অপার সৌন্দর্যের ব্রাজিল, মানুষগুলোও যেন ভিন গ্রহের
মজিবর রহমান ব্রাজিল থেকে ফিরে
মেঘলা হয়ে গিয়েছিল আকাশ শুরু থেকেই। কিন্তু বৃষ্টি ঝরেনি বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগও নেমে আসেনি। সংশয়, শঙ্কার এই মেঘ আবার নিমিষে উধাও গেল। এটা মনের মধ্যে জমে থাকা কালোমেঘ। আকাশের নয়। অস্থিরতা ঝেড়ে শুরু করলাম কাজ, অনেক স্বস্তি সঙ্গী করে। হ্যা, ব্রাজিলে বিশ্ব কাঁপানো বিশ্বকাপ ফুটবল কভার করতে গিয়ে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরলাম। পেশাগত কারণ, ব্যক্তিগত, কিংবা শখে এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, এমনকি স্বপ্নের আমেরিকা-সৌভাগ্য হয়েছে অনেক দেশ ভ্রমণের। সেলিব্রেটি থেকে ট্যাক্সি চালক, হোটেলবয়-জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাতে হাত মিলানোর সুযোগ হয়েছে বিশ্বের অগণিত মানুষের। জানতে পেরেছি তাদের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতিসহ অনেক কিছু। ব্রিকলেন থেকে সেন্ট্রাল লন্ডন যাওয়ার সময় একবার দোতলা বাসের ভেতরের সিঁড়ি থেকে অবধানতাবশত পড়ে যাওয়া ছাড়া জীবনে কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা বা দুর্ঘটনায় পড়তে হয়নি। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিল্মি স্টাইলে এক ছিনতাইয়ের ঘটনা কোন দিন ভুলতে পারব না। তবে নিজের নয়। বোতসোয়ানার এক সংাবাদিক নিজের গাড়ি সমেত ভেতরে থাকা দামী ক্যামেরা, লেপটপ, টাকা, সর্বস্ব খুইয়েছিলেন বিশ্বকাপ কভার করতে এসে। ২০১০ সালের ঘটনা। জোহানেসবার্গে চোখের সামনে রাস্তার পাশে গাড়ি পার্কিং করা মাত্র অস্ত্র হাতে দুই ছিনতাইকারী এসে প্রথমে তাঁকে চালকের আসন থেকে নামতে বলল। তারপর গাড়ির চাবি চাইল। আফ্রিকান সন্ত্রাসীরা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা তাঁর জানা ছিল। কাজেই কোন ছলচাতুরির আশ্রয় না নিয়ে ভদ্রলোক পুরোপুরি স্যারেন্ডার, চাবি পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে গাড়ি ড্রাইভ করে চলে গেল ছিনতাইকারীরা। গা শিউরে উঠার মতোই এক দৃশ্য। হলিউড, বলিউডের ছবির মতো কোন মহানায়ককে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়নি সহযোগিতায়, নিরীহ মানুষটির মালামাল উদ্ধারে। সেটা আসলে রূপালি পর্দায় মানায়। বাস্তবে নয়। এটাই নির্জলা সত্য। সেই থেকে অবশ্য বিদেশ সফরের আগে মনের মধ্যে অজানা একটা ভয় কাজ করে থাকে। আর দেশটির সম্পর্কে যদি বিশ্ব মিডিয়ায় ঢালাওভাবে বিরূপ-অপপ্রচার চলতে থাকে তখন সেটা আরও বড় হয়ে ভর করে, নিজের মধ্যে।
ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফুটবল কভার করতে গিয়ে দু’ধরনের অভিজ্ঞতার কথাই বলব। এক, যাওয়ার আগে। দ্বিতীয়, যাওয়ার পর। ব্রাজিল সন্ত্রাসী দেশ, বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় মাস খানেক আগে থেকেই ‘হেডলাইন’ হয়ে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। পাশাপাশি আন্দোলন-বিক্ষোভ, বিশ্বকাপবিরোধী নানা অপতৎপরতার খবর। সঙ্গত কারণে যে কারও মনে হতে বাধ্য, ব্রাজিলে গিয়ে না আবার কোন বিপদে পড়তে হয়? ফলে বার বার মনের আয়নায় ভেসে উঠছিল জোহানেসবার্গের সেই ছিনতাইয়ের দৃশ্য। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকট হয়ে উঠছিল শঙ্কা-ভয়। ভিসা-বিমানের টিকেট হাতে পাওয়ার পর তা আরও বেড়েই চলছিল। আসলে এটাই স্বাভাবিক। শেষতক ভয়-ডর ঝেড়ে ফেলে রণাঙ্গনের সৈনিকের মতো সাহসী না হয়ে উপায় ছিল না। পেশাটাই তো আসলে ঝুঁকির। ভয় পেয়ে গেলে তো আর সাংবাদিকতা করা চলবে না। জীবনাটাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে পাড়ি জমালাম ব্রাজিলে, ঢাকা থেকে সাও পাওলো। বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচের শহরে পা রাখার পর বিচ্ছন্ন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা যে চোখে পড়েনি তা নয়। কিন্তু সেটা তেমন বড় কিছু নয়। বিশ্বকাপবিরোধী আজেবাজে লিখন শহরের বাড়ি-ঘর, অফিস, আদালতের দেয়ালে। এমনকি ঝটিকা মিছিলও দেখা গেল। অবশ্য তা মাঝে মধ্যে, নিত্য কোন ঘটনা নয়। ব্রাজিলের ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়াবীদ, এমনকি সচেতন মানুষের কাছে জানতে চাইলে সবাই বললেন, এটা কোন ব্যাপার নয়। বিশ্বকাপের বল মাঠে গড়ানোর পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আন্দোলন-বিক্ষোভ ভুলে গিয়ে ফুটবল উন্মাদনায় মেতে উঠবে গোটা ব্রাজিল। কথার সঙ্গে বাস্তবতার অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া গেল। ১২ জুন থেকে বিশ্বকাপের শহরগুলো পরিণত হলো বিস্তীর্ণ হলুদের সম্রাজ্যে। বিশ্বকাপ উত্তাপে ঘরের মাঠে ব্রাজিলের হলুদের মাঝে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছিল আকাশী-সাদা রংটাও। আসলে গোটা বিশ্বে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ফুটবল মাঠ মুখী হওয়ার ব্যাপারটা রূপসী আকাশী-সাদায় রাঙিয়ে দেয়ার কথাই বলে। বলে তাদের মায়াবী উচ্ছ্বাস আর শব্দযন্ত্রের কথা, যা ফুটবল ম্যাচের চেহারাই পাল্টে দেয়।
চল্লিশ দিন ব্রাজিলে অবস্থানে নিজেদের জেন চিনিয়েছে ব্রাজিলের মানুষ। বিশ্ব মিডিয়ায় যা প্রচার করা হয়েছিল তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, প্রমাণ দেশটিতে দীর্ঘ চল্লিশ দিনের অবস্থানে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা চোখে পড়েনি। গভীর রাত অবধি রাস্তায় চলাফেরা করে কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানা নেই। পাহাড়-বনানী ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যই চারদিকে। দেশটিতে আসার আগে অনেকের মুখেই শুনছিলাম, ব্রাজিল গরিব দেশ। সেটারও বড় বাস্তবতা হচ্ছে দেশটির মুদ্রার মান। এক ডলারের বিপরীতে মাত্র দুই হেইস (ব্রাজিলীয় মুদ্রা)। আর বাংলাদেশ প্রায় আশি টাকা। রাস্তা-ঘাট? ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে পরিচ্ছন্ন, গোছাল। এক কথায় খুবই সুন্দর-নয়নাভিরাম। আসলে মানুষ কখন চিত্তসুখ খুঁজে? যখন তার পকেটে অঢেল অর্থ থাকে। যারা বিশ্বকাপ ফুটবল, অলিম্পিন আয়োজন করতে পারে তারা গরিব হয় কিভাবে? ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংকের’ মূল উদ্যোক্তা ব্রাজিল অনেক ধনী দেশ। ফল-ফুলের দেশের মানুষের মনটাও ফুলের মতো। দেশটির মানুষের প্রশংসা না করলেই নয়। ঠগবাজ, চিটার, বাটপার দেখলাম না, বাংলাদেশের অলি-গলিতে যা নিত্য ব্যাপার। তবে সমস্যা একটাই ‘ভাষা।’ পর্তুগীজ ভাষা না জানলেও কেউ যদি আকার ইঙ্গিতে বুঝাতে পারেন সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়বে যে কোন মানুষ। ভাষাগত কারণে প্রথম বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম সাও পাওলো থেকে রিও ডি জেনিরো যাওয়ার সময়। ছয়টি অঞ্চলে বিভক্ত দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল দেশ ব্রাজিল। এক শহর থেকে অন্যটিতে যাওয়ার সময় স্থানীয় নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর বাসের টিকেটের পেছনে লিখতে হয়। আবার উঠার সময় তা দেখাতে হয় স্যুটেড-বুটেড বাস সুপারভাইজারকে। আর বিদেশীদের জন্য পাসপোর্ট। আমরা আসলে এই কালচারে অভ্যস্ত নই। কাউন্টার থেকে টিকেট কিনে উঠতে চাইলে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুপাভাইজার হাত উচিয়ে বললেন ‘ফসাফস।’ অঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে টিটেকের পেছনের খালি জায়গা। আসলে ফসাফস কি আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম না। অন্তত মিনিট দশেক আকার ইঙ্গিতে কথা চলাচাললির সময় আমাদের মতো এক ভিনদেশীকে দেখা গেল পাসপোর্ট বেড় করে টিকেটের পেছনে নম্বর বসাচ্ছেন। আর তখনই বোধদয় হলো। হাসি লুকিয়ে রাখার উপায় ছিল না। পরবর্তিতে ফসাফস নিয়ে আর সমস্যায় পড়তে হয়নি। এ ধরনের অনেক ঘটনাই আছে যা, ধীরে ধীরে ধাতস্ত হয়ে পড়ছিলাম। মাস খানেক থাকার পর খাবার, ফলের দোকান, প্রয়োজনীয় কোন কিছু কিনতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কোয়ার্টার পর্তুগীজ বনে যাওয়ায়। যেখানে যাবেন, কোন কিছু কিনবেন? টাকা দিয়ে ফেরার সময় ‘ওব্রিগাদো’- মানে ধন্যবাদ। সরকারী হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও ইংরেজী জানেন না। আমাদের এক সহকর্মী ফাইনালের পরেরদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। মিডিয়া সেন্টার থেকে এ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পর ডাক্তারকে বুঝানো যাচ্ছিল না রোগীর মূল সমস্যা কি? কেন তার কাছে ছুটে আসা। হাতের ইশারায় যেটুকু বুঝনো গিয়েছিল তাতে প্রথমিক চিকিৎসা হিসেবে স্যালাইন পর্যন্ত এগোতে পেরেছিলেন ডাক্তার। মহা সমস্যায় সবাই যখন চিন্তিত, তখন এক নার্স হাল্কা, পাতলা গড়নের দারুণ স্মার্ট এক সুন্দরী মেয়েকে ডেকে নিয়ে আসলেন। গায়ের পোশাক দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়নি তিনি ডাক্তার। বেশ চমৎকার ইংরেজী বলতে পারেন। তাঁকে পেয়ে রোগী এমনিতেই অর্ধেক ভাল হয়ে গিয়েছিল। আর আমারও হাফ ছেড়ে বাঁচেছিলাম।
ব্রাজিলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ইংরেজী বাধ্যতামূলক নয়। এ বিষয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকের মন্তব্য হচ্ছে, প্রয়োজন পড়ে না। ব্রাজিল সবকিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। পরনির্ভরশীল নয়। প্রায় বিশ কোটি মানুষের দেশে নিজেরাই সব কাজ করে থাকে। কাজের বিনিময়ে বিদেশীদের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা তুলে দিতে রাজি নয় দেশটির সরকার। চিকিৎসা-শিক্ষা, সবকিছুই ফ্রি। সুইপার থেকে হোটেল বেয়ারা সবাই সচ্ছল, ধনীর মতো।
আসলে লেখার আছে অনেক কিছু। কিন্তু বোঝার উপায় ছিল না। তবে শেখার ছিল অনেক কিছু। বিদেশে থেকে সংবাদ পাঠাতে, তৈরি করতে শুধু নিজের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পড়ে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিনের সহায়তা। যা ব্রাজিলে পাওয়ার উপায় ছিল না। ব্রাজিলিয়ানদের ভাষা পর্তুগীজ। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোও পর্তুগীজ ভাষায়। ইংরেজী কোন দৈনিক খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর এ কারণেই বলতে হচ্ছে ‘বুঝতে হলে জানতে হবে।’ আর সেটা কী? সহজ উত্তর-ভাষা। দীর্ঘ ২২ বছরের বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে বিষয়টা প্রথম উপলব্ধি করলাম ব্রাজিলে এসে। আগেই বলেছি পেশাগত কাজে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে। এমনকি আফ্রিকা পর্যন্ত। কিন্তু ভাষা বিড়ম্বনা জীবনে প্রথম। যদিও এটাকে বিড়ম্বনা বলা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমার কাজ আমি করব, ওদের ভাষা, সংবাদপত্রে কি লিখেছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আবার নেহায়েতই যে প্রয়োজন পড়ে না তা নয়।
২০০৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক জার্মানি, এমন কি পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের চিত্রটা ভেসে উঠল মনের মধ্যে। মনে পড়ে মিউনিখ বিমানবন্দরে নামার পরই বাহারি রঙের পোশাক পড়া তরুণ-তরুণী ভলান্টিয়াররা দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত বিদেশীদের বরণ করতে। বিমান বোঝাই যাত্রী টার্মিনালে নামার পরই দু’ভাগে বিভক্ত। মাইকে সুরেলা কণ্ঠে ঘোষণা করা হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আগত যাত্রীদের অমুক কাউন্টার। ভলান্টিয়ারা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন যেন জামাই আদরে। বিশ্বকাপের কাউন্টারে যাওয়ার পর হাতে তুলে দেয়া হলো নানা গাইডবুক, কোটপিন। আমন্ত্রিত অতিথি ও বিদেশী মিডিয়াকর্মীদের জন্য দাঁড়িয়ে সুসজ্জিত শাটল বাস। যে যেখানে যেতে ইচ্ছুক নামিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা। আসলে জার্মানিদের আতিথেয়তা ভুলার নয়। তবে খুব একটা পেছনে ফেলার সুযোগ নেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে। জোহানেসবার্গ বিমানবন্দরে নেমেই টের পাওয়া গিয়েছিল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশেই পা রেখেছি। অথচ সবচেয়ে বেশি উৎসাহ নিয়ে ব্রাজিলে গিয়েছিলাম। আর বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশটার চিত্র দেখে হতাশ হয়েছিলাম সবচেয়ে বেশি। পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম, হোক বিশ্বকাপ, দ্য গেটেস্ট শো অন আর্থ- তাতে ব্রাজিলের মানুষের কিছু যায় আসে না। সম্ভবত এ কারণে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত বিদেশী বরণে কোন বাড়তি ব্যবস্থা রাখা হয়নি বিমানবন্দরে। নিজেদের দলের খেলার দিনই কেবল আনন্দ করেন তাঁরা। বিশাল শপিং মল থেকে সাধারণ দোকানের মালিক-কর্মচারী, সবাই হলুদ। অতি উৎসাহী নয়। কিন্তু একটা হলুদ জার্সী কিভাবে গোটা জাতিকে এক সুতোয় গাঁথতে পারে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো কঠিন।
লন্ডন বা ইতালির মতো সাউথ এশিয়ানদের অবাধে ব্রাজিলে বসবাসের সুযোগ নেই। যদিও কাজের সুযোগ রয়েছে অনেক। মাসে তিন চার লাখ টাকা রোজগার করা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু সমস্যা ওই একটাই, ভাষা। তার চেয়ে বড় ব্যাপার ব্রাজিলিয়ানরা তাদের দেশটাকে ইংল্যান্ড-ইতালির মতো ডাস্টবিন বানাতে চায় না সাউথ এশিয়ানদের জায়গা দিয়ে। তবু বিশ কোটি মানুষের দেশটিতে বাঙালী যে নেই তা নয়। তবে খুবই নগণ্য, মাত্র পাঁচ থেকে ছয় শ’ বাংলাদেশী লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্রাজিলে। তথ্যটা সাও পাওলোয় বসবরত এক বাঙালী জানিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য চাকরি করেন না। একটা ছোট দর্জি দোকানের মালিক। বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে ব্রাজিলের প্রায় সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ শহর দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোন ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশী বা পাকিস্তানী হোটেল পাওয়া যায়নি। চোখে পড়েনি। ব্রাজিলিয়াদের প্রধান খাবার ‘পোর্কো’- শুকরের মাংস। প্যাটিশ, স্যান্ডউইচ, সবকিছুতেই। দূরে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বাস। শহরগুলো এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে। ফলে দূরপাল্লার ট্রেন নেই। তবে শহরের মেট্রো রেল বেশ জনপ্রিয়।
যা হোক, এবার খেলায় ফিরি। বিশ্বকাপ ফুটলের প্রায় সবগুলো খেলা মনযোগ দিয়ে যারা দেখেছেন, সবার মাথায় নিশ্চয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে বিক্ষিপ্ত কিছু মুহূর্ত। যা ভেসে ভেসে উঠছে। মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার ভেসে উঠছে। তাদের মতো ব্রাজিলে বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে আমার অবস্থাও ছিল সে রকম। এক মাসেরও বেশি সময় এখানে অবস্থান যেন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছি। এমন প্রতিদ্বন্ধিতা, অনেক ভাল ম্যাচ, গতির সঙ্গে শিল্পের মিশেল। টেকনিক্যাল প্রয়োগ-সবই দেখলাম। আর উপভোগ্য ফাইনালে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে লাতিন আমেরিকার মাটি থেকে ইউরোপের প্রথম দল হিসেবে জার্মানির বিশ্বজয়। তাও লিওনেল মেসি আর ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। রোমাঞ্চে ভরা রঙ্গ-বিহবলতার, বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলীয়ানদের যেভাবে কাঁদতে দেখেছি তা কোন দিন ভুলার নয়। নেইমার দ্য সিলভা নামক তাদের মহাতারকা বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া আর দলের বিপর্যয়। এর মধ্যে নেইমার নাটকীয়ভাবে বিশ্বকাপের বাইরে চলে যাওয়ায় গোটা ব্রাজিলজুড়ে যে স্থবিরতা- দেশটির মানুষকে যেভাবে কাঁদতে দেখলাম তা চোখে না দেখলে লিখে ততটা বুঝানো যাবে না। নেইমারের বিদায়ে ছোট বন্ধুর জন্য মেসি নিজেও ঘোর বিষণœ ছিলেন। নশ্বর এবং নৈতিক বিপর্যয় যেভাবে মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক হয়ে সেই জীবনকেই দ্বিখণ্ডিত করে, ঠিক সে রকমই এক মুহূর্ত ছিল ব্রাজিলের আপামর ফুটবলপ্রেমীর মন, জীবনকেও করে তুলেছিল বিপর্যস্ত।
পরিশেষে রিও ডি জেনিরোর কোপকাভানা বিচ, আটলান্টিকের অপার সৌন্দর্যের এই সমুদ্র সৈকত ব্রাজিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বিকিনী খ্যাত সুন্দরীদের ভিরে ঢুকতে না পারলে ব্রাজিল ভ্রমণ নাকি বৃথা।
ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফুটবল কভার করতে গিয়ে দু’ধরনের অভিজ্ঞতার কথাই বলব। এক, যাওয়ার আগে। দ্বিতীয়, যাওয়ার পর। ব্রাজিল সন্ত্রাসী দেশ, বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় মাস খানেক আগে থেকেই ‘হেডলাইন’ হয়ে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। পাশাপাশি আন্দোলন-বিক্ষোভ, বিশ্বকাপবিরোধী নানা অপতৎপরতার খবর। সঙ্গত কারণে যে কারও মনে হতে বাধ্য, ব্রাজিলে গিয়ে না আবার কোন বিপদে পড়তে হয়? ফলে বার বার মনের আয়নায় ভেসে উঠছিল জোহানেসবার্গের সেই ছিনতাইয়ের দৃশ্য। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকট হয়ে উঠছিল শঙ্কা-ভয়। ভিসা-বিমানের টিকেট হাতে পাওয়ার পর তা আরও বেড়েই চলছিল। আসলে এটাই স্বাভাবিক। শেষতক ভয়-ডর ঝেড়ে ফেলে রণাঙ্গনের সৈনিকের মতো সাহসী না হয়ে উপায় ছিল না। পেশাটাই তো আসলে ঝুঁকির। ভয় পেয়ে গেলে তো আর সাংবাদিকতা করা চলবে না। জীবনাটাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে পাড়ি জমালাম ব্রাজিলে, ঢাকা থেকে সাও পাওলো। বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচের শহরে পা রাখার পর বিচ্ছন্ন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা যে চোখে পড়েনি তা নয়। কিন্তু সেটা তেমন বড় কিছু নয়। বিশ্বকাপবিরোধী আজেবাজে লিখন শহরের বাড়ি-ঘর, অফিস, আদালতের দেয়ালে। এমনকি ঝটিকা মিছিলও দেখা গেল। অবশ্য তা মাঝে মধ্যে, নিত্য কোন ঘটনা নয়। ব্রাজিলের ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়াবীদ, এমনকি সচেতন মানুষের কাছে জানতে চাইলে সবাই বললেন, এটা কোন ব্যাপার নয়। বিশ্বকাপের বল মাঠে গড়ানোর পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আন্দোলন-বিক্ষোভ ভুলে গিয়ে ফুটবল উন্মাদনায় মেতে উঠবে গোটা ব্রাজিল। কথার সঙ্গে বাস্তবতার অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া গেল। ১২ জুন থেকে বিশ্বকাপের শহরগুলো পরিণত হলো বিস্তীর্ণ হলুদের সম্রাজ্যে। বিশ্বকাপ উত্তাপে ঘরের মাঠে ব্রাজিলের হলুদের মাঝে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছিল আকাশী-সাদা রংটাও। আসলে গোটা বিশ্বে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ফুটবল মাঠ মুখী হওয়ার ব্যাপারটা রূপসী আকাশী-সাদায় রাঙিয়ে দেয়ার কথাই বলে। বলে তাদের মায়াবী উচ্ছ্বাস আর শব্দযন্ত্রের কথা, যা ফুটবল ম্যাচের চেহারাই পাল্টে দেয়।
চল্লিশ দিন ব্রাজিলে অবস্থানে নিজেদের জেন চিনিয়েছে ব্রাজিলের মানুষ। বিশ্ব মিডিয়ায় যা প্রচার করা হয়েছিল তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, প্রমাণ দেশটিতে দীর্ঘ চল্লিশ দিনের অবস্থানে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা চোখে পড়েনি। গভীর রাত অবধি রাস্তায় চলাফেরা করে কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানা নেই। পাহাড়-বনানী ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যই চারদিকে। দেশটিতে আসার আগে অনেকের মুখেই শুনছিলাম, ব্রাজিল গরিব দেশ। সেটারও বড় বাস্তবতা হচ্ছে দেশটির মুদ্রার মান। এক ডলারের বিপরীতে মাত্র দুই হেইস (ব্রাজিলীয় মুদ্রা)। আর বাংলাদেশ প্রায় আশি টাকা। রাস্তা-ঘাট? ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে পরিচ্ছন্ন, গোছাল। এক কথায় খুবই সুন্দর-নয়নাভিরাম। আসলে মানুষ কখন চিত্তসুখ খুঁজে? যখন তার পকেটে অঢেল অর্থ থাকে। যারা বিশ্বকাপ ফুটবল, অলিম্পিন আয়োজন করতে পারে তারা গরিব হয় কিভাবে? ‘বিকল্প বিশ্বব্যাংকের’ মূল উদ্যোক্তা ব্রাজিল অনেক ধনী দেশ। ফল-ফুলের দেশের মানুষের মনটাও ফুলের মতো। দেশটির মানুষের প্রশংসা না করলেই নয়। ঠগবাজ, চিটার, বাটপার দেখলাম না, বাংলাদেশের অলি-গলিতে যা নিত্য ব্যাপার। তবে সমস্যা একটাই ‘ভাষা।’ পর্তুগীজ ভাষা না জানলেও কেউ যদি আকার ইঙ্গিতে বুঝাতে পারেন সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়বে যে কোন মানুষ। ভাষাগত কারণে প্রথম বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম সাও পাওলো থেকে রিও ডি জেনিরো যাওয়ার সময়। ছয়টি অঞ্চলে বিভক্ত দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল দেশ ব্রাজিল। এক শহর থেকে অন্যটিতে যাওয়ার সময় স্থানীয় নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর বাসের টিকেটের পেছনে লিখতে হয়। আবার উঠার সময় তা দেখাতে হয় স্যুটেড-বুটেড বাস সুপারভাইজারকে। আর বিদেশীদের জন্য পাসপোর্ট। আমরা আসলে এই কালচারে অভ্যস্ত নই। কাউন্টার থেকে টিকেট কিনে উঠতে চাইলে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুপাভাইজার হাত উচিয়ে বললেন ‘ফসাফস।’ অঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে টিটেকের পেছনের খালি জায়গা। আসলে ফসাফস কি আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম না। অন্তত মিনিট দশেক আকার ইঙ্গিতে কথা চলাচাললির সময় আমাদের মতো এক ভিনদেশীকে দেখা গেল পাসপোর্ট বেড় করে টিকেটের পেছনে নম্বর বসাচ্ছেন। আর তখনই বোধদয় হলো। হাসি লুকিয়ে রাখার উপায় ছিল না। পরবর্তিতে ফসাফস নিয়ে আর সমস্যায় পড়তে হয়নি। এ ধরনের অনেক ঘটনাই আছে যা, ধীরে ধীরে ধাতস্ত হয়ে পড়ছিলাম। মাস খানেক থাকার পর খাবার, ফলের দোকান, প্রয়োজনীয় কোন কিছু কিনতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কোয়ার্টার পর্তুগীজ বনে যাওয়ায়। যেখানে যাবেন, কোন কিছু কিনবেন? টাকা দিয়ে ফেরার সময় ‘ওব্রিগাদো’- মানে ধন্যবাদ। সরকারী হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও ইংরেজী জানেন না। আমাদের এক সহকর্মী ফাইনালের পরেরদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল। মিডিয়া সেন্টার থেকে এ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পর ডাক্তারকে বুঝানো যাচ্ছিল না রোগীর মূল সমস্যা কি? কেন তার কাছে ছুটে আসা। হাতের ইশারায় যেটুকু বুঝনো গিয়েছিল তাতে প্রথমিক চিকিৎসা হিসেবে স্যালাইন পর্যন্ত এগোতে পেরেছিলেন ডাক্তার। মহা সমস্যায় সবাই যখন চিন্তিত, তখন এক নার্স হাল্কা, পাতলা গড়নের দারুণ স্মার্ট এক সুন্দরী মেয়েকে ডেকে নিয়ে আসলেন। গায়ের পোশাক দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়নি তিনি ডাক্তার। বেশ চমৎকার ইংরেজী বলতে পারেন। তাঁকে পেয়ে রোগী এমনিতেই অর্ধেক ভাল হয়ে গিয়েছিল। আর আমারও হাফ ছেড়ে বাঁচেছিলাম।
ব্রাজিলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ইংরেজী বাধ্যতামূলক নয়। এ বিষয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকের মন্তব্য হচ্ছে, প্রয়োজন পড়ে না। ব্রাজিল সবকিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। পরনির্ভরশীল নয়। প্রায় বিশ কোটি মানুষের দেশে নিজেরাই সব কাজ করে থাকে। কাজের বিনিময়ে বিদেশীদের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা তুলে দিতে রাজি নয় দেশটির সরকার। চিকিৎসা-শিক্ষা, সবকিছুই ফ্রি। সুইপার থেকে হোটেল বেয়ারা সবাই সচ্ছল, ধনীর মতো।
আসলে লেখার আছে অনেক কিছু। কিন্তু বোঝার উপায় ছিল না। তবে শেখার ছিল অনেক কিছু। বিদেশে থেকে সংবাদ পাঠাতে, তৈরি করতে শুধু নিজের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পড়ে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিনের সহায়তা। যা ব্রাজিলে পাওয়ার উপায় ছিল না। ব্রাজিলিয়ানদের ভাষা পর্তুগীজ। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোও পর্তুগীজ ভাষায়। ইংরেজী কোন দৈনিক খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর এ কারণেই বলতে হচ্ছে ‘বুঝতে হলে জানতে হবে।’ আর সেটা কী? সহজ উত্তর-ভাষা। দীর্ঘ ২২ বছরের বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে বিষয়টা প্রথম উপলব্ধি করলাম ব্রাজিলে এসে। আগেই বলেছি পেশাগত কাজে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে। এমনকি আফ্রিকা পর্যন্ত। কিন্তু ভাষা বিড়ম্বনা জীবনে প্রথম। যদিও এটাকে বিড়ম্বনা বলা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমার কাজ আমি করব, ওদের ভাষা, সংবাদপত্রে কি লিখেছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আবার নেহায়েতই যে প্রয়োজন পড়ে না তা নয়।
২০০৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক জার্মানি, এমন কি পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের চিত্রটা ভেসে উঠল মনের মধ্যে। মনে পড়ে মিউনিখ বিমানবন্দরে নামার পরই বাহারি রঙের পোশাক পড়া তরুণ-তরুণী ভলান্টিয়াররা দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত বিদেশীদের বরণ করতে। বিমান বোঝাই যাত্রী টার্মিনালে নামার পরই দু’ভাগে বিভক্ত। মাইকে সুরেলা কণ্ঠে ঘোষণা করা হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আগত যাত্রীদের অমুক কাউন্টার। ভলান্টিয়ারা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন যেন জামাই আদরে। বিশ্বকাপের কাউন্টারে যাওয়ার পর হাতে তুলে দেয়া হলো নানা গাইডবুক, কোটপিন। আমন্ত্রিত অতিথি ও বিদেশী মিডিয়াকর্মীদের জন্য দাঁড়িয়ে সুসজ্জিত শাটল বাস। যে যেখানে যেতে ইচ্ছুক নামিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা। আসলে জার্মানিদের আতিথেয়তা ভুলার নয়। তবে খুব একটা পেছনে ফেলার সুযোগ নেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে। জোহানেসবার্গ বিমানবন্দরে নেমেই টের পাওয়া গিয়েছিল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশেই পা রেখেছি। অথচ সবচেয়ে বেশি উৎসাহ নিয়ে ব্রাজিলে গিয়েছিলাম। আর বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশটার চিত্র দেখে হতাশ হয়েছিলাম সবচেয়ে বেশি। পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম, হোক বিশ্বকাপ, দ্য গেটেস্ট শো অন আর্থ- তাতে ব্রাজিলের মানুষের কিছু যায় আসে না। সম্ভবত এ কারণে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত বিদেশী বরণে কোন বাড়তি ব্যবস্থা রাখা হয়নি বিমানবন্দরে। নিজেদের দলের খেলার দিনই কেবল আনন্দ করেন তাঁরা। বিশাল শপিং মল থেকে সাধারণ দোকানের মালিক-কর্মচারী, সবাই হলুদ। অতি উৎসাহী নয়। কিন্তু একটা হলুদ জার্সী কিভাবে গোটা জাতিকে এক সুতোয় গাঁথতে পারে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো কঠিন।
লন্ডন বা ইতালির মতো সাউথ এশিয়ানদের অবাধে ব্রাজিলে বসবাসের সুযোগ নেই। যদিও কাজের সুযোগ রয়েছে অনেক। মাসে তিন চার লাখ টাকা রোজগার করা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু সমস্যা ওই একটাই, ভাষা। তার চেয়ে বড় ব্যাপার ব্রাজিলিয়ানরা তাদের দেশটাকে ইংল্যান্ড-ইতালির মতো ডাস্টবিন বানাতে চায় না সাউথ এশিয়ানদের জায়গা দিয়ে। তবু বিশ কোটি মানুষের দেশটিতে বাঙালী যে নেই তা নয়। তবে খুবই নগণ্য, মাত্র পাঁচ থেকে ছয় শ’ বাংলাদেশী লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্রাজিলে। তথ্যটা সাও পাওলোয় বসবরত এক বাঙালী জানিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য চাকরি করেন না। একটা ছোট দর্জি দোকানের মালিক। বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে ব্রাজিলের প্রায় সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ শহর দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোন ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশী বা পাকিস্তানী হোটেল পাওয়া যায়নি। চোখে পড়েনি। ব্রাজিলিয়াদের প্রধান খাবার ‘পোর্কো’- শুকরের মাংস। প্যাটিশ, স্যান্ডউইচ, সবকিছুতেই। দূরে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বাস। শহরগুলো এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে। ফলে দূরপাল্লার ট্রেন নেই। তবে শহরের মেট্রো রেল বেশ জনপ্রিয়।
যা হোক, এবার খেলায় ফিরি। বিশ্বকাপ ফুটলের প্রায় সবগুলো খেলা মনযোগ দিয়ে যারা দেখেছেন, সবার মাথায় নিশ্চয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে বিক্ষিপ্ত কিছু মুহূর্ত। যা ভেসে ভেসে উঠছে। মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার ভেসে উঠছে। তাদের মতো ব্রাজিলে বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে আমার অবস্থাও ছিল সে রকম। এক মাসেরও বেশি সময় এখানে অবস্থান যেন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছি। এমন প্রতিদ্বন্ধিতা, অনেক ভাল ম্যাচ, গতির সঙ্গে শিল্পের মিশেল। টেকনিক্যাল প্রয়োগ-সবই দেখলাম। আর উপভোগ্য ফাইনালে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে লাতিন আমেরিকার মাটি থেকে ইউরোপের প্রথম দল হিসেবে জার্মানির বিশ্বজয়। তাও লিওনেল মেসি আর ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। রোমাঞ্চে ভরা রঙ্গ-বিহবলতার, বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলীয়ানদের যেভাবে কাঁদতে দেখেছি তা কোন দিন ভুলার নয়। নেইমার দ্য সিলভা নামক তাদের মহাতারকা বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া আর দলের বিপর্যয়। এর মধ্যে নেইমার নাটকীয়ভাবে বিশ্বকাপের বাইরে চলে যাওয়ায় গোটা ব্রাজিলজুড়ে যে স্থবিরতা- দেশটির মানুষকে যেভাবে কাঁদতে দেখলাম তা চোখে না দেখলে লিখে ততটা বুঝানো যাবে না। নেইমারের বিদায়ে ছোট বন্ধুর জন্য মেসি নিজেও ঘোর বিষণœ ছিলেন। নশ্বর এবং নৈতিক বিপর্যয় যেভাবে মানুষের জীবনে প্রাসঙ্গিক হয়ে সেই জীবনকেই দ্বিখণ্ডিত করে, ঠিক সে রকমই এক মুহূর্ত ছিল ব্রাজিলের আপামর ফুটবলপ্রেমীর মন, জীবনকেও করে তুলেছিল বিপর্যস্ত।
পরিশেষে রিও ডি জেনিরোর কোপকাভানা বিচ, আটলান্টিকের অপার সৌন্দর্যের এই সমুদ্র সৈকত ব্রাজিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বিকিনী খ্যাত সুন্দরীদের ভিরে ঢুকতে না পারলে ব্রাজিল ভ্রমণ নাকি বৃথা।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment