ভূমিকা পালন করেছে তা ভাবতেই অবাক লাগে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুইজন মাত্র নারী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন। এই তারামন বিবি তাদের একজন। এ থেকে প্রমাণিত আন্তরিক ও নিবেদিত দেশ প্রেমই এই সংগ্রামী ভূমিকায় তাকে উদ্দীপনা যুগিয়েছে।
প্রসঙ্গত তারামন বিবি প্রসঙ্গে কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করছি। তাঁর জন্ম ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে। বাবা আবদুস সোবাহান, মা কুলসুম বেওয়া। তাঁর এক ছেলে আবু তাহের এক ও মেয়ে মাজেদা বেগম। অতিসাধারণ কৃষক পরিবারের স্বল্প শিক্ষিত এই নারী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দেশ-বিদেশে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য দুইজন নারী মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত হন। অপরজন হলেন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম। তারামন বিবি ১১নং সেক্টরে নিজ গ্রাম কুড়িগ্রাম জেলার শংকর মাধবপুরে পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস করতেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। এ সময় মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। তিনি তারামনকে তাদের ক্যাম্পে রান্নাবান্নার প্রস্তাব দেন। প্রথমে তারামনের মা কুলসুম বেওয়া এতে রাজি হননি। পরে মুহিব হাবিলদার তারামনকে ধর্ম মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপরই তারামনকে দশঘরিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে রান্নার কাজে পাঠাতে রাজি হন তাঁর মা। কিন্তু পরবর্তীতে তারামনের সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার তাঁকে অস্ত্র চালনা শেখান।
তারামন বিবি তাঁর স্মৃতিচারণায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেন। আর তা হলো একদিন দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় তারামন ও তার সহযোদ্ধারা জানতে পারলেন পাকবাহিনীর একটি গানবোট তাদের দিকে আসছে। তারামন তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন এবং তারা শত্রুদের পরাস্ত করতে সক্ষম হন। এরপর তারামন অনেক যুদ্ধে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অংশ নেন। শুধু সম্মুখ যুদ্ধই নয়, নানা কৌশলে শত্রুপক্ষের তৎপরতা এবং অবস্থান জানতে গুপ্তচর সেজে সোজা চলে গেছেন পাকবাহিনীর শিবিরে। কখনও প্রতিবন্ধী কিংবা পঙ্গুর মতো করে চলাফেরা করে শত্রু সেনাদের খোঁজ নিয়ে এসেছেন নদী সাঁতরে গিয়ে। আবার কলা গাছের ভেলা নিয়ে কখনও পাড়ি দিয়েছেন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। আর জানমানের কথা না ভেবেই এসব দুঃসাহসী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একমাত্র দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য।
তারামন বিবির প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৭৩ সালে তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করা। কিন্তু এরপর ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের একজন গবেষক প্রথম তাঁকে খুঁজে বের করেন এবং নারী সংগঠনগুলো তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তারামন বিবি বীরত্বের পুরস্কার পান।

No comments:

Post a Comment