Sunday, April 27, 2014

খরার প্রভাব কৃষিতে, জলশূন্য নদী

খরার প্রভাব কৃষিতে, জলশূন্য নদী
জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ তীব্র দাবদাহে কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। রাজশাহী অঞ্চলে বোরো ক্ষেত ফেটে চৌচির। গাছের ডালে ঝোলা সজনে ডাঁটা শুকিয়ে কাঠ। ঝরে পড়ছে আম ও লিচু। সূর্য তাপে নুইয়ে পড়ছে গাছের পাতা। এ ছাড়া নওগাঁর সাত নদী শুকিয়ে কাঠ। দেখা দিয়েছে পানি সঙ্কট। চলছে দখল-দূষণ। এবং সাগরপাড়ের জনপদ কলাপাড়ায় খালবিল-পুকুর শুকিয়ে চৌচির। কোথাও সবুজের দেখা নেই। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আউশ আবাদ। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের পাঠানো-

রাজশাহীতে সজনে ডাঁটা শুকিয়ে কাঠ, ঝরে পড়ছে
আম লিচুর গুঁটি, বোরো ক্ষেত চৌচির

গাছের ডালে ডালে ঝোলা সজনে ডাঁটা শুকিয়ে কাঠ। ঝরে পড়ছে আমের গুঁটি। বোঁটা শুকিয়ে খসে পড়ছে গাছের লিচু। দিনভর সূর্যতাপে নুইয়ে পড়ছে গাছের পাতাও। অব্যাহত খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলের অনেক বোরোর ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
অব্যাহত সেচপাম্প চালু রেখেও তা পূরণ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় মানুষ এখন অপেক্ষার প্রহর গুণছেন এক পশলা বৃষ্টির জন্য। গ্রামাঞ্চলে বৃষ্টির জন্য দেয়া হচ্ছে ব্যাঙের বিয়ে। বিভিন্ন স্থানে ইসতেস্কার নামাজ আদায় করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিলম্বিত খরায় হাঁপিয়ে উঠেছে মানুষ ও প্রকৃতি।
প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে যেন বাড়ছে রাজশাহীর তাপমাত্রা। আগুন ঝরা আবহাওয়ায় রীতিমতো তেঁতে উঠেছে রাজশাহী। সূর্যের দহনে নগরবাসীর প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। একটু শীতল পরশের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। যতদিন গড়াচ্ছে তাপমাত্রা ততোই বাড়ছে। দিনভর সূর্যের তীর্যক রশ্মি আর লু হাওয়া, রাতে গোমট গরমে নাভিশ্বাস উঠেছে সবার।
শনিবার সামান্য তাপমাত্রা কমলেও কোন প্রভাব পড়েনি। এদিন রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এর আগে শুক্রবার তাপমাত্রা উঠেছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে।
প্রচ- তাপদাহ থেকে রক্ষা পেতে শনিবার বৃষ্টির আশায় তানোর ও বাগমারা এলাকায় ব্যাঙের বিয়ে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চলছে বৃষ্টির জন্য বিশেষ নামাজ। এর আগে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে নগরীর বিভিন্ন মসজিদে বৃষ্টির জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়েছে।
অব্যাহত তাপপ্রবাহে কৃষি অঞ্চলে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। কৃষকের বোরোর ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বিবর্ণ হতে শুরু করেছে ধান ক্ষেত। রোদে শুকিয়ে চুপসে গেছে ক্ষেতের বেগুন। সজনে ডাটাও শুকিয়ে যাচ্ছে গাছেই। আর আম ও লিচু খসে পড়ছে বোটা শুকিয়ে। মানুষ আর প্রকৃতি সব ক্ষেতেই যেন বিরূপ পরিস্থিতি।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খরার কবলে পড়ে এ অঞ্চলের আম লিচু, পান, ধান বেগুন শুকিয়ে যাচ্ছে। পাট চাষ এখনও শুরু করতে পারেনি। ক্ষেতে বাড়ছে না ভুট্টা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে এখন বৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। এক পশলা বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। রাজশাহী অফিসের সহকারী আবহাওয়া কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, আজ রবিবারের মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন তাপমাত্রা কমে যাবে।

নওগাঁর সাত নদীতে পানি নেই
‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত এ কবিতাটির বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর কোন মিল নেই। ছোট কেন? বড় নদীগুলোতেও কোন পানি নেই। কোন কোন নদীতে এ মধ্য বৈশাখ মাসে হাঁটু বালি মিললেও পানির কোন অস্তিত্ব নেই। নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোও দিন দিন যেন মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। এক সময় এ নদীকে কেন্দ্র করে নওগাঁয় নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল অনেক জনপদ ও হাট বাজারসহ লোকালয়। গড়ে ওঠা ওইসব জনপদসহ আশপাশের অসংখ্য মানুষ ওইসব হাটবাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবন-জীবিকার পথ। এসব নদীতে এক সময় ঢেউয়ের তালে চলাচল করেছে অসংখ্য পালতোলা নৌকো। এ নদী সংস্কারের অভাবে নওগাঁর ছোট বড় ৭টি নদী শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। একদিকে নদীতে পানি নেই, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নেমে গেছে। এতে খরা মৌসুমে পানি শূন্য হয়ে পড়ায় বোরো সেচ নিয়ে শঙ্কিত নদী তীরের হাজার হাজার কৃষক। বেকার হয়ে পড়েছে নদী নির্ভর শত শত মৎস্যজীবীরা।
নওগাঁর নদীগুলোর আত্রাই নদী, ছোট যমুনা নদী, তুলসী গঙ্গা নদী, নাগর নদ, শিব নদী, ফকিন্নি নদী ও পুনর্ভবা নদী শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। এক সময় এসব নদী ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবিকার উৎস। নদীপথে নৌযানের দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক কেন্দ্র। নদীর পানি ব্যবহার করে দু’পাড়ের মানুষ ভরে তুলত তাদের ফসলের ক্ষেত। গোসল করাসহ গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করত নদীর পানি। এখন বছরে সর্বোচ্চ মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাস পানি থাকে এসব নদীতে। বছরের বাকি মাস নদীগুলো ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়। পানি শূন্য মরা নদীতে চলছে দখল ও দূষণের প্রতিযোগিতা। ছোট যমুনা ও তুলসী গঙ্গা নদীর দু’তীরের অবৈধভাবে দখল করা বড় বড় বিল্ডিং, মার্কেট, বয়লার-চাতাল, ঘর বাড়ি নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে। গড়ে তোলা চাতাল থেকে বিষাক্ত বর্জ্য, দুর্গন্ধ ময়লা পানি ও ছাই ফেলা হচ্ছে নদীতে। নওগাঁর নদীগুলোকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষার দাবিতে সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
একুশে উপযাপন পরিষদের সভাপাতি এ্যাডভোকেট ডিএম আব্দুল বারি জানান, নওগাঁর নদী দূষণ ও দখলের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে দিন দিন এ মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি জয়পুরহাটের চিনি কল থেকে বিষাক্ত গাদ ফেলা হয় ছোট যমুনা নদীতে। এ কারণে নদীর মাছসহ জলজ প্রাণী মরে যায়। এতে আগামীতে পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়বে। সিপিবি’র নওগাঁ জেলার সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মহসীন রেজা জানান, নদী খনন, চাতালের বিষাক্ত বর্জ্য ও ছাই নদীতে ফেলা বন্ধ ও দখলদারদের উচ্ছেদ করার জন্য একাধিকবার মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা ও প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। যার কারণে এসব ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মোক্তার হোসেন বলেন, আমরা অবৈধ দখলদারদের ব্যাপারে তালিকা প্রণয়ন করে জেলা প্রশাসক বরাবর দিয়েছি। এ ব্যাপারে নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোঃ এনামুল হক বলেন, পরিবেশের বিরূপ প্রভাবমুক্ত রাখতে অবৈধ উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হবে। জেলার নদীগুলোকে সচল করা গেলে শস্যসমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এ অঞ্চল।

কলাপাড়ায় আউশ আবাদ অনিশ্চিত
সাগরপাড়ের জনপদের উপকূলীয় কলাপাড়ায় খালবিল-পুকুর শুকিয়ে তলার মাটি পর্যন্ত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। মাঠঘাট আর বিল সব ধূসর, বিবর্ণ হয়ে গেছে। ১২টি ইউনিয়নের আটটিতে নেই সবুজের আস্তরন। দীর্ঘ খরায় লাখ লাখ মানুষের জীবন নিরাপদ পানির অভাবে বিপন্নের শঙ্কায় পড়েছে। আশপাশের দূরের কোথাও থেকে গভীর নলকূপের পানি সংগ্রহ করলেও রান্না, গোসল কিংবা ব্যবহারের পানির জন্য চলছে হাহাকার।
শতকরা ৮০টি খাল কিংবা ব্যক্তিগত পুকুর এখন পানিশূন্য হয়ে আছে। কোন কোন পুকুরের তলদেশে খানিকটা পানি থাকলেও তা এখন ব্যবহারের উপযোগী নয়। দীর্ঘ খরা আর প্রচণ্ড দাবদাহে এ জনপদের মানুষ এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কৃষকসহ সাধারণ মানুষ তাদের নিত্যদিনের ব্যবহারের পানি পর্যন্ত পাচ্ছে না। গবাদিপশু পর্যন্ত হানা দেয় বিভিন্ন বাড়ির শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের তলদেশের পানিতে। এভাবে একটানা অনাবৃষ্টি অন্তত একযুগে দেখেননি এ জনপদের মানুষ। কোম্পানিপাড়ার অহিদুল জানালেন, দুপুরে গবাদিপশু মাঠ ছেড়ে পানি খাওয়ার জন্য দৌড়ে ছুটে আসে বাড়ির পুকুরে। কৃষক শাহ আলম মোল্লা জানালেন, গবাদিপশু নিয়েও তাঁরা পড়েছেন চরম বিপাকে। বহু চাষী হাইব্রিড ধানের আবাদ করেছেন। লকলক করে বেড়ে ওঠার পরে ধান পাকার আগেই ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ধান আর পাকতে পারেনি। অধিকাংশ ধান চিটা হয়ে গেছে। কেউ আবার আধাপাকা ক্ষেত গরুকে খাইয়েছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জানালেন, খরায় সেচ সঙ্কটে ধানখালীর ছয় চাষীর পাঁচ একর বোরো (হাইব্রিড) ধান নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন লালুয়া, মিঠাগঞ্জ, চাকামইয়া, টিয়াখালী, মহীপুর, ডালবুগঞ্জ, ধুলাসার, লতচাপলী ও কুয়াকাটা পৌরএলাকার মানুষ। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডীন আকম মোস্তফা জামান জানান, আরও বেশি গভীর থেকে পানি তুলতে হবে কৃষককে। দীর্ঘ খরায় এমন সমস্যা হয়ে আসছে বলেও তিনি জানালেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় অর্ধশত খালের প্রত্যেকটি এক দেড় কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। এ ছাড়া এ বছরও আবার দ্বিতীয় পর্যায় আরও কয়েকটি পুনর্খননের কাজ চলছে। একই কথা পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিসের। তবে তাদের খননকর্ম নিয়ে মানুষের রয়েছে অভিযোগের পাহাড়। লোকজনের ভাষায় খনন তো নয়, যেন হরিলুট। এভাবে সরকারীভাবে পানি সঙ্কট মোকাবেলায় নেয়া উদ্যোগও কিয়দংশ কাজে আসে না মানুষের। কৃষিকাজ, নিত্যদিনের ব্যবহারিক কাজের ভয়াবহ দুরবস্থার পাশাপাশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে পানির সমস্যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. আব্দুর রহিম জানালেন নিরাপদ খাবার ও ব্যবহারের পানির সঙ্কটে জলবসন্ত, জ্বর, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রকোপ বেড়েই চলছে। তাদের হিসাবে দৈনিক দেড় শতাধিক রোগী আসছে হাসপাতালে, যাদের অধিকাংশ দূষিত পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত।

No comments:

Post a Comment