Thursday, July 24, 2014

কমরেড এবং মালবিকা কথন আলমগীর রেজা চৌধুরী

কমরেড এবং মালবিকা কথন আলমগীর রেজা চৌধুরী
জগন্নাথগঞ্জ স্টেশনে যখন ট্রেন থামল, তখন শেষ বিকেল। শীতের বিকেল। ট্রেন থেকে নামার আগে জমাট কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে কৃষক বধূদের হেঁসেলের ধোঁয়া গাছ-গাছালি ছাপিয়ে আকাশের গায় রেখার মতো লেগে আছে। এ দৃশ্য মনোবিস্ময় নিয়ে দেখা হয়নি। সারা পথ কেমন দূরু দূরু অবস্থা। ট্রেন কি চেক করবে ওরা? করতে পারে। পরপর দু’দুটো হত্যাকা এ অঞ্চলে বর্তমানে অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা। কনস্টেবল থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত তটস্ত। কে বা কারা রাতের অন্ধকারে ধড় থেকে কল্লা আলাদা করে হত্যা করেছে তমিজ রিজভীকে। তমিজ রিজভী সরকারী দলের প্রভাবশালী নেতা। তুখোড় বক্তা, শিক্ষিত। ছাত্র রাজনীতি থেকে সরে সম্প্রতি মূল দলের প্রাথমিক সদস্য পদ পেয়েছে। স্বভাবে বিনয়ী। দলের রুটস লেবেল থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত তমিজ রিজভীর হত্যায় ব্যথিত। তার মৃত্যুরহস্য সাংঘাতিক! হত্যার পর চুলের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছে একখ লাল পতাকা। তাতেই যত জল্পনা-কল্পনা। না না তমিজ রিজভীর টাকা পয়সা নেই। কেবল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে থানা লেভেলের এক অখ্যাত কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছে। বউও হয়নি। দলের কাউন্সিলে ব্যাপক ভোটে মূল দলে ঢুকেছে। যোগ্যতা এটুকুই। সৎ, বিনয়ী সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানবচরিত্র। অন্য হত্যাকা টির লাল পতাকার ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। মধ্য রাতের বিপ্লবী চরিত্র। চাঁদা না দেয়ার কারণে এই অঞ্চলে যতগুলো হত্যাকা সংঘটিত হয়েছে, তার সবগুলোতে এই ক্যাডার জড়িত। পুলিশের খাতায় তেইশটি মামলা রয়েছে।
ইত্যাকার গল্পগুলো বাউসি ব্রিজ পার হবার পর যাত্রীদের কানাঘুষার মধ্যে চলতে থাকল। এসব যাত্রী সবাই স্থানীয়। ঘাটে যাবে। টিকেটের বালাই নেই। টিকেট কাটলে নিজেরা অসম্মানিতবোধ করে। যুক্তি হলো, আমাদের জমির ওপর দিয়ে ট্রেন চলে! আর টিকেট চেকার এদের জিজ্ঞেস করে না।
কিন্তু আজ পরিবেশ অন্যরকম। সবার মধ্যে কেমন ভীত সন্ত্রস্ত ভাব। যে কোন সময় ট্রেনের প্রতিটি কামরা সার্চ হতে পারে। এ রকম বলেছিল লাল ভাইয়ের সেকে ইন কমা কমরেড তৈমুর।
জিগাতলার এক বাসায় ডেকে নেওয়া হয়েছিল যাত্রার তিনদিন আগে। ভোরবেলা। কমরেড তৈমুরের মুঠোফোন। আবু ইউসুফ এখান থেকে বের হয়ে কমলাপুর ট্রেনে উঠবে। স্টেশনে মাহতাব অপেক্ষা করবে। নির্দেশ সেই দেবে। শুধু জেনে রাখো, তুমি যাচ্ছো তালাচাবি বিক্রেতার ভূমিকায়, আর সাথী কবি সমর চক্রবর্তী একজন টিপিক্যাল হিন্দু বৈষ্ণব।
কমরেড তৈমুর যে টিনের সুটকেস ধরিয়ে দিলো তার মূল্য নিতান্তশই কম। মরচে পড়া। ভেতরে রাজ্যের চাবি। হ্যাচকো ব্লেড, স্ক্রু ড্রাইভার, শিরিস কাগজ, বাড়তি ক’খ একসুতি রড, গ্রীচ, ভাঙ্গা তালা, মোটর ওয়ার্কসপে ব্যবহৃত তেল চিটচিটে ন্যাকড়া। এতো কিছুর পরে পিস্তলটা এমন ভাবে মরচে টিন দিয়ে স্ক্রু দেয়া হয়েছে, সূক্ষ্ম তল্লাশি করলেও বোঝার উপায় নেই যে আগ্নেয়াস্ত্রের মতো স্পর্শকাতর জিনিষ আবু ইউসুফের মতো একজন তালাচাবিওয়ালার পক্ষে বহন করা সম্ভব! শুধু কমরেড মাহতাব জানিয়েছিলো, পোষাকগুলো এবং আচরণ যেন চাবিওয়ালার মতো হয়। এসব কাজে আবু ইউছুফ অভ্যস্ত। এর আগে কিশোরগঞ্জের হাওরের এক অপারেশনে নৌকার মাঝির ভূমিকায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। মুন্না গ্রুপের তিন ক্যাডারকে হাওরের জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এগুলো বেশ আগের কথা। আবু ইউসুফকে লালভাই পছন্দ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে আবু ইউসুফের ক্যামোফেক্স পাটির ওপরের লেভেলে প্রশংসিত।
যথা সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে কমরেড মাহতাব আর কবি সমর চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা। সমর চক্রবর্তীর সঙ্গে কখনও দেখা হয়েছিলো বলে মনে পড়ে না। তবে কমরেড মাহতাবের ভাষ্য অনুযায়ী পার্টি তাত্ত্বিক হিসেবে কবি সাবের খ্যাতি আছে। তাছাড়া পলিতেরিয়েত কবি হিসেবে কিছু উল্লেখযোগ্য কবিতা লেখে সাহিত্য জগতে পরিচিতি পেয়েছে। কী কারণে সমর বাবুকে আবু ইউসুফের সঙ্গী হিসেবে দেয়া হয়েছে তা কমরেড উল্লেখ করেননি।
স্টেশনে প্রথম দেখাতে সমর চক্রবর্তী বলে, ‘বিপ্লব তো শ্রেণী বৈষম্য না, ভ্রান্ত ইকোনমির আক্রমণ।’
ওই পর্যন্তই।
তবে আবু ইউসুফের প্রথম দর্শনেই সমর চক্রবর্তীকে অপছন্দ হয়েছে। বেঁটে মানুষ। ভগ্ন স্বাস্থ্য। মুখ ভর্তি দাঁড়ি গোফ। চুলগুলো আবার বৈষ্ণবদের মতো বাউরি। তবে, পোষাকে একেবারে সনাতনী। কপালে চন্দনচর্চিত। কাপড়ের পোটলা কাঁধে ঝুলানো। গলায় একশ গুটির রুদ্রাক্ষের মালা। কথায় কথায় উপরের দিকে দু’হাত তুলে প্রভু প্রভু বলার বাতিক আছে।
কমরেড মাহতাব বলেছে, ‘বাবুকে তার মতোন থাকতে দেবেন।’
এ কারণেই কবি সমর চক্রবর্তী সম্পর্কে রহস্যময় আগ্রহ রয়েছে। গফরগাঁও আসার আগ পর্যন্ত তার সঙ্গে কোন কথাই হয়নি। টিনের সুটকেস বাংকারে রেখে অনেকটা নির্ভার মনে হলেও সহযাত্রী কমরেডের নির্লিপ্ততা একটু ক্ষণের জন্য আবু ইউসুফকে ভাবিত করে। সেকেন্ড ক্লাশ কম্পার্টমেন্টে যাত্রীর কমতি নেই। সারাক্ষণ একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে। তারপর কমরেড জানালায় মুখ করে হলদে সর্ষেক্ষেত দেখতে দেখতে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। তাকে নিয়ে এ মিশনের উদ্দেশ্য কী আবু ইউসুফের অজানা। পার্টির কোন নির্দেশনা নেই। জগন্নাথগঞ্জ স্টেশনে অপেক্ষা করতে হবে। ওখান থেকে রাত দুটোর পর তাদেরকে অন্যত্র চলে যেতে হবে চড়নদার চঞ্চল আকতারের সঙ্গে।
‘কৃষ্ণবাবু কী এক কাপ চা খাবেন?’
চক্রবর্তী মহাশয় অন্যদিকে চোখ রেখে বলে, ‘না, আমার নিকট চিড়ে আছে।’
চিড়ার সঙ্গে চা পানের সম্পর্ক আবু ইউসুফ নির্ণয় করতে পারলো না। শুধু দু’তিনবার বাথরুমে যাতায়াত করলো। ময়মনসিংহ আসার আগেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বগি লাইনচ্যুত হবার সংবাদ আসে। তাতেই সারা। দু’তিন ঘণ্টা লেটের মামলা। সুতিয়াখালীতে যাত্রীরা এই লেট আওয়ারে উঠবস করলেও কৃষ্ণবাবু তেমনি অনড় বসে থাকলো। কৃষ্ণ গোস্বামী সহযাত্রী কমরেডের রহস্য। রাস্তার দুর্ঘটনা ঘটনা মিলিয়ে জামালপুরের পর পরই ট্রেনের দৃশ্যপট বদলে যায়। দু’দুটো হত্যাকাে র গসিপ শুনতে শুনতে শঙ্কিত হৃদয়ে জগন্নাথ স্টেশনে নেমেই বিপত্তির মধ্যে পরে আবু ইউসুফ।
‘দাদা এখানে আদর্শ হিন্দু হোটেল আছে? আমি তো হিন্দু হোটেল ছাড়া জলপান করবো না।’
আর এতেই আবু ইউসুফ বিরক্ত। কৃষ্ণবাবু বলে কী? আমি এখন কোথায় হিন্দু হোটেল পাবো? অথচ নির্দেশ বাবুকে তার মতো থাকতে দেবেন। কোথায় গোপন সংগঠনের মিশন। এমনিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পথ চলতে হয়। চারদিক শ্যেন দৃষ্টি রেখে সতর্ক হয়ে পা ফেলতে হয়। বাবুর চন্দনচর্চিত কাপালে এখন আর তেমন গাঢ় ঔজ্জ্বল্য নেই বরং সারাদিনের পথশ্রান্ত মুখায়ব জুড়ে ক্লান্ত-চিহ্ন। কপাল জুড়ে ঘামের স্বেদবিন্দু লেগে আছে।
একটু পরই সূর্য ডুবে যাবে। ঘাটের কুলি-কামিনদের হাকডাক। স্টীমারে কালো ধোঁয়া। নদীর ওপারে চকচকে বালির সঙ্গে সূর্যের শেষ মাতামাতি। কলকল করে যমুনা বয়ে যাচ্ছে। কমরেড বলছিলো নদী পার হয় চর নলসন্ধ্যায় যেতে হবে। চর জুড়ে কাঁশফুল ফুটে আছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় রুপালি চাদোয়া। আবু ইউসুফ খুব অল্পক্ষণে জগন্নাথগঞ্জ স্টেশনে অবস্থান জেনে নেয়। চারদিক সার সার হোটেলে ভাজা ইলিশের গন্ধ ম ম করছে। জেটির কাছে পুলিশের সরব উপস্থিতি। সন্দেহভাজন কাউকে পেলেই চেক করছে। আবু ইউসুফ একবার নিজের বেশ-ভূষার দিকে তাকালো। বিগত কয়েক দিনের ভোল পাল্টানো সবকিছু ঠিক আছে তো? সমর বাবুর চিন্তা নেই। টিনের বাক্স আর তাকে বহন করতে হয় না। অথবা তার কাপড়ের পোটলার মধ্যে কী আছে কে জানে। তবে চক্রবর্তী হিন্দুর আদলে নিখুঁত বেদ-এর সেøাক জানে কী না? অথবা রাধা-কৃষ্ণ গীতিকা গাইতে পারে কি? ইত্যাকার ভাবনায় হোটেল খুঁজতে খুঁজতে আযান পড়লো। এ এলাকা হিন্দু প্রধান। হিন্দু হোটেল নিশ্চয়ই আছে। সমর বাবু কী জানে! জানতে পারে। পার্টির পুরনো কমরেড। স্টেশনের দু’একটা বাতি জ্বলে উঠেছে। নদী ভাঙ্গনের ফলে স্টেশনের সব কিছুই অস্থায়ী। ল্যাম্পোষ্ট থেকে স্টেশনের জেটি পর্যন্ত। ইতোমধ্যে দু’একজন জিজ্ঞেস করেছে। ‘বাবুরা যাবেন কোথায়?’
‘চর নলসন্ধ্যায়।’ ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিয়েছে। ওইটুকুই। আফসোস হিন্দু হোটেল পাওয়া গেলো না। তবে বালুর মধ্যে টিনের ছাপড়া মতো ‘এখানে হিন্দু হোটেল’ পাওয়া গেলো। মালিক সদানন্দ মহালনবীশ প্রৌঢ় সনাতনী হিন্দু। ধূপের ধোঁয়া হালকা লেগে আছে আশপাশটায়। এক পাশে তিন চারটা চৌকি পেতে ঢালাও বিছানা করা আছে। একটু দূরে কাঁচা পায়খানা। পাশেই টিপকল। এদঞ্চলে হিন্দু ধর্ম রক্ষা প্রকল্পের মহান সেবক সদানন্দ বাবুর সঙ্গে সমর চক্রবর্তীর এক লহমায় ভাব হায় যায়। ইতোমধ্যে কী সব পদবাচ্যও আদান-প্রদান হয়।
কাপড়ের পোটলা চৌকির উপরে রেখে বলল, ‘তিনুবাবু কী স্নান করবেন?’
আবু ইউসুফ একটু ক্ষণের জন্য চমকে উঠলো।
সমর বাবু দেখি পার্টি নাম জানে।
কিছু বলার আগেই পোটলা থেকে বড় তাঁতের গামছা পরে কলতলার দিকে ছুটল।
সমর বাবুর ফতুয়া, ধুতি, চাদর চৌকির ওপর এলোমেলো পড়ে থাকলো।
আবু ইউসুফ একটা ষ্টার সিগারেট ধরিয়ে সমর বাবুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
ইতোমধ্যে সদানন্দ বাবু খোঁজ নিয়ে গেছেন।
‘বাবুরা এখন কী নস্তা করবেন? না রাতে একবারে ভাত খাবেন?’
‘বাবু স্নান সেরে না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।’
‘বাবুরা কী নাম কীর্ত্তন করেন না পালাগান?’
‘ওই বাবু গাথক? আমি তার চড়নদার।’
‘ও।’ বলে সদানন্দ বাবু রান্নার দিকে চলে যায়।
একটু উচ্চকণ্ঠে বলল, ‘সুবল বাবুদের খেয়াল রাখিস । ট্রেন লেট। বাবুরা কষ্ট করে এসেছেন।’
আবু ইউসুফের হাতের সিগারেট শেষ হবার আগেই সমর চক্রবর্তী বয়াতীদের মতোন চুল ঝাকাতে ঝাকাতে ফিরে এলো।
‘তিনুবাবু স্নান করে আসুন।’
এতোক্ষণ পর আবু ইউসুফ বুঝতে পারলো কমরেড অনেক পুরনো খেড়ু। কোন বাক্য উচ্চারণ না করে আবু ইউসুফ কলতলার দিকে ছুটে গেল। সমর চক্রবর্তী স্নান সেরে এসে দরোজায় টানানো গণেশের ফটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিগলিত চিত্তে দু’হাত জোটবদ্ধ করে বলে উঠে, ‘প্রভু প্রভু।’ ওপাশে একটু হেলান দিয়ে মালিক সদানন্দ মহালনবীস সমর বাবুর দেবতা ভক্তি দেখে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।
কমরেড সমর চক্রবর্তী ইতোমধ্যে বেদের কয়েকটি সেøাক ধ্যান-নিমগ্ন হয়ে আওড়িয়ে চলছেন।
পাশের রান্নার রুম থেকে পাচক ঠাকুর সুবল চন্দ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই হোটেলের অতিথি নতুন নারায়ণের ধর্ম শিষ্ঠাচার দেখে মুগ্ধ নয়নে বার বার তাকাচ্ছিলো।
বাবু, ছোটখাটো মানুষ হলে কী হবে। এক্কেবারে সাক্ষাৎ দেবতা। প্রভু প্রভু। বলে অদৃশ্য উপরের দিকে তাকিয়ে ভক্তি প্রকাশ করে। কমরেড তিনুবাবু স্নান সেরে এসে দেখে সমর বাবু গভীর ধ্যান-নিমগ্ন। পাশে ধূপধানিতে ক্ষীণ রেখায় ধোঁয়া উড়ছে।
কেমন যেন পবিত্র পবিত্র ভাব। আবু ইউসুফ টিনের সুটকেজটা পাটখড়ির বেড়া বরাবর কুরসির ওপর রেখে দিয়েছে। শুধু স্নান করার সময় বাক্সটা খুলে আধা ময়লা লুঙ্গিটা বের করেই টিপতালা লাগিয়ে দিয়েছে। তারপর ভয়ানক অবহেলায় রেখে দিয়েছে। যদি পুলিশি চেকের মধ্যে পরে যায়। তাহলে গুরুত্বহীন সুটকেসটা অস্বীকার করে বাঁচার উপায় বের করা যাবে।
অল্প পরেই কমরেড কৃষ্ণবাবু তার কাপড়ের ঝোলা থেকে অতিব ময়লা কাঁকই বের করে নিজের বয়াতী টাইপের চুলগুলো বিন্যস্ত করতে থাকে। কৃষ্ণবাবুকে এখন বেশ পরিশীলিত দেখাচ্ছে। ক্যামন ভাবগম্ভীর মৌন বদন। যেন স্নান সেরে ফিরেছেন প্রাজ্ঞ শিব। চন্দন চর্চিত কপাল যেন রাজটিকা। ইতোমধ্যে দু’তিনবার ঠাকুর সুবল চন্দ ঘুর ঘুর করে গেছে। বাবুরা রাতে কী সেবন করবেন তা নিয়ে তার মাঝে উৎকণ্ঠা আছে। কেন যেন বাবুকে তার পছন্দ হয়েছে। স্নান করার পর আবু ইউসুফের বেশ গভীর ঘুম জাঁকিয়ে আসতে চাইছে। সারাদিন ট্রেন জার্নি, উৎকণ্ঠা, কমরেডের আচরণবিধি মিলিয়ে এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে কেটেছে। ঘুমানো প্রয়োজন। কিছু খেতে পারলেই হতো। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে কমরেড চঞ্চল আকতার আসবে।
‘সুবল চন্দ, এদিক মানে একটু আসতে হয়।’ কৃষ্ণবাবু একটু উচ্চস্বরে ডাকলো।
রান্না ঘর থেকে দ্রুত ছুটে এলো ঠাকুর চন্দ।
‘আজ্ঞে বাবু।’
‘অন্ন গ্রহণ করার আগে আমাকে যে একটু তামাক সেবন করতে হবে।’
‘করবেন।’
‘কিন্তু কলকে তো সঙ্গে নেই। তামাক আছে। আজ সারাদিন মহাদেবের সঙ্গে দেখা হয় নি।’
‘বলেন কী? কলকে আর হেঁসেলের আঙড়া দিলে হবে তো।’
‘হবে, হবে।’
অত্যন্ত দ্রুততার মধ্যে ঠাকুর চন্দ কৃষ্ণবাবুকে কলকে, ন্যাকড়া, কাটনি দিয়ে যায়।
ইতোমধ্যে সমর বাবু পোটলা থেকে একপুরা গঞ্জিকা বের করে হাতের তালুতে নিয়ে ডলতে শুরু করেছে।
আবু ইউসুফের বিষয়ে সীমা নেই। কমরেড গঞ্জিকা সেবন করে। তার ঝোলার মধ্যে পিস্তলের চেয়ে মারাত্মক মারণাস্ত্র ছিলো। র্যাব ও পুলিশ সার্চ করলে কমরেড আটকা পড়ে যেত। আবু ইউসুফের শরীর কাঁপুনি দিয়ে ওঠে। এ ত্যাদড়কে নিয়ে মিশনে আসা উচিত হয়নি। স্টেশনে কমরেড মাহতাবের বাণীর কথা মনে পড়ল, ‘বাবুকে তার মতোন থাকতে দেবেন।’
আরে এটা কী তার মতোন থাকার নমুনা। পার্টির এসব খতরনক সিদ্ধান্ত নিকুচি করে আবু ইউসুফ। সব দায়িত্বহীন। কমরেড কৃষ্ণবাবু একটু সময় নিয়েই গঞ্জিকা তৈরি করে হাঁক ছাড়ে, ‘বাবা চন্দ ঠাকুর।’
‘আজ্ঞে বাবু।’
‘আগুনের আঙড়া।’
কৃষ্ণবাবু কলকেতে আঙড়া দিয়ে বলল, ‘চন্দ ঠাকুর! তোমার মালিক সদানন্দ মহালনবীশের কি মহাদেবে ভক্তি আছে।’
‘আছে বাবু আছে।’ খুব তড়িৎ জবাব দেয়।
‘উনাকে পেন্নাম দিয়ে বলুন মহাদেব ডাকছে।’
‘ডাক দিতে হবে না। সুবাসেই চলে আসবে।’
ধূপদানিতে একটু ধূপ আর আঙড়া দিয়ে ধূয়া উসকে দিয়ে ঠাকুর চন্দ বলল, বাবুর কী মা কালি ভক্তি আছে।’
কৃষ্ণবাবু কোন কথা বলল না।
বেশ জোরে কলকে টান দিয়ে বকবক করে ধোঁয়া উদ্গীরণ করে বলল, ‘চন্দ ঠাকুর, কলকে মহালনবীশ মশাইকে দিয়ে বলেন, সংসারে প্রভু নেই। মা কালীই রাধিকা।’
আজ্ঞে আজ্ঞে করতে করতে চন্দ ঠাকুর কলকে নিয়ে মহালশনবীশ বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাবু দিয়েছেন, সাক্ষাৎ দেবতা। প্রভু, প্রভু।’
আধো জড়ানো ঘুম চোখ নিয়ে কলকে গ্রহণ করে মহালনবীশ বাবু বলল, ‘বাবুরা কী সিআইডি নাকি?’
‘বাদ দিন তো কর্তা, মহাপুরুষদের ব্যাগ পুলিশ দেখতে পায় না। নইলে স্টেশনে ভর্ত্তি পুলিশ-র্যাব অথচ বাবু গাঁজায় দম দিচ্ছে।’
‘তুই ভালো বুঝিস তো চন্দ।’ বলেই আকাশের দিকে পেন্নাম তুলে কলকে টান দিয়ে বলল, ‘অতিথিদের দে। জানিস না নর রূপে নারায়ণ।’
মালিক কর্মচারী বাক্যালাপ তিনুবাবু এবং কৃষ্ণবাবু শুনতে পেলো না। উদোম গা নিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রাতের গভীরতা মেপে নিলো কমরেড আবু ইউসুফ। এখন তার সব কিছুতে বিবমিষা। ফাউল টাইপের একজন মানুষকে ঢাকা থেকে এই জগন্নাথগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত বয়ে বেড়ানো কী চাট্টিখানি কথা। কী যে কপালে আছে। সপ্তর্ষিম ল দেখা যাচ্ছে না। আকাশ খাঁচকাটা মেঘে পরিপূর্ণ। শুক্লপক্ষের আজ ষষ্ঠ দিন। চারদিক মেটে আলো। ঘাটের দিকে স্টিমারের হুইসেল বাজল কয়েকবার।
‘ও চন্দ বাবু এ স্টিমার কনে যাবে?’
‘আজ্ঞে সিরাজগঞ্জ ঘাট।’
‘আচ্ছা।’
‘বাবুকে বলেন রাতের অন্ন সেবন শেষ করার জন্য।’
‘শেষ ট্রেন কখন আসবে?’
‘রাত দশটার দিকে। আজ তো দেরি হবেই।’
সুবল চন্দ রান্না ঘর থেকে আবার কৃষ্ণবাবুর কাছে যায়।
‘বাবু অন্ন সেবন করে বিশ্রাম নিন।’
‘সুবল চন্দ, অন্ন সেবন করার আগে একটু নিরিবিল কথা বলতে হবে যে।’
‘আমার সঙ্গে না কর্তা বাবুর সঙ্গে।’
‘সুবল চন্দের সঙ্গে।’
‘বলুন। এখানে তো কেউ নেই।’
‘চলুন। খোলা আকাশের নিচে যাই।’
‘আজ্ঞে।’
তিনুবাবু সিগারেটে শেষ টান দিয়ে হিন্দু হোটেলের সার সার চৌকির একটিতে গা এলিয়ে দিলো। আজ এ হোটেলের বাসিন্দা ওরা দু’জন সনাতনী। কবি সমর চক্রবর্তী এ রকম পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
কৃষ্ণবাবু সুবল চন্দকে নিয়ে কলতলার দিকে যায়।
আকস্মিক ওই দিকটায় হাউকাউ। সুবল চন্দের গলা শোনা যাচ্ছে।
‘রাম রাম। জাত কী আর থাকবিনে। বাবু বলে কী । ও কর্তা ?’
আবু ইউসুফ প্রথমে ভাবলো। সাপ খোক কী কামড়ে দিয়েছে বাবুকে। ঈষৎ শীত পড়তে শুরু করেছে। সাপ আসবে কোথা থেকে। কর্তা সদানন্দ মহালনবীস ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘কী হয়েছেরে সুবল?’
‘কী হয়নি বাবু। জাত ধর্ম সব চলে গেছে।’
আবু ইউসুফ হন্তদন্ত হয়ে কলতলার দিকে ছুটে গেলো। মহালনবীশ বাবু উঠে এসেছেন।
‘বাবু বলে আমাদের হোটেলে কী বীফ আছে, আমি বুঝতে পারিনি!’
‘আরে বীফ বোঝো না, সুবল চন্দ। গরুর মাংস।’
‘রাম, রাম।’ বিস্ময় নিয়ে মহালনবীশ বাবু কৃষ্ণবাবুকে দেখছে। অনেকটা বাঁকরুদ্ধ। এমন অধর্মের কথা যেন প্রথম শুনছে।
হঠাৎ করে আবু ইউসুফের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। আজকের এই নিরাপদ আশ্রয়টুকু এই ত্যাদড়টা নষ্ট করে দেবে। প্রচ রাগ নিয়ে চক্রবর্তীকে খোঁজ করতেই দেখে টিপকলের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
‘ও কৃষ্ণবাবু সুবল চন্দকে কী বলেছেন? ওর তো জাত ধর্ম সব চলে গেছে।’
‘কিছু বলিনি। বলেছি এখানে কী বীফ পাওয়া যায়।’
‘সব্বোনাশ!’
‘না সব্বেনাশ না।’
ইতোমধ্যে মহালনবীশ বাবু, সুবল চন্দ গো গো করতে করতে কলতলায় ছুটে এলো।
‘একি অধর্মের কথা বলছেন। আমার হোটেল তো যবনদের জন্য নয়। না না এমন কথা বলবেন না। আপনারা আমার হোটেল ছেড়ে চলে যান।’
পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হতে থাকে। সুবল চন্দ ক্রমাগত গো গো করে যাচ্ছে।
আবু ইউসুফের একবার মনে হলো সুটকেস খুলে পিস্তল বের করে সমর চক্রবর্তীর বুক বরাবর গুলি চালিয়ে দেয়। সিগারেট শেষ টান দিয়ে এগিয়ে আসে সমর বাবু।
‘ও কর্তা বাবু, ও সুবল চন্দ আপনারা তো দেখি ধর্মের কিছুই জানেন না। দাপর যুগে গোমেধ যজ্ঞের নাম শুনেছেন। হাজার হাজার গো বলি দিয়ে ব্রাহ্মণ ভোজন করাতো, তাদের তো জাত যায়নি। আপনার আমার জাত যাবে কেন?’
‘রাম রাম।’ তারস্বরে দু’বার বলে উঠলো।
‘কমরেড আবু ইউসুফের ক্রমাগত রাগ বাড়তে থাকে। ইচ্ছে হয় সমর বাবুকে কষে একটা চড় দিতে। আহ কী আমার ধর্ম বিশারদ রে। এই রাতে ধর্মপাঠ দিতে গেছে। স্টুপিড কোথাকার।
হঠাৎ সমর চক্রবর্তী ঘরে ঢুকে পোটলা থেকে বেদ-এর একটা মিনি সংস্করণ নিয়ে বলে, ‘বাবু দেখুন, বেদ-এ কী বলে।’
হঠাৎ আবু ইউসুফ লক্ষ্য করে ভক্তিতে সুবল চন্দের চোখ জলে ছলছল করছে।
গঞ্জিকা সেবনের কারণে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে সদানন্দ বাবু ভক্তি রসে সিক্ত হচ্ছে। আর সমর বাবু যেন সাক্ষাৎ দাপর যুগ থেকে চলে এসেছে। কণ্ঠের ওঠানামায় যেন সমর বাবুকে মনে হচ্ছে কুরুক্ষেত্রের করুণ পা ব, যজ্ঞসিদ্ধ অর্জুন। আর দুই সনাতনী বাবুকে কষ্ট দেবার জন্য ক্ষমা চাইছে।
ঠিক তখন আবু ইউসুফ বলে উঠে, ‘বাবুরা আপনজন ভেবে সমর বাবু সুবলের সঙ্গে একটু রস করেছে। তারপরও তা করাটা ঠিক হয়নি।’ ‘না না বাবুকে আমি বুঝতে পারিনি, আমার পাপ হয়েছে। বাবুকে অন্ন সেবন করিয়ে আমি পাপ মুক্ত হতে চাই।’ সুবল চন্দের দু’চোখে জল গড়াচ্ছে। সে সমর চক্রবর্তীর পদচুম্বন করে।
‘ হে প্রভু, প্রভু রক্ষা করেক।’ বলে দ্রুত রান্না ঘরে চলে গেল।
আবু ইউসুফ ভাবলো, যাক আপাতত রক্ষে। ইতোমধ্যে নানান ব্যঞ্জন দিয়ে দুটি কাঁসার থালায় সুবল খাবার সাজিয়ে নিয়ে এলো। সমর বাবু কোন দিকে না তাকিয়ে খাবারে মনোনিবেশ করে। আবু ইউসুফের মনে হয় এ ফাজিলটাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করতে করতে রাত নয়টা বেজে গেল। আবু ইউসুফ হোটেলের বিল পরিশোধ করে বলল, ‘কৃষ্ণবাবুকে নিতে শেষ রাতে লোক আসবে। চর নলসন্ধ্যায় বাবুর গান আছে।’
হোটেল মালিক সদানন্দ মহালনবীশ অত্যন্ত ভক্তিভরে বলে, ‘বাবু ত্রুটি মার্জনা করবেন। ফেরার পথে আমার হোটেলে পদধূলি দিলে ধন্য হবো।’
‘বাক্য তো দিতে পারি না। বাবু কেমন দেখলেন তো। কখন আবার আমাকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। সে তো আবার রাধিকা প্রেমিক।
সুবল চন্দ পিছন থেকে বলে উঠে, ‘প্রভু, প্রভু।’
০২
হোটেলের খড়িরবেড়ার ফাঁক দিয়ে কালপুরুষের মুখ দেখা যায়। পঞ্চমীর মেটে চাঁদ ঈষৎ পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আবু ইউসুফের ঘুম আসে না। নানান রকম চিন্তা ওকে আচ্ছন্নœ করতে থাকে।
সমর চক্রবর্তী ঘুমুচ্ছে। চেতনাহীন। যার ওপর দায়িত্ব দিয়ে পার্টি আবু ইউসুফকে এ মিশনে পাঠিয়েছে। তার মতো দায়িত্বশীল পার্টিকর্মীর আচরণ দেখে বিস্মিত আবু ইউসুফ হাইকমান্ডের প্রতি বিরক্তবোধ করে।
সারাক্ষণ তার কান উৎকীর্ণ থাকে। চঞ্চল আকতার আসবে তো! এ ছোকড়ার কোন দিন নামও শুনিনি। দেখা হয়নি কখনও। মধ্যরাতে কিভাবে সদানন্দ মহালনবীশের এ বিখ্যাত আদর্শ হোটেলে তাদের অবস্থান জানতে পারবে! না এলে সকালবেলায় কি উপায় হবে? ইত্যাকার ভাবনায় আচ্ছন্ন আবু ইউসুফ স্টিমারের হুইসেল শুনতে পায়। সিরাজগঞ্জগামী স্টিমার গমন না প্রত্যাগমন তাও ঠাওর করার চেষ্টা করলো না। চোরকাঁটার মতো বাজতে থাকলো, চঞ্চল আকতার আসবে তো! তক্ষক ডাকছে। স্টিমার ঘাটের ছাউনির লোহার বীমে আশ্রিত।
এরও বেশ পরে আবু ইউসুফ তখন তন্দ্রার মধ্যে। ঠিক তখন সদানন্দ মহালনবীশের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।
‘ও বাবুরা, গাথককে নেবার জন্য চর নলসন্ধ্যা থেকে লোক এসেছে। এদিক মানে ঘুম থেকে উঠতে হয়।’
আবু ইউসুফ তড়িঘড়ি করে বলে, ‘ওদের অপেক্ষা করতে বলুন।’
কাঁথার নিচে লুকানো সমর চক্রবর্তীকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, ‘বাবু উঠুন, নলসন্ধ্যায় যেতে হবে।’
দু’ধাক্কা দেবার পর সমর বাবু বলে, ‘আজ তো যেতে পারবো না, এখন ঘুমোবো।’
আবু ইউসুফ বিরক্ত কণ্ঠে বলে, ‘বাবু বিরক্ত করবেন না উঠুন।’
প্রায় একমাইল শর্ষেক্ষেত পেরিয়ে নৌকায় পৌঁছে সমর বাবু বলে, ‘ভালোই হলোরে, সলু মিয়ার সঙ্গে দেখা হলো।’
‘আমাকে মাহতাব ভাই আপনার কথাই বলেছে।’
‘চাঁদ মরে গেছে তোর মুখ তো দেখতে পাচ্ছি না। গায়ের রঙ তো মাসাল্লাহ! এখানো কি আগের মতো আছো?’
‘না কমরেড। কালো হয়েছি।’
নৌকার হাল ধরে আছে যে, তার পরিচয় নেবার আগেই নৌকা ছেড়ে দিলো। স্রোতের অনুকূলে শুধু হাল ধরে বসে ফুস ফুস করে বিড়ি ফুঁকছে। আবু ইউসুফ ভয়ানক বিস্মিত হয়। চঞ্চল আকতারের পার্টির নাম সমর বাবু জানে?
ক্রমাগত স্টিমারে বাতি ক্ষীণ হতে থাকে। মাঝ নদী বরাবর নৌকা চলছে। শীতকালে সব নদী তার যৌবন হারায়। তারপরও স্রোতস্বিনী। জলের ঘূর্ণিও আছে। শব্দহীন নৌকা চলছে। মধ্যম রাত প্রহর। শীত ঝাঁকিয়ে আসছে।
‘সলু মিয়া, চাদরে যে শীত মানতে চায় না।’
‘হাত মোজা পরবেন কমরেড?’
‘তোমার হাত ঠান্ডা রাখতে চাই না।’ আবু ইউসুফ চঞ্চল আকতারকে পেয়ে খুশি হয়েছে। তারপরও বিরক্তির অন্ত নেই। অবশ্য সলু মিয়া যে পার্টির গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার, তা বোধগম্য হতে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়নি আবু ইউসুফের।
সমর চক্রবর্তী নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘চিড়ি ক্যমান?’
সলু মিয়া ক্ষীণকণ্ঠে বলল, ‘শিক্ষিত।’
চর নলসন্ধ্যায় যখন নৌকা ভিড়লো তখন রাতের শেষ প্রহর। আর আধাঘণ্টা পর দূরে কোথাও মসজিদে আযান হাঁকবে। ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে দুই কমরেড চরের বালিতে পা রাখে। চড়নদার চঞ্চল আকতার অন্য মাঝির দিকে না তাকিয়ে অতিথিদের নিয়ে আখ ক্ষেতে ঢুকে যায়। চাঁদ ডুবে গেছে। ঘুটঘুটে আঁধার। শেষ রাতের পাখি ডাকছে কোথাও। খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে যেতে হবে। বেশ কিছু পথ হেঁটে বালি আর কাঁশফুলের ক্ষেত মাড়িয়ে ঠিক আযানের পূর্বে এক বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বিছানা পাতা ছিলো, সমর চক্রবর্তী বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমের রাজ্যে চলে যায়। আবু ইউসুফের ঘুম আসে আরো পরে। সূর্য তখন উঠি উঠি ভাব করছে। এর মধ্যে অনেক কিছু ভেবে নেয়। চক্রবর্তী ঘোড়েল চিজ। টপমোস্ট থেকে চঞ্চল আকতার পর্যন্ত প্রোথিত শেকড়। চোখ মেলে তাকাতেই মনে হয় গাঢ় অন্ধকার। এর মাঝে বিকট শব্দে মুঠোফোন বাজছে। ঘুম ভেঙ্গেছে আবু ইউসুফের। সম্ভবত সমর বাবুরও। আবু ইউসুফের বিস্ময় সমর বাবু কাছে মুঠোফোন আছে। এ দেড়দিনও আবু ইউসুফ বুঝতে পারিনি। হঠাৎ কী করে ফুঠোফোন সশব্দে ফিরে এলো। প্রশ্নগুলো মাথায় মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।
‘বাবু মুঠোফোন এনেছেন তাতো বলেননি।’
‘বললে কি হতো? ঘুমান।’
আবু ইউসুফের কণ্ঠস্বর বেশ স্বপ্রতিভ।
সমর চক্রবর্তী পাশের জানালা খুলতে উদ্যত হয়।
‘না না জানালা খুলবেন না। লাইট জ্বালিয়ে দিচ্ছি। বাথরুম সেরে স্নান করে আসুন।’
আবু ইউসুফ লাইট জ্বালায়। বেশ পরিপাটি রুম। হাফ বিল্ডিং। এটাস্ট বাথরুম। পিলার দিয়ে গাজী টাংকি বসিয়ে দিয়েছে। নিচ থেকে মেশিনে পানি উঠানো হয়। সমর বাবু বাথরুমে ঢুকে পড়ে। আবু ইউসুফ একটু পর দরোজায় টোকা শুনতে পায়। খাট থেকে নেমে দরোজা খুলতেই তরুণ বয়সী এক ছেলে ডুকে পরে। হাতে চার বাটিওয়ালা টিফিন কেরিয়ার।
‘চঞ্চল ভাই পাঠিয়েছে। রাত আটটার দিকে আসবে।’
টিফিন কেরিয়ার রেখে নিঃশব্দে চলে যায় তরুণ। বেশ সময় নিয়ে সমর বাবু স্নান করেন। আবু ইউসুফ ভাবে, সমর বাবুর কাজটা কি?
চিরুনি দিয়ে চুল বিন্যাস করতে করতে সমর বাবু বলে, ‘সলু মিয়া আসে নাই?’
‘না, রাতে আসবে।’
‘ও।’
আবু ইউসুফ স্নান সেরে বেরিয়ে দেখে সমর বাবুর খাওয়া প্রায় শেষের দিকে।
‘একাই খেলেন, কমরেড।’
‘না। আপনার জন্য রেখেছি।’
আবু ইউসুফ বুঝতে পারে সমর বাবু রহস্য রেখে কথা বলে। খাওয়া শেষ করে আবার ঘুমের রাজ্যে চলে যায় কমরেড সমর চক্রবর্তী। আবু ইউসুফ তাকে বিরক্ত না করে নিজেই ঘুমাতে চেষ্টা করে।
শীতকাল। দুটোর পর পর ক্যামন বিকেল বিকেল ভাব। আর গ্রাম দেশের বিকেল তো আরো তাড়াতাড়ি।
আযানের পূর্বে ঘুম ভাঙ্গে সমর বাবুর। অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় না। তবে আবু ইউসুফ যে ঘুমাচ্ছে তা টের পায়। সূর্যের অন্তিম মুহূর্ত। তারপরও দরোজার ফাঁক-ফোকর গলিয়ে হালকা আলো।
সারাদিন বন্দী রুমের ভিতর নিজকে খাঁচার পাখি মনে হল সমর চক্রবর্তীর। জানালা খুলে দিতেই এক পশলা ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ঢুকে গেলো। যেন পুরোটাই অক্সিজেন। রাত নামছে। প্রকৃতি কালো হয়ে আসছে। সন্ধ্যা পাখিদের কলরব থেমে আসছে। জানালায় দাঁড়িয়ে দুটো সিগারেট শেষ করে। বয়স কত সমর চক্রবর্তীর? বিয়াল্লিশ- তেতাল্লিশ। বিয়ে থা করেনি। পার্টির পেছনে আজ উনিশ বছর। কবিতা লেখে। ভার্সিটির সেরা ছাত্র হলেও এম এ পাশ করা হয়নি। অনার্স পর্যন্ত থেমে গেছে। এ জন্য কোন আর্তি নেই তার। খ-কালীন বেকার। সমর চক্রবর্তী একশো পারসেন্ট জনগণের পক্ষে। দেশের সর্বক্ষেত্রে পলিতরিয়েতদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, এ স্বপ্ন লালন করে। গত দুই বছর যাবত যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে তা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পার্টির শ্রেণীশত্রুদের খতম করার জন্য পার্টি যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে তার প্রতিটি নকশার কপি সমর বাবুর হাত ঘুরে আসে। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব কিলিং মিশনে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে হয়।
আকস্মিক আবু ইউসুফের আগ্নেয়াস্ত্রটির কথা মনে পড়ে। তাকে তো কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি।
কমরেড মাহতাব বলেছে, ‘সব সঠিক সময় পেয়ে যাবেন কমরেড।’
পার্টি সিদ্ধান্তের এতো কিছু জানা থাকলেই শুধু মিশনটির কোন আউট লাইন জানা নেই।
নাম : মানিক সিকদার। শিক্ষিত।
পেশা : ভূস্বামি
স্ত্রী : মালবিকা সিকদার। ধর্মান্তরিত। সুন্দরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের আলোচিত নারী। বর্তমানে গৃহিণী।
এক কন্যা, আর দুই পুত্র।
কন্যা স্কুল শেষ করেছে, পুত্রদ্বয় প্রাথমিক পর্যায়।
মানিক সিকদার ঢাকায় বসবাস করলেও চরের ধান কাটার বড় লাঠিয়াল সরদার। ভূস্বামি। শ্রেণিশত্রু।
বি: দ্র: বিগত তিন বছর পার্টি ফান্ডে তার অনুদান যৎসামান্য।
সমর বাবুর প্রথমে মনে হয়েছিল, সিদ্ধান্ত সঠিক। পরক্ষণেই ভাবে এটুকু অপরাধে হত্যার দরকার কি? মুখোমুখি বসলেই সব ঠিকঠাক সম্ভব। এ ব্যাপারে লাল ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে ঠিক করে নেয়া যাবে।
আজ তিরিশ সেপ্টেম্বর দুই হাজার এগারো সাল। সমর বাবু সেই কিলিং মিশনে চর নলসন্ধ্যায় এসেছে মানিক সিকদারের সঙ্গে ফয়সালা করার জন্য।
বাইরে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। অপেক্ষা করছে আবু ইউসুফ ঘুম থেকে উঠলে অস্ত্রটা করায়ত্ত করবে। চঞ্চল আকতারের প্রোগ্রাম মোতাবেক এগোতে হবে।
বেশ শীত নেমেছে। ঝোলা ব্যাগ থেকে মোজা বের করে নেয়। মাফলারটা কাজে দেবে।
চঞ্চল আকতার আসে ঠিক সাড়ে আটটায়। মাংকি ক্যাপ, সুয়েটার, চাদর, ক্যাডস পায়ে যেন ফুলবাবু। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার।
গোঁফটা আলাদা তা সমর বাবু প্রথম দর্শনে বুঝতে পারে।
ইতোমধ্যে আবু ইউসুফের কাছ থেকে রিভলভার নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে সমর বাবু। চঞ্চল আকতার রুমে ঢুকতেই খুব নির্বিকারভাবে সিগারেট ধরায় সমর বাবু। কষে একটা টান দিয়ে বলে, ‘কি গো সলু মিয়া একেবারে চে সাহেব।’
‘কি যে বলেন কমরেড? তবে ওর নোট বুক পড়েছি। আইকন।’
ভীষণ অবাক হয়ে সলু মিয়া আর সমর চক্রবর্তীর কথা শুনছে আবু ইউসুফ। মাথা তালগোল পাকাচ্ছে। এত বছরে ও কী সলু মিয়া পর্যন্ত আসতে পেরেছে? কি মন্ত্র বলে দেশ পাল্টে যাবে! আবু ইউসুফ, সলু মিয়া, সমর চক্রবর্তীর আগামী কি? ইত্যাকার ভাবনার মধ্যে বসবাস করতে থাকে আবু ইউসুফ।
সলু মিয়াকে নিয়ে সমর বাবু বাইরে বের হয়। রাত বাড়ছে। পাড়াগাঁয়ের রাত এমনিতে গভীর। খড়ের গম্বুজের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায় সমর বাবু। ‘মুরগা সিকদার ঢাকা থেকে আসেনি। মুরগী বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে এসেছে। তবে আজ রাত দশটায় ঋষিপাড়ায় কৃষ্ণযাত্রা হবে। সিকদারের পরিবর্তে শ্রীমতি আসবেন। ওই পর্যন্ত কমরেড মাহতাব জানেন।’ খুব দ্রুত কথাগুলো বলে সলু মিয়া। আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেটে শেষ টান মেরে সমর বাবু বলে, ‘শ্রীমতিকে দেখলে ক্ষতি কি! বিশদ জানার কাছাকাছি থাকা যাবে।’
‘তা যাবে। তা হলে রাতের খাবার খেয়ে কৃষ্ণপুর ঋষিপাড়ার দিকে হাঁটতে হয়।’
‘সলু মিয়া, সাধারণত তোমার সিদ্ধান্ত আমি পছন্দ করি। লাল ভাইকে বলেছি, পার্টির জন্য নিবেদিত তোমাকে দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্ব দেবার জন্য।’ সমর বাবু খুব দ্রুত কথাগুলো বলে।
সলু মিয়া উদাসীন কণ্ঠে বলে, ‘কমরেড, এ জীবনের প্রতি মোহমুক্তি ঘটছে। আতঙ্কিত জীবন কি করে এতগুলো বছর বহন করছি। মাঝে মাঝে খুব অবাক হই। ‘এতদিন পর এ কথা ক্যানে, কমরেড। মানুষ নিয়ে খেলতে খেলতে বহু সময় অতিক্রম করে এখন কি ফেরা সম্ভব? তবে লাল ভাইকে বলবো।’
‘দরকার কি? লাল ভাই একদিন কার্ল মার্কসের দেশে চলে যাবেন। আমরা রুটস লেবেলে কিল্ড হতে থাকবো। নিয়তি?’ সলু মিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে নিজকে খুব অসহায় মনে হয়। সলু মিয়া তো খারাপ বলেনি।
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রুম থেকে সলু মিয়া আর সমর চক্রবর্তী যখন বের হয় তখন রাত দশটা অতিক্রম করে গেছে। কুয়াশাচ্ছন্ন পিঙ্গল জোছনা।
শুধু আবু ইউসুফকে বলে, ‘কমরেড ঘুমান। ঠিক সময় পৌঁছে যাবো।’
‘একটু ব্যবধান রেখে চঞ্চল আকতারের সঙ্গে পথ হাঁটছে সমর বাবু।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment