মোদীর ভূমিকায় পর্দার বাবুরাও
পরেশ রাওয়াল
আমেদাবাদ: বাবুরাও গণপতরাও আপ্টের পরনে ফিকে গোলাপি হাফ হাতা মোদী কুর্তা, সাদা পাজামা৷ গালে দিন দুয়েকের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কদমছাঁট চুল, স্নানের পর হালকা সুরভি ছড়ানো ঘর জুড়ে৷ আমেদাবাদ শহরের ধনীতম এলাকাগুলির একটিতে বাবুরাওয়ের বিশাল বাংলো, শাহি কুটির৷ জুনা (পুরোনো) আমেদাবাদের ১২টা শাহি দরজা, ঘিঞ্জি রাস্তার ধারে জঞ্জালের স্তূপ আর রাবারিদের (পশুপালক) গোরু-মোষের আস্তানা পেরিয়ে বাপুনগর হয়ে পৌঁছতে হয় নিকোল গাঁও৷ সেখানে কাথিয়াওয়াড়িদের আরাধ্যা দেবী কোডিয়ারি মাতার মন্দির পিছনে ফেলে খানিক দূর গেলেই শুরু হয়েছে একের পর এক সাজানো বাংলো, বিরাট বিরাট বিলাসবহুল হাইরাইজের সারি৷ ঢিল ছোড়া দূরত্বে আমেদাবাদ শহরকে বেড় দিয়ে রাখা সর্দার প্যাটেল রিং রোড৷ আগে এই এলাকায় ছিল জলা আর গোচারণভূমি৷ রিং রোড হওয়ার পর জমির দাম আকাশ ছুঁয়েছে৷ শহরের হইহট্টগোল থেকে একটু দূরে সরে এসে শান্তিতে বাস করছেন অবস্থাপন্নরা৷
বাবুরাওয়ের বাংলোর কাজ এখনও অসম্পূর্ণ৷ পাশাপাশি দুটো বাংলো জুড়ে নিয়ে আপাতত এই শাহি কুটিরেই আমেদাবাদ পূর্ব আসন জয়ের ওয়ার রুম৷ কয়েক সপ্তাহ আগে আমেদাবাদের সাতবারের সাংসদ হারীন পাঠককে উপেক্ষা করে মোদীর আস্থা জিতে নিয়ে চমক দিয়েছিলেন বাবুরাও ওরফে পরেশ রাওয়াল৷ জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতার টিকিট পাওয়া নিয়ে প্রাথমিক ভাবে কিছুটা জলঘোলাও হয় বিজেপির অন্দরে৷ কিন্ত্ত সময়ের সঙ্গে সে সব ক্ষোভ থিতিয়ে পড়েছে৷ আপাতত শুটিং থেকে একমাসের ছুটি নিয়ে এই শাহি কুটিরে পড়ে রয়েছেন পরেশ৷ সকাল সকাল স্নান সেরে প্রচারে বেরিয়ে পড়তে হয় তাঁকে৷ দিন তিনেক চেষ্টার পর সকাল আটটায় দেখার করার সময় মিলল৷
প্রায় ছবির সেটের মতো সাজানো বৈঠকখানায় বসেছিলেন পরেশ রাওয়াল৷ সামনে রাখা প্লেটে গুজরাটি পরোটা খাখরা আর পুরি৷ তবে উচ্চ রক্তচাপের রোগী পরেশ শুধু চিনি ছাড়া এক কাপ চায়েই চুমুক দিচ্ছেন৷ নন্দিতা দাসের ছবি 'ফিরাক'-এ তো আপনি অভিনয় করেছিলেন? 'হ্যাঁ, তো? তাতে কী?' প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই তীক্ষ্ণ স্বরে পাল্টা প্রশ্ন ধেয়ে এল৷ কয়েক মুহূর্ত আগের সৌজন্যের হাসিটাও গায়েব৷ না মানে, নন্দিতা দাসের মতো বলিউডের আরও অনেকেই তো আবেদন করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ কোনও দলকেই ভোট দিতে, এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন? 'কী আবার ভাবব৷ নন্দিতাদের তো তা হলে নরেন্দ্র মোদীকেই ভোট দেওয়া উচিত৷ এই দেশে ওঁর চেয়ে সেকুলার আর কে আছে!'
উত্তর শুনে সামলে নিতে কয়েক মুহূর্ত লাগল৷ দক্ষ অভিনেতাও রাগটা গিলে নিয়ে হেসে ফেললেন৷ 'আমি জানি আপনারা এই সব প্রশ্নই খুঁচিয়ে তুলতে ভালোবাসেন৷ কী করবেন বলুন, পেশার দাবি৷ আমাদেরও ভেবেচিন্তে উত্তর দিতে হয়৷' ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে নন্দিতার ছবি ফিরাক-এ পরেশের ভূমিকা ছিল স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর৷ যে দাঙ্গার সুযোগে পাড়ার শোরুম থেকে জিনিসপত্র লুঠ করে আনে, গণধর্ষণে অভিযুক্ত ভাইকে বাঁচাতে পুলিশকে ঘুষ দিতে চায়৷ প্রত্যাশিত ভাবেই প্রশ্নটায় বিরক্ত হয়েছিলেন তিনি৷ এর পর অবশ্য খোলাখুলিই বললেন, 'দেখুন এ বারের ভোটে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী করাটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য৷ আমি তাতে সাহায্য করছি মাত্র৷' বলিউডের একাংশের এই ভূমিকাকে তিনি মনে করেন 'দুর্ভাগ্যজনক'৷ তাঁর স্পষ্ট কথা, 'বলিউডে কোনও দিনই ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন ছিল না৷ সমস্ত ধর্মের, সব প্রদেশের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন৷ আমি নিজে অসংখ্য মুসলিম পরিচালক, প্রযোজকের সঙ্গে কাজ করেছি৷ ভবিষ্যতেও করতে কোনও অসুবিধে হবে না৷'
কিন্ত্ত এত ব্যস্ততার মধ্যে আপনি নিজের কেন্দ্রে সময় দিতে পারবেন? 'ওই তো আপনাদের ভুল৷ সংসদে কি পাড়ার কলে জল আসার সমস্যা নিয়ে কথা হয়? ওখানে আমরা জাতীয় নীতি নির্ধারণ নিয়ে কথা বলব৷' পরেশের প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের প্রার্থী হিম্মতসিন প্যাটেল অবশ্য এই প্রশ্ন তুলেই এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন৷ চারবারের কাউন্সিলর হিম্মতসিন এলাকার হাল হকিকতও বোঝেন ভালো৷ তবে সে সবে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না পরেশ৷ তাঁর সমর্থনে দু'দিন আগেই রোড শো করে গিয়েছেন অভিনেতা সুনীল শেট্টি৷ কংগ্রেস আবার নিয়ে এসেছিল অমিশা প্যাটেলকে৷ তাঁর নির্বাচনী এলাকায় পড়ে ২০০২ সালের দাঙ্গা বিধ্বস্ত নারোদাও৷
দাঙ্গার প্রশ্ন তুলতেই হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে পরেশ বললেন, 'ছাড়ুন তো৷ লোকে ও সব ভুলে গিয়েছে৷ আর ২০০২ নিয়েই যত সমস্যা আপনাদের৷ কই একবারও তো বলছেন না ১৯৮৪ সালে দিল্লিতে কী হয়েছিল৷ আসলে মোদীর জনপ্রিয়তায় সকলেই ঈর্ষাকাতর৷' এর আগে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পরেশ৷ জানালেন মোদীর জীবনীতেও অভিনয় করবেন৷ সেই ছবির চিত্রনাট্যের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে৷
সময় প্রায় শেষ, প্রচারে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী পার্থ রাওয়াল এসে কানে কানে বললেন, 'শুধু শুধু ওঁকে চটিয়ে দিলেন তো, সারাদিন মেজাজ খারাপ থাকবে৷' ২০০০ সালের ছবি 'হেরাফেরি'র বাবুরাও ছিল সরল সাদাসিধে এক বাড়িওয়ালা৷ তার মুখে 'মারাঠি মানসা জাগা হো' ডাক শুনে লোকে হো হো করে হেসে ওঠে আজও৷ আমেদাবাদ পূর্বের বিজেপি প্রার্থী পরেশ রাওয়াল ভুরু কুঁচকে যখন গুজরাটি অস্মিতার প্রচার করেন, লোকে কিন্ত্ত হাসে না৷ পর্দার হাসিখুশি বাবুরাওয়ের সঙ্গে এই পরেশ রাওয়ালের দূরত্ব অনেক৷
আমেদাবাদ: বাবুরাও গণপতরাও আপ্টের পরনে ফিকে গোলাপি হাফ হাতা মোদী কুর্তা, সাদা পাজামা৷ গালে দিন দুয়েকের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কদমছাঁট চুল, স্নানের পর হালকা সুরভি ছড়ানো ঘর জুড়ে৷ আমেদাবাদ শহরের ধনীতম এলাকাগুলির একটিতে বাবুরাওয়ের বিশাল বাংলো, শাহি কুটির৷ জুনা (পুরোনো) আমেদাবাদের ১২টা শাহি দরজা, ঘিঞ্জি রাস্তার ধারে জঞ্জালের স্তূপ আর রাবারিদের (পশুপালক) গোরু-মোষের আস্তানা পেরিয়ে বাপুনগর হয়ে পৌঁছতে হয় নিকোল গাঁও৷ সেখানে কাথিয়াওয়াড়িদের আরাধ্যা দেবী কোডিয়ারি মাতার মন্দির পিছনে ফেলে খানিক দূর গেলেই শুরু হয়েছে একের পর এক সাজানো বাংলো, বিরাট বিরাট বিলাসবহুল হাইরাইজের সারি৷ ঢিল ছোড়া দূরত্বে আমেদাবাদ শহরকে বেড় দিয়ে রাখা সর্দার প্যাটেল রিং রোড৷ আগে এই এলাকায় ছিল জলা আর গোচারণভূমি৷ রিং রোড হওয়ার পর জমির দাম আকাশ ছুঁয়েছে৷ শহরের হইহট্টগোল থেকে একটু দূরে সরে এসে শান্তিতে বাস করছেন অবস্থাপন্নরা৷
বাবুরাওয়ের বাংলোর কাজ এখনও অসম্পূর্ণ৷ পাশাপাশি দুটো বাংলো জুড়ে নিয়ে আপাতত এই শাহি কুটিরেই আমেদাবাদ পূর্ব আসন জয়ের ওয়ার রুম৷ কয়েক সপ্তাহ আগে আমেদাবাদের সাতবারের সাংসদ হারীন পাঠককে উপেক্ষা করে মোদীর আস্থা জিতে নিয়ে চমক দিয়েছিলেন বাবুরাও ওরফে পরেশ রাওয়াল৷ জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতার টিকিট পাওয়া নিয়ে প্রাথমিক ভাবে কিছুটা জলঘোলাও হয় বিজেপির অন্দরে৷ কিন্ত্ত সময়ের সঙ্গে সে সব ক্ষোভ থিতিয়ে পড়েছে৷ আপাতত শুটিং থেকে একমাসের ছুটি নিয়ে এই শাহি কুটিরে পড়ে রয়েছেন পরেশ৷ সকাল সকাল স্নান সেরে প্রচারে বেরিয়ে পড়তে হয় তাঁকে৷ দিন তিনেক চেষ্টার পর সকাল আটটায় দেখার করার সময় মিলল৷
প্রায় ছবির সেটের মতো সাজানো বৈঠকখানায় বসেছিলেন পরেশ রাওয়াল৷ সামনে রাখা প্লেটে গুজরাটি পরোটা খাখরা আর পুরি৷ তবে উচ্চ রক্তচাপের রোগী পরেশ শুধু চিনি ছাড়া এক কাপ চায়েই চুমুক দিচ্ছেন৷ নন্দিতা দাসের ছবি 'ফিরাক'-এ তো আপনি অভিনয় করেছিলেন? 'হ্যাঁ, তো? তাতে কী?' প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই তীক্ষ্ণ স্বরে পাল্টা প্রশ্ন ধেয়ে এল৷ কয়েক মুহূর্ত আগের সৌজন্যের হাসিটাও গায়েব৷ না মানে, নন্দিতা দাসের মতো বলিউডের আরও অনেকেই তো আবেদন করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ কোনও দলকেই ভোট দিতে, এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন? 'কী আবার ভাবব৷ নন্দিতাদের তো তা হলে নরেন্দ্র মোদীকেই ভোট দেওয়া উচিত৷ এই দেশে ওঁর চেয়ে সেকুলার আর কে আছে!'
উত্তর শুনে সামলে নিতে কয়েক মুহূর্ত লাগল৷ দক্ষ অভিনেতাও রাগটা গিলে নিয়ে হেসে ফেললেন৷ 'আমি জানি আপনারা এই সব প্রশ্নই খুঁচিয়ে তুলতে ভালোবাসেন৷ কী করবেন বলুন, পেশার দাবি৷ আমাদেরও ভেবেচিন্তে উত্তর দিতে হয়৷' ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে নন্দিতার ছবি ফিরাক-এ পরেশের ভূমিকা ছিল স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর৷ যে দাঙ্গার সুযোগে পাড়ার শোরুম থেকে জিনিসপত্র লুঠ করে আনে, গণধর্ষণে অভিযুক্ত ভাইকে বাঁচাতে পুলিশকে ঘুষ দিতে চায়৷ প্রত্যাশিত ভাবেই প্রশ্নটায় বিরক্ত হয়েছিলেন তিনি৷ এর পর অবশ্য খোলাখুলিই বললেন, 'দেখুন এ বারের ভোটে নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী করাটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য৷ আমি তাতে সাহায্য করছি মাত্র৷' বলিউডের একাংশের এই ভূমিকাকে তিনি মনে করেন 'দুর্ভাগ্যজনক'৷ তাঁর স্পষ্ট কথা, 'বলিউডে কোনও দিনই ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন ছিল না৷ সমস্ত ধর্মের, সব প্রদেশের মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন৷ আমি নিজে অসংখ্য মুসলিম পরিচালক, প্রযোজকের সঙ্গে কাজ করেছি৷ ভবিষ্যতেও করতে কোনও অসুবিধে হবে না৷'
কিন্ত্ত এত ব্যস্ততার মধ্যে আপনি নিজের কেন্দ্রে সময় দিতে পারবেন? 'ওই তো আপনাদের ভুল৷ সংসদে কি পাড়ার কলে জল আসার সমস্যা নিয়ে কথা হয়? ওখানে আমরা জাতীয় নীতি নির্ধারণ নিয়ে কথা বলব৷' পরেশের প্রতিপক্ষ কংগ্রেসের প্রার্থী হিম্মতসিন প্যাটেল অবশ্য এই প্রশ্ন তুলেই এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন৷ চারবারের কাউন্সিলর হিম্মতসিন এলাকার হাল হকিকতও বোঝেন ভালো৷ তবে সে সবে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না পরেশ৷ তাঁর সমর্থনে দু'দিন আগেই রোড শো করে গিয়েছেন অভিনেতা সুনীল শেট্টি৷ কংগ্রেস আবার নিয়ে এসেছিল অমিশা প্যাটেলকে৷ তাঁর নির্বাচনী এলাকায় পড়ে ২০০২ সালের দাঙ্গা বিধ্বস্ত নারোদাও৷
দাঙ্গার প্রশ্ন তুলতেই হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে পরেশ বললেন, 'ছাড়ুন তো৷ লোকে ও সব ভুলে গিয়েছে৷ আর ২০০২ নিয়েই যত সমস্যা আপনাদের৷ কই একবারও তো বলছেন না ১৯৮৪ সালে দিল্লিতে কী হয়েছিল৷ আসলে মোদীর জনপ্রিয়তায় সকলেই ঈর্ষাকাতর৷' এর আগে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পরেশ৷ জানালেন মোদীর জীবনীতেও অভিনয় করবেন৷ সেই ছবির চিত্রনাট্যের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে৷
সময় প্রায় শেষ, প্রচারে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী পার্থ রাওয়াল এসে কানে কানে বললেন, 'শুধু শুধু ওঁকে চটিয়ে দিলেন তো, সারাদিন মেজাজ খারাপ থাকবে৷' ২০০০ সালের ছবি 'হেরাফেরি'র বাবুরাও ছিল সরল সাদাসিধে এক বাড়িওয়ালা৷ তার মুখে 'মারাঠি মানসা জাগা হো' ডাক শুনে লোকে হো হো করে হেসে ওঠে আজও৷ আমেদাবাদ পূর্বের বিজেপি প্রার্থী পরেশ রাওয়াল ভুরু কুঁচকে যখন গুজরাটি অস্মিতার প্রচার করেন, লোকে কিন্ত্ত হাসে না৷ পর্দার হাসিখুশি বাবুরাওয়ের সঙ্গে এই পরেশ রাওয়ালের দূরত্ব অনেক৷
No comments:
Post a Comment