Wednesday, May 7, 2014

শিলাইদহ ও পতিসরে রবীন্দ্রমেলা জমে উঠবে ভক্তদের আড্ডা কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীতে তিন দিনের অনুষ্ঠান

শিলাইদহ ও পতিসরে রবীন্দ্রমেলা জমে উঠবে ভক্তদের আড্ডা
কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীতে তিন দিনের অনুষ্ঠান
-------------
জনকণ্ঠ ফিচার
-------------
বাঙালীর এক অবিস্মরণীয় দিন পঁচিশে বৈশাখ। আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মজয়ন্তী। দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে দেশব্যাপী গ্রহণ করা হয়েছে পৃথক ব্যাপক কর্মসূচী। সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ-আয়োজনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ পালন করা হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা ও রবীন্দ্রমেলা। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, নওগাঁর পতিসর, খুলনার দক্ষিণডিহি এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রশাসনের উদ্যোগে পৃথক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক লেখিয়েদের মিলন ঘটবে, জমবে কবিভক্তদের মিলনমেলা।
শিলাইদহ
এমএ রকিব, কুষ্টিয়া থেকে জানান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক সময় কুষ্টিয়ার যে গ্রামে বসবাস করেছিলেন সেই গ্রামটির নাম ‘শিলাইদহ।’ কুমারখালী উপজেলার পদ্মা নদী তীরবর্তী ছোট্ট এ গ্রামখানি কবির ভাল লাগত। তাঁর হৃদয়ে কাব্যভাবের স্পন্দন জাগাত। তিনি যে লেখার জন্য নোবেল পুরস্কারে বিশ্বখ্যাত হয়েছিলেন; সেই গীতাঞ্জলীর কাব্যরসই ছিল এ শিলাইদহ। এ গ্রামেই কালের সাক্ষী হয়ে আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিমাখা ঐতিহাসিক ‘কুঠিবাড়ি।’ বিশ্বকবির এ স্মৃতিকে ঘিরে প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ এলেই জমে ওঠে উৎসব, বসে বিরাট গ্রামীণ মেলা। নামে দর্শনার্থীদের ঢল। আগমন ঘটে দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য কবি, সাহিত্যিক ও গুণীজনসহ হাজার হাজার পর্যটকের। এবার কবিগুরুর ১৫৩তম জন্মবার্ষিকীর আয়োজনেও কমতি নেই এখানে। পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে কবির স্মৃতিধন্য কুঠিবাড়িকে। এ উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিলাইদহে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠান। ২৫, ২৬ ও ২৭ বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীর এসব আয়োজনে রয়েছে আলোচনা, সেমিনার, আবৃত্তি, নাটক ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শিলাইদহে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম দিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি। জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখবেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আবদুল হাকিম ও কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী। শিলাইদহে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ঘোষণা চার বছরেও বাস্তবায়িত না হওয়ায় জেলাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহে শান্তি নিকেতনের আদলে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সেই ইচ্ছা ও স্বপ্নের কথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হলে তিনি বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ১৪১৭ সালের ২৫ বৈশাখ (২০১০ সালের ৮ মে) ঢাকায় আয়োজিত কবির ১৪৯তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শিলাইদহে শান্তি নিকেতনের আদলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণায় তিনি বলেন, এর মূল ক্যাম্পাস হবে শিলাইদহে, আর একটি একাডেমিক ভবন থাকবে শাহাজাদপুরে। কিন্তু ঘোষণার চার বছর অতিবাহিত হলেও শিলাইদহে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যকর কোন পদক্ষেপ আজও গ্রহণ করা হয়নি।
জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারিত্বের ভারপ্রাপ্ত হয়ে শিলাইদহে আসেন ১৮৯২ সালে। কবির জীবনে শিলাইদহের অবস্থান ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। এ সময় পদ্মার বুকে পাল তোলা নৌকা, বকুল তলার শান বাঁধানো ঘাট, একটু দূরে গড়াই নদীর সৌন্দর্য ছাড়াও গ্রাম বাংলার সবুজের সমারোহ ভরা শিলাইদহ তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। কবির যখন ভরা যৌবন এবং কাব্য সৃষ্টির প্রকৃষ্ট সময়, তখনই তিনি বিচরণ করেছেন এই শিলাইদহকে ঘিরে। জমিদারির কাজে, ব্যবসার কাজে এ সময় তিনি কখনও স্বল্প সময় কখনও দীর্ঘসময় অবস্থান করেছেন শিলাইদহে। কখনও একাকী, কখনও স্ত্রী, পুত্র-কন্যা নিয়ে এসেছেন শিলাইদহে, পেতেছেন ক্ষণিকের সংসার; ঘুরে বেড়িয়েছেন বোটে ও পালকিতে। কবিগুরু শিলাইদহে ছিলেন ১৯২২ সাল পর্যন্ত। এই সুদীর্ঘ ৩০ বছর এখানে অবস্থানকালে তিনি সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

দক্ষিণডিহি
অমল সাহা খুলনা থেকে জানান, কবি গুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে খুলনার দক্ষিণডিহিতে ২৫ থেকে ২৭ বৈশাখ তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। খুলনা জেলা প্রশাসন ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে আলোচনাসভা, লোকমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। এতে সভাপতিত্ব করবেন খুলনা জেলা প্রশাসক আনিস মাহমুদ। আলোচক থাকবেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। এ ছাড়া একই স্থানে তিন দিনব্যাপী লোকমেলা ও প্রতিদিন আলোচনাসভার পর সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে।
কবি গুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা খুলনার পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর উমেশ চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের গানের প্রশিক্ষণ ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

পতিসর
বিশ্বজিৎ মনি নওগাঁ থেকে জানান, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে প্রতিবছরই তাঁর স্মৃতি জড়িত পতিসর কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে নামে রবীন্দ্র ভক্তের ঢল। পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। এ মিলনমেলা চলে সপ্তাহ জুড়ে। দূর-দুরান্ত থেকে কবিভক্তরা ছুটে আসেন তাদের প্রিয় কবির পতিসর কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গণে। একে অপরের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতি চারণে লিপ্ত হন কবিভক্তরা। কবিগুরুর ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে পতিসরকে সাজানো হয়েছে অপরূপ সাজে। কাছারি বাড়িতেই কবিগুরুর ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। পতিসরে নাগর নদের পাড়কে মনোমুগ্ধকর করে তোলা হয়েছে। দীর্ঘদিনেও পতিসরের তেমন উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়ন না হলেও এবার যেন উন্নয়নের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।
কবিগুরুর জমিদারি এলাকা কালিগ্রাম পরগনার সদর দফতর ছিল পতিসর। আর এই পতিসর নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার একটি গ্রাম। এবার পতিসরে ১ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে, আলোচনাসভা, স্মৃতিচারণ, নাটক, আবৃত্তি, নাচ ও গানসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন নওগাঁ, আত্রাই, রাণীনগর, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহীর প্রথিতযশা শিল্পীরা। দেশী ও বিদেশী পর্যটক ও রবীন্দ্র গবেষকদের নিরাপদে রাত্রিযাপন ও গবেষণার স্বার্থে পতিসরে ৫ কক্ষবিশিষ্ট অত্যাধুনিক ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি নীড়’ নামে দ্বিতলভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে ২৭ জুলাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাজার হাজার প্রজাকে কাঁদিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পতিসর তথা বাংলাদেশ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি প্রজাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘সংসার থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বে তোমাদের দেখার ইচ্ছা ছিল তা আজ পূর্ণ হলো। তোমরা এগিয়ে চল-জনসাধারণের জন্যে সবার আগে চাই শিক্ষা-এ্যাডুকেশন ফাস্ট, সবাইকে শিক্ষা দিয়ে বাঁচাও। ইচ্ছা ছিল মানসম্মান-সম্ভ্রম সব ছেড়ে দিয়ে তোমাদের সঙ্গে তোমাদের মতোই সহজ হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেব। কী করে বাঁচতে হবে তোমাদের সঙ্গে মিলে সেই সাধনা করব, কিন্তু আমার আর এ বয়সে তা হওয়ার নয়, এ নিয়ে দুঃখ করে কী করব? আমার সময় ফুড়িয়ে এসেছে, তোমরা নিজ পায়ে দাঁড়াতে শেখ। আমি তোমাদের বড় ভালবাসি, তোমাদের দেখলে আমার আনন্দ হয়, তোমাদের কাছে আমি অনেক কিছু পেয়েছি; কিন্তু কিছুই দিতে পারিনি-আশীর্বাদ করি তোমরা সুখী হও। তোমাদের সবার উন্নতি হোক-এ কামনা নিয়ে পরলোকে চলে যাব।’ আবার একই দিনে কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউটের শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘রথীন্দ্র নাথের নাম চিহ্নিত কালিগ্রামের এই বিদ্যালয়ের আমি উন্নতি কামনা করি। এখানে ছাত্র এবং শিক্ষকদের সম্পর্ক যেন অকৃত্রিম স্নেহের এবং ধৈর্যের দ্বারা সত্য ও মধুর হয় এই আমাদের উপদেশ। শিক্ষাদান উপলক্ষে ছাত্রদিগকে শাসনপীড়নে অপমানিত করা অক্ষম ও কাপুরুষের কর্ম- এ কথা সর্বদা মনে রাখা উচিত। এরূপ শিক্ষাদান প্রণালী শিক্ষকদের পক্ষে আত্মসম্মান হানিজনক। সাধারণত আমাদের দেশে অল্প বয়স্ক বালকগণ প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষকদের নির্মম শাসনের উপলক্ষ হইয়া থাকে- এ কথা আমার জানা আছে। সেই কারণেই সতর্ক করিয়া দিলাম।’ শেষ বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কবির ৭৬ বছর বয়সের একটি উন্মুক্ত ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে পতিসরে। ভাস্কর্যটি জার্মানের কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসায় পদার্থবিদ রবীন্দ্রগবেষক প্রফেসর ড. গোলাম জাকারিয়ার আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত।

শাহজাদপুর
বাবু ইসলাম সিরাজগঞ্জ থেকে জানান, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারি বাড়িতে বিশ্বকবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ৩ দিনব্যাপী কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গণে ৩ দিনের রবীন্দ্র মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রথমদিন ২৫ বৈশাখ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী প্রধান অতিথি থাকবেন। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার প্রধান অতিথি থাকবেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এমপি। সমাপনী দিন শনিবার একই স্থানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রধান অতিথি থাকবেন। তিন দিনের অনুষ্ঠানে সঙ্গীতানুষ্ঠান, আবৃত্তি, রবিঠাকুর রচিত নাটকসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment