Sunday, May 11, 2014

শান্তি বজায় রাখার আবেদন সংঘর্ষে বিরক্ত বিদ্বজ্জনেদের

biddo
এই সময়: পঞ্চম ও শেষ দফার নির্বাচনের আগে রাজ্যে হিংসা ও সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বিগ্ন বিদ্বজ্জনেরা৷ প্রথম দু'দফার নির্বাচন নিয়ে বিশেষ কোনও অভিযোগ না উঠলেও, তৃতীয় দফার নির্বাচন থেকেই সংঘর্ষ ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ আর তা চরমে উঠেছে রাজ্যে শেষ দফার নির্বাচনের প্রাক্কালে৷

কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সংঘর্ষের এই সব ঘটনা ভোটদানের হারে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলের৷ রাজ্যের বিশিষ্টজনেরাও এই সংঘর্ষ, সন্ত্রাসের ঘটনার নিন্দা করেছেন৷ তবে ভয়-ভীতি উপেক্ষা করেই সাধারণ মানুষকে ভোটদানের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা৷ কবি শঙ্খ ঘোষ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, 'নির্বাচনের সময় কিছু সংঘাতে আর অনাচারে এ রাজ্য অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, কিন্ত্ত এবারকার মতো এত উগ্র আর উত্‍কট চেহারা বহুকাল দেখিনি৷'

ভোটে সংঘর্ষ, বুথ-দখলের মতো ঘটনায় বাংলার মতোই যে রাজ্যগুলির এক সময়ে কুখ্যাতি ছিল, সেই বিহার, উত্তরপ্রদেশ কিন্ত্ত বদনাম অনেকটাই কাটিয়ে উঠছে৷ এ বার কলকাতা বাদে দিল্লি, মুম্বইয়ের মতো যে সমস্ত বড় শহরে ইতিমধ্যেই নির্বাচন হয়েছে, সেখানেও মারদাঙ্গার খবর নেই৷ কিন্ত্ত পশ্চিমবঙ্গের ভোট-সংস্কৃতির আজও পরিবর্তন ঘটেনি৷ সে আক্ষেপই ধরা পড়েছে সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর কথায়৷ রবিবার তিনি বলেন, 'নির্বাচনে সংঘর্ষ এ রাজ্যে নতুন কিছু নয়৷ কিন্ত্ত এখনও সেই ধারা অব্যাহত দেখে দুঃখ পাই৷' সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারও তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন এই সংস্কৃতির৷ তিনি বলেন, 'এটা কোনও নির্বাচন নয়৷ এটা এক পক্ষের কাছে অস্তিত্বের লড়াই, আর অন্য পক্ষের ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা৷ যারা ভোট করাতে আজ রাস্তায় নামবেন, তারা সব স্থির করেই নামবেন৷ কোনও সদুপদেশ ওদের কানে পৌঁছবে না৷ তবে আমি ভোট দিতে যাব৷'

নিজে ভোট দিতে যাবেন কি না, সে নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে পারেননি সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য৷ তবে চাঁছাছোলা ভাষাতেই সন্ত্রাসের পরিবেশের নিন্দা করেছেন৷ তাঁর কথায়, 'শরীর ঠিক নেই৷ তাই ভোট দিতে যাব কি না, ঠিক নেই৷ তবে ভোট ঘিরে রক্তক্ষয়ী হিংসা দেখে আমি অবাক হচ্ছি না৷ যেখানে কল-কারখানা বন্ধ, মেয়েদের উপর অত্যাচার হয়, চিটফান্ডের দ্বারা মানুষ প্রতারিত হয়, সেখানে তো এ সবই হবে৷ এটা কে যে কোন ধরনের গণতন্ত্র বলব, বুঝতে পারি না৷'

ভোট মানে আসলে ক্ষমতা-লিপ্সা আর অর্থ উপার্জনের পথ৷ এমনটাই মনে করছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিকাশ সিন্হা৷ বিকাশবাবু বলেন, 'রাজনীতির সঙ্গে অর্থের একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে৷ সকলেই ভাবছেন সিংহাসনে বসলে প্রচুর, প্রচুর টাকা পাওয়া যাবে৷ আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে সংঘর্ষের বীজ৷ শান্তির আবেদন রাখছি৷ বৃহত্তম গণতন্ত্রে কেবল ভোট দেবেন বলে মানুষ কত কষ্ট করেন৷ আর রাজনীতির কারবারিরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে গোটা পরিবেশটাই নষ্ট করে দেন৷ এটা খুবই দুঃখের৷'

নিজে যে রাজনৈতিক পন্থায় বিশ্বাসী, তার প্রতি এখনও আস্থা না-ফেরায় এ বার আবার ভোটই দেবেন না নাট্যব্যক্তিত্ব কৌশিক সেন৷ তবে দেশের অন্য কোথাও যা হচ্ছে না, এ রাজ্যে সেই সংঘর্ষ এড়িয়ে ভোট করানোটাই নির্বাচন কমিশনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তিনি৷ কৌশিক বলেন, 'আমি ভোট দেব না বলে দার্জিলিং চলে এসেছি৷ তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আর সিপিএমের প্রতি আমার এখনও আস্থা ফেরেনি৷ ফিরলে সরাসরি পার্টির হয়েই কাজ করতাম৷ তবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক, এটাই আমার আবেদন৷ প্রাণহানি যেন না হয়, সে দিকে সবাই সজাগ থাকুন৷ নির্বাচন কমিশনের কাছে এটা বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ গোটা ভারতে আর কোথাও এতটা সন্ত্রাস, গোলমাল হচ্ছে না৷'

ভোটে গোলমাল, সংঘর্ষ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন আরও বহু বিশিষ্টজনই৷ গায়ক, অভিনেতা, চিত্রপরিচালক অঞ্জন দত্তের মন্তব্য, 'ভোট আর সংঘর্ষ--এ সব নিয়েই তো এতটা দিন চলল৷ সকলের কাছে আবেদন করব, শান্তি বজায় রাখুন৷' সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পক্ষে সওয়াল করেছেন ক্রীড়াবিদ চুনী গোস্বামীও৷ তিনি বলেন, 'সকলের কাছে আমার এটাই প্রার্থনা, কোনও হানাহানিতে জড়িয়ে পড়বেন না৷ সকলকে বলব, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা করুন৷ সংঘর্ষের প্রয়োজন নেই৷ হিংসা আমাদের কোথাও পৌঁছে দিতে পারে না৷' সব দলের কাছে বিশিষ্ট চিকিত্‍সক কুণাল সরকারের আবেদন, 'ভোট সংঘর্ষের মধ্যে সাধারণ মানুষকে টেনে আনবেন না৷'

No comments:

Post a Comment