দলিত সম্প্রদায়ের লোকেরা বৈষম্যের অবসান চায়
দক্ষিণ এশিয়ার “অচ্ছ্যুৎ” সম্প্রদায়ের লোকেরা এখনো দাসত্ব ও অবহেলার জীবন যাপন করছে।
ঢাকা থেকে খবর সাউথ এশিয়ার জন্য লিখেছেন শাহরিয়ার শরীফ
এই সেদিনের এক বিকেলে নির্মল চন্দ্র বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা জেলার রাস্তার পাশের একটি হোটেলে ঢুঁকে এবং এক কাপ চা চায়। চায়ের দোকানদার মুখের উপর তাকে না করে দেয়।
কারণ হলোঃ নির্মল দলিত সম্প্রদায়ভূক্ত। অথচ, ঐ চায়ের দোকানদারের পোষা বানরটি একটি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল।
“একটি বানরও হোটেলে চা পান করতে পারে অথচ আমাকে ফিরিয়ে দেয়া হলো”, নির্মল দুঃখের সাথে এরকম একটি ঘটনার কথা বলছিল সম্প্রতি ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে। “এটি শত শত বছর ধরে আমাদের ভাগ্যের লিখন। আমরা মানুষ নই। আমরা দলিত। আমি নিশ্চিত যে যখন আমি মারা যাব, আমার মৃতদেহের সৎকারের জন্য একটি আলাদা চিতা হবে”।
হরিজন একতা সংঘের সাধারন সম্পাদক হিসাবে নির্মল সমঅধিকার ও তার সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের মানুষ হিসাবে সম্মান আদায়ের জন্য বছরের পর বছর ধরে প্রচারনা চালাচ্ছে, কিন্তু এ পর্যন্ত কোন কিছুই অর্জিত হয়নি।
সমগ্র দক্ষিন এশিয়া ব্যাপী, দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত জনগন বৈষম্যের শিকার এবং শত শত বছর ধরে অত্যাচারিত হয়ে আসছে। ভারতে, যেখানে তাদের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি বা সমগ্র জনসংখ্যার ১৬%, অথচ সেখানে তারা জাতি সত্ত্বার পরিচয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নীচে অবস্থান করছে। বেশিরভাগই খুবই নীচু ধরনের পেশার মধ্যে গন্ডিবদ্ধ হয়ে আছে, যেমন, নোংরা ঝাড়ু এবং গামলা নিয়ে মানুষের মল-মূত্র পরিষ্কার করার কাজ করে থাকে।
তাদেরকে এত অপবিত্র মনে করা হয় যে তাদের স্পর্শে সব কিছু অপবিত্র হয়ে যায়, এবং তাদেরকে অচ্ছুৎ নামে ডাকা হয়।
বাংলাদেশে দলিতদের কোন কোন সময় হোটেল এবং সেলুনে ঢুকতে নিষেধ করা হয়। এমনকি যদি কখনো ঢোকার অনুমতি দেয়াও হয়, তাদের জন্য চিহ্ন দেয়া থালাবাসন রাখা হয়। চা পানের জন্য, তাদেরকে তাদের নিজেদের কাপ কাছে রাখতে হয়।
“জাতিগত বৈষম্য বাংলাদেশের একটি মারাত্মক সমস্যা”, দলিত সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের একজন কর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল খবর সাউথ এশিয়াকে বলেন। তিনি বলেন দলিত সম্প্রদায়ের লোকদেরকে মূল ধারার সাথে সংযুক্ত করতে আইনের প্রয়োজন।
এর সাথে তিনি আরো যুক্ত করে বলেন যে, “তাদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে উদ্যোগ প্রয়োজন এবং এজন্য তাদের জন্য শিক্ষা এবং অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে বিশেষ আসন সংরক্ষনের ব্যবস্থা রাখা উচিত”।
দলিত সম্প্রদায়ের নেতাদের মতও তাই, যে নতুন আইন ছাড়া আশা খুবই কম।
“যেহেতু অচ্ছুৎ এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নে কোন ধরনের কোন আইন নাই, আমরা এর প্রতিকার চেয়ে কোন ধরনের কোন অভিযোগ দায়ের করতে পারিনা”, বোধানকি সলোমন, যিনি বঞ্চিত সম্প্রদায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন নেতা, তিনি খবরকে এমনটিই বলছিলেন।
বাংলাদেশে দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সংখ্যার ব্যাপারে কোন ধরনের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। সে যাই হোক, বেসরকারী সংস্থা নাগরিক উদ্যোগ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন সংঘের মতে, এ সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের মত ।
রাজধানীর পুরনো ঢাকায় অবস্থিত, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দলিত সম্প্রদায়ের কলোনিতে পরিবারগুলো খড় ও টিন দিয়ে তৈরি একটি ছোট খুপরি ঘরের ভিতরে গাদাগাদি করে বাস করে। বিবস্ত্র বাচ্চারা খোলা জায়গায় বসে পায়খানা করছে, এবং এলাকাটি মাছি ভর্তি খোলা নর্দমা দিয়ে ঠাসা।
দলিত শিশুরা তাদের কলোনির বাহিরে কোন বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেনা এবং এ ক্ষেত্রে তারা সমাজে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে যদি তারা শুধুমাত্র তাদের পরিচয় গোপন করে।
এই কলোনির একজন বাসিন্দা বি. অপ্পা রাও, বলেন স্থানীয় দলিতরা প্রধানত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের জন্য ঝাড়ুদার ও আবর্জনা সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করে থাকে, এক্ষেত্রে তাদের মাসিক বেতন হয় ছয় থেকে বারো হাজার টাকা ( ৭৫ থেকে ১৫০ ডলার)। অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে আয়ের পরিমাণ অনেক কম যেমন দুই থেকে চার হাজার টাকা (২৫ থেকে ৫০ ডলার)।
একই জায়গায় বসবাসকারী আরতি রানী তার জীবনের বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমার দাদা ঢাকা এসেছিলেন অন্ধ্র প্রদেশ থেকে ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ করতে। তারপর আমার পিতা একই কাজ করতেন এবং আমিও তাকে অনুসরণ করি। আমি জানি যে ভবিষ্যতে যখন আমার শিশুরা বড় হবে তখন তারাও ওই একই কাজ করবে।”
![পুরনো ঢাকার দলিত সম্প্রদায়ের নারীরা একটি নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহের জন্য জড়ো হয়েছে। দলিত সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষেরা পরিচ্ছন্নকর্মী এবং আবর্জনা সংগ্রহকারী হিসাবে কাজ করে, মাসে ছয় হাজার থেকে ১২,০০০টাকা (৭৫ ডলার থেকে ১৫০ডলার) পর্যন্ত আয় করে থাকে।[মুসলিম জাহান/খবর]](http://khabarsouthasia.com/shared/images/2012/05/02/120503-SHARIF_IN_DALITCOMMUNITY-310_207.jpg)
No comments:
Post a Comment