Monday, April 28, 2014

মোদি প্রার্থী হলেও মূলত নির্বাচন করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ

মোদি প্রার্থী হলেও মূলত নির্বাচন করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ
কাওসার রহমান ॥ বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ফ্রন্ট লাইনে থাকলেও দেশজুড়ে এ দলটির নির্বাচন পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। দেশের প্রধান বিরোধী এ দলের শীর্ষনেতারাই কেবল নিজ নিজ আসনে প্রচার চালাতে পারছেন। এর বাইরে সঙ্ঘের নির্দেশেই চলতে হচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বকে। নরেন্দ্র মোদির রয়েছে নিজস্ব ‘কোর গ্রুপ।’ এই কোর গ্রুপ থেকেই সভা-সমাবেশের পরিকল্পনা, যেখানে যেমন প্রয়োজন তেমন প্রচার, সর্বোপরি ধীরে ধীরে মেরুকরণ বৃদ্ধির কাজে দেশজুড়ে নেমেছে সঙ্ঘ। অতীতেও বিজেপির হয়ে নির্বাচনী প্রচার করেছে আরএসএস। কিন্তু এবারের উদ্যোগ নজিরবিহীন। যার পুরোটাই মোদিকে ঘিরে। তাদের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি। তাঁকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম। আর এতে যে তারা সফল হয়েছে তার প্রমাণ ‘মোদি ওয়েভ।’
জানা যায়, নির্বাচনের অন্তত দশ মাস আগে সঙ্ঘের পরিকল্পনা হয় এবারের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে জয়ী করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। গত বছরের ১৬ জুলাই নাগপুরে সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়। নরেন্দ্র মোদি ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে প্রচার শুরু করা হবে। আর বিজেপির মধ্যে এই প্রশ্নে আপত্তি প্রশমিত করার দায়িত্ব নেবে সঙ্ঘ। এমনকি বারানসী আসনে থেকে মোদি দাঁড়াবেন, তাও ঠিক হয়ে যায় ওই বৈঠকেই। আরও ঠিক হয়, সঙ্ঘের নেতা ইন্দ্রেশ কুমার মোদির প্রচারের মুখ্য সমন্বয়কারী হবেন।
উল্লেখ্য, সে হিসেবেই নরেন্দ্র মোদি গত ২৪ এপ্রিল ব্যাপক শোডাউন করে ভারতের পবিত্র নগরীর বারানসীতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ওই রোডশোর সব আয়োজনই করা হয় সঙ্ঘের তরফ থেকে।
সঙ্ঘের পরিকল্পনার যাবতীয় ধাপে প্রায় ২৭৫ লোকসভা আসনকে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে বিজেপি অন্তত একবার জিতেছে। কোন আসনকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে, তারও তালিকা তৈরি করা হয়। এর বাইরে ৭৫টি আসন চিহ্নিত হয়েছে যেখানে বিজেপি জেতেনি, এবারে জয়ের চেষ্টা করা হবে। এই ৩৫০ আসনই সঙ্ঘের মুখ্য লক্ষ্য। এ কারণেই বিভিন্ন জরিপে দেখানো হচ্ছে, বিজেপি ২৭৫ আসন পাবে। আসলে এ সকল জরিপের মাধ্যমেও মোদি ওয়েভকে আরও জোরদার করতে চাইছে। ভোটারদের মধ্যে এমন একটি হাওয়া তুলতে চাইছে যে, ‘মোদি তো জিতেই যাচ্ছে আমার ভোট নষ্ট করে লাভ কী?’
অক্টোবর মাস থেকে এই আসনগুলোতে সঙ্ঘের শাখা নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করে। এ সময় তাঁরা নানা পদ্ধতিতে প্রচার চালায়। বিভিন্ন সংগঠনকে ব্যবহার করে বিজেপির পক্ষে একটি ভিত্তি তৈরির চেষ্টাও করা হয়। পাশাপাশি অন্য সব কিছুর সঙ্গে নানা বিষয় সামনে এনে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা চালানো হয়। বিজেপি সূত্রেরই খবর, এই মুহূর্তে ৭ লাখ স্বয়ংসেবক প্রত্যক্ষভাবে বিজেপির নির্বাচনী প্রচার পরিচালনা করছেন।
নরেন্দ্র মোদি একসময় নিজে আরএসএসের প্রচারক ছিলেন। সঙ্ঘের মতাদর্শের সবচেয়ে আগ্রাসী রূপায়ণকারীও তিনি। বিজেপির মধ্যে অন্য কোন চিন্তা যাতে তার পথের বাধা না হয়ে দাঁড়ায় তাই সঙ্ঘেরই হাতে বিশেষ করে মোদির নির্বাচনী কাজ ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মোদির প্রচার দেখার জন্য তৈরি কোর গ্রুপে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন দুই সঙ্ঘ নেতা সুরেশ যোশী ও সুরেশ সোনি। সঙ্ঘের অন্য তিন নেতা রামলাল, সৌদান সিং ও ভি সতীশ প্রতিদিনের সভা-সমাবেশের রুটিন, প্রচারের বিষয়, মোদির বক্তৃতার উপাদান ঠিক করছেন।
দিল্লীতে মোদির অফিসে কাজ করছেন বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে আসা কয়েকজন ‘পেশাদার।’ তাঁদের মধ্যে বিপণন বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞাপনের কাজে দক্ষ এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কয়েকজনও রয়েছেন। তবে তাঁদের বেছে নিয়েছে আরএসএস। গুজরাটের দুই মন্ত্রী নীতীশভাই প্যাটেল এবং সৌরভ প্যাটেলও এই গোষ্ঠীতে রয়েছেন। বিজেপির নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান এই গোষ্ঠীর সঙ্গে দলের যোগাযোগ রাখছেন। মোদি কী বলবেন, কোথায় বলবেন, কিভাবে বলবেন সবই ঠিক করছে এই গোষ্ঠী। অনেক সময় দলের নেতারাই জানেন না মোদি কোথায় কী বলবেন, কোন্ বিষয় উত্থাপন করবেন।
সঙ্ঘের আরেকটি নির্দেশও পালন করছে বিজেপি। মোদির জনসভায় মোদিই বলবেন। অন্য কেউ যেন আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা ছাড়া কোন ভাষণ না দেন। এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যেন মোদির সভায় মোদি ছাড়া বিজেপির আর কোন বড় নেতা না থাকেন। প্রার্থীরা, দলের রাজ্য সভাপতি, খুব প্রবীণ নেতারা থাকলেও তাঁরা চুপচাপ থাকবেন নির্দেশ এমনই। বিজেপি নেতাদের সঙ্ঘ স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এই নির্বাচন মোদির নির্বাচন। ‘মোদি সরকার’ গঠনের নির্বাচন। মোদির রাজনৈতিক কৌশলে বিজেপির মাথা গলানোর প্রয়োজন নেই।
আরএসএস কর্মীরা রাজ্যভিত্তিক এবং কেন্দ্রভিত্তিক পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রচারের ধারা ঠিক করছেন। উত্তর প্রদেশে আরএসএস কর্মীরা হিন্দুত্বের বিষয়কেই সামনে আনছেন। পশ্চিম-উত্তর প্রদেশে সরাসরি সাম্প্রদায়িক প্রচার করা হয়েছে। রাজ্যের অন্য জায়গায় মেরুকরণ বৃদ্ধির জন্য গোরক্ষা থেকে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’ উত্থাপন করা হয়েছে। আবার, অনেক জায়গায় ধর্মীয় সভা-সমিতি করে এই প্রচার চলছে। ‘গীতা’ বিতরণের মতো পথও নেয়া হয়েছে অনেক জায়গায়। ইন্দ্রেশ কুমার উত্তর প্রদেশ চষে বেড়িয়েছেন। অন্তত ২৫ জেলায় তিনি সভা করেছেন। বারানসীতে গত তিন মাস ধরে ছোট ছোট অসংখ্য সভা করেছেন তিনি। মোদির ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত অমিত শাহকে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আগেই। সঙ্ঘকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে শাহ কাজ করেছেন। রাজ্য বিজেপির প্রতিষ্ঠিত নেতাদের শাহ পাত্তাও দেননি। তার প্রমাণ হিসেবে দেখা গেছে, ২৪ এপ্রিল বারানসীতে মোদির মনোনয়নপত্র জমাদানের রোডশোতে খোলা জীপে অন্য দুই নেতার সঙ্গে অমিত শাহ রয়েছেন।
কর্ণাটকে ২৫টি লোকসভা আসন বেছে ৭০ হাজার সঙ্ঘ কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতের অন্য রাজ্য থেকেও কর্ণাটকে নিয়ে আসা হয়েছিল সঙ্ঘের কর্মীদের। কর্ণাটককে ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করছে সঙ্ঘ। মহারাষ্ট্রেও এবারে ভোট পরিচালনা করছে আরএসএস। বিজেপি সূত্রের খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গেও আরএসএস-ই নির্বাচন পরিচালনা করছে। বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গে তেমন বেশি নয়। কিন্তু গত তিন বছরে রাজ্যে আরএসএসের শাখার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা এবং কলকাতায় শাখার সদস্যসংখ্যাও বেড়েছে। তারাই বিজেপির হয়ে মূল প্রচারের দায়িত্বে। পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবতা বিচার করে সঙ্ঘ কর্মীদের নিজেদের সঙ্ঘ-সত্তা প্রকাশ্যে না এনেই প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন সঙ্ঘের শীর্ষ পদাধিকারীরা।
রাজ্যভিত্তিক পরিস্থিতি যাই হোক, নির্বাচনে সঙ্ঘের সাংগঠনিক সেøাগান একই- ‘বুথ জেতো, ভোট জেতো’। বুথভিত্তিক হিসেব করেই এগোচ্ছে সঙ্ঘকর্মীরা। বাস্তবে বুথ জেতা যে আদৌ সহজ কাজ নয়, দেশের অধিকাংশ রাজ্যে যে আরএসএস শেষ পর্যন্ত বিজেপিকে জিতিয়ে আনতে পারবে না, তা নাগপুরে সঙ্ঘের সদর কেন্দ্রও জানে। কিন্তু এ সুযোগে বিজেপিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়া এবং সঙ্ঘের প্রকাশ্য উপস্থিতি অনেক বাড়ানো যাবে বলে সঙ্ঘনেতারা মনে করছেন।
সারদা কান্ডে নয়া মোড়
শুভদীপ বকসী কলকাতা থেকে জানান, প্রায় এক বছর ধরে চলা তদন্ত প্রাক ভোট মুহূর্তে ইডির হস্তক্ষেপে পেয়েছে নতুন মোড়। শুধু সারদা কান্ডে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরাই নয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর সারদা থেকে পাওয়া বিজ্ঞাপনকেও এবার তদন্তের আওতায় আনল কমিশন। সারদা কাণ্ডের তদন্তের আওতায় এবার এল সংবাদপত্র ও খবরের চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনও? সারদা তদন্তে গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিট রাজ্যের মিডিয়া সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে জানতে চাইল, সারদার তরফে দেয়া বিজ্ঞাপনের খুঁটিনাটি তথ্য? সিট সূত্রে খবর, চিঠি পাঠানো হয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান, গণশক্তি, সংবাদ প্রতিদিন, আজকাল, এই সময়, টেলিগ্রাফ, স্টেটসম্যান, টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস, এবিপি আনন্দ, ২৪ ঘণ্টাসহ মোট ১৯টি খবরের কাগজ ও চ্যানেলকে।
২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বিভিন্ন্ খবরের কাগজ ও চ্যানেলে সারদার কিছু বিজ্ঞাপন কবে ও কখন প্রকাশিত বা প্রদর্শিত হয়েছে ও বিজ্ঞাপন বাবদ কত টাকা নেয়া হয়েছে এবং প্রদেয় টাকা দেয়ার মাধ্যম কি ছিল, এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছে সিট? সিটের তরফে রাজ্যের সমস্ত প্রথম শ্রেণীর দৈনিক ও পরিচিত খবরের কাগজ ও চ্যানেলগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, ‘সারদা গ্রুপ অব কোম্পানিজ যে বিজ্ঞাপন দিয়েছে, সে সম্পর্কে যেন দ্রুত তথ্য দিয়ে তদন্তে সাহায্য করা হয়। একই সঙ্গে সিট জানিয়েছে, মিডিয়া সংস্থাগুলোর মধ্যে যাদের সঙ্গে সারদার বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত কোন লেনদেন হয়নি, সেই তথ্যও দিতে হবে?
সারদা কাণ্ডের জল ইতোমধ্যেই অনেক দূর গড়িয়েছে। গোটা বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রীমকোর্টে বিচারাধীন? তারই মধ্যে এই তদন্তে বিজ্ঞাপন নিয়ে মিডিয়া হাউসগুলোর কাছে সিটের চিঠি পাঠানো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কারণ এ রাজ্যে আরও একাধিক চিট ফান্ড সক্রিয়। যার মধ্যে বেশ কয়েকটি সংস্থা সেবি বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার কালো তালিকাভুক্ত। সংস্থাগুলোর ব্যবসার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। অথচ দেখা যাচ্ছে সেই সব সংস্থাই রাজ্যের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র ও চ্যানেলের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকায়? দেশের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কালো তালিকাভুক্ত হওয়া ও নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ‘বেআইনীভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে কিভাবে ওই সংস্থাগুলো ব্যবসা চালাচ্ছে ও খবরের কাগজ ও চ্যানেলের ক্ষেত্রে মুখ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা?
ওয়াকিফহাল মহলের ধারণা, চিট ফান্ডগুলোর সঙ্গে প্রথম শ্রেণীর সংবাদ গোষ্ঠীগুলোর (সংবাদপত্র ও সংবাদ চ্যানেল) বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল এবং ওই সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বিজ্ঞাপন এসেছে চিট ফান্ডের কাছ থেকেই? লোকসভা ভোটে যখন চিট ফান্ডের বিজ্ঞাপন কেন সংবাদ মাধ্যম নিয়েছে, প্রচারে এই প্রশ্ন উঠছে, তখন গোটা বিষয়টি নিয়ে সিটের চিঠি পাঠানো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে?
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment