ইউনিয়ন তথ্য সেবা ॥ কাছে এলো সাত সমুদ্র
০ গাঁয়ের বধূর হাতে স্কাইপে-হাতের মুঠোয় দুনিয়া
০ ইউনিয়ন অফিসে এখন ভিড় জমেই থাকে
০ ব্রডব্যান্ড লাইন না হওয়ায় স্পীড কম
০ ইউনিয়ন অফিসে এখন ভিড় জমেই থাকে
০ ব্রডব্যান্ড লাইন না হওয়ায় স্পীড কম
রশিদ মামুন ॥ মা কেমন আছ মা? এই তো বাবা ভাল। তোর শরীর কেমন? তোমার দোয়ায় ভাল আছি মা। তোমাকে কত দিন দেখি না,
তোকেও খুব দেখতে ইচ্ছা করে।
মায়ের চোখ ভিজে ওঠে। ছেলে তাঁকে বুঝায়, এই তো ডিসেম্বরে আসছি মা। লক্ষ্মী মা আর কেঁদ না। মা থেমে যান। ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় জানতে চান খাইছস? সোনারং ইউনিয়নের অজ পাড়াগাঁয়ের মরিয়ম সিঙ্গাপুর প্রবাসী ছেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ভাবা যায়, হেডফোন অজ পাড়াগাঁয়ের মা আজ ইন্টারনেটে সুদূরপ্রবাসী ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। ভিডিও কলে দেখে নেন সাত সমুদ্র তের নদী ওপারে থাকা তাঁর বুকের মানিককে। আশায় প্রহর গোনেন ডিসেম্বরে ছেলে আসবে। বিন্নি ধানের খই ভাজেন, ডালের বড়ি শুকান, আরও কত কী? এ এক বিস্ময়কর এগিয়ে যাওয়া। প্রযুক্তির সঙ্গে জীবনের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠা। মানুষের জীবনকে প্রযুক্তির সঙ্গে একাকার করে দিয়েছে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র।
সোনারং ইউনিয়নের তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা রকিবুল হাসান জানালেন, গাঁয়ের বধূর হাতে স্কাইপি পৌঁছার গল্পটি এরই মধ্যে পুরনো হয়ে গেছে। মা মরিয়মের মতো এখন আর খুব বেশি কেউ এখানে প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন না। স্মার্টফোন কেনার পর প্রথমবার আসেন মেইল খুলতে, স্কাইপে সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে আর ফেসবুক এ্যাকাউন্ট করতে। তিনি যুক্ত হন বিশ্বের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে। মুহূর্তে পৃথিবী বন্দী হয় তাঁর হাতের তালুতে। চাইলেই তিনি পৃথিবীর অপরপ্রান্তের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। প্রিয়জন যেন আর সুদূরে নয় সব সময় তাঁর কাছে তাঁর অতি নিকটেই থাকেন।
শুধুই কি কথা বলা, না। এখানে বসে ইতালি প্রবাসীর সঙ্গে চার মাস আগে বিয়ে হলো লুনার (ছদ্ম নাম)। ভিডিও কলে পাত্রপাত্রীর প্রথম দেখাদেখি। এরপর পছন্দ, অতঃপর বিয়ে-সংসার। এখানে একই প্রক্রিয়ায় বিয়ে হয়েছিল আরেক গাঁয়ের কন্যা নাফিজার (ছদ্ম নাম)। তিনি নিজেও চার মাস হয় সিঙ্গাপুর গেছেন। এখান থেকেই পাসপোর্টের ফরম পূরণ, ভিসার জন্য আবেদন করেন। এরপর স্বামীর কাছে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান।
আগে যেখানে ইউনিয়ন পরিষদে মানুষ আসতেই চাইত না, এখন সেখানেই সারাদিনমান মানুষের ভিড় লেগে থাকে। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির আরেক ইউনিয়ন আব্দুল্লাপুরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম জানান, এখন সারাদিন মানুষ গমগম করে। মানুষ তার প্রয়োজনেই ইউনিয়ন পরিষদে ছুটে আসে। তাঁর মতে, তথ্য এবং সেবাকেন্দ্র শুধু মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কটি আরও নিবিড় হচ্ছে। জন্ম এবং মৃত্যু সনদ স্বাক্ষর করতে করতে চেয়ারম্যান জানালেন, এ সবই তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের কাজ।
উপজেলার আরেক ইউনিয়ন বেতকা। ঘড়িতে তখন ১২টা বেজে ৫১ মিনিট। সূর্য মধ্য গগনে। কাঠফাটা রোদ। তীব্র দাবদাহে মনে হচ্ছে সব কিছু পুড়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট অনেকটাই জনমানব শূন্য। কিন্তু এর মধ্যেই তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রে রমা খানম বসে আছেন, স্বামীর ওয়ারেশ কায়েম সনদ নেয়ার জন্য। স্থানীয় মাস্টার মুতালিব খানের স্ত্রী রমা খানম জানালেন, এই প্রথমবার নয়Ñ হজে যাওয়ার আগে পাসপোর্টের ফরম পূরণ করতে তিনি এর আগেও সেবাকেন্দ্রে এসেছেন। আরও একবার এসেছিলেন নাতি-পুতির জন্মসনদ নিতে। এক কথায় চমৎকার সেবার মান। শিক্ষিত ছেলেরা কাজ করছেন। এদের কাছে এলে হরেক রকম সমাধান পাওয়া যায়।
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের চারটি ইউনিয়ন ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সেবাকেন্দ্র হওয়ায় হাতের কাছেই এমন অনেক কিছুই পাচ্ছেন, যা আগে ছিল না। সামান্য একটু কাজের জন্য উপজেলা এবং জেলায় যেতে হতো, এখন ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রই তা মিটিয়ে দিচ্ছে। হাতের কাছে সেবা পাওয়ায় সময় এবং অর্থ বেঁচে যাচ্ছে। মানুষের জীবন বদলে দিতে সেবাকেন্দ্র অনন্য ভূমিকা রাখছে।
গ্রামের যে ছেলেটি বা মেয়েটি এসএসসি বা এইচএসসি পাস করছে, সে ইউনিয়ন তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রে গিয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেন ২০০৭ সালে স্থানীয় হরগঙ্গা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। তার পর এই ইউনিয়নের তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন। এখন তিনিই অন্যদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এমনই একজন রোকসানা আক্তার। তিনিও বিকম পাস করার পর এখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। রোকসানা জানালেন, এখন চাকরির জন্য কম্পিউটার জানাটা আবশ্যক। তাই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন। শুধু রোকসানাই নয় এমন লাখো রোকসানা এ সব সেবাকেন্দ্র থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ঘুচেছে তাদের বেকারত্ব। ফিরছে সুদিন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সনদও দিয়ে থাকে তথ্য ও সেবাকেন্দ্রগুলো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সনদ (সার্টিফিকেট) প্রদান করেন। সরকারী-বেসরকারী সকল চাকরির ক্ষেত্রে এ সব সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য। তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার এখানেই কাজের ঠিকানা হয়েছেÑ এমন উদাহরণও খুঁজে পাওয়া গেল। সোনারং ইউনিয়নের নাজিম শেখ তথ্য ও সেবাকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে সেখানেই কাজ করছেন। তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা বলছেন, এমন এক সময় ছিল কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য শহরে গিয়ে থাকতে হতো। গ্রামে কম্পিউটার শেখার মতো বিষয় ভাবাই যেত না। আবার সনদ গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে গহিন গ্রামে হাতের কাছেই সেই সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
সোনারংয়ের তথ্যকেন্দ্রের উদ্যোক্তা রকিবুল হাসান জানালেন, প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ মেইল খুলতে আসেন। ফেসবুকের প্রতি ঝোঁক অল্প বয়সীদের। বাড়িতে হয়ত কম্পিউটার-ইন্টারনেট কিছুই নেই, তার পরও একটা মেইল-ফেসবুক খুলে যান তাঁরা। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চান সকলে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানায়, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বীমাকে এই কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা হলে উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রবি, বীমার মধ্যে সরকারী প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা কর্পোরেশন আর ব্যাংকের মধ্যে মার্কেন্টাইল এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ইতোমধ্যে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় কোটি। বিশাল এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে পারে সেবাকেন্দ্রগুলো।
বেতকার চেয়ারম্যান শওকত আলী খান (মুক্তার) জানালেন, সেবার মান আরও বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিষয় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এখানে এলে মোবাইল ব্যাংকিং, বীমার সুবিধাও পাবেন সাধারণ মানুষ। আমরা সে ব্যবস্থা করছি। এ ছাড়াও আমরা চেষ্টা করছি বাল্যবিবাহ এবং মাদকের ছোবল থেকে এলাকাবাসীকে বাঁচাতে। এ জন্য প্রয়োজন জীবনকে উন্নত করা; কেবল তা হতে পারে তথ্যের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ঘটলে। নিজকক্ষে বসেই তিনি একটি বিবাহের আগে জন্ম নিবন্ধনপত্রও দেখতে চাইলেন। বয়স নিশ্চিত হওয়ার পরই বিয়ের অনুমতি দিলেন। এর পর বলেন, তথ্যকেন্দ্র চালু হওয়ার পর আমরা খুব সহজেই একজন মানুষের প্রকৃত বয়স সম্পর্কে অবগত হতে পারছি। সঙ্গত কারণে কেউ চাইলেই তাঁর অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না।
কৃষি এবং কৃষকের কাছে সত্যিই আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারত সেবাকেন্দ্রগুলো। প্রয়োজন ছিল একটু প্রশিক্ষণের। তবে এখনও সে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কৃষকের জন্য সুবিধা বলতে কেবল জমির পর্চার জন্য আবেদন নেয়ার পাশাপাশি তা সরবরাহ করা হয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল হওয়ায় এমনটা সম্ভব হয়েছে।
আউটশাহী ইউনিয়নের আসলাম ঢালী জানালেন, আগে জমির কাগজপত্রের জন্য দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরতে হতো, এখন সেবাকেন্দ্রে গেলেই সব পাওয়া যায়। কোন দালাল নেই ঝঞ্ঝাটও নেই। আবেদন ফরম পূরণ করলেই হয়। এতটুকুও কৃষকের জন্য কম কিছু নয়। কিন্তু কৃষির নানা বিষয়ে চটজলদি সমাধানের পথ খুলে দিতে পারত ইউনিয়ন তথ্য এবং সেবাকেন্দ্র। উদ্যোক্তাদের কিছুটা প্রশিক্ষণ দিলেই এমনটা করা যেত বলে মনে করেন এই কৃষক।
কৃষকের নানা সমস্যায় তথ্যকেন্দ্র কী সেবা দিতে পারে- জানতে চাইলে বেতকা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মাহবুব হাসান সেলিম বলেন, যেহেতু আমরা এ ধরনের সেবা প্রদান করি না, তাই কৃষক এখানে তেমন আসেন না। তবে মাঝে মধ্যে কেউ এলে আমরা কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং অনলাইন ঘেঁটে সমস্যার সামাধান দেয়ার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে কোন কৃষি তথ্য সার্ভিসের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকলে আমরা কৃষকের সমস্যাগুলো তাদের কাছে পাঠাতে পারতাম। প্রয়োজনে সমস্যার ছবি এবং ভিডিও কলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো। এতে কৃষক আরও উপকৃত হতে পারতেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র (ইউআইএসসি), বাংলাদেশের ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য ও সেবাকেন্দ্র, যার উদ্দেশ্য হলো তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দোরগোড়ায় তথ্যসেবা নিশ্চিত করা। ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র ২০০৭ সালে ‘কমিউনিটি ইনফরমেশন সেন্টার’ (সিইসি) নামে শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামের (এটুআই) আওতায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদে এবং দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মুর্শিদহাট ইউনিয়ন পরিষদে পাইলট প্রকল্প আকারে সিইসির কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হয়। পাইলট প্রকল্পে অভিজ্ঞতার আলোকে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিভাগ এটুআই প্রোগ্রামের সহায়তায় ৩০টি ইউনিয়ন পরিষদে সিইসি থেকে বেরিয়ে এসে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে আবারও স্থানীয় সরকার বিভাগ এটুআইয়ের সহায়তায় ১০০টি ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপন করে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জাতীয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এ সব ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র সমন্বয় করছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ সিদ্ধান্ত নেয় ওই বছরের জুন মাসের মধ্যে আরও ১০০০টি তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপন করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১০ সালের ১১ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও ইউএনডিপির এডমিনিস্ট্রেটর মিস. হেলেন ক্লার্ক যৌথভাবে দেশব্যাপী ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের আওতায় তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রগুলোকে পরিচালনা করা হয়। ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ই-গবর্ন্যান্স সেলের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির গৃহীত উদ্যোগ ও প্রোগ্রামের যথার্থ বাস্তবায়নে নিশ্চয়তা প্রদান করছে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমর্থন দিয়ে থাকে এবং প্রকল্পের মূল্যায়ন এবং নিরীক্ষণে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে যা বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশের ই-গবর্ন্যান্স ভিশন এবং কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করছে, যা দেশের উন্নয়নে ডিজিটাল সুযোগ সুবিধাকে জনগণের নিকট নিশ্চিত করতে পারে। এ ছাড়া দেশের জাতীয় ই-গবর্ন্যান্স ভিশন পরিকল্পনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সুবিধাকে শনাক্ত করা হয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে সেবাকেন্দ্র করার জন্য সরকার এক্ষেত্রে উদ্যোগ নিয়েছে। একটি উদ্যোগই এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আর এখনও স্থানীয় থানা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা এবং আইসিটি) মাধ্যমে মন্ত্রণালয় বিষয়টির সমন্বয় ছাড়া আর তেমন কিছু করছে না। সরকারের যৎসামান্য অনুদান আর ইউনিয়ন পরিষদের আয় থেকেই একটি করে ডেক্সটপ কম্পিউটার, একটি করে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফটোকপিয়ার, মডেম এবং প্রজেক্টর কেনা হয়েছে। এখন টুকটাক মেরামতের কাজ উদ্যোক্তাদেরই করতে হয়। এখান থেকে প্রত্যেক মাসের আয়কেই উদ্যোক্তা নিজের সম্মানী হিসেবে নিয়ে থাকেন।
উদ্যোক্তা বাছাই করার ক্ষেত্রেও একজন পুরুষ এবং একজন মহিলাকে বাছাই করা হয়েছে। ইউনিয়নগুলোতে দুজন উদ্যোক্তা রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারী। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মমুখী করে তোলার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নারী যাতে সেবা গ্রহণ করতে এসে বিব্রত বোধ না করে সেটিও একটি উদ্দেশ্য ছিল। তবে বেশিরভাগ ইউনিয়নে কাজ বেশি থাকায় তিন থেকে চারজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শুরুতে ১৩ ধরনের সেবা দেয়া হলেও। এখন সেবার পরিধি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সেবাগুলো হচ্ছে- বিভিন্ন রকম সনদ প্রদান করা, কম্পিউটার কম্পোজ, ই-মেইল, ইন্টারনেট, ছবি তোলা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, অনলাইনে বিভিন্ন সরকারী ফরম পূরণ, জমির খতিয়ানের জন্য আবেদন ও সরবরাহ, মোবাইল ব্যাংকিং, ফটোকপি, জীবন বীমা, প্লাস্টিক আইডি কার্ড, ছাপার কাজ, বিদ্যুত বিল গ্রহণ, বিভিন্ন প্রকার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় তথ্য প্রদান, বিমানের টিকেট করা, পরীক্ষার ফলাফল জানা, অনলাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম পূরণ, চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন করা, বিদেশ যাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন, বিদেশের ভিসা আবেদন এবং ভিসা যাচাই, লেমিনেটিং, ফটোকপি, প্রজেক্টর ভাড়া দেয়া, ভিডিও প্রোগ্রামিং, ভিডিও এডিটিং করা। তথ্য ও সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠার পাশাপাশি একটি ইউনিয়নের সব কার্যক্রম হয়ে উঠেছে অনলাইনকেন্দ্রিক। যদিও নিয়মিত সংস্করণ (আপডেট) হয় না, তার পরও যে কেউ চাইলেই একটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ তথ্য সেখান থেকে জেনে নিতে পারেন। প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি করে ওয়েবপোর্টালও করা হয়েছে। এখানে ইউনিয়ন পরিষদে কতজন প্রবাসে রয়েছেন, সে তথ্যটি পর্যন্ত পাওয়া যাবে। তথ্য ও সেবাকেন্দ্রগুলোর উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিমাসে একবার বৈঠক করেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। যে কোন প্রয়োজনে যখন তখন উদ্যোক্তারা ফোন করে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন ইউএনওকে। প্রতি দুই মাস পর পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা এবং আইসিটি) সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। এ সব বৈঠকে তথ্যকেন্দ্রগুলোর সমস্য শুনে সমাধান দেন তাঁরা। কিভাবে সেবাকেন্দ্রকে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনাও দেয়া হয় উদ্যোক্তাদের। বছরে অন্তত একবার উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল মেলার আয়োজন করা হয়। সেবাকেন্দ্রগুলো মেলায় নিজেদের স্টল স্থাপন করে। এখানে মানুষকে অনলাইনে নানা সুবিধা দেয়া হয়। নানা মাপকাঠিতে ফেলে উপজেলার শ্রেষ্ঠ তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের পুরস্কার দেয়া হয় কোন না কোন ইউনিয়নকে। এতে সেবার মান বৃদ্ধিতে কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের আরও ভাল সেবা পাওয়ার পথ প্রসারিত হয়।
সেবাকেন্দ্রগুলোকে কিভাবে আরও কার্যকর করা যায়- এমন প্রশ্নের উত্তরে উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা কেউ স্থায়ী নয়। কর্মীর কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য সেবা পেতে হলে তাঁর চাকরির নিশ্চয়তা থাকতে হয়। চাকরিতে নিয়মিত পারিশ্রমিক থাকতে হয়। কিন্তু তাদের কোনটিই নেই। তাঁরা নিয়োগ পান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের খেয়ালখুশিতে। তিনি না চাইলে উদ্যোক্তার পক্ষে আর পরিষদে আসা সম্ভব হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর উদ্যোক্তারাও পরিবর্তন হয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউএনওকে একটি মেইল প্রেরণ করা ছাড়া আর কিছু করা হয় না। উদ্যোক্তাদের সকলের দাবি- সরকার যদি ন্যূনতম একটু বেতন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে আরও ভাল সেবা দিতে পারবেন।
উদ্যোক্তা মাহবুব হাসান সেলিম মনে করেন, এখানে আমার চাকরির কোন নিশ্চয়তা নেই। প্রতিমাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হয় ঠিকই। কিন্তু তা দিয়ে কোনমতে জীবন চালিয়ে নেয়া যায়। কাজের শুরুতে কোন নিয়োগপত্রও দেয়া হয় না। আমাকে যদি হুট করে ইউনিয়ন পরিষদে আসতে মানা করে দেয়া হয় তাহলে কিছুই করার থাকবে না। আমাদের আয়ের একটি অংশ নিয়ে যদি সরকার যে কোন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের বেতন দেয়, তাহলেও আমরা এক ধরনের স্বীকৃতি পাব। আর এতে আরও উৎসাহের সঙ্গে কাজ করতে পারব।
সেবাকেন্দ্রের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ইন্টারনেট স্পিড। ব্রডব্যন্ড লাইন দেয়ার কথা থাকলেও এখনও মডেম দিয়েই চালাতে হচ্ছে সব কাজ। ফলে বড় ফাইল ডাউনলোড করা, ভিডিও দেখা, ভিডিও ডাউনলোড করা খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্রডব্যন্ড লাইন দেয়া হলে তাদের অনেক সুবিধা হতো।
দেশের ইউনিয়নগুলোতে সরকারী নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাত্র একজন। তিনি হচ্ছেন ইউনিয়ন পরিষদ সচিব। যাকে সরকার থেকে বেতন দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রত্যেক ওয়ার্ডে একজন করে গ্রামপুলিশ আর একজন দফাদার রয়েছেন। গ্রামপুলিশদের বেতন ১ হাজার ৭০০ টাকা আর দফাদারের বেতন ১ হাজার ৯০০ টাকা। এতে দৈনিক ৫৬ বা ৬৩ টাকা আয়ে জীবন চালানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের পার্থক্য বিস্তর বেড়ে যাওয়ায় এ পেশাও পরিবর্তন করেছেন অনেকে। এর ওপর আবার নতুন কাউকে নিয়োগের বিষয়টি এখন সরকারের চিন্তার মধ্যেই নেই বলে জানালেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
২০০৭ সালে প্রথম পাইলট প্রকল্প হিসেবে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়ন এবং দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মুর্শিদহাট ইউনিয়নে তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রের কাজ শুরু হয়। প্রায় সাত বছর পর ওই এলাকার মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তনের কথা জানা গেছে। অন্তত গ্রামীণ জনপদে এগিয়ে থাকা মানুষের কাতারে রয়েছেন তাঁরা। এখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।
প্রথম চালু হওয়া দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মুর্শিদহাট ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তা সোমা আক্তার মৌ জানান, তাঁদের সেবাকেন্দ্রে এখন দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ জন সেবা নিতে আসেন। অনেকেই রয়েছেন কম্পিউটার ট্রেনিং নিয়ে বাইরে ভাল কাজ করছেন। আগে মানুষ কম্পিউটার ইন্টারনেট সম্পর্কে তেমন কিছু না জানলেও এখন তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রের কল্যাণে সব কিছুই জানেন বোঝেন।
পাইলট প্রকল্পে থাকা সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মোঃ সালাহ উদ্দিন জানান, প্রথমদিকে দুই-তিন বছর তাঁদের বসেই থাকতে হতো। এখন মানুষের ভিড় বেড়েছে। প্রত্যেক দিন অনেকেই সেবা নিতে আসেন। প্রথমদিকে বিভাগীয় পর্যায়ে ডিজিটাল মেলা হতো। এখন উপজেলা পর্যায়েও হচ্ছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন কোনদিন হয়ত ইউনিয়ন পর্যায়ে এমন মেলার আয়োজন করা হবে। এখন পর্যন্ত তিনি ১৮ জনকে কম্পিউটার ট্রেনিং করিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের চাকরি হয়েছে। আপাতত ইউএনও সনদ দিলেও ভবিষ্যতে কারিগরি বোর্ডের অধিভুক্ত করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। তাহলে আরও বেশি বেশি মানুষ এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হবেন বলে মনে করেন তিনি।
বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার এ প্রসঙ্গে বলেন, নিসন্দেহে সরকারের এটি অনেক বড় উদ্যোগ। জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য প্রযুক্তির সেবা পৌঁছে দিতে সাংগঠনিক কাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এটি করার আগে তিনটি বিষয়ে আরও ভাল করে চিন্তা করা প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি। উদ্যোক্তাদের স্থায়ী পদ না থাকা, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা এবং ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে ব্রডব্যন্ড লাইন দেয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, সবাই খুব ভালভাবে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এমন নয়। এখানে যাঁরা ভাল তাঁরা ভাল করছেন আর যাঁরা যথেষ্ট প্রশিক্ষিত নয় তাঁরা সঙ্গত কারণেই ভাল করতে পারছেন না। সরকারের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে কিন্তু সেই বিনিয়োগের ফলাফল কী পাওয়া যাচ্ছে, তার মূল্যায়ন করা উচিত। মোস্তফা জব্বার বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের এখানে একবার একটি কাজ করা হয়ে গেলে আর মনিটরিং করা হয় না। যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেখভালের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা চিন্তা করছি কিভাবে এই সেবার মান আরও বৃদ্ধি করা যায়। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি সেবাকেন্দ্রগুলোকে যথাযথ মনিটরিং করা হবে। এভাবে এক সময় মানুষের ঘরে ঘরে ই-তথ্যসেবা পৌঁছে যাবে। উদ্যোক্তাদের স্থায়ী চাকরি এবং বেতন দেয়ার কোন চিন্তা আছে কিনা- জানতে চাইলে বলেন, চেয়ারম্যান বদলের সঙ্গে উদ্যোক্তা বদল- এমন পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় তা আমরা দেখব। তারা কারও হাতের পুতুল হবে না। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এ পদগুলোকে স্থায়ী করা হবে বলেও জানান তিনি।
তোকেও খুব দেখতে ইচ্ছা করে।
মায়ের চোখ ভিজে ওঠে। ছেলে তাঁকে বুঝায়, এই তো ডিসেম্বরে আসছি মা। লক্ষ্মী মা আর কেঁদ না। মা থেমে যান। ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় জানতে চান খাইছস? সোনারং ইউনিয়নের অজ পাড়াগাঁয়ের মরিয়ম সিঙ্গাপুর প্রবাসী ছেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ভাবা যায়, হেডফোন অজ পাড়াগাঁয়ের মা আজ ইন্টারনেটে সুদূরপ্রবাসী ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। ভিডিও কলে দেখে নেন সাত সমুদ্র তের নদী ওপারে থাকা তাঁর বুকের মানিককে। আশায় প্রহর গোনেন ডিসেম্বরে ছেলে আসবে। বিন্নি ধানের খই ভাজেন, ডালের বড়ি শুকান, আরও কত কী? এ এক বিস্ময়কর এগিয়ে যাওয়া। প্রযুক্তির সঙ্গে জীবনের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠা। মানুষের জীবনকে প্রযুক্তির সঙ্গে একাকার করে দিয়েছে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র।
সোনারং ইউনিয়নের তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা রকিবুল হাসান জানালেন, গাঁয়ের বধূর হাতে স্কাইপি পৌঁছার গল্পটি এরই মধ্যে পুরনো হয়ে গেছে। মা মরিয়মের মতো এখন আর খুব বেশি কেউ এখানে প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন না। স্মার্টফোন কেনার পর প্রথমবার আসেন মেইল খুলতে, স্কাইপে সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে আর ফেসবুক এ্যাকাউন্ট করতে। তিনি যুক্ত হন বিশ্বের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে। মুহূর্তে পৃথিবী বন্দী হয় তাঁর হাতের তালুতে। চাইলেই তিনি পৃথিবীর অপরপ্রান্তের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। প্রিয়জন যেন আর সুদূরে নয় সব সময় তাঁর কাছে তাঁর অতি নিকটেই থাকেন।
শুধুই কি কথা বলা, না। এখানে বসে ইতালি প্রবাসীর সঙ্গে চার মাস আগে বিয়ে হলো লুনার (ছদ্ম নাম)। ভিডিও কলে পাত্রপাত্রীর প্রথম দেখাদেখি। এরপর পছন্দ, অতঃপর বিয়ে-সংসার। এখানে একই প্রক্রিয়ায় বিয়ে হয়েছিল আরেক গাঁয়ের কন্যা নাফিজার (ছদ্ম নাম)। তিনি নিজেও চার মাস হয় সিঙ্গাপুর গেছেন। এখান থেকেই পাসপোর্টের ফরম পূরণ, ভিসার জন্য আবেদন করেন। এরপর স্বামীর কাছে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান।
আগে যেখানে ইউনিয়ন পরিষদে মানুষ আসতেই চাইত না, এখন সেখানেই সারাদিনমান মানুষের ভিড় লেগে থাকে। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির আরেক ইউনিয়ন আব্দুল্লাপুরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম জানান, এখন সারাদিন মানুষ গমগম করে। মানুষ তার প্রয়োজনেই ইউনিয়ন পরিষদে ছুটে আসে। তাঁর মতে, তথ্য এবং সেবাকেন্দ্র শুধু মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কটি আরও নিবিড় হচ্ছে। জন্ম এবং মৃত্যু সনদ স্বাক্ষর করতে করতে চেয়ারম্যান জানালেন, এ সবই তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের কাজ।
উপজেলার আরেক ইউনিয়ন বেতকা। ঘড়িতে তখন ১২টা বেজে ৫১ মিনিট। সূর্য মধ্য গগনে। কাঠফাটা রোদ। তীব্র দাবদাহে মনে হচ্ছে সব কিছু পুড়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট অনেকটাই জনমানব শূন্য। কিন্তু এর মধ্যেই তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রে রমা খানম বসে আছেন, স্বামীর ওয়ারেশ কায়েম সনদ নেয়ার জন্য। স্থানীয় মাস্টার মুতালিব খানের স্ত্রী রমা খানম জানালেন, এই প্রথমবার নয়Ñ হজে যাওয়ার আগে পাসপোর্টের ফরম পূরণ করতে তিনি এর আগেও সেবাকেন্দ্রে এসেছেন। আরও একবার এসেছিলেন নাতি-পুতির জন্মসনদ নিতে। এক কথায় চমৎকার সেবার মান। শিক্ষিত ছেলেরা কাজ করছেন। এদের কাছে এলে হরেক রকম সমাধান পাওয়া যায়।
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের চারটি ইউনিয়ন ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সেবাকেন্দ্র হওয়ায় হাতের কাছেই এমন অনেক কিছুই পাচ্ছেন, যা আগে ছিল না। সামান্য একটু কাজের জন্য উপজেলা এবং জেলায় যেতে হতো, এখন ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রই তা মিটিয়ে দিচ্ছে। হাতের কাছে সেবা পাওয়ায় সময় এবং অর্থ বেঁচে যাচ্ছে। মানুষের জীবন বদলে দিতে সেবাকেন্দ্র অনন্য ভূমিকা রাখছে।
গ্রামের যে ছেলেটি বা মেয়েটি এসএসসি বা এইচএসসি পাস করছে, সে ইউনিয়ন তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রে গিয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেন ২০০৭ সালে স্থানীয় হরগঙ্গা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। তার পর এই ইউনিয়নের তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন। এখন তিনিই অন্যদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এমনই একজন রোকসানা আক্তার। তিনিও বিকম পাস করার পর এখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। রোকসানা জানালেন, এখন চাকরির জন্য কম্পিউটার জানাটা আবশ্যক। তাই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন। শুধু রোকসানাই নয় এমন লাখো রোকসানা এ সব সেবাকেন্দ্র থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ঘুচেছে তাদের বেকারত্ব। ফিরছে সুদিন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সনদও দিয়ে থাকে তথ্য ও সেবাকেন্দ্রগুলো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্দিষ্ট দিনে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সনদ (সার্টিফিকেট) প্রদান করেন। সরকারী-বেসরকারী সকল চাকরির ক্ষেত্রে এ সব সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য। তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার এখানেই কাজের ঠিকানা হয়েছেÑ এমন উদাহরণও খুঁজে পাওয়া গেল। সোনারং ইউনিয়নের নাজিম শেখ তথ্য ও সেবাকেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে সেখানেই কাজ করছেন। তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা বলছেন, এমন এক সময় ছিল কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য শহরে গিয়ে থাকতে হতো। গ্রামে কম্পিউটার শেখার মতো বিষয় ভাবাই যেত না। আবার সনদ গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে গহিন গ্রামে হাতের কাছেই সেই সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
সোনারংয়ের তথ্যকেন্দ্রের উদ্যোক্তা রকিবুল হাসান জানালেন, প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ মেইল খুলতে আসেন। ফেসবুকের প্রতি ঝোঁক অল্প বয়সীদের। বাড়িতে হয়ত কম্পিউটার-ইন্টারনেট কিছুই নেই, তার পরও একটা মেইল-ফেসবুক খুলে যান তাঁরা। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চান সকলে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানায়, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বীমাকে এই কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা হলে উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রবি, বীমার মধ্যে সরকারী প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা কর্পোরেশন আর ব্যাংকের মধ্যে মার্কেন্টাইল এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ইতোমধ্যে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় কোটি। বিশাল এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে পারে সেবাকেন্দ্রগুলো।
বেতকার চেয়ারম্যান শওকত আলী খান (মুক্তার) জানালেন, সেবার মান আরও বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিষয় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এখানে এলে মোবাইল ব্যাংকিং, বীমার সুবিধাও পাবেন সাধারণ মানুষ। আমরা সে ব্যবস্থা করছি। এ ছাড়াও আমরা চেষ্টা করছি বাল্যবিবাহ এবং মাদকের ছোবল থেকে এলাকাবাসীকে বাঁচাতে। এ জন্য প্রয়োজন জীবনকে উন্নত করা; কেবল তা হতে পারে তথ্যের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ঘটলে। নিজকক্ষে বসেই তিনি একটি বিবাহের আগে জন্ম নিবন্ধনপত্রও দেখতে চাইলেন। বয়স নিশ্চিত হওয়ার পরই বিয়ের অনুমতি দিলেন। এর পর বলেন, তথ্যকেন্দ্র চালু হওয়ার পর আমরা খুব সহজেই একজন মানুষের প্রকৃত বয়স সম্পর্কে অবগত হতে পারছি। সঙ্গত কারণে কেউ চাইলেই তাঁর অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিতে পারছেন না।
কৃষি এবং কৃষকের কাছে সত্যিই আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারত সেবাকেন্দ্রগুলো। প্রয়োজন ছিল একটু প্রশিক্ষণের। তবে এখনও সে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কৃষকের জন্য সুবিধা বলতে কেবল জমির পর্চার জন্য আবেদন নেয়ার পাশাপাশি তা সরবরাহ করা হয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল হওয়ায় এমনটা সম্ভব হয়েছে।
আউটশাহী ইউনিয়নের আসলাম ঢালী জানালেন, আগে জমির কাগজপত্রের জন্য দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরতে হতো, এখন সেবাকেন্দ্রে গেলেই সব পাওয়া যায়। কোন দালাল নেই ঝঞ্ঝাটও নেই। আবেদন ফরম পূরণ করলেই হয়। এতটুকুও কৃষকের জন্য কম কিছু নয়। কিন্তু কৃষির নানা বিষয়ে চটজলদি সমাধানের পথ খুলে দিতে পারত ইউনিয়ন তথ্য এবং সেবাকেন্দ্র। উদ্যোক্তাদের কিছুটা প্রশিক্ষণ দিলেই এমনটা করা যেত বলে মনে করেন এই কৃষক।
কৃষকের নানা সমস্যায় তথ্যকেন্দ্র কী সেবা দিতে পারে- জানতে চাইলে বেতকা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মাহবুব হাসান সেলিম বলেন, যেহেতু আমরা এ ধরনের সেবা প্রদান করি না, তাই কৃষক এখানে তেমন আসেন না। তবে মাঝে মধ্যে কেউ এলে আমরা কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং অনলাইন ঘেঁটে সমস্যার সামাধান দেয়ার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে কোন কৃষি তথ্য সার্ভিসের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকলে আমরা কৃষকের সমস্যাগুলো তাদের কাছে পাঠাতে পারতাম। প্রয়োজনে সমস্যার ছবি এবং ভিডিও কলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো। এতে কৃষক আরও উপকৃত হতে পারতেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র (ইউআইএসসি), বাংলাদেশের ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য ও সেবাকেন্দ্র, যার উদ্দেশ্য হলো তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দোরগোড়ায় তথ্যসেবা নিশ্চিত করা। ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র ২০০৭ সালে ‘কমিউনিটি ইনফরমেশন সেন্টার’ (সিইসি) নামে শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামের (এটুআই) আওতায় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদে এবং দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মুর্শিদহাট ইউনিয়ন পরিষদে পাইলট প্রকল্প আকারে সিইসির কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হয়। পাইলট প্রকল্পে অভিজ্ঞতার আলোকে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিভাগ এটুআই প্রোগ্রামের সহায়তায় ৩০টি ইউনিয়ন পরিষদে সিইসি থেকে বেরিয়ে এসে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে আবারও স্থানীয় সরকার বিভাগ এটুআইয়ের সহায়তায় ১০০টি ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপন করে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জাতীয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এ সব ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র সমন্বয় করছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ সিদ্ধান্ত নেয় ওই বছরের জুন মাসের মধ্যে আরও ১০০০টি তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপন করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১০ সালের ১১ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও ইউএনডিপির এডমিনিস্ট্রেটর মিস. হেলেন ক্লার্ক যৌথভাবে দেশব্যাপী ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের আওতায় তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রগুলোকে পরিচালনা করা হয়। ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ই-গবর্ন্যান্স সেলের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনা করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির গৃহীত উদ্যোগ ও প্রোগ্রামের যথার্থ বাস্তবায়নে নিশ্চয়তা প্রদান করছে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমর্থন দিয়ে থাকে এবং প্রকল্পের মূল্যায়ন এবং নিরীক্ষণে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে যা বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশের ই-গবর্ন্যান্স ভিশন এবং কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করছে, যা দেশের উন্নয়নে ডিজিটাল সুযোগ সুবিধাকে জনগণের নিকট নিশ্চিত করতে পারে। এ ছাড়া দেশের জাতীয় ই-গবর্ন্যান্স ভিশন পরিকল্পনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সুবিধাকে শনাক্ত করা হয়।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে সেবাকেন্দ্র করার জন্য সরকার এক্ষেত্রে উদ্যোগ নিয়েছে। একটি উদ্যোগই এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আর এখনও স্থানীয় থানা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা এবং আইসিটি) মাধ্যমে মন্ত্রণালয় বিষয়টির সমন্বয় ছাড়া আর তেমন কিছু করছে না। সরকারের যৎসামান্য অনুদান আর ইউনিয়ন পরিষদের আয় থেকেই একটি করে ডেক্সটপ কম্পিউটার, একটি করে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফটোকপিয়ার, মডেম এবং প্রজেক্টর কেনা হয়েছে। এখন টুকটাক মেরামতের কাজ উদ্যোক্তাদেরই করতে হয়। এখান থেকে প্রত্যেক মাসের আয়কেই উদ্যোক্তা নিজের সম্মানী হিসেবে নিয়ে থাকেন।
উদ্যোক্তা বাছাই করার ক্ষেত্রেও একজন পুরুষ এবং একজন মহিলাকে বাছাই করা হয়েছে। ইউনিয়নগুলোতে দুজন উদ্যোক্তা রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারী। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মমুখী করে তোলার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া নারী যাতে সেবা গ্রহণ করতে এসে বিব্রত বোধ না করে সেটিও একটি উদ্দেশ্য ছিল। তবে বেশিরভাগ ইউনিয়নে কাজ বেশি থাকায় তিন থেকে চারজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শুরুতে ১৩ ধরনের সেবা দেয়া হলেও। এখন সেবার পরিধি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সেবাগুলো হচ্ছে- বিভিন্ন রকম সনদ প্রদান করা, কম্পিউটার কম্পোজ, ই-মেইল, ইন্টারনেট, ছবি তোলা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, অনলাইনে বিভিন্ন সরকারী ফরম পূরণ, জমির খতিয়ানের জন্য আবেদন ও সরবরাহ, মোবাইল ব্যাংকিং, ফটোকপি, জীবন বীমা, প্লাস্টিক আইডি কার্ড, ছাপার কাজ, বিদ্যুত বিল গ্রহণ, বিভিন্ন প্রকার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় তথ্য প্রদান, বিমানের টিকেট করা, পরীক্ষার ফলাফল জানা, অনলাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম পূরণ, চাকরির জন্য অনলাইনে আবেদন করা, বিদেশ যাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন, বিদেশের ভিসা আবেদন এবং ভিসা যাচাই, লেমিনেটিং, ফটোকপি, প্রজেক্টর ভাড়া দেয়া, ভিডিও প্রোগ্রামিং, ভিডিও এডিটিং করা। তথ্য ও সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠার পাশাপাশি একটি ইউনিয়নের সব কার্যক্রম হয়ে উঠেছে অনলাইনকেন্দ্রিক। যদিও নিয়মিত সংস্করণ (আপডেট) হয় না, তার পরও যে কেউ চাইলেই একটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ তথ্য সেখান থেকে জেনে নিতে পারেন। প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি করে ওয়েবপোর্টালও করা হয়েছে। এখানে ইউনিয়ন পরিষদে কতজন প্রবাসে রয়েছেন, সে তথ্যটি পর্যন্ত পাওয়া যাবে। তথ্য ও সেবাকেন্দ্রগুলোর উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিমাসে একবার বৈঠক করেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। যে কোন প্রয়োজনে যখন তখন উদ্যোক্তারা ফোন করে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন ইউএনওকে। প্রতি দুই মাস পর পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা এবং আইসিটি) সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। এ সব বৈঠকে তথ্যকেন্দ্রগুলোর সমস্য শুনে সমাধান দেন তাঁরা। কিভাবে সেবাকেন্দ্রকে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনাও দেয়া হয় উদ্যোক্তাদের। বছরে অন্তত একবার উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল মেলার আয়োজন করা হয়। সেবাকেন্দ্রগুলো মেলায় নিজেদের স্টল স্থাপন করে। এখানে মানুষকে অনলাইনে নানা সুবিধা দেয়া হয়। নানা মাপকাঠিতে ফেলে উপজেলার শ্রেষ্ঠ তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের পুরস্কার দেয়া হয় কোন না কোন ইউনিয়নকে। এতে সেবার মান বৃদ্ধিতে কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের আরও ভাল সেবা পাওয়ার পথ প্রসারিত হয়।
সেবাকেন্দ্রগুলোকে কিভাবে আরও কার্যকর করা যায়- এমন প্রশ্নের উত্তরে উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা কেউ স্থায়ী নয়। কর্মীর কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য সেবা পেতে হলে তাঁর চাকরির নিশ্চয়তা থাকতে হয়। চাকরিতে নিয়মিত পারিশ্রমিক থাকতে হয়। কিন্তু তাদের কোনটিই নেই। তাঁরা নিয়োগ পান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের খেয়ালখুশিতে। তিনি না চাইলে উদ্যোক্তার পক্ষে আর পরিষদে আসা সম্ভব হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর উদ্যোক্তারাও পরিবর্তন হয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউএনওকে একটি মেইল প্রেরণ করা ছাড়া আর কিছু করা হয় না। উদ্যোক্তাদের সকলের দাবি- সরকার যদি ন্যূনতম একটু বেতন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে আরও ভাল সেবা দিতে পারবেন।
উদ্যোক্তা মাহবুব হাসান সেলিম মনে করেন, এখানে আমার চাকরির কোন নিশ্চয়তা নেই। প্রতিমাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হয় ঠিকই। কিন্তু তা দিয়ে কোনমতে জীবন চালিয়ে নেয়া যায়। কাজের শুরুতে কোন নিয়োগপত্রও দেয়া হয় না। আমাকে যদি হুট করে ইউনিয়ন পরিষদে আসতে মানা করে দেয়া হয় তাহলে কিছুই করার থাকবে না। আমাদের আয়ের একটি অংশ নিয়ে যদি সরকার যে কোন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের বেতন দেয়, তাহলেও আমরা এক ধরনের স্বীকৃতি পাব। আর এতে আরও উৎসাহের সঙ্গে কাজ করতে পারব।
সেবাকেন্দ্রের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ইন্টারনেট স্পিড। ব্রডব্যন্ড লাইন দেয়ার কথা থাকলেও এখনও মডেম দিয়েই চালাতে হচ্ছে সব কাজ। ফলে বড় ফাইল ডাউনলোড করা, ভিডিও দেখা, ভিডিও ডাউনলোড করা খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্রডব্যন্ড লাইন দেয়া হলে তাদের অনেক সুবিধা হতো।
দেশের ইউনিয়নগুলোতে সরকারী নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাত্র একজন। তিনি হচ্ছেন ইউনিয়ন পরিষদ সচিব। যাকে সরকার থেকে বেতন দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রত্যেক ওয়ার্ডে একজন করে গ্রামপুলিশ আর একজন দফাদার রয়েছেন। গ্রামপুলিশদের বেতন ১ হাজার ৭০০ টাকা আর দফাদারের বেতন ১ হাজার ৯০০ টাকা। এতে দৈনিক ৫৬ বা ৬৩ টাকা আয়ে জীবন চালানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের পার্থক্য বিস্তর বেড়ে যাওয়ায় এ পেশাও পরিবর্তন করেছেন অনেকে। এর ওপর আবার নতুন কাউকে নিয়োগের বিষয়টি এখন সরকারের চিন্তার মধ্যেই নেই বলে জানালেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
২০০৭ সালে প্রথম পাইলট প্রকল্প হিসেবে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়ন এবং দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মুর্শিদহাট ইউনিয়নে তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রের কাজ শুরু হয়। প্রায় সাত বছর পর ওই এলাকার মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তনের কথা জানা গেছে। অন্তত গ্রামীণ জনপদে এগিয়ে থাকা মানুষের কাতারে রয়েছেন তাঁরা। এখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।
প্রথম চালু হওয়া দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার মুর্শিদহাট ইউনিয়নের নারী উদ্যোক্তা সোমা আক্তার মৌ জানান, তাঁদের সেবাকেন্দ্রে এখন দৈনিক ৪০ থেকে ৪৫ জন সেবা নিতে আসেন। অনেকেই রয়েছেন কম্পিউটার ট্রেনিং নিয়ে বাইরে ভাল কাজ করছেন। আগে মানুষ কম্পিউটার ইন্টারনেট সম্পর্কে তেমন কিছু না জানলেও এখন তথ্য এবং সেবাকেন্দ্রের কল্যাণে সব কিছুই জানেন বোঝেন।
পাইলট প্রকল্পে থাকা সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের উদ্যোক্তা মোঃ সালাহ উদ্দিন জানান, প্রথমদিকে দুই-তিন বছর তাঁদের বসেই থাকতে হতো। এখন মানুষের ভিড় বেড়েছে। প্রত্যেক দিন অনেকেই সেবা নিতে আসেন। প্রথমদিকে বিভাগীয় পর্যায়ে ডিজিটাল মেলা হতো। এখন উপজেলা পর্যায়েও হচ্ছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন কোনদিন হয়ত ইউনিয়ন পর্যায়ে এমন মেলার আয়োজন করা হবে। এখন পর্যন্ত তিনি ১৮ জনকে কম্পিউটার ট্রেনিং করিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের চাকরি হয়েছে। আপাতত ইউএনও সনদ দিলেও ভবিষ্যতে কারিগরি বোর্ডের অধিভুক্ত করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। তাহলে আরও বেশি বেশি মানুষ এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হবেন বলে মনে করেন তিনি।
বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার এ প্রসঙ্গে বলেন, নিসন্দেহে সরকারের এটি অনেক বড় উদ্যোগ। জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য প্রযুক্তির সেবা পৌঁছে দিতে সাংগঠনিক কাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এটি করার আগে তিনটি বিষয়ে আরও ভাল করে চিন্তা করা প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি। উদ্যোক্তাদের স্থায়ী পদ না থাকা, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা এবং ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে ব্রডব্যন্ড লাইন দেয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করেন, সবাই খুব ভালভাবে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এমন নয়। এখানে যাঁরা ভাল তাঁরা ভাল করছেন আর যাঁরা যথেষ্ট প্রশিক্ষিত নয় তাঁরা সঙ্গত কারণেই ভাল করতে পারছেন না। সরকারের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে কিন্তু সেই বিনিয়োগের ফলাফল কী পাওয়া যাচ্ছে, তার মূল্যায়ন করা উচিত। মোস্তফা জব্বার বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের এখানে একবার একটি কাজ করা হয়ে গেলে আর মনিটরিং করা হয় না। যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেখভালের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা চিন্তা করছি কিভাবে এই সেবার মান আরও বৃদ্ধি করা যায়। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি সেবাকেন্দ্রগুলোকে যথাযথ মনিটরিং করা হবে। এভাবে এক সময় মানুষের ঘরে ঘরে ই-তথ্যসেবা পৌঁছে যাবে। উদ্যোক্তাদের স্থায়ী চাকরি এবং বেতন দেয়ার কোন চিন্তা আছে কিনা- জানতে চাইলে বলেন, চেয়ারম্যান বদলের সঙ্গে উদ্যোক্তা বদল- এমন পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় তা আমরা দেখব। তারা কারও হাতের পুতুল হবে না। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এ পদগুলোকে স্থায়ী করা হবে বলেও জানান তিনি।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment