মুরলীমনোহর যোশি যথেষ্ট সঙ্গত কারণে বারাণসীর মোটামুটি নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে কানপুরে আসতে চাননি৷ কানপুরে আসার আগেই স্হানীয় দলের নেতাদের কাছ থেকে তিনি সব খবর পেয়েছিলেন৷ প্রথমত, মোদি-লহর বলে কিছুই নেই কানপুরে৷ এবং এখানে ইউ পি এ সরকারের কয়লামন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা শ্রীপ্রকাশ জয়সওয়াল লাগাতার তিনবার লোকসভায় জিতে চতুর্থবারের জন্য দাঁড়িয়েছেন৷ এলাকায় তিনি জনপ্রিয়৷ সামাজিক অনুষ্ঠানে নির্বাচনী কেন্দ্রের কেউ নিমন্ত্রণ করলে সমস্ত কাজ ফেলে জয়সওয়াল উপস্হিত থাকেন৷ তিনি কেন্দ্রে মন্ত্রী থাকাকালীনও এই আচরণের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি৷ তবু কংগ্রেসিরা বলেছেন, মোদি-লহর বলে যদি কোথাও কিছু থেকেও থাকে, কানপুরে তা নেই৷ প্রাচীন এই শিল্পনগরীর প্রত্যম্ত প্রাম্তে কয়লানগর৷ সেখানেই শুক্রবার নরেন্দ্র মোদি জনসভা করে গেলেন৷ ময়দানে গিয়ে দেখা গেল সুবিশাল কয়লানগর ময়দানের একচিলতে অংশে শুধু কিছুটা লোক৷ তা-ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে৷ চতুর্দিকে বি জে পি-র সৌজন্যে যখন নরেন্দ্র মোদির জনসভার ভিড় দেখাচ্ছে মিডিয়া, তখন এই কানপুরের দৃশ্য নিশ্চয়ই সবাইকে অবাক করে দেবে৷ বি জে পি-র ঝান্ডা হাতে বা ইতিউতি মোদির মুখোশ পরা বি জে পি ক্যাডারদেরই দেখা গেল শুধু৷ কিন্তু মাঠ ভরা তো দূরের কথা, তেমন লোকসমাগমের কোনও সম্ভাবনাই দেখা গেল না৷ এই জনসভায় দাঁড়িয়ে কানপুরের বি জে পি প্রার্থী মুরলীমনোহর যোশি বললেন, কেন্দ্রের এই ইউ পি এ সরকারটাকে শিগগিরই আমরা বিদায় করব৷ সেই জায়গায় দিল্লিতে গঠিত হবে মোদির নেতৃত্বে নতুন সরকার৷ কিন্তু যোশির আশা যদি পূর্ণও হয়, তা হলেও সেই সরকারে কি তিনি শেষ পর্যম্ত থাকতে পারবেন? এ শহরের ব্যবসায়ী উত্তমকুমার গুপ্তা বললেন, যোশিজিকে কে জেতাবে? ওঁর দলের লোকেরাই তো ওঁর হারার ব্যবস্হা করে রাখছেন৷ এই জায়গায় শ্যামবিহার মিশ্র (প্রাক্তন সাংসদ) দাঁড়ালেও হয়ত জিততে পারতেন৷ স্হানীয় দলের সম্পূর্ণ অসহযোগিতায় যোশি জিতবেন কী করে? উত্তম গুপ্তার কথায় বোঝা গেল এ শহরের প্রথম সারির ব্যবসায়ীরা কংগ্রেসের শ্রীপ্রকাশ জয়সওয়ালের জন্যই প্রাণপণ কাজ করছেন৷ জাতপাতের নিরিখে দেখা যাচ্ছে, কানপুরের বিপুল সংখ্যক বানিয়া ভোট কিন্তু বি জে পি-তে যাচ্ছে না৷ কংগ্রেস এবারও এই ভোটের মূল দাবিদার৷ বিশিষ্ট নাগরিক অশোক গুপ্তা রোজই শ্রীপ্রকাশের সমর্থনে পাড়ায় পাড়ায় ঘরোয়া সভা, বৈঠক সংগঠিত করছেন৷ তিনি বললেন, বি জে পি-র ভুল হয়ে গেছে৷ মুরলীমনোহর যোশির মতো একজন হেভিওয়েট নেতাকে এখানে দাঁড় করানো উচিত হয়নি৷ প্রথমত, তিনি বাইরের লোক৷ এলাহাবাদ ও বারাণসী ঘুরে শেষ পর্যম্ত কানপুরে এসেছেন৷ দ্বিতীয়ত, তিনি মোদিকেই পাত্তা দেন না৷ বি জে পি-র স্হানীয় নেতারাও তাঁর সঙ্গে একাসনে বসতে পারেন না৷ তিনি জিততে পারলে এলাকার মানুষ কি তাঁর কাছে পাত্তা পাবেন? তা ছাড়া তাঁর বয়স ৮২৷ কানপুরে জয়সওয়ালের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নিতে হলে জয়সওয়ালের থেকে কমবয়সী একজনকে প্রার্থী করা উচিত ছিল বি জে পি-র৷ তবে ভোটের শতাংশ নিয়ে একটা ভয় রয়েই গেছে কংগ্রেসের৷ গতবার, অর্থাৎ ২০০৯ সালে কানপুরে মোট ভোট পড়েছিল ৩৮ শতাংশ৷ এবারও যদি সেইরকমই ভোট পড়ে, তা হলে জয়সওয়াল অনেকটা নিশ্চিম্ত৷ কিন্তু ভোটের দিনে বি জে পি-র পক্ষে যদি সত্যিই কোনও লহর কাজ করে এবং ভোটের শতাংশ হয় বিপুল, তা হলে সব সমীকরণকে তুচ্ছ করে মুরলীমনোহর যোশিই জিতে যাবেন৷ এদিকে তাকিয়ে বি জে পি প্রার্থীর তরফ থেকে ভোট শতাংশ বাড়ানোর ওপর বারবার জোর দেওয়া হচ্ছে৷ আসরে কংগ্রেস এবং বি জে পি-র পাশাপাশি আছেন বহুজন সমাজ পার্টি, সমাজবাদী পার্টি ও আপ-এর প্রার্থীরা৷ কংগ্রেসের পক্ষে স্বস্তির, তাদের নিয়ামক ভোট বলতে যে বানিয়া অংশের সমর্থন, তাতে কোনও ফাটল ধরেনি৷ কংগ্রেসের থেকে এই ভোটে কেউ ভাগ বসাতে পারবে বলে মনে করছেন না খোদ প্রার্থী জয়সওয়াল৷ শেষ বাজারে কানপুরে হাওয়া গরম করতে বি জে পি চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি৷ গতকাল রাত দেড়টা পর্যম্ত মোদির সভা নিয়ে বি জে পি-র গোপন বৈঠক চলে কানপুরে৷ কিন্তু যে সভার জন্য এত সাজ সাজ রব, সেই সভাই আজ নেতাদের আশা পূরণ করতে পারেনি৷ কথা ছিল সকাল সাড়ে ১১টায় কয়লানগর ময়দানের জনসভায় মোদি এসে পৌঁছবেন৷ কিন্তু বেলা ১টাতেও মোদি কানপুরে পৌঁছতেই পারেননি৷ উদ্যোক্তারা বারবার জানান, মোদিজি ইটাওয়ায় সভা করছেন৷ সেখানকার সভায় আটকে গেছেন৷ আপনারা আর একটু ধৈর্য ধরুন৷ কিন্তু তা বললে কি আর চিঁড়ে ভেজে? লোকজন একটু দাঁড়িয়েই হাঁটা দিচ্ছেন৷ এদিকে মোদির সভামণ্ডপ রক্ষা করাই বি জে পি-র কাছে হয়ে দাঁড়ায় কঠিন৷ গতরাতে এখানে আঁধি তুফানে কানপুর ও সন্নিহিত এলাকায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ মণ্ডপের অনেকটাই উড়ে যায়৷ আজ সকালে ফের জোড়াতালি লাগিয়ে কিছুটা সামাল দেওয়া হয়৷ ক্ষমতায় থেকেও আজও কানপুরে তেমন ফ্যা’র হয়ে উঠতে পারেনি সমাজবাদী পার্টি৷ আজ শহরের রেসকোর্স মাঠে ছিল মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশের জনসভা৷ প্রার্থী সুরেন্দ্রমোহন আগরওয়ালের সমর্থনে সভা করে যান অখিলেশ৷ সাম্প্রদায়িকতার বিপদের কথা বলেন৷ ওদিকে, মোদির সভায় মুরলীমনোহর যোশি বলেন, স পা, ব স পা মিলে গেছে কংগ্রেসের সঙ্গে৷ স্বভাবতই কংগ্রেসের সঙ্গে এই দুই দলকে মিলিয়ে দিয়ে তাদের কোণঠাসা করতে চায় বি জে পি৷ কানপুরে বন্ধ কলকারখানাগুলির এতই দুর্দশা যে, এখন কলকারখানার কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও আর কেউ ভোটের ময়দানে তেমনভাবে নেই৷ একসময় কানপুর থেকে জিতেছিলেন সুভাষিণী আলি৷ সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী অনেকের সমর্থন ছিল তাঁর প্রতি৷ সে সময় তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘কানপুর কি বেটি’৷ বন্ধ কলকারখানা এ নির্বাচনে কোনও ইস্যু নয়৷ যারা কংগ্রেসের কুশাসনের কথা বলে মানুষের ভোট চেয়েছে, সেই বি জে পি-ও বন্ধ কলকারখানার কথা উচ্চারণ করেনি৷
|
No comments:
Post a Comment