মা গুলিবিদ্ধ, ফুঁসে উঠে বন্দুক চাইল একরত্তি শিশু
অতনু দাস
হাড়োয়া: ছ'বছরের ছোট্ট ছেলে রোহন বলছিল, 'যারা আমার মাকে গুলি করেছে, তাদের আমি চিনি৷ আমাকে বন্দুক দাও৷ আমি শুভঙ্কর, দীপঙ্কর, উদয়কাকুদের গুলি করে মারব৷' টিভি চ্যানেলে রোহনের ওই কথাগুলি শুনে রাজ্যবাসীর গায়ে কাঁটা দিয়েছে৷ মা রক্তাক্ত৷ ফুঁসে উঠেছে রোগপাতলা শিশুও৷ অনেকের মনেই ভেসে উঠেছে নেতাই, নন্দীগ্রামের পুরোনো ছবিগুলো৷ চিত্রনাট্য একই৷ শুধু পাল্টেছে কুশীলবেরা৷ অভিযোগ, বসিরহাট কেন্দ্রের হাড়োয়ায় হামলার নেতৃত্বে ছিলেন তৃণমূল বিধায়ক ও তাঁর স্বামী৷
স্যান্ডো গেঞ্জি আর কালো হাফ প্যান্ট পরা শীর্ণ চেহারার রোহন সোমবার সকালে ব্রাহ্মণচকের মহামায়াতলায় মায়ের চিত্কার শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল৷ রাস্তায় এসে সে দেখে, মা রুমা মণ্ডল রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন৷ তার চেনাশোনা অনেকে শাসকদলের সমর্থকদের মার খেয়ে পালাচ্ছেন৷ কারও পায়ে, কারও হাতে গুলি লেগেছে৷ কেউ আবার লাঠি কিংবা বাঁশের বাড়ি খেয়েছেন৷ অনেকেরই গায়ে রক্ত৷ রোহন এক ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে৷ আর একটু হলে সে কারও পায়ের তলায় পিষেও যেতে পারত৷ একটু দূরে তখনও চলছে অস্ত্র হাতে নিয়ে শাসকদলের সমর্থকদের আস্ফালন, 'ফের বুথমুখো হলেই মেরে ফেলব৷' এই হুমকি শুনে কার সাধ্য, আবার বুথে যাবেন ভোট দিতে৷ ঘটনার অনেক পরে অবশ্য পুলিশ আসে, আসে কেন্দ্রীয় বাহিনী৷ বিকেলে ছুটে আসেন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীরকুমার রাকেশ৷ তিনি গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন৷ একের পর এক গ্রামবাসী তাঁর কাছে অভিযোগ করেন, মিনাখাঁর তৃণমূল বিধায়ক উষারানি মণ্ডল এবং তাঁর স্বামী মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের নেতৃত্বে সকালে তাঁদের উপর হামলা হয়েছে৷ তাঁরা নিরাপত্তার অভাবের কথাও জানান৷ রাকেশ তাঁদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও গ্রামবাসী আশ্বস্ত হতে পারেননি৷ তৃতীয় দফার ভোটে যাঁর বিরুদ্ধে দিনভর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকার অভিযোগ উঠেছিল, সেই রাকেশ কিন্ত্ত এ দিন বিকেলে ছিলেন অত্যন্ত তত্পর৷ তিনি পুলিশ অফিসারদের নিয়ে গ্রামে অভিযান চালান৷ বিধায়ক এবং তাঁর স্বামীকে পাওয়া যায়নি৷ তবে তাঁদের দুই আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ তার আগে সকালেই আরও ১২ জনকে আটক করা হয়েছে৷
শুধু রোহনের মা রুমাই নন, হাড়োয়ার ব্রাহ্মণচক গ্রামের আরও তিন জন সকালে গুলিবিদ্ধ হন৷ বাঁশ, রড, লাঠির ঘায়ে জখম হয়েছেন আরও ১৪ জন৷ তাঁদের প্রথমে হাড়োয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়৷ রুমা-সহ চার জনকে বারাসত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়৷ ছ'জনকে প্রাথমিক চিকিত্সার পর ছেড়ে দেওয়া হয়৷ রুমার স্বামী রবীন মণ্ডল নিউটাউনের একটি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষী৷ তিনি ছেলেকে নিয়ে বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী করবেন৷ ছেলে রোহনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন প্রতিবেশীরা৷ তাঁরাই বারাসত হাসপাতালে রুমার চিকিত্সার জন্য ছোটাছুটি করেন৷
গুলিবিদ্ধ রুমা, বেহুলা মালি, টুটুন মণ্ডল, ক্ষিতীশ মণ্ডল সিপিএম সমর্থক৷ এরকম প্রায় তিনশো সিপিএম সমর্থক এক সঙ্গে লাইন করে ব্রাহ্মণচক অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন৷ রুমাদেবী অবশ্য সেই দলে ছিলেন না৷ গোলমাল দেখে তিনি রাস্তায় নেমে আসেন৷ তখনই তাঁর গায়ে গুলি লাগে৷ শাসকদলের হর্তাকর্তারা চাননি, সিপিএম সমর্থকরা ভোট দিতে যান৷ তাই এই হামলা৷ বাম আমলে ঠিক এ ভাবেই বিরোধী দলের সমর্থকদের অনেক জায়গায় বুথে যেতে বাধা দিত সিপিএমের লেঠেল বাহিনী৷ তবে সেই আমলেও এ ভাবে এত জন মানুষের উপর গুলি, বোমা নিয়ে চড়াও হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি৷
কী ঘটেছিল সকালে? একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক৷ ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই এই গ্রামেই তৃণমূল সমর্থকদের হাতে নৃশংস ভাবে খুন হন দীপঙ্কর মণ্ডল নামে এক সিপিএম সমর্থক৷ তার পরই তৃণমূলের ভয়ে এলাকার শ'পাঁচেক সিপিএম সমর্থক এলাকাছাড়া হয়ে যান৷ পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তৃণমূলের কাছে টাকা দিয়ে আত্মসমর্পণও করেন৷ অনেকেই মাঝে মাঝে বাড়ি আসেন৷ নির্বাচন কমিশনের কাছে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে ঘরছাড়ারা ৯ মে গ্রামে ফেরেন৷ সকাল ছ'টা নাগাদ দুই সিপিএম এজেন্ট সুপর্ণকান্তি মণ্ডল এবং দীপঙ্কর মণ্ডলকে নিয়ে শ'তিনেক মানুষ বুথের দিকে রওনা দেন৷ পথে আর এক সিপিএম সমর্থক সঞ্জয় মণ্ডলের বাড়ি৷ ওই দলটি সঞ্জয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল৷ তখনই দেখা যায়, তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী স্থানীয় নেতা উদয় মণ্ডলের বাড়ি থেকে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে৷ কারও হাতে বন্দুক, কারও হাতে বাঁশ, লোহার রড৷ তাদের দেখে গ্রামবাসীরা কিছুটা থমকে যান৷ অভিযোগ, উদয় এবং অন্যরা তাঁদের বলে, 'খবরদার, ভোট দিতে যাবি না৷' সে কথা শুনে ওই দলের দু'এক জন প্রতিবাদ করেন৷ তার থেকেই শুরু হয় বচসা এবং ধাক্কাধাক্কি৷ এর পরই আচমকা ওই গ্রামবাসীদের লক্ষ করে পাইপগান থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করে তৃণমূল বাহিনী৷ অসহায় মানুষগুলি যে যেদিকে পারেন, পালাতে থাকেন৷ কেউ কেউ গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন৷ তাতেও নিস্তার মেলেনি৷ পালাতে থাকা মানুষগুলোকে লোহার রড, বাঁশ নিয়ে তাড়া করে তৃণমূলের লোকজন৷ আশপাশের কেউ আর ভয়ে সামনে আসেননি৷ মিনিট কুড়ি শাসকদলের ভৈরব বাহিনীর এই তাণ্ডব চলে৷ তার পর গ্রামবাসীরা যে যাঁর মতো বাড়িতে বা অন্যত্র পালিয়ে যান৷ কেউ যাতে হাসপাতালে যেতে না পারেন, তার জন্য রাস্তাও আটকে রাখা হয়৷ সাড়ে সাতটা নাগাদ পুলিশ আসে৷ প্রথমে তারা শাসকদলের কর্মী-সমর্থকদের সরাতে পারেনি৷ পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী আসে৷ তখন তারা রণে ভঙ্গ দেয়৷ পুলিশই জখমদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে৷
এই অবস্থার মধ্যেই ওই স্কুলের ৬২ এবং ৬৩ নম্বর বুথে ভোট শুরু হয়৷ ঘটনার পর এলাকার রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়৷ অভিযোগ, বিরোধীদের কোনও এজেন্ট না-থাকায় শাসকদল একতরফাই ভোট করেছে ওই দুই বুথে৷ বেলা সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থলে আসেন নির্বাচন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষক রাজেশ নুরুয়ান৷ তিনি দুই বুথের ভোটের হিসেব নিয়ে চলে যান৷ বিশেষ পর্যবেক্ষক রাকেশ বিকেল চারটে নাগাদ ওই গ্রামে আসেন৷ কথা বলেন দুই বুথের প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে৷ তখন ভোট দিচ্ছিলেন ওই গ্রামেরই নমিতা রায়৷ তিনি বুথের মধ্যেই রাকেশকে সকালের ঘটনার বিবরণ দেন৷ বুথ থেকে বেরিয়ে তিনি গ্রামের ভিতরে চলে যান৷ এলাকাবাসীরা তাঁকে ঘিরে ক্ষোভে ফেটে পড়েন৷ গুলিতে জখম রুমার শাশুড়ি মালতী মণ্ডল রাকেশকে বলেন, 'তৃণমূলের লোকজন সকালে বর্বর আক্রমণ চালিয়েছে৷ গ্রামে আমাদের কোনও নিরাপত্তা নেই৷ আপনি আমাদের বাঁচান৷ গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা বিষ্ণু মণ্ডল সরাসরিই রাকেশকে জানান, হামলার সময় বিধায়ক, তাঁর স্বামী ঘটনাস্থলে ছিলেন৷ হামলার নেতৃত্ব দেয় মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়তুতো ভাই উদয়৷ রাকেশ গ্রামবাসীদের ভোট দিতে যেতে বলেন৷ তাঁরা পাল্টা বলেন, 'আজ ভোট দেব৷ কাল আমাদের কে বাঁচাবে?' হংসধর মণ্ডল নামে আর এক বাসিন্দা বলেন, 'আমাদের কারও ছেলে, কারও মেয়ে, কারও স্ত্রী মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি৷ এর পর কোন মুখে আমরা ভোট দিতে যাব?' এ-সব শোনার পরে তিনি আর জোরাজুরি করেননি৷ গ্রামবাসীদের কথামতোই রাকেশ পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিধায়কের বাড়িতে যান৷ তাঁরা কেউ বাড়ি ছিলেন না৷ অভিযান চালানো হয় উদয়ের বাড়িতেও৷ তিনিও বাড়িতে ছিলেন না৷ তবে তাঁর দুই ছেলে শুভঙ্কর এবং দীপঙ্করকে পুলিশ বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার করে৷ কলকাতার দিকে রওনা হওয়ার আগে রাকেশ সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি সব শুনলাম৷ গোটা ঘটনাটি দিল্লিতে নির্বাচন সদনে জানাব৷ বিকেলেই তিনি এ ব্যাপারে জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট তলব করেন৷
বসিরহাটের তৃণমূল প্রার্থী ইদ্রিস আলির অবশ্য দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের কোনও যোগ নেই৷ তিনি বলেন, 'আমরা ভালো অবস্থায় আছি৷ কাজেই আমরা গোলমাল করতে যাব কেন?' জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানান, দু'জনকে গ্রেপ্তার এবং বেশ কয়েক জনকে আটক করা হয়েছে৷ আরও তল্লাশি চলছে৷
http://eisamay.indiatimes.com/election-news/TMC-strongmen-shots-villagers-at-South-24-Parganas-on-polling-day/articleshow/35031281.cms
অতনু দাস
হাড়োয়া: ছ'বছরের ছোট্ট ছেলে রোহন বলছিল, 'যারা আমার মাকে গুলি করেছে, তাদের আমি চিনি৷ আমাকে বন্দুক দাও৷ আমি শুভঙ্কর, দীপঙ্কর, উদয়কাকুদের গুলি করে মারব৷' টিভি চ্যানেলে রোহনের ওই কথাগুলি শুনে রাজ্যবাসীর গায়ে কাঁটা দিয়েছে৷ মা রক্তাক্ত৷ ফুঁসে উঠেছে রোগপাতলা শিশুও৷ অনেকের মনেই ভেসে উঠেছে নেতাই, নন্দীগ্রামের পুরোনো ছবিগুলো৷ চিত্রনাট্য একই৷ শুধু পাল্টেছে কুশীলবেরা৷ অভিযোগ, বসিরহাট কেন্দ্রের হাড়োয়ায় হামলার নেতৃত্বে ছিলেন তৃণমূল বিধায়ক ও তাঁর স্বামী৷
স্যান্ডো গেঞ্জি আর কালো হাফ প্যান্ট পরা শীর্ণ চেহারার রোহন সোমবার সকালে ব্রাহ্মণচকের মহামায়াতলায় মায়ের চিত্কার শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল৷ রাস্তায় এসে সে দেখে, মা রুমা মণ্ডল রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন৷ তার চেনাশোনা অনেকে শাসকদলের সমর্থকদের মার খেয়ে পালাচ্ছেন৷ কারও পায়ে, কারও হাতে গুলি লেগেছে৷ কেউ আবার লাঠি কিংবা বাঁশের বাড়ি খেয়েছেন৷ অনেকেরই গায়ে রক্ত৷ রোহন এক ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে৷ আর একটু হলে সে কারও পায়ের তলায় পিষেও যেতে পারত৷ একটু দূরে তখনও চলছে অস্ত্র হাতে নিয়ে শাসকদলের সমর্থকদের আস্ফালন, 'ফের বুথমুখো হলেই মেরে ফেলব৷' এই হুমকি শুনে কার সাধ্য, আবার বুথে যাবেন ভোট দিতে৷ ঘটনার অনেক পরে অবশ্য পুলিশ আসে, আসে কেন্দ্রীয় বাহিনী৷ বিকেলে ছুটে আসেন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীরকুমার রাকেশ৷ তিনি গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন৷ একের পর এক গ্রামবাসী তাঁর কাছে অভিযোগ করেন, মিনাখাঁর তৃণমূল বিধায়ক উষারানি মণ্ডল এবং তাঁর স্বামী মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলের নেতৃত্বে সকালে তাঁদের উপর হামলা হয়েছে৷ তাঁরা নিরাপত্তার অভাবের কথাও জানান৷ রাকেশ তাঁদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও গ্রামবাসী আশ্বস্ত হতে পারেননি৷ তৃতীয় দফার ভোটে যাঁর বিরুদ্ধে দিনভর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকার অভিযোগ উঠেছিল, সেই রাকেশ কিন্ত্ত এ দিন বিকেলে ছিলেন অত্যন্ত তত্পর৷ তিনি পুলিশ অফিসারদের নিয়ে গ্রামে অভিযান চালান৷ বিধায়ক এবং তাঁর স্বামীকে পাওয়া যায়নি৷ তবে তাঁদের দুই আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ তার আগে সকালেই আরও ১২ জনকে আটক করা হয়েছে৷
শুধু রোহনের মা রুমাই নন, হাড়োয়ার ব্রাহ্মণচক গ্রামের আরও তিন জন সকালে গুলিবিদ্ধ হন৷ বাঁশ, রড, লাঠির ঘায়ে জখম হয়েছেন আরও ১৪ জন৷ তাঁদের প্রথমে হাড়োয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়৷ রুমা-সহ চার জনকে বারাসত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়৷ ছ'জনকে প্রাথমিক চিকিত্সার পর ছেড়ে দেওয়া হয়৷ রুমার স্বামী রবীন মণ্ডল নিউটাউনের একটি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষী৷ তিনি ছেলেকে নিয়ে বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী করবেন৷ ছেলে রোহনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন প্রতিবেশীরা৷ তাঁরাই বারাসত হাসপাতালে রুমার চিকিত্সার জন্য ছোটাছুটি করেন৷
গুলিবিদ্ধ রুমা, বেহুলা মালি, টুটুন মণ্ডল, ক্ষিতীশ মণ্ডল সিপিএম সমর্থক৷ এরকম প্রায় তিনশো সিপিএম সমর্থক এক সঙ্গে লাইন করে ব্রাহ্মণচক অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে ভোট দিতে যাচ্ছিলেন৷ রুমাদেবী অবশ্য সেই দলে ছিলেন না৷ গোলমাল দেখে তিনি রাস্তায় নেমে আসেন৷ তখনই তাঁর গায়ে গুলি লাগে৷ শাসকদলের হর্তাকর্তারা চাননি, সিপিএম সমর্থকরা ভোট দিতে যান৷ তাই এই হামলা৷ বাম আমলে ঠিক এ ভাবেই বিরোধী দলের সমর্থকদের অনেক জায়গায় বুথে যেতে বাধা দিত সিপিএমের লেঠেল বাহিনী৷ তবে সেই আমলেও এ ভাবে এত জন মানুষের উপর গুলি, বোমা নিয়ে চড়াও হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি৷
কী ঘটেছিল সকালে? একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক৷ ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই এই গ্রামেই তৃণমূল সমর্থকদের হাতে নৃশংস ভাবে খুন হন দীপঙ্কর মণ্ডল নামে এক সিপিএম সমর্থক৷ তার পরই তৃণমূলের ভয়ে এলাকার শ'পাঁচেক সিপিএম সমর্থক এলাকাছাড়া হয়ে যান৷ পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তৃণমূলের কাছে টাকা দিয়ে আত্মসমর্পণও করেন৷ অনেকেই মাঝে মাঝে বাড়ি আসেন৷ নির্বাচন কমিশনের কাছে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে ঘরছাড়ারা ৯ মে গ্রামে ফেরেন৷ সকাল ছ'টা নাগাদ দুই সিপিএম এজেন্ট সুপর্ণকান্তি মণ্ডল এবং দীপঙ্কর মণ্ডলকে নিয়ে শ'তিনেক মানুষ বুথের দিকে রওনা দেন৷ পথে আর এক সিপিএম সমর্থক সঞ্জয় মণ্ডলের বাড়ি৷ ওই দলটি সঞ্জয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল৷ তখনই দেখা যায়, তৃণমূলের সশস্ত্র বাহিনী স্থানীয় নেতা উদয় মণ্ডলের বাড়ি থেকে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে৷ কারও হাতে বন্দুক, কারও হাতে বাঁশ, লোহার রড৷ তাদের দেখে গ্রামবাসীরা কিছুটা থমকে যান৷ অভিযোগ, উদয় এবং অন্যরা তাঁদের বলে, 'খবরদার, ভোট দিতে যাবি না৷' সে কথা শুনে ওই দলের দু'এক জন প্রতিবাদ করেন৷ তার থেকেই শুরু হয় বচসা এবং ধাক্কাধাক্কি৷ এর পরই আচমকা ওই গ্রামবাসীদের লক্ষ করে পাইপগান থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করে তৃণমূল বাহিনী৷ অসহায় মানুষগুলি যে যেদিকে পারেন, পালাতে থাকেন৷ কেউ কেউ গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন৷ তাতেও নিস্তার মেলেনি৷ পালাতে থাকা মানুষগুলোকে লোহার রড, বাঁশ নিয়ে তাড়া করে তৃণমূলের লোকজন৷ আশপাশের কেউ আর ভয়ে সামনে আসেননি৷ মিনিট কুড়ি শাসকদলের ভৈরব বাহিনীর এই তাণ্ডব চলে৷ তার পর গ্রামবাসীরা যে যাঁর মতো বাড়িতে বা অন্যত্র পালিয়ে যান৷ কেউ যাতে হাসপাতালে যেতে না পারেন, তার জন্য রাস্তাও আটকে রাখা হয়৷ সাড়ে সাতটা নাগাদ পুলিশ আসে৷ প্রথমে তারা শাসকদলের কর্মী-সমর্থকদের সরাতে পারেনি৷ পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী আসে৷ তখন তারা রণে ভঙ্গ দেয়৷ পুলিশই জখমদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে৷
এই অবস্থার মধ্যেই ওই স্কুলের ৬২ এবং ৬৩ নম্বর বুথে ভোট শুরু হয়৷ ঘটনার পর এলাকার রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়৷ অভিযোগ, বিরোধীদের কোনও এজেন্ট না-থাকায় শাসকদল একতরফাই ভোট করেছে ওই দুই বুথে৷ বেলা সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থলে আসেন নির্বাচন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষক রাজেশ নুরুয়ান৷ তিনি দুই বুথের ভোটের হিসেব নিয়ে চলে যান৷ বিশেষ পর্যবেক্ষক রাকেশ বিকেল চারটে নাগাদ ওই গ্রামে আসেন৷ কথা বলেন দুই বুথের প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে৷ তখন ভোট দিচ্ছিলেন ওই গ্রামেরই নমিতা রায়৷ তিনি বুথের মধ্যেই রাকেশকে সকালের ঘটনার বিবরণ দেন৷ বুথ থেকে বেরিয়ে তিনি গ্রামের ভিতরে চলে যান৷ এলাকাবাসীরা তাঁকে ঘিরে ক্ষোভে ফেটে পড়েন৷ গুলিতে জখম রুমার শাশুড়ি মালতী মণ্ডল রাকেশকে বলেন, 'তৃণমূলের লোকজন সকালে বর্বর আক্রমণ চালিয়েছে৷ গ্রামে আমাদের কোনও নিরাপত্তা নেই৷ আপনি আমাদের বাঁচান৷ গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা বিষ্ণু মণ্ডল সরাসরিই রাকেশকে জানান, হামলার সময় বিধায়ক, তাঁর স্বামী ঘটনাস্থলে ছিলেন৷ হামলার নেতৃত্ব দেয় মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়তুতো ভাই উদয়৷ রাকেশ গ্রামবাসীদের ভোট দিতে যেতে বলেন৷ তাঁরা পাল্টা বলেন, 'আজ ভোট দেব৷ কাল আমাদের কে বাঁচাবে?' হংসধর মণ্ডল নামে আর এক বাসিন্দা বলেন, 'আমাদের কারও ছেলে, কারও মেয়ে, কারও স্ত্রী মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি৷ এর পর কোন মুখে আমরা ভোট দিতে যাব?' এ-সব শোনার পরে তিনি আর জোরাজুরি করেননি৷ গ্রামবাসীদের কথামতোই রাকেশ পুলিশ বাহিনী নিয়ে বিধায়কের বাড়িতে যান৷ তাঁরা কেউ বাড়ি ছিলেন না৷ অভিযান চালানো হয় উদয়ের বাড়িতেও৷ তিনিও বাড়িতে ছিলেন না৷ তবে তাঁর দুই ছেলে শুভঙ্কর এবং দীপঙ্করকে পুলিশ বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার করে৷ কলকাতার দিকে রওনা হওয়ার আগে রাকেশ সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি সব শুনলাম৷ গোটা ঘটনাটি দিল্লিতে নির্বাচন সদনে জানাব৷ বিকেলেই তিনি এ ব্যাপারে জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট তলব করেন৷
বসিরহাটের তৃণমূল প্রার্থী ইদ্রিস আলির অবশ্য দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের কোনও যোগ নেই৷ তিনি বলেন, 'আমরা ভালো অবস্থায় আছি৷ কাজেই আমরা গোলমাল করতে যাব কেন?' জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানান, দু'জনকে গ্রেপ্তার এবং বেশ কয়েক জনকে আটক করা হয়েছে৷ আরও তল্লাশি চলছে৷
http://eisamay.indiatimes.com/election-news/TMC-strongmen-shots-villagers-at-South-24-Parganas-on-polling-day/articleshow/35031281.cms
No comments:
Post a Comment