গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা : রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে
এক বছর ধরে মাহমুদুর রহমান কারাগারে থাকলেও বিচারকদের বিবেক জাগ্রত হয় না : ডা. জাফরুল্লাহ
গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ নামের সরকারটি জন্ম থেকেই ফ্যাসিস্ট। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করেছে। হিটলার ও মুসোলিনীর ফ্যাসিজম থেকেও তাদের ফ্যাসিজম ভয়ঙ্কর। এই ফ্যাসিজমকে তাড়াতে হলে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে হবে। জনগণকে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এজন্য জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংকট : উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন।
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ এ আলোচনার আয়োজন করে। এতে অংশ নেন রাষ্ট্র ও সমাজ চিন্তক কবি ফরহাদ মজহার, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি শওকত মাহমুদ, ফোবানা নিউইয়র্ক-২০১৪-এর আহ্বায়ক হাসানুজ্জামান হাসান, পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি কামরুল ইসলাম খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী, অনলাইন পত্রিকা জাস্ট নিউজের সম্পাদক মুশফিকুল ফজল আনসারী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাপ্তাহিক বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহ-সভাপতি এম আবদুল্লাহ।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে কবি ফরহাদ মজহার বলেন, রেজোয়ানার স্বামীকে অপহরণের ঘটনা আমাদের চরমভাবে মর্মাহত করেছে। দেশে গুম, অপহরণের ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে এটা তার প্রমাণ। রেজোয়ানার স্বামীকে অপহরণের ঘটনার সঙ্গে ভারতের ‘র’ জড়িত থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যারা বর্তমান সরকারকে সমর্থন করছেন না তাদের পরিবারের কেউ নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগ নামের সরকারটি জন্ম থেকেই ফ্যাসিস্ট। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করেছে। হিটলার ও মুসোলিনীর ফ্যাসিজম থেকেও ভয়ঙ্কর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজম। এই ফ্যাসিজমকে তাড়াতে হলে দেশে রক্তাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে হবে।
ফরহাদ মজহার বলেন, অদ্ভুত এক দেশ যেখানে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তুলে নিয়ে তাদের দেশে চলে যাচ্ছে। স্বাধীন কোনো দেশে এটা চলতে পারে না। কেউ এখানে নিরাপদ নয়। এই সরকার বাংলাদেশের সবকিছু লুট করে নিয়ে পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে দেবে। তিনি বলেন, এমন অদ্ভুত দেশ যেখানে ফ্যাসিস্ট সরকারের একশ্রেণীর সন্ত্রাসী লোক সাংবাদিক পরিচয়ে আমাকে গ্রেফতারের জন্য বাসায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছে। তিনি বলেন, দেশে-বিদেশের কেউ এ সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার বলে মনে করে না। রাশিয়াসহ কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে নষ্ট করছে। দলের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রের জন্য কাজ করতে হবে। প্রবাসীদেরকে নির্দলীয় অবস্থান থেকে গণতন্ত্রের পক্ষে ভূমিকা রাখতে হবে। সমাজের বিভাজনগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রতিটি মানুষের কথা বলার অধিকার রক্ষা করা আমাদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। গণতন্ত্র আমাদের অধিকার। এটাকে আমরা রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।
ফরহাদ মজহার বলেন, পৃথিবীর কোথাও নেই বিচার চলাকালীন সময়ে আইন পরিবর্তন করে কাউকে ফাঁসি দেয়া হয়। শুধুমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। ৭১-এ সেটি হয়নি। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক সময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণায় ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ বর্তমান চার নীতি ছিল না। সেখানে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। এর বাইরে যা যোগ হয়েছে তা দিল্লির সংযোজন।
মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কিছু মানবাধিকার সংগঠন সরকারের অধীনে কাজ করছে। মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করে তাদেরকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। প্রথমে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। কারণ বর্তমান সংবিধান ফ্যাসিস্ট। একজন ব্যক্তির বক্তৃতা সংবিধানের মধ্যে ঢুকে গেছে। এটা কখনো সংবিধান হতে পারে না। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে হবে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকলেও শেখ মুজিব মেহেরপুরের মুজিবনগরে একদিনের জন্যও যাননি। এটা নিয়ে নতুন বিতর্ক চলছে। জাতীয় সংসদে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন নিয়ে কথা না বলে কে কার বিরুদ্ধে কতটুকু কুত্সা রটনা করতে পারে সেটি চলছে। বিচারকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জজ সাহেবদের বিবেক নাড়াচাড়া করে না, মাহমুদুর রহমান এক বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। তাকে জামিন দিতে বিব্রতবোধ করলেও বেতন নিতে বিব্রত হন না বিচারকরা। প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে অর্জিত পয়সা দিয়ে সরকার কুইক রেন্টালের নামে কুইক পকেট ভর্তি করছে।
শওকত মাহমুদ বলেন, দেশে বর্তমানে শুধু গণতান্ত্রিক সঙ্কট নয়, রাষ্ট্রীয় সঙ্কট চলছে। বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদের চরম রূপ দেখিয়েছে। মানুষের সমাধানের জন্য নয়, সমস্যা জিইয়ে রাখার জন্য ক্ষমতায় থেকে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, আদালতের স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করলেও সেই আদালত গণমাধ্যম ও বিশিষ্ট নাগরিকদের হেয় প্রতিপন্ন করছে। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যমতে না পৌঁছার কারণ জাতীয় ঐক্যের সরকারকে জনগণ বাধ্য করতে পারছে না। এজন্য জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বর্তমানে জেলে। সরকার নিজে অথবা আদালতকে দিয়ে গণমাধ্যম বন্ধ করছে।
ডা. রফিক চৌধুরী বলেন, সারা দেশে আজ গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি চলছে। বিএনপি নেতা এম ইলিয়াসের মতো পরিবেশবাদী আন্দোলনের নেতা রেজোওয়ানার স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছে।
মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, দেশের চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় প্রবাসীরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সঙ্কট উত্তরণে অবিলম্বে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান বলেন, এখন রাজনীতিতে শুধু অসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবই বিরাজ করছে না, রাষ্ট্রীয় মৌলিক বিষয়, জাতীয়তা, জাতীয় স্লোগান, স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রীয় আদর্শ এমনকি স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির কথা বলে জাতিকে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে নিশ্চিত সংঘাতের পরিস্থিতি। ক্রমেই এ আশঙ্কা বেড়েই চলছে। সংঘাত পরিস্থিতির প্রশমন অর্থাত্ শান্তির পথে ফেরার আপাতত কোনো আগ্রহ বা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
http://www.amardeshonline.com/
No comments:
Post a Comment