Wednesday, April 23, 2014

অনন্ত অপেক্ষায় বসে মহাদেবরা

অনন্ত অপেক্ষায় বসে মহাদেবরা

mahadeb
সুমন চট্টোপাধ্যায়

সিঙ্গুর: মহাদেব দাসের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ২০০৬-এর পুজোর আগে৷ টাটা প্রকল্পের জমিতে যে বহুমুখী হিমঘরটি এখনও মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার সামনে৷ সিঙ্গুরের আকাশে তখন সবে সিঁদুরে মেঘ জমতে শুরু করেছে, কৃষিরক্ষা কমিটি তখনও গঠিত হয়নি, গন্ধে গন্ধে ভিড় করা শুরু হয়নি রাজনৈতিক দলগুলোর৷ যে কয়েকটি কৃষক পরিবার তখনই সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা শুরু করেছিল, মহাদেব ছিলেন তার পুরোভাগে৷ বেশ মনে আছে, সেদিন মহাদেবের পাশে লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেচারাম মান্না আর এক উত্তেজিত বুড়ি৷ হাতের হাঁসুয়াটি তুলে সেই বৃদ্ধা খুব উত্তেজিত ভাবে বলেছিলেন, যে-ই তাঁর জমি কাড়তে আসবে, তিনি তার গলা এক কোপে ধড় থেকে নামিয়ে দেবেন৷

সিঙ্গুরে আন্দোলন যত জমাট বেঁধেছে, বেচারামের চেয়েও ততই বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন মহাদেব৷ তাঁর সঙ্গে কথা না-বললে সিঙ্গুরের কোনও কাহিনিই সম্পূর্ণ হত না৷ সেই আন্দোলন থেমে গিয়েছে অনেক দিন, টাটার কারখানার শূন্য ঘরবাড়িগুলো শুধু একটা ব্যর্থ পরীক্ষার ক্ষতচিহ্ন গায়ে মেখে এখনও দাঁড়িয়ে আছে৷ আন্দোলনে নাম-যশ হওয়ার সুবাদে বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠে গিয়েছে বেচারামের, সামান্য কারখানার পাম্প চালানোর দায়িত্ব থেকে তরতর করে উঠে গিয়ে তিনি হয়ে গিয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী৷ কিন্ত্ত মহাদেব? তিনি গেলেন কোথায়? আর তো তাঁর নামগন্ধও শুনতে পাওয়া যায় না কোথাও! হুগলিতে ভোটের সুলুকসন্ধানে এসে তাই হঠাত্‍ মনে হল, একবার সেই অক্লান্ত যোদ্ধার খবর নিলে কেমন হয়?

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে বর্ধমান যাওয়ার পথে টাটার না-হওয়া কারখানার পাঁচিল ঠিক যেখানে শেষ হয়েছে, তার পাশ দিয়ে গাড়ি নামিয়ে দিলাম খাসেরভেড়িতে যাব বলে৷ সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় এই খাসেরভেড়িই ছিল তার নার্ভ সেন্টার৷ এখানেই গ্রামে ঢুকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পুলিশ সাধারণ গ্রামবাসীর উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল৷ ঘরে ঘরে ঢুকে হাতের সামনে যাকে পেয়েছিল, লাঠিপেটা করেছিল তাকেই৷ টিভি চ্যানেলের পর্দায় সেই অত্যাচারের দৃশ্যই হঠাত্‍ নাটকীয় ভাবে জাগিয়ে তুলেছিল বাংলার বিবেক, কাঁপিয়ে দিয়েছিল ২৩৫-এর সরকারের ভিত৷

যেতে যেতে দেখি, যে যেখানে যে ভাবে পেরেছে, পাঁচিল থেকে খুবলে বার করে নিয়েছে ইট৷ মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ছে গর্ত৷ সেই ইট যে একেবারে কারও কাজেই লাগেনি, তা নয়৷ এ তল্লাটে অনেক 'বুদ্ধিমান' মানুষ বাড়ির গাঁথনি তৈরি করেছেন রতন টাটার ইট দিয়েই৷ পরিত্যক্ত কারখানার ভিতর পড়ে থাকা লোহালক্কড়গুলোও হাওয়া হয়ে গিয়েছে অনেক দিন৷ সিঙ্গুর ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও বেশ কিছুকাল কারখানার দরজায় নাকি রক্ষী মোতায়েন করা ছিল, শ্মশান পাহারার যে তাগিদ কালে কালে ফিকে হয়ে গিয়েছে৷ বড় রাস্তা থেকে নীচে নামার আগে তবু দেখলাম, একটা গুমটি জাতীয় বস্ত্তর মধ্যে জনা দু'য়েক মানুষ বসে বসে অঘোর নিদ্রায়৷ উফ, বাইরে যা গরম!

একদা এ রাস্তা দিয়ে গিয়েছি অনেক৷ কিন্ত্ত পাঁচ-ছ' বছরের মধ্যে এত নতুন বাড়ি-ঘরদোর হয়ে গিয়েছে যে, চেনা এলাকাকেও প্রথম চোটে অচেনা বলে মনে হয়৷ জয়মোল্লা গ্রামে পৌঁছে দেখি, কাস্তে-হাতুড়ি লাগানো প্রায় ডজনখানেক লাল ঝান্ডা রাস্তার দু'পাশে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ রোদের তেজের মধ্যে নতুন শালুগুলো থেকে যেন ঠিকরে বের হচ্ছে রক্তিম আভা৷ তিন দিন ধরে জেলার এ মাথা থেকে ও মাথা করছি, এত লাল ঝান্ডা একসঙ্গে এক জায়গায় অন্যত্র কোথাও উড়তে দেখিনি৷ গাঁয়ের লোকগুলো তার মানে বাপের বেটা! কলজেতে দম আছে বিস্তর!

ষোলো আনা মুসলিম-প্রধান গ্রাম এই জয়মোল্লা৷ প্রধানত খেতমজুরদের বাস৷ আন্দোলনের সময় থেকেই এ গাঁয়ের লোক সিপিএমের সমর্থক, পরিবর্তনের সর্বগ্রাসী ঢেউয়ের মধ্যেও সেই আনুগত্যে দেখছি একচুলও চিড় ধরেনি৷ অবশ্য সিঙ্গুর গোঘাট কিংবা খানাকুল নয়, শঠে শাঠ্যং সমাচরেত্‍-এর ধম্মো পালনে এখানে কারও তেমন একটা গা নেই৷ আন্দোলনের সময় ইচ্ছুক আর অনিচ্ছুকদের মধ্যে গ্রামের পর গ্রাম যখন বাঁটোয়ারা হয়ে গিয়েছিল, চলছিল রাজনীতির কুশীলবদের নানাবিধ মন্ত্রণা আর প্ররোচনা, সিঙ্গুরে তখনও গ্রামে গ্রামে লড়াই হয়নি তেমন একটা৷ সিপিএম দাদাগিরি করেছে, তাপসী মালিককে বেঘোরে মরতে হয়েছে, কিন্ত্ত কারখানার জমি নিয়ে বিবাদ সে ভাবে স্পর্শ করতে পারেনি দিব্যি যে যার মতো করে আনন্দে বাঁচা গ্রামবাসীদের৷ অবাক হয়ে দেখলাম, লাল-গ্রাম জয়মোল্লাতেই ভাঙা মেঠো রাস্তা মেরামত করার জন্য স্টোনচিপ ফেলা হয়েছে৷ সিপিএম বলে এ গাঁয়ে উন্নয়ন হবে না, এমন সঙ্কীর্ণতাও গ্রাস করেনি খবরের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত সিঙ্গুরকে৷

টেলিফোনে মহাদেবকে পীড়াপীড়ি করা হল বেড়াবেড়ি বাজারে এসে দেখা করার জন্য৷ কিছুতেই রাজি হলেন না৷ অগত্যা সরুস্য-সরু সাড়ে চার কিলোমিটার গেঁয়ো রাস্তা ধরে, বেমক্কা গাড়ি দেখে হতচকিত হয়ে যাওয়া কলের পাশে স্নানরতা গাঁয়ের বধূদের পাশ কাটিয়ে, খাসেরভেড়িতে পৌঁছতেই হল মহাদেবের দর্শনলাভে৷

যে বাড়ির ছাদে উঠে পুলিশ ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধিয়েছিল, তার সামনেই একখণ্ড খোলা জমিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন মহাদেব৷ এই ক'বছরে এ কী চেহারা হয়েছে মহাদেবের? গাল তোবড়ানো, মাথার চুলও বেশ ফাঁকা৷ পরনে একটা নোংরা হাফ-প্যান্ট, ফুলহাতা জামার একটা হাত মোবিলে ভিজে চপচপে৷ করুণ হেসে মহাদেব বললেন, 'দাদা, আন্দোলন করে কিছুই হল না৷ না পারলাম নেতা (পড়ুন, বেচারাম মান্না) হতে, না করতে পারলাম বিয়েটা৷ দেখতে দেখতে বিয়াল্লিশ হয়ে গেল আমার৷'

ফুটবলার তুলসীদাস বলরামের উদ্বোধন করা পাশের একটা ক্লাবঘরের বাইরের বারান্দায় বসে অনেক দিন পরে জমিয়ে গপ্পো হল মহাদেবের সঙ্গে৷ কারখানার ভিতরে চলে গিয়েছে বারো বিঘে জমি আর দুটো পাওয়ার টিলার৷ রয়ে গিয়েছে সামান্য এগারো কাঠা, তাতে যত্‍সামান্য চাষাবাদ হয়৷ বারো বিঘে জমি চার ভাইয়ের, তাই মাসে মাথাপিছু দু' হাজার টাকা করে আট হাজার টাকার ভর্তুকি জোটে আর মাথাপিছু মাসে ষোলো কিলো চাল৷ এত জনের একান্নবর্তী পরিবারে সবার পেট ভরাতে সব ভাইকেই এখন কোনও না কোনও কাজের বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে৷ অনিচ্ছুক জমির মালিক পর্যবসিত হয়েছেন জনমজুরে৷

মহাদেবের হিসেব অনুসারে, মোট ২,২০০-২,৩০০ জন অনিচ্ছুক কৃষক পান টাকা ও চালের এই সাহায্য৷ তাঁদের সম্মিলিত মোট জমির পরিমাণ পৌনে তিনশো থেকে তিনশো একর৷ অনিচ্ছুক কৃষকদের সবাইকে সরকার একই মানদণ্ডে ফেলে বিচার করেছে বলে মনে হল, কোথাও একটা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এলাকায়৷ যার দু'কাঠা জমি গিয়েছে তার জন্য যে সাহায্য, পাঁচ বিঘে জমি হারানোর জন্যও তাই৷ যার বাড়িতে দুটো পেট, তার জন্য ষোলো কিলো চাল, যার বাড়িতে আটটা পেট তার জন্যও তাই৷ যদিও মহাদেব বা তাঁর মতো ভুক্তভোগীরা এ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলতে চান না এখনই৷ বরং তাঁরা এখনও, এ ভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে বসে থাকা সত্ত্বেও 'দিদি'র সদিচ্ছার ওপর ষোলো আনা আস্থাশীল৷ 'দিদি তো কথা রেখে জমি ফেরানোর জন্য আইনটা ঠিকই করেছিলেন৷ দেখা যাক, সুপ্রিম কোর্ট কী বলে৷'

'যদি বলে, ওই জমি টাটাদের হাতেই থাকবে, তা হলে? তখন ক্ষতিপূরণ নেবেন?'

মাথা ঝাঁকান মহাদেব৷ 'না৷ শুনেছি, রাজ্য সরকার সে ক্ষেত্রে আবার নতুন করে একটা আইন আনতে পারে৷'

তার মানে প্রয়োজনে অনাদি-অনন্তকাল ধরে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতেও কোনও আপত্তি নেই মহাদেবের মতো সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকদের৷ জমি কবে ফেরত পাওয়া যাবে, জানা নেই৷ পাওয়া গেলেও সেখানে যে আর কোনও দিন সেখানে ফসল ফলানো যাবে না, সেটাও তাঁরা বিলক্ষণ জানেন৷ তা হলে ? এটা কি বোকার গোঁয়ার্তুমি হয়ে যাচ্ছে না? অদৃষ্টের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে এ ভাবে দিনযাপনের কোনও মানে হয়?

জবাবে মহাদেবের বক্তব্য প্রায় দার্শনিকসুলভ৷ 'দাদা, লড়েছি নীতির জন্য৷ পেটের জন্য নয়৷ কত অপমান সহ্য করেছি, গায়ে মাওবাদী তকমা পর্যন্ত তুলেছি৷ নিরুপম সেন ডেকে নিয়ে কোটি টাকার টোপ দিয়েছেন, গিলিনি৷ জমি ফেরত পাওয়াটার তাত্‍পর্য আমার কাছে তাই গ্রাসাচ্ছদনের নয়৷ আমরা জিততে চাই৷ জয়ের মতো তৃপ্তি আর কোথাও আছে, বলুন?'

জমি-জমা, উপার্জন গিয়েছে বলে নয়, এখনও গর্বিত তৃণমূলি মহাদেবের আক্ষেপ অন্যত্র৷ আগে কলকাতার নেতারা নিয়মিত খবর নিতেন৷ 'দিদি' ওঁর বাড়িতে গিয়ে চা-ও খেয়েছেন৷ কিন্ত্ত এখন বেচারামের বোলবোলার তলায় অন্ধকারে চলে গিয়েছেন মহাদেবরা৷ '২০১২-র বিজয়া দশমীর দিন শেষ দেখা হয়েছে দিদির সঙ্গে৷ তার পর আর তাঁর ধারেকাছেও ভিড়তে পারিনি৷ একমাত্র ব্যতিক্রম মুকুল রায়৷'

তার মানে, সিঙ্গুর আছে সিঙ্গুরেই৷ কারখানা হল না বলে কারও হেলদোল নেই, অনিচ্ছুকেরা জমি পেল না বলে বিক্ষোভও দানা বাঁধছে না কোথাও৷ সিঙ্গুরেই টাটা কারখানা সে অর্থে কোনও ইস্যু নয়৷
তার সুফল বিশেষ একটা না-খেটেও তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী রত্না দে নাগ পেয়ে যাবেন৷ যদিও টাটার কারখানার জমি থেকে অনেক দূরে বলরামবাটির শিবরামবাটিতে নিজের বাড়িতে বসে আন্দোলনের মাস্টারমশাই, আপাদমস্তক সজ্জন রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য স্বীকার করে নিলেন, দলের জনপ্রিয়তায় আগের সেই জোয়ারটা নেই৷ বিধানসভায় মাস্টারমশাই যে ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন, পঞ্চায়েতেই সেই মার্জিনটা অর্ধেক হয়ে গিয়েছে৷ তলানিতে যাতে না-এসে ঠেকে, তার জন্য তো মহাদেব দাসেরা এখনও আছেন৷ ওই সিঙ্গুরেই৷
http://eisamay.indiatimes.com/-/article-of-suman-chatterjee/articleshow/34080666.cms?

No comments:

Post a Comment