Monday, April 28, 2014

হিটস্ট্রোকে ৩ জনের মৃত্যু তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন

হিটস্ট্রোকে ৩ জনের মৃত্যু

তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন

ইত্তেফাক ডেস্ক
কোথাও এক পশলা বৃষ্টি আবার কোথাও বৈশাখী ঝড় হলেও গরম থেকে রেহাই পাচ্ছে না দেশবাসী। সকালে প্রখর রোদ, দুপুর থেকে বিকাল অবধি প্রচণ্ড তাবদাহ। রাতে অসহনীয় গরম। শ্বাসরুদ্ধকর এ বৈরি আবহাওয়ায় কমবেশি সারাদেশেই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় ঘটছে ছন্দপতন। ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি। ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ। অনেক স্থানে প্রশাসনের উদ্যোগে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় হিটস্ট্রোকে কমপক্ষে ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। 

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, গত শনিবার উপজেলায় হিটস্ট্রোকে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরা হলেন- গুনাইগাছ ইউনিয়নের পূর্ব কালুডাঙ্গা গ্রামের মৃত আবু তাহেরের স্ত্রী জোবেদা বেগম (৬৫) ও বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের আইনুদ্দিন (৬৫)। অন্যদিকে প্রচণ্ড গরমে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গত কয়েকদিনে প্রায় ৩ শতাধিক শিশু উলিপুর হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। উলিপুর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অজয় কুমার রায় বলেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে এমন হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে শিশুদের প্রচুর পানি খাওয়ানো উচিত। 

এদিকে শ্রমিকরা প্রচণ্ড রোদ ও দাবদাহের কারণে কাজে বের হতে পারছে না। আর লাগামহীন লোডশেডিং এর কারণে এইচএসসি ও ডিগ্রি পরীক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। দিনে রাতে ৪/৫ ঘন্টার বেশি বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিকল হয়ে পড়ছে সেচপাম্প, ফ্রিজ, টিভিসহ বিভিন্ন বিদ্যুত্চালিত যন্ত্র। 

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলার সাদুল্লাপুরে শনিবার সন্ধ্যায় হিটস্ট্রোকে সোহেল মিয়া (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সোহেল উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে। নিহতের পরিবার জানায়, দুপুরে প্রচণ্ড গরমে সোহেল অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে তিনি চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আখতার আলম ডন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, তীব্র তাপদাহের কারণে মানুষসহ পশু-পাখিরও হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। 

বরিশাল অফিস জানায়, বৈশাখের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও বর্ষা তো দূরের কথা, মেঘের দেখাও মিলছে না দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে। বরং প্রচণ্ড খড়ায় পুড়ছে উপকূলীয় এ জনপদ। প্রচণ্ড তাপদাহ আর ভ্যাপসা গরমে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগের কোন সীমা নেই। রিকশা-ভ্যান চালিয়ে বা ঠেলাগাড়ি ঠেলে যাদের জীবন চলে তাদের এখন বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এ পরিস্থিতিতে তাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল রবিবার দুপুরে নগরীর অশ্বীনি কুমার হলের সামনে রিকশা ও অটোচালক থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ঠাণ্ডা বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইনের সাথে বিস্কুট তুলে দেন জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম। আগামী ১ মে পর্যন্ত প্রতিদিন একই জায়গায় এ ভাবে বিনামূল্যে পানি বিতরণ করা হবে। গরিব ও খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল আলম।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণাঞ্চলে স্মরণকালের মধ্যে এ বছর সর্বোচ্চ গরম পড়ছে। গতকাল রবিবার এখানকার তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

সিলেট অফিস জানায়, তীব্র তাপদাহে নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠেছে। গতকাল বেলা ৪ টায় এখানে তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আগের দিন সন্ধ্যার পর তীব্র বাতাসের সাথে এক পশলা বৃষ্টি হয়। কিন্তু কাল থেকে আবার শুরু হয় প্রচণ্ড তাপদাহ। এদিকে ভ্যাপসা গরমের সাথে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া মানুষকে আরো অতিষ্ঠ করে তুলেছে। গরম থেকে বাঁচতে পুকুর ও নদীতে নেমে দূরন্তপনায় মেতে উঠতে দেখা গেছে শিশু-কিশোরদের।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর চরাঞ্চলসহ ৯টি ইউনিয়নে প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সদ্য বোনা পাট, ধান ও তিলের চারা মরে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার স্যালো মেশিনে পানি উঠছে না। ফলে ইরি-বোরোর মাঠ শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। গোটা চরাঞ্চলে পানির অভাবে কৃষকরা হাহাকার করছেন। গত কয়েকদিনে সদরপুর হাসপাতালে অন্তত ২০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন বলে জানা গেছে। 

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সৈয়দপুরসহ আশপাশের এলাকার জনজীবন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। কর্মজীবী মানুষ জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে বের হলেই অতিরিক্ত ঘামে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আসাদ জানান, তাপমাত্রা প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। 

এদিকে অতিরিক্ত গরমের কারণে সর্দি-কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। সৈয়দপুর ১শ' শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘরের পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখা গেলে ডায়রিয়া ও শ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা কম থাকবে। গরমে শিশুদের সাবধানে রাখতে হবে এবং রোদে যেন বেশি ঘোরাঘুরি না করে সেদিকে নজর দিতে হবে। 

সুজানগর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে পাবনার সুজানগরে তালের পাখার কদর বাড়ছে। উপজেলার হাট-বাজার ও অফিস-আদালতে ব্যাপকভাবে তালের পাখা বিক্রি হচ্ছে। সেই সাথে পাখার দামও বেড়েছে দ্বিগুণ। 

উপজেলার মানিকদী গ্রামের তাল পাখা ব্যবসায়ী হাফিজুর জানান, প্রতি পিস পাখা ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের কাছে তালের পাখার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তিনি প্রতিদিন প্রায় ৫শ' পিস পাখা বিক্রি করেন। এতে খরচ বাদে তার প্রতিদিন ১২শ' টাকার মতো লাভ হয় বলে জানান।

উল্লাপাড়ার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে

উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড গরম ও তাপদাহে উল্লাপাড়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। প্রতিদিন মাঠে সমাবেশ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের অসুস্থ শিক্ষার্থীদের মাথায় পানি ঢেলে সুস্থ করে বাড়ি পাঠাতে হচ্ছে। গরমে প্রচণ্ডতায় স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও অনেক কমে গেছে। তাই মর্নিং স্কুলের দাবি তুলেছে শিক্ষার্থীরা।

উল্লাপাড়ার সলপ স্কুলের প্রধান শিক্ষক খায়রুল ইসলাম জানান, গত এক সপ্তাহে প্রচণ্ড তাপদাহে তার স্কুলে সমাবেশ করতে গিয়ে অন্তত ৩৫ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। পঞ্চক্রোশী আলী আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুজ্জামান জানান, ক্লাসে প্রতিদিন ৬/৭ জন করে শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

No comments:

Post a Comment