ভারতের নির্বাচন ২০১৪—ভোটের হাওয়া: রায়বেরিলি
৫৬ ইঞ্চি ছাতি নয়, চাই দয়ালু মন: প্রিয়াঙ্কা

গতকাল রোববারের দুপুর। উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলি শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে বছরাঙ্গা জনপদের দোস্তপুর গ্রামে ছোট্ট জনসভা। প্রিয়াঙ্কা সকাল ১০টায় শহর থেকে বের হয়ে বিকেল চারটা পর্যন্ত যে ১২টি জনসভা করেন, দোস্তপুরেরটা তার মধ্যে চতুর্থ। আসার কথা ছিল দুপুর ১২টার দিকে। এলেন তার দুই ঘণ্টা পর। ততক্ষণে ‘দিকে দিকে বার্তা রটে গেছে ক্রমে’, প্রিয়াঙ্কা আবার একহাত নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদিকে। রায়বেরিলির প্রথম জনসভাতেই বলেছেন, দেশ চালাতে গেলে ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এক দয়ালু মনের, যে মন মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি হতে পারে, যা মানুষের সামান্য চাহিদাগুলো মেটাতে পারে।
দিনের শুরুতেই কেন এমন টি-টোয়েন্টি মেজাজে মোদিকে পগার পার করানো মার? জানা গেল, আগের দিনে গোরক্ষপুরে মুলায়ম সিংকে কটাক্ষ করে মোদি বলেছেন, ‘নেতাজি, উত্তর প্রদেশকে আপনি গুজরাট করতে পারবেন না। গুজরাট করা মানে ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ। তা করতে গেলে ৫৬ ইঞ্চি বুকের পাটা হতে হবে।’
রায়বেরিলিতে তাঁর মা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়ার বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের দরুন কিনা কে জানে, প্রিয়াঙ্কার দিন শুরুই হলো এভাবে মোদি-কটাক্ষ দিয়ে। দোস্তপুরে যখন এলেন, ততক্ষণে ৫৬ ইঞ্চি বনাম দয়ালু মনের বিতর্ক বেশ রটে গেছে। অথচ কী আশ্চর্য, ১৫ মিনিটের দোস্তপুর সভায় মোদি-টোদির ধারে-কাছে দিয়েও হাঁটলেন না প্রিয়াঙ্কা। বরং রায়বেরিলি কেন তাঁদের এত সাধের, কীভাবে তাঁর মা এই জায়গার উন্নয়ন করে চলেছেন, সেই ফিরিস্তি দিলেন। আর বললেন, ‘স্বনির্ভর প্রকল্প আমিই প্রথম আমেথিতে চালু করেছিলাম ১০ বছর আগে। রাহুল বিস্মিত হয়েছিল। আজ সেই মডেল এই দুই জেলায় ১২ লাখ জীবনে সুখ ও স্বস্তি এনে দিয়েছে। বিকাশের কোনো শেষ নেই। সেই বিকাশকে অব্যাহত রাখতে আপনারা সোনিয়া গান্ধীকে আবার ভোট দিন।’
ভাষণ শেষ করে শালগুড়ির বেড়ার ওধার থেকে গ্রামীণ মানুষের ভালোবাসার উষ্ণতা অনুভব করতে করতে এগিয়ে গেলাম। প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি কংগ্রেসে বিরাট একটা আলোড়ন তুলেছেন। আপনাকে দেখে নতুনভাবে উজ্জীবিত কংগ্রেসিরা।’ শুনে প্রিয়াঙ্কা হাসলেন ও বললেন, ‘ধন্যবাদ।’ পরের প্রশ্নটাই মোদিকে এড়িয়ে মোদিকেন্দ্রিক। ‘আপনার প্রচার আপনার আক্রমণাত্মক ভূমিকাকে বড় করে তুলে ধরছে। আপনি কি মনে করেন, আক্রমণই সেরা রক্ষণ?’ প্রিয়াঙ্কা একমুহূর্তও ভাবলেন না। মুখের হাসিটি ধরে রেখে বললেন, ‘আমি মনে করি, রাজনীতিতে রক্ষণাত্মক ভূমিকার কোনো স্থান নেই।’
এটাই প্রিয়াঙ্কার বিশেষত্ব। মা সোনিয়ার মতো তাঁকে লিখিত ভাষণ পাঠ করতে হয় না। ভাই রাহুলের মতো জোর করে আক্রমণাত্মক হতে হয় না। প্রিয়াঙ্কার ভাষণ দেওয়ার ক্ষমতাটা দাদি ইন্দিরার মতোই সহজাত। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর রূপ, যে রূপে সনাতন ভারতীয়ত্বের সঙ্গে মিশেছে পশ্চিমি লাবণ্য, লোকজনের সঙ্গে আড়ষ্টতাহীন মেশার ক্ষমতা এবং অমলিন হাসি। ঠায় দুই ঘণ্টার ওপর সবাইকে এই কাঠফাটা রোদে অপেক্ষায় রেখে যখন কালো সরু পাড়ের কাঁচা হলুদ রঙের সুতি শাড়িতে শরীর মুড়ে ওই মোহিনী হাসি হেসে সামনে এসে দাঁড়ালেন, নিমেষেই সব কষ্ট ভুলে গেল অপেক্ষমাণ মানুষগুলো। সবার চোখে মুগ্ধতা। যেন তিনি কী বলছেন সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, তিনি তাঁদের সামনে এসেছেন মায়ের হয়ে ভোট চাইতে। এটাই যেন যথেষ্ট। কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ দোস্তপুরের লোকজনের আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের কাছে হেরে গেল। মানুষ এগিয়ে এল, প্রিয়াঙ্কাও। ফুলে ফুলে বরণ করে নিল তাঁকে দোস্তপুরের আবালবৃদ্ধবনিতা।
তিন ঘণ্টা আগে রায়বেরিলি শহরের কংগ্রেস দপ্তর তিলক ভবনে বসে রাজ্য কংগ্রেসের সহসভাপতি গণেশ শঙ্কর পান্ডে ও জেলা কমিটির সম্পাদক বিজয় শঙ্কর অগ্নিহোত্রী রায়বেরিলি কেন্দ্রে সোনিয়া গান্ধীর কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। পাঁচ বছরে রায়বেরিলিকে ঘিরে এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করা ও চারটি রাস্তাকে জাতীয় সড়কের মর্যাদা দেওয়া সেই তালিকার ১ নম্বরে। এ যে নিছক কথার কথা নয়, লক্ষৌ থেকে রায়বেরিলি আসতে-যেতে তার প্রমাণ মেলে। বিরোধীরা উন্নয়নের কথা বলে খোঁটা দিতে ছাড়ছেন না। অথচ রায়বেরিলি, আমেথি গেলে উন্নয়ন বা বিকাশের চিহ্নগুলো দেখলে মনে হতেই পারে, এই দুই লোকসভা আসন যেন রাজার সুয়োরানির পরিবার। সেই পরিবারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ নিতে সমাজবাদী পার্টি আজ বহুদিন নারাজ। এবারও তারা সোনিয়ার বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়নি। মায়াবতীও দিতে হয় তাই দেওয়া গোছের কাজ সেরেছেন ‘অজ্ঞাতকুলশীল’ একজনকে দাঁড় করিয়ে। আর বিজেপি একেবারে শেষ মুহূর্তে বেছে নিয়েছে আইনজীবী অজয় আগরওয়ালকে।

রায়বেরিলিতে গতবার সোনিয়া জিতেছিলেন পৌনে চার লাখ ভোটের ব্যবধানে। এবার ‘মামলাবাজ’ অজয় আগরওয়ালের জামানত জব্দের ডাক দিয়েছে জেলা কংগ্রেস। কেন? কারণ, মোদির ৫৬ ইঞ্চির ছাতির বেলুনটা ফুস করে ২২ ইঞ্চিতে নামিয়ে আনার জবাব নাকি এটাই। এটাই নাকি প্রিয়াঙ্কার মাথার দিব্যি। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর মাত্র একটা দিন সোনিয়া রায়বেরিলিতে প্রচারের জন্য এসেছিলেন। প্রিয়াঙ্কাই মাকে বলেছেন, কোনো প্রয়োজন নেই; ‘ম্যায় হুঁ না!’সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, রায়বেরিলি | আপডেট: ০২:৩৮, এপ্রিল ২৮, ২০১৪
No comments:
Post a Comment