Monday, May 12, 2014

আদিবাসী – বিচ্ছিন্নতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে

আদিবাসী – বিচ্ছিন্নতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে

লিখেছেনবন্ধু বাংলা
cht-9আদিবাসীদের বিচ্ছিন্নতার কথাআত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা আজকাল শুনতে পাওয়া যায়। তবে আদিবাসীদের কথায় যাবার আগে আমি একটু জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের সাথে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্কটা একটু দেখে নিতে চাই। সামন্তবাদ পুঁজিবাদের বিকাশের জন্য একটা বাধা স্বরূপ ছিল। তাই সামন্তবাদ বিলোপ করতে হয়েছেএই বিলোপের সাথে বিভিন্ন দেশের বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটা সম্পর্ক আছে। অর্থাৎবুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে যে রাষ্ট্র গঠিত হয়তা পুঁজিবাদের বিকাশে ভূমিকা রাখে। আমাদের এখানেও যখন বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ হলো তখনই আমরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিলাম। বলা হয় ৫২ এর ভাষা আন্দোলন দিয়ে এর শুরু। হ্যাঁ,সেটা শুরু হলেও সেখানে কিন্তু বিচ্ছিন্নতার কোন বিষয় ছিল না এবং এই বিচ্ছিন্নতার বিষয় না থাকার পড়েও ৫২ এর আন্দোলনে জাতীয়তাবাদের উগ্রতা সুপ্ত অবস্থায় ছিল এবং আজকের আদিবাসী সমস্যার মূলেও ভাষা আন্দোলনের ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানের একটা ভূমিকা আছে। যাইহোকএকটা পর্যায়ে পশ্চিমী বুর্জোয়াদের বিপরীতে যখন আমাদের বুর্জোয়া সোসাইটি গড়ে উঠলআমরা স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্নতার স্বপ্ন দেখলাম এবং বিচ্ছিন্ন হলামস্বাধীন হলাম এবং এর পিছনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সায় ছিলসাহায্য ছিল। সমগ্র বিশ্বব্যাপী সামন্তবাদের উপর পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় এই জাতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত। এসকল আন্দোলনের মূলে রয়েছে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য পুঁজির মালিক/বুর্জোয়াদের একটি দেশীয় বাজার দখল করা এবং কাঁচামাল বা সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র রুপে একটি ভূখণ্ডঅবশ্যই এরূপ বাজার বা ভূখণ্ডকে হতে হবে একই ভাষাভাষী লোক অধ্যুষিতরাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ একটি ভূখণ্ড এবং এর সংস্কৃতি নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ঠে এক বা কাছাকাছি। ফলে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী যুগে সকল জাতীয় আন্দোলনের ঝোঁক হল জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের দিকেযার মাধ্যমে আধুনিক পুঁজিবাদের সকল প্রয়োজনসমুহ পূর্ণ হয়।জাতীয় রাষ্ট্র হচ্ছে পুঁজিবাদের নিয়ম ও ধর্ম। এটা যেমন আমার দেশের রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনি এটা প্রযোজ্য হাল আমলের পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রেও। উপনিবেশিক বাস্তবতায় বা সামন্তবাদ বিলোপে এই জাতীয় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটা গ্রহণ যোগ্য ভূমিকা ছিল। এই হল জাতীয়তাবাদ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের নামে বিচ্ছিন্নতার একটি দিক।
আদিবাসীদের উপর রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে জাতীয় নিপীড়ন চালাচ্ছে এ কারণে আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োজনপ্রয়োজন বিচ্ছিন্নতার। এটা মার্কসবাদী না হলেও বুঝে চলে আসেঅন্তত যারা নিপীড়িত জাতি তাঁরা আরও সহজে এটা স্বীকার করবে। কিন্তু আদিবাসীদের মাঝে কি সেই ধরণের বুর্জোয়া সমাজ গড়ে উঠেছেপুঁজির বিকাশ কি ঘটেছে বা ঘটানো সম্ভববিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মরক্ষা করতে পারবে কিসাম্রাজ্যবাদকে কি তাঁরা তাঁদের আস্থায় (সম্পদ লুটেরনিয়ে আসতে পেরেছে অর্থাৎ জাতীয়তার ভিত্তিতে বিচ্ছিন্নতা হতে গেলে কিছু সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। আদিবাসীদের সেটা আছে কিনাযদি থাকে তবে ভাল কথা। তাঁদের ওয়েলকাম করি। এরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁদের যে নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং সেটা অবশ্যই পুঁজির তত্ত্বাবধানেসেখানে তাঁদের যৌথ মালিকানাযৌথ শ্রমভূমির ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা এসব কিভাবে সমাধান করবেএসব প্রশ্ন মনে হয় স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায়। কিন্তু যদি এরূপ সক্ষমতা অর্জন ছাড়াই বা কোন কিছু অমীমাংসিত রেখে তাঁরা যদি বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা ভেবে থাকে তবে সেটা কি হঠকারিতা হবে কিনাএটাও তাঁদের ভেবে দেখা উচিত। আরেকটা বিষয় যেটা তা হলোবিচ্ছিন্নতো বাঙালিরাও হয়েছেহয়েছে স্বাধীন। কিন্তু ‘মুক্তি’ কি এসেছেবিষয়টা কিন্তু এমন না আজ আমার খাওয়ার চিন্তা করতে হচ্ছেআরেকজনের এক সপ্তাহ পরে কি খাবে সেই চিন্তা করতে হচ্ছে। সমতল ও আদিবাসীর পার্থক্য কি এই এক সপ্তাহের খাওয়ার চিন্তায়এরা কি শুধুই পার্থক্যে আছে নাকি মিলেও আছেযে মিল একটি স্কেলেরএকটি অবস্থানেরএকটি শ্রেণীরপীড়নেরবেঁচে থাকার?
cht-8যারা মার্কসবাদী তাঁরা জাতীয়তাবাদআত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার,বিচ্ছিন্নতার এসব শব্দমালাকে কিভাবে দেখেমার্কসবাদীরা শ্রেণী সংগ্রামের অংশ রূপে ‘জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ’ বলতে নিপীড়ক জাতি থেকে রাজনইতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র গঠন করাকেই বুঝে। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার বলতে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত অন্য কিছু বুঝা ভুল হবে। মার্কসবাদীরা মনে করে জাতীয় সংগ্রামের সাথে শ্রেণী সংগ্রামের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্যজাতীয় সংগ্রাম শ্রেণী সংগ্রামের একটি অংশ। যদি একটি সংগ্রামে দুটি অর্থাৎ জাতীয় সংগ্রাম ও শ্রেণী সংগ্রাম থেকে থাকে তবে একেক সময়ে একটা মুখ্য অপরটি গৌণ হয়ে উঠে। শ্রেণী সংগ্রাম যখন জাতীয় সংগ্রামে রূপ নেয় তখন জাতীয় সংগ্রাম মুখ্য হয়ে উঠেজাতি সংগ্রাম শ্রেণী সংগ্রামের অধীনে থাকে। বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশ্লেষণে এই দুটোর মাঝে একত্ব বিধান করতে হয়সমন্বয় সাধন করতে হয়। এখন আদিবাসীরা এই বিষয়ে কি চিন্তা করলকিভাবে একত্ব বিধান করল কি করল নাসমন্বয় সাধন করল কি করল সেটা তাঁদের নিজস্ব বিচার বিশ্লেষণ।
আদিবাসীদের কাছ থেকে বিচ্ছন্নতা বা নিপীড়ন প্রশ্নে তিব্বত বা চেচেনদের এই খারাপ উদহারন আসতে পারে। আমি এসব উদহারনকে উদহারন আকারেই দেখি। কারণআমাকে যেমন সমতলের দৃষ্টি দিয়ে পাহাড়িদের দেখলে হবে নাতেমনি চীন রুশের উদহারন দিয়ে মার্কসবাদী রাজনীতিকে নির্ণয় করা ঠিক হবে না। আবারআমার দেশের যারা বাম ধারার নেতা তাঁরা নামে বাম(!) হলেওপাহাড়ি বা আদিবাসী নিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বললেও আদিবাসীদের যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকার আছে এমনটি কেউ বলে নাস্বীকার করে না। তাই তাঁদের বাম রাজনীতি (!) দ্বারাও যদি মার্কসবাদী রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করে ফেলি সেটাও ভুল হবে। সমস্যা হলআদিবাসীরা তাঁদেরকেও ভুল বলে সাথে সাথে মার্কসবাদকেও ভুল মানেআসলে মার্কসবাদ ভুল নয়,বাম নামধারী মার্কসবাদী দাবীদার সেইসব মহান (!) ব্যক্তিবর্গই ভুল!
যাইহোকমার্কসবাদের অনুশীলনেবাস্তবায়নে চীন বা রুশের যে সমস্যা নাই এটা বলব না। একটা নতুন ব্যবস্থার অধীনে এসব সমস্যা আসতেই পারেসোভিয়েত ভেঙ্গেছেস্ট্যালিন পরবর্তী সময়েই সোভিয়েত পুঁজিবাদে নাম লিখিয়েছেচীনারা পুঁজিবাদের সাথে মার্কসবাদের খিচুরি বানাচ্ছে। সেখান থেকে আজকের মার্কসবাদীরা শিক্ষা নিবেযেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়এটাই স্বাভাবিক। তবে যেহেতু এদের কথা এসেছে তাই তদ্রূপ একটা বিচ্ছিন্নতার বিষয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। সেটা হলো সোভিয়েত ভেঙ্গে গেল,ওটা ছিল রাজনৈতিক একটা সিদ্ধান্ত। দেশসুমুহ সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছিল নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্যআবার সেটা অর্জন করার পর যখন প্রশ্ন আসল ইউনিয়ন ভেঙ্গে বেড়িয়ে যাওয়ার সবাই এই সুযোগ নিয়ে বের হয়ে গেল। এটা কি অন্যত্র সম্ভব ছিলআমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্রেকিংবা সম্প্রসারণবাদী ভারতেনাঅন্তত আমার বিশ্বাস ও জ্ঞান তাই বলে।
cht-11এবার চলে যাই, ‘বিচ্ছিন্নতার দাবী হবে হঠকারিতা’ এই অংশে!হ্যাঁকিছু অর্জন বা সক্ষমতা না হলে এই জাতীয় বিচ্ছিন্নতার দাবী কোন ফল নিয়ে আসতে পারবে না। আমি জানি আপনারা একমত হবেন যেআদিবাসীদের এই রূপ সক্ষমতা নাই এবং এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সেটা গড়ে যেমন উঠেনিতেমনি এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সেটা আশা করাও যায় না। হয়তো প্রশ্ন আসবে তাঁর মানে আমার সক্ষমতা হবেও নাআর সেহেতু আমি বিচ্ছিন্নতার দাবী তুলতেও পারব না। এর উত্তরে শুধু এটুকুই বলবআগেই বলেছি এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সক্ষমতার সুযোগ লাভ করা হবে না। অর্থাৎ যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা আপনাকে সক্ষমতার সুযোগ দান করতে পারেযে রাজনীতি আপনাকে এই সক্ষমতার সুযোগ দানে ‘বিচ্ছিন্নতা’কে অধিকার মনে করে সেখানেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায় কিনা?এক কথায় প্রথমে যা বলেছিসেটা হলযে জাতীয় সংগ্রামশ্রেণী সংগ্রামের অধীনে থাকেসে লড়াই সংগ্রাম করা যায় কিনা?এখন কখন কোনটা মুখ্য এবং গৌণ এটা নির্ভর করে বিশেষ অবস্থার বিশেষ বিশ্লেষণে। কিন্তু যেটা দরকার হয়তা হলো এই দুটোর মাঝে একত্ব বিধান করাসমন্বয় সাধন করা। এই একত্ব বিধান করা যায় কিনা?
তাই আদিবাসীরা কি এই দুই সংগ্রামের একত্ব বিধান ও সমন্বয় সাধন করে তাঁদের লড়াই চালিয়ে যেতে পারে কিনাএটাই আসল বিষয়। নচেৎ তাঁদের লড়াই হবে স্রেফ ঠুনকো জাতীয়তাবাদী। ধরে নিলাম আদিবাসীরা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে গেল। কি হবেযে জাতীয়তাবাদ বাঙালিকে নিপীড়ন করতে শিখিয়েছে। ঠিক তেমনি এ জাতীয় ‘পাহাড়ি জাতীয়তাবাদ’ সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী কর্তৃক অন্য আদিবাসীদের উপর আধিপত্য কায়েম করবে। আজকের বাঙালি আধিপত্যবাদের ভূত ভর করবে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী সমাজের উপর। বিশেষত এখানে সকল আদিবাসীরা মিলে যতই একটি ফ্রন্টে লিয়াজো করে;কোন ধরণের জাতীয়তাবাদ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদকে’ সামনে নিয়ে এসে লড়াই সংগ্রাম যাই করুকএটা সামাজিক অর্থনৈতিক ‘মুক্তি’ এনে দিতে পারে নাযদি না শোষণ মুক্তির লড়াইয়ে মার্কসবাদে নিজেদেরকে সজ্জিত করে না নেয়। যদি না আদিবাসীরা শ্রেণী সংগ্রাম ও জাতি সংগ্রাম এই দুই সংগ্রামের মাঝে একত্ব বিধান ও সমন্বয় সাধন করে তাঁদের লড়াই চালিয়ে যেতে না পারে।
সব শেষে যা বলবআদিবাসীরা যেন শুধু পাহাড় বা শুধু সমতল নয়সমতল ও পাহাড়ের সকল আদিবাসীদের কথা বলে। নিপীড়িত হয়ে সে যেন সকল নিপীড়িতের কথা বলেতাদের হয়ে যেন কাজ করে। এটাই প্রত্যাশা।।

No comments:

Post a Comment