Thursday, July 24, 2014

ইউরোপীয় রেনেসাঁর বিকাশে ইবনে তোফায়েলের ভূমিকা

ইউরোপীয় রেনেসাঁর বিকাশে ইবনে তোফায়েলের ভূমিকা
কাজী আখতারউদ্দিন
ইরাক যুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে ইউরোপের বিরোধিতা প্রসঙ্গে ২২ জানুয়ারি ২০০৩, এক সাংবাদিকের একটি প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রামস্ফিল্ড ফ্রান্স ও জার্মানিকে ‘পুরনো ইউরোপ’ হিসেবে বাতিলের খাতায় ফেলে দেন। রামস্ফিল্ড বলেন, ‘আপনারা ইউরোপ বলতে ফ্রান্স ও জার্মানিকে বুঝেন, কিন্তু আমি না। আমি মনে করি সেটা পুরনো ইউরোপ...।’ জার্মানি ও ফ্রান্স এর তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুই মাইকেল, রামস্ফিল্ডের অপমানজনক মন্তব্যকে একটি চপেটাঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “রামসফিল্ড ‘পুরনো ইউরোপকে’ দু’একটি বিষয় শেখাতে এসেছেন- গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ইউরোপ, মানবিক ইউরোপ, যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশের কালের (রেনেসাঁর) ইউরোপকে, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এটি দুঃখজনক। ”
তবে ইউরোপীয় রেনেসাঁর পথ দেখিয়ে যারা আলোক বর্তিকা বহন করেছিলেন তাদের একজন ছিলেন এই জংলি দ্বীপবাসী বালক, যে ধীরে ধীরে পরিপক্ব হয়ে ৫০ বছর বয়সে একজন জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তাঁর নাম হাঈ ইবনে ইয়াকজান, তাঁকে সৃষ্টি করেছিলেন ১২ শতকের স্পেনের একজন আরব মুসলিম দার্শনিক ইবনে তোফায়েল। ইতিহাসকে অস্বীকার করে, কিংবা নিজের ইতিহাসকে অনন্য মনে করে গুরুত্ব প্রদান করে, শুধু মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীই নন, ইউরোপীয় কর্মকর্তাগণও অন্যদের প্রতি যে অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেছেন তা একে অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা না দেখানোর এবং স্বার্থপর মনোবৃত্তির পরিচায়ক, যা আজকাল আমাদের জীবনে প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু ইবনে তোফায়েল কখনও প্রাচীন দার্শনিকদের বাতিল করতেন না। তিনি তাঁদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতেন কিংবা তাদের সমালোচনাও করতেন, কিন্তু সবসময় তাঁদের ঋণ স্বীকার করেছেন...। তিনি মনে করতেন আমরা সকলেই মানুষ এবং ইচ্ছা করলে আমরা এই পৃথিবীকে বদলে দিতে পারি।
পশ্চিমা তাত্ত্বিকগণ সবসময়ই আধুনিক ইউরোপে ইবনে তোফায়েলের প্রভাব উপেক্ষা করে এসেছেন- যিনি ইউরোপীয় দার্শনিক ও লেখকদের প্রকৃত গুরু বা শিক্ষকদের একজন ছিলেন তাঁর কথা ইতিহাসে চাপা পড়ে ছিল।
একটি নির্জন দ্বীপে শিশু হাঈ ইবনে ইয়াকজানের চরিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে ইবনে তোফায়েল দেখিয়েছেন, কিভাবে সে পিতামাতা, ধর্মগুরু বা সমাজের সহায়তা ছাড়া বড় হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপ যখন বিজ্ঞান আবিষ্কারের পথ খুঁজছে তখন ইবনে তোফায়েল তাঁদের সামনে তুলে ধরেন ভবিষ্যৎ নতুন মানুষের একটি নমুনা (প্রোটোটাইপ)। হাঈ যে কেবল আগুন জ্বালাতে শিখেছেন, ঘর বানাতে শিখেছেন, বন্য পশুকে মানাতে পেরেছেন, কিংবা হাতিয়ার আবিষ্কার করেছেন তাই নয়, তিনি শিখেছেন কি করে একজন চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, পদার্থবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক হওয়া যায়। লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাঁকে কেউ সাহায্য করেনি, কেবল তাঁর কারণ অনুসন্ধান এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছাড়া।
হাঈ ইবনে ইয়াকজানের কোন ধর্ম ছিল না। তিনি না ছিলেন মুসলমান, না খ্রিষ্টান না ইহুদী। তিনি কালোও নন, সাদাও নন। যখন তিনি পিতামাতা, সমাজ অথবা কোন ধর্মীয় গুরুর সহায়তা ছাড়া নিজে নিজেই বড় হচ্ছিলেন, তখন তিনি বিশ্বব্রহ্মা-ে একটি শক্তি আবিষ্কার করেন এবং বলবিদ্যার বিজ্ঞান থেকে এর একটি নামকরণ করেনÑ বিশ্বব্রহ্মা-ের চালক, গড, আল্লাহ কিংবা জিহুয়া নয়। হাঈয়ের মূল যুক্তি দর্শন এবং ধর্মের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে বেড়ানোর মধ্যে ছিল না, যা লিওন গথাঁর দাবি করেছিলেন। এটি ছিল মানুষকে নিয়ে, আমাদের ভিন্নতা, একে অন্যের সাথে সমঝোতা করার প্রয়োজনীয়তা এবং যতদূর সম্ভব শান্তিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করে সহিংসতা ও রক্তপাত এড়িয়ে চলা।
জেনে রাখা ভাল, পশ্চিমা দার্শনিক এবং লেখকগণ একসময় এই আরবি পুস্তকটি সংগ্রহ করতেন অথবা পড়তেন, তাদের কর্মে পুস্তকটির প্রভাব নিশ্চিত করার জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো হাঈয়ের নতুন নতুন এবং আধুনিক চিন্তাধারা পর্যবেক্ষণ করা। যেমন, জ্ঞান সম্পর্কে তাঁর ধারণা, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ, শিক্ষার নিয়ম, সমতার ধারণা, স্বাধীনতা ও সহনশীলতা, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্রমোন্নতি এবং পরিপূর্ণতা অর্জন। আর সব বিষয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবের বিপরীতে কারণ অন্বেষণকেই প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা। এসব আধুনিক চিন্তাধারা দাবানলের মতো মুসলিম স্পেন হতে সমগ্র মধ্যযুগের ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে এক সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতো জাদুটোনার সহযোগী হিসেবে। তবে ১৭/১৮ শতকে নতুন এসব চিন্তাধারা ইউরোপীয় মনে গেড়ে বসতে শুরু করে। পরবর্তীকালে বিখ্যাত জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও লেখক আরনস্ট ট্রলস (১৮৬৫-১৯২২) ও অন্যরা বলেছেন, ‘দি এনলাইটেনমেন্টÑ যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশের কাল ছিল মূল সূত্র বা কেন্দ্রবিন্দু যার উপর ভর করে ইউরোপীয় জাতিসমূহ মধ্য যুগ থেকে আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছে। অতিপ্রাকৃতিক-কাল্পনিক-কর্তৃত্বব্যঞ্জক পথ থেকে স্বাভাবিক-বিজ্ঞানসম্মত-ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।’ আলোকিত এই যুগের ধ্যান-ধারণা ও উৎকৃষ্ট ভাবাদর্শ আজকের দিনে ইউরোপীয় সমাজের গর্বের বিষয় হয়েছে।
ইবনে তোফায়েলের পুরো নাম আবুবকর মোহাম্মদ ইবন আব্দুল মালিক ইবন মোহাম্মদ ইবন তোফায়েল আল-কাইসি আল-আন্দালুসি। পাশ্চাত্যে তিনি আবুবাকের নামেই সুপরিচিত।
তাঁর জন্ম স্পেনের গ্রানাডা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তরÑপশ্চিমে ওয়াদি এ্যাশ, বর্তমান গুয়াডিক্স নামে একটি ছোট্ট শহরে (৪৯৩-৫৮১ হিজরি/১১০০-১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দে)। তৎকালীন মুসলিম স্পেনের দু’টি জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রÑকর্ডোভা ও সেভিলের বিজ্ঞান ও দর্শনের জ্ঞান তিনি আহরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ১১৬৩ থেকে ১১৮৪ পর্যন্ত তিনি খলিফা মুওয়াহিদ সুলতান আবু ইয়াকুব ইউসুফের উজির এবং প্রধান রাজ চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন তাকে টেনে নিয়ে যায় গভীর চিন্তার জগতে, যা বিপ্লবী মানুষের সতত বিচরণ ক্ষেত্র। যে কালে ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশাসন ছিল বাধ্যবাধকতা, তখন তিনি কারণ অন্বেষণ ও যুক্তির সপক্ষে দাঁড়িয়ে সব কিছু পরীক্ষার মধ্যে নিয়ে আসার হেলেনিয় ঐতিহ্য ধারণ করেছিলেন।
ইবনে তোফায়েল শুধুমাত্র হাঈ ইবনে ইয়াকজান রচনার জন্য ইতিহাসে সুপরিচিত তাই নয়, বরং মারাক্কাসে একটি শিক্ষণীয় বিষয়ে তার অবদানের জন্য ইউরোপীয় চিন্তাজগতকে প্রচ-ভাবে প্রভাবিত করেন। ১১৬৯ সালের শীতকালে তিনি এবং খলিফা একত্রিত হয়ে তৃতীয় আরেকজন আন্দালুসীয় ইবনে রুশদ্রে (আভেরস) উপর একটি দায়িত্ব অর্পণ করেন। রুশদ্ আতঙ্কিত হলেন, যখন আমিরুল মোমেনিন তাকে দর্শন সংক্রান্ত প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। তারা দুজনেই ইবনে রুশদ্কে প্রণোদিত করলেন এরিস্টটল ও প্ল্যাটোর জটিল দর্শনের ব্যাখ্যা রচনার জন্য।
এভাবেই শুরু হল আভেরসের সুবিখ্যাত কর্মটি, যা ইউরোপে প্রথম রেনেসাঁর সূচনা করে। গ্রিক থেকে আরবিতে অনুবাদ করে তিনি গ্রিক দার্শনিকদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সমস্ত দার্শনিক কর্ম পশ্চিমা জগতে ফিরিয়ে আনেন। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডিতে’ তিনিই হলেন ‘বিখ্যাত মত প্রদানকারী’ এবং রাফায়েলের আঁকা ‘স্কুল অফ এথেন্সে’ তিনিই একমাত্র বাদামি মুখ।

১১৮২ খ্রি. ইবনে তোফায়েল অবসর নেওয়ার পর ইবন রুশদ্ তার উত্তরসূরি হন। এর পরের বছর ১১৮৫ সালে ইবনে তোফায়েল মারাক্কেশে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে সেখানেই সমাহিত করা হয়।
একজন চিকিৎসাবিদ হিসেবে ইবনে তোফায়েল শব ব্যবচ্ছেদ এবং ময়নাতদন্ত বিষয়েও প্রথম দিককার একজন সমর্থক ছিলেন।
ইবনে তোফায়েল আরবি ভাষার প্রথম এবং বিশ্বের প্রথম দর্শনভিত্তিক প্রতিকাশ্রয়ী উপন্যাস ‘হাঈ ইবনে ইয়াকজান’ রচনা করেন।
উপন্যাসটির শিরোনাম ও কয়েকটি চরিত্রের নাম তিনি ইবনে সিনার দুটি দর্শনভিত্তিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ থেকে গ্রহণ করেছেন। ধারণা করা হয় কাহিনীটির কাঠামো গঠিত হয়েছে প্রাচ্যের একটি প্রাচীন গল্পÑ দেবতা, রাজা ও তার কন্যার (ঞযব ঝঃড়ৎু ড়ভ ঃযব ওফড়ষ ধহফ ড়ভ ঃযব করহম ধহফ ঐরং উধঁমযঃবৎ) কাহিনী থেকে। এই কাহিনীর ভূমিকা ও উপসংহারে লেখক ইবনে তোফায়েল সরাসরি পাঠকের উদ্দেশে বক্তব্য রেখেছেন, বাকি অংশে তিনি একটি ‘সূক্ষ্ম পর্দা’, প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করে তার দার্শনিক মতামত তুলে ধরেছেন। গ্রন্থটি চমৎকার সাহিত্যিক ধারায় রচিত একটি দর্শনভিত্তিক গবেষণামূলক উপন্যাস। এতে মানব জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, যা উদিত হয়েছে মনের শূন্যাবস্থা থেকে। এরপর বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আধ্যাত্মিক ও আল্লাহর অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার দিকে ধাবিত হয়েছে। এই কাহিনীর মূল উদ্দেশ্য মানুষকে জানানো যে, কারণ অন্বেষণের মাধ্যমে সমাজের রীতিনীতি কিংবা ধর্মের সাহায্য ছাড়াই একজন মানুষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম এবং অতিন্দ্রীয় বা মানব জ্ঞানের সর্Ÿোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। এতে দেখানো হয়েছে, ধর্মীয় সত্য এবং দার্শনিক সত্যের রূপ একই রকম। প্রথমটি বিভিন্ন প্রতীকের সাহায্যে বলা হয়েছে, যা দিয়ে সংখ্যাধিক্য বোঝা সম্ভব। দ্বিতীয়টি কোন ধরনের প্রতীক ছাড়া এর অন্তস্থ অর্থ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষের বোঝার ক্ষমতা বিভিন্ন ধরনের হওয়ায় তার বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। সুতরাং মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দিতে গেলে তাদের বোঝার ক্ষমতানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই।
হাঈ ইবনে ইয়াকজানের কাহিনীর শুরু নিরক্ষীয় অঞ্চলের একটি জনমানবহীন দ্বীপে। হাঈকে সেখানে দেখা যায় একটি মানব শিশুরূপে। দার্শনিকদের মতে, সেখানে তার জন্ম হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অবশ্য রক্ষণশীলদের বিশ্বাস এই শিশুর জন্মদাত্রী পার্শ্ববর্তী দ্বীপের একজন নারী। শিশু হাঈকে তার মা একটি সিন্দুকে করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। ভাসতে ভাসতে সিন্দুকটি একটি জনমানবহীন দ্বীপে পৌঁছে।
সদ্য শাবকহারা একটি হরিণী তাকে স্তন্যদান করে এবং দ্বীপের অন্যান্য পশুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। শিশুটি অন্যান্য পশুপাখির ভাষা শিখে। হরিণীর মৃত্যুর পর সে প্রকৃতির কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করে পরনির্ভরশীলতা থেকে নিজের জীবনে পরিবর্তন আনে। জীবনের জন্য অপরিহার্য প্রাণশক্তির ধর্ম নিয়ে সে ভাবতে শুরু করে এবং বুঝতে পারে দেহ নয়, প্রাণশক্তির এই স্বতন্ত্র সত্ত্বাই প্রাণীর সমস্ত কর্মের উৎস। নানা কিছুর কার্যকারণ খুঁজতে খুঁজতে সে উপলব্ধি করে, পদার্থ ও তার সামগ্রিক বিন্যাস, কারণ ও প্রতিক্রিয়া, একক ও সংখ্যাধিক্য এবং পৃথিবী, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সংক্রান্ত জগতের ধারণা। সে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, বিভিন্ন বস্তুর সমাহার সত্ত্বেও বিশ্বব্রহ্মা- এক। অতঃপর সে অন্বেষণ করে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের পর বুঝতে সক্ষম হয় কোন একটি উৎসের উপর এটি নির্ভরশীল এবং সেই উৎস দেহাতীত। এই অন্তর্দৃষ্টি তাকে চরম আনন্দ দান করে। এ অবস্থায় তার নিজের অস্তিত্বই যে শুধু মুছে গেল তাই নয়, ঐ প্রয়োজনীয় সত্ত্বাটি ছাড়া অন্য সব কিছুরই অস্তিত্ব মুছে যায়। প্রকৃতি ও বোধশক্তির অতীত এই সত্ত্বার কোন ধরনের ব্যাখ্যা সম্ভব নয়, কেবল ইঙ্গিত করা যায়Ñ যা ইবনে সিনা তাঁর (৯৮০-১০৩৭) ‘আল-ইশারাত ওয়াল-তানবিহাত’ (জবসধৎশং ধহফ ধফসড়হরঃরড়হং) এ ব্যক্ত করেছেন। মানুষের ভাষা, একটি অসম্পূর্ণ মাধ্যম, তা দিয়ে হাঈ এই অবস্থায় যে সত্য অবলোকন করেছে, সে সম্পর্কে এরকম একটি আভাস দেওয়া যায় Ñ
সূর্যের আলো যেমন প্রাকৃতিক জগতে ছড়িয়ে পড়ে, সেইরকম এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সত্ত্বাও বিশ্বব্রহ্মা-ে ছড়িয়ে আছে। ব্যাখ্যার অতীত এই সত্ত্বার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে লেখক বলেছেন, এই অবস্থায় হাঈ অনুধাবন করতে পেরেছে, একক কিংবা একাধিক হোকÑ সব কিছুরই মূল হচ্ছে এক। অন্য সব কিছুর বিপরীতে এর অস্তিত্ব শুধু অনুভব করা যায়। নিওপ্ল্যাটোনিক প্যাানথিয়েসটিক প্রবণতা এখানে স্পষ্টত প্রতীয়মান অর্থাৎ ঈশ্বর সবকিছুতে বিরাজমান।
ইবনে তোফায়েল ১১৬০ সালে মারাক্কেসে আরবি ভাষায় এই পুস্তকটি রচনা করেন। ১৪ শতকে মোসেস রাব্বি নারবোনেনসিস পুস্তকটি হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করেন। ১৪ থেকে ১৫ শতকে হিব্রু সংস্করণটি পিরেনিস পর্বত পার হয়ে প্রোভেন্স হয়ে ফ্লোরেন্সে পৌঁছে। সেখানে ১৪৯২ সালে মেনিফেস্টো অফ রেনেসার রচয়িতা ইতালীয় দার্শনিক জিওভান্নি পিকো ডেল্লা মিরানডোলা (১৪৬৩-৯৪) পুস্তকটির সর্বপ্রথম ল্যাটিন অনুবাদ করেন।
উল্লেখ্য, ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের বিকাশ শুরু হয় ১৩ শতকে ইটালির নগর রাষ্ট্র ফ্লোরেন্স থেকে। মূলত রেনেসাঁ এমন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী মহলকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ইটালি থেকে শুরু হয়ে আধুনিক যুগের প্রথম দিকে ১৬ শতকের মাঝে এই আন্দোলন সমস্ত ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলা, সঙ্গীত, রাজনীতি, ধর্মতত্ত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সকল অনুসন্ধিৎসু ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনুভূত হয়।
১৬৫৩ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিশারদÑঅক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এডওয়ার্ড পোকোক জুনিয়র (১৬৪৮-১৭২৭) এবং আরবি ভাষায় একজন সুপ-িত এই উপন্যাসটি সরাসরি আরবি থেকে ‘ফিলসফাস অটোডিডাকটাস’ নামে ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। ১৬৭১ সালে এটি আরবি টেক্সটসহ অক্সফোর্ড হতে প্রকাশিত হয় এবং সমগ্র পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তখন যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশের কাল পুরোদমে চলছিল এবং পুস্তকটি ‘স্বশিক্ষিত দার্শনিক’ উপশিরোনামে ‘টাবুলা রাসা’ বা ‘সাদা সেøটের’ মতো মন অর্থাৎ একটি নিষ্পাপ মনের নিজ ক্ষমতায় ক্রমান্বয়ে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হওয়ার ধারণা প্রকাশ করে। দার্শনিক জন লক এতে আত্মীভূত হন। লন্ডনের একটি সভায় তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে এই অভিনব ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জন লক তার ‘এন এ্যাসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডার স্ট্যান্ডিং’ (১৬৯০) পুস্তকে এই ধারণার কথা প্রকাশ করেছেন। এর পরপরই হাঈ ইবনে ইয়াকজানের তিনটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
ফিলসফাস অটোডিডাকটাস-এর কাহিনী ব্রিটিশ দার্শনিক ও রসায়নবিদ রবার্ট বয়েলকে (১৬২৭-১৬৯১) ‘দি এসপায়ারিং নেচারালিস্ট’ রচনায় অনুপ্রাণিত করে যার পটভূমিও একটি দ্বীপ। পরবর্তীকালে সুইস দার্শনিক ও লেখক জাঁ-জ্যাকুইস রুশো’র (১৭১২-১৭৭৮) ‘এমিল’ (১৭৬২), রুডিয়ার্ড কিপলিং (১৮৬৫-১৯৩৬)-এর জাঙ্গল বুক (১৮৯৪) এবং এডগার রাইস বারোজের(১৮৭৫-১৯৫০) ‘টারজান’ (১৯১২)-এর সাথে এর কাহিনীর অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

সাইমন ওকলের ইংরেজি অনুবাদ, ‘দ্য ইমপ্রুভমেন্ট অফ হিউম্যান রিজন : এগজিবিটেড ইন দ্য লাইফ অফ হাঈ ইবন ইয়াকজান’ প্রকাশিত হওয়ার ১১ বছর পরে ডানিয়েল ডেফো এত্থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম উপন্যাসÑ ‘রবিনসন ক্রুসো’ (১৭০৮) রচনা করেন। এখানেও একটি জনবিরল দ্বীপের বর্ণনা রয়েছে। এর সাথে হাঈ ইবনে ইয়াকজানের ধারাবাহিক মিলের কথা লেখক এন্টনিও প্যাস্টর ‘দি আইডিয়া অফ রবিনসন ক্রুসো’ পুস্তকে (১৯৩০) বর্ণনা করেছেন। বিখ্যাত এই ক্লাসিক উপন্যাসে ইবনে তোফায়েলের পদচিহ্ন সহজেই শনাক্ত হয়েছে।
দর্শনভিত্তিক এই পুস্তকটি মধ্য যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত মুসলিম ও খ্রিস্টীয় উভয় জগতকে প্রভাবিত করেছে তা বলাই বাহুল্য। ১৯৪৮ সালে খাজা আব্দুল হামিদ তাঁর রচিত ‘দি ফিলসফিক্যাল সিগনিফিকেন্স অফ ইবনে তোফায়েল’স হাঈ ইবনে ইয়াকজান’ পুস্তকে লিখেছেন : “পরিশেষে এটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই রূপক বর্ণনাটি মধ্যযুগের মুসলিম ও খ্রিস্টীয় উভয় জগতেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে। জার্মান দার্শনিক লিবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬) ও ডাচ-ইহুদি দার্শনিক স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭) উভয়েই এর দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হন। স্পিনোজার উৎসাহে এর সফল ডাচ অনুবাদ (বাউমিস্টার, আম্সটার্ডামÑ ১৬৭২) এবং লিবনিজের কারণে দুটি জার্মান অনুবাদ হয়। ইউরোপীয় দর্শন, মূলত আধ্যাত্মিক ধারণা সম্পর্কে প্রাথমিক পরিচিতি এখান থেকে লাভ করে। এসব ধারণার মাঝে নিহিত কারণেই প্রধানত লক, বার্কলে এবং হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের (ঊসঢ়রৎরপরংস) পতন ঘটে। সুতরাং ইবনে তোফায়েলের এই পুস্তকটি তৎকালীন ইসলামী বিশ্বে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দার্শনিকচিন্তার কেবল একটি রূপক বর্ণনাই নয়, এটি পরবর্তীতে ইউরোপীয় দর্শনে একটি নবযুগ সূচনার অগ্রদূত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এদিক দিয়ে দর্শনের ইতিহাসে ইবনে তোফায়েলের অবস্থান অদ্বিতীয়।
বেলজিয়ান রসায়নবিদ ও ঐতিহাসিক প্রয়াত জর্জ সার্টন (১৮৮৪-১৯৫৬) হাঈ ইবনে ইয়াকজানকে ‘মধ্য যুগের অন্যতম মৌলিক পুস্তক হিসেবে অভিহিত করেন।’ তিনি তাঁর রচিত বিশাল পুস্তক ‘ইন্ট্রুডাকশন টু দি হিস্ট্রি অফ সায়েন্স’ এ মুসলিম প-িত এবং তাদের কীর্তিকলাপ নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা কালক্রমে ইউরোপীয় সভ্যতা বিকাশে সহায়ক ছিল। বিশিষ্ট প-িতদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তিনি ইবনে সিনা (মৃ. ১০৩৭), ইবন বাজাহ (১১০৬-১১৩৮), ইবন রুশদ্ (১১২৬-১১৯৮) এবং আরও অনেক প-িত ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেন। তিনি ইবনে তোফায়েলের (১১১০-১১৮৬) নাম উল্লেখ করে, তাঁর রচিত মৌলিক দর্শনভিত্তিক রম্যোপোন্যাস হাঈ ইবনে ইয়াকজানের প্রশংসা করেন।
একটি দর্শনভিত্তিক উপন্যাস হিসেবে হাঈ ইবনে ইয়াকজানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্যতম হলোÑব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে কিছু প্রশ্নের উত্তরÑ ‘ আমি কে?’ ‘আমি কি?’ ‘আত্মা কি?’ ‘মানুষ কি দেহ?’ ‘দেহ কি একই রূপে থাকে না পরিবর্তিত হয়?’ ‘স্মরণ শক্তির বৈশিষ্ট্য কি?’ ‘এগুলো কি সত্যি না আবিষ্কৃত?’ ‘কি করে একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে?’ ‘নিজের সম্পর্কে মানুষ কি দেখে বা ভাবে?’ ‘অন্যরা আমাদের কি ভাবে দেখে?’
এই উপন্যাসে ইবনে তোফায়েল অভিমত প্রকাশ করেছেন, একজন মানুষের পরিচিতি গঠন করা কিংবা তার সুখ অর্জনের জন্যÑ জন্ম পরিচয়, পরিবার, রক্তের সম্পর্ক, নাম, ভাষা, ইতিহাস এবং ধর্ম মোটেই জরুরী উপকরণ নয়। ইবনে তোফায়েলের মতে, একজন মানুষ তার কা-জ্ঞানের যথার্থ ব্যবহার ও অন্তরের আলোর মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিচিতি গঠিন করতে পারে। দৈহিক মানদ- এখানে বাতিল করা হয়েছে, কেননা শেষাবধি দেহের বিনাশ হয়, অথচ সত্তা বা আত্মপ্রকৃতি পরিপূর্ণতার দিকে ধাবিত হতে সচেষ্ট থাকে এবং এক-এর প্রতি উপরে উঠতে থাকে, যা চিরন্তন। একজন মানুষকে অন্য মানুষ থেকে যা আলাদা করে তা কারণ নয়, কেননা জন্মসূত্রে আমরা সবাই একই কারণের অধিকারী, কিন্তু এই কারণ থেকে আমরা কি পেয়েছি? অনেকেই এই স্বাভাবিক গুণটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে অক্ষম এবং তারা নিজেদের সম্পর্কে চিন্তা করে না। তবে বিভিন্ন ধরনের স্বাধীন ও উচ্চতর জ্ঞান যারা অর্জন করেছেন, সেরকম আলোকপ্রাপ্ত মানুষেরা ইচ্ছা করলে সেইসব মানুষদের সচেতন করে তুলতে পারেন যারা কারণকে কাজে লাগায়নি, তবে তাদের কোন প্রকার ক্ষতি করে নয়। জ্ঞানীজনকে বুঝতে হবে সাধাণ মানুষ বিভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং পরম সত্য খুঁজতে তারা ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। এটি সত্য যে মানুষ, পশু এবং উদ্ভিদের মাঝে কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। কিন্তু এই বিশ্ব জগত পরিপূর্ণ হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতি নিয়ে। ইবনে তোফায়েল আমাদের প্রতি আবেদন করেছেন এইসব ভিন্নতাকে সম্মান জানাতে। তিনি আরো সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, কেউ দাবি করতে পারে না যে, তার সত্যই একমাত্র সত্য এবং তার পথই একমাত্র সঠিক পথ। তিনি মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে সমান ও শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের পক্ষে জোর সমর্থন জানিয়েছেন, মানুষে মানুষে এবং মানুষ ও তার স্রষ্টার মাঝে। ব্যক্তিগতভাবে ও সামাজিকভাবে মানুষ তাদের পরিচিতি সীমাবদ্ধ করেছে তাদের পরিবার, ইতিহাস, ধর্ম এবং ভাষার মাঝে। তাদের সাহিত্যে তারা চেনা-অচেনা ধারণার বিশদ বিবরণ দেন এবং অন্যান্য যারা তাদের সাথে নৃতাত্তিক, ভাষাগত কিংবা ধর্মীয় পটভূমির সাথে মিলে না তাদের বাদ দেয়ার প্রয়াস পান। পক্ষান্তরে ইবনে তোফায়েল সেইসব ধারণা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা পরিশেষে বর্জন, অসহিষ্ণুতা এবং ধমীর্য় গোড়ামির দিকে অগ্রসর হয়। এই উপন্যাসের নায়ক হাঈ ইবনে ইয়াকজানকে একটি কাল্পনিক জগতের বিশ্বজনীন আদর্শ ব্যক্তি মনে করা যেতে পারে, যে তার ব্যক্তিগত পরিচিতি গঠনের জন্য আবশ্যিক তথ্য হিসেবে নাম, পারিবারিক ইতিহাস, ধর্ম এবং ভাষাকে বাদ দিয়েছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, হাঈ ইবনে ইয়াকজান পুস্তকটি মধ্য যুগে রাজনৈতিক দর্শনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত যাতে এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে, এক ও বহুর মাঝে কোন ধরনের বিবাদ নেই। ব্যক্তি পরিচিতি একই রকম বা ভিন্ন ধরনের হতে পারে আর ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষের পক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে সহঅবস্থান সম্ভব এবং কিংবা নিজ মর্জিমাফিক আলাদাভাবেও অবস্থান করতে পারে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইবনে তোফায়েল একটি বহুজন সমাজ ব্যবস্থার (ঢ়ষঁৎধষরংঃরপ ংড়পরবঃু) জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সময়কালীন স্বর্ণালী যুগে যে রকম সমাজ ব্যবস্থা ছিলÑ যেখানে আরব, বার্বার, স্পেনীয়, অন্যান্য ইউরোপীয়, মুসলিম খ্রিস্টান, ইহুদি এবং নাস্তিকগণ পাশাপাশি কিংবা আলাদা আলাদাভাবে মুসলিম স্পেনে বসবাস করতেন। সমাজ ব্যবস্থার এই মডেলটি শুধু যে ইউরোপীয় রেনেসাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে তাই নয়, এটি সেই সাথে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষত যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশের যুগের চিন্তাবিদদেরও প্রভাবিত করে, যারা সাম্যাবস্থা, স্বাধীনতা এবং সহিষ্ণুতার প্রবক্তা ছিলেন।
এখানে একটি কথা বলা যেতে পারে যে, ইবনে তোফায়েল তাঁর উপন্যাসে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বিশদ কিছু বলেন নি। কেননা যখন তিনি এই পুস্তক রচনা করেন তখন সব ধরনের সহিষ্ণুতার অবসান ঘটেছিল এবং তৎকালীন সমাজে যুক্তিহীন ও গোঁড়ামি চরমে পৌঁছেছিল। সেজন্যই তিনি দর্শনভিত্তিক প্রতিকাশ্রয়ী রূপ গ্রহণ করেন, যদিও তিনি পাঠকের জন্য যথেষ্ট দিকদর্শন রেখে যান তৎকালীন বিপজ্জনক পরিস্থিতি বোঝার জন্য। একজন বন্ধুর উদ্দেশে লিখিত চিঠিতে, যা এই পুস্তকের ভূমিকাস্বরূপ কাজ করেছে, তিনি সত্য অন্বেষণে দুটি ভিন্নœ পদ্ধতির কথা বলেছেন- একটি যুক্তিনির্ভর ও অন্যটি অন্তর্জ্ঞান। কিন্তু তিনি উল্লেখ করেন ইশরাক বা আলোকপ্রাপ্তির গুপ্ত রহস্য কিংবা বিভিন্ন মাত্রা, যার দ্বারা একজন মানুষ সত্য অবলোকন করতে পারে কিংবা বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়, তার সঠিক বর্ণনা করা বা বুঝিয়ে বলা দুঃসাধ্য। এই অভিজ্ঞতা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে না বলার একটি কারণ তিনি জানিয়েছেন তৎকালীন আন্দালুসিয়ার বিরাজমান অবস্থা এবং যে ধরনের ধর্মীয় ব্যবস্থা সেখানে অনুসরণ করা হতো তার কারণে। তিনি তাঁর বন্ধুকে বিভিন্ন ধাঁধা ও প্রতীকের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। হাঈ ইবনে ইয়াকজানের কাহিনীর মমার্থ অনুধাবন করা না করা এখন তাঁর বন্ধুর উপর নির্ভর করে।
উল্লেখ্য যে, ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে উসমানিয়া তুরস্কের হাতে কন্সটান্টিনোপলের পতনের পর অনেক গ্রিক পণ্ডিত প্রাচীন গ্রিকের মূল্যবান পাণ্ডুলিপি নিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশে অভিবাসী হন এবং মূল্যবান অনেক পাণ্ডুলিপি কালের অতলে হারিয়ে যায়।
আবার ১২ শতকের ল্যাটিন পণ্ডিতেরা অধিকাংশ গ্রিক ও আরবি ভাষায় লিখিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, দর্শন এবং গণিত নিয়ে পড়াশুনা করতেন।
১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দে পিকো ডেল্লা মিরানডোলা রচনা করেন ‘অরেশন অন দি ডিগনিটি অফ ম্যান।’ এটি ছিল যে কোন কারণ নির্ভর বিরুদ্ধবাদীর বিপরীতে দর্শন, স্বাভাবিক ভাবনা, বিশ্বাস ও জাদুবিদ্যার উপর রচিত কতগুলো থিসিস। ১৫ শতকের প্রথম দিকে পশ্চিমা পণ্ডিতগণ ল্যাটিন ভাষার সাহিত্যকর্ম উদ্ধারের পর নজর দেন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় রচনার উদ্ধারে। সে সময়ে প্রাচীন গ্রিক দর্শন, গণিত এবং বিজ্ঞান সম্পর্কীয় রচনাসমূহ ইসলামী জগতে পণ্ডিতেরা আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন।
হাঈ ইবনে ইয়াকজান আরবি, ফারসি ও পশ্চিমা সাহিত্যে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে এবং ১৭ থেকে ১৮ শতকব্যাপী সমগ্র পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে একটি বেস্ট সেলারে পরিণত হয়। উপন্যাসটি চিরায়ত ইসলামী দর্শন এবং আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৮ শতকে ইউরোপীয় রেনেসাঁর বিকাশে উপন্যাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে যেসব ধারণা প্রকাশিত হয়েছে, তা নানাভাবে ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯), দার্শনিক ও পদার্থবিদ জন লক (১৬৩২-১৭০৪), বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৬) এবং জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ( ১৭২৪-১৮০৪) রচনায় দেখতে পাওয়া যায়।
হাঈয়ের বস্তুবাদ সম্পর্কিত ধারণার সাথে কার্ল মাকর্সের (১৮১৮-৮৩) ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য ইউরোপীয় লেখক, যারা ফিলসফাস অটোডিডাকটাস দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম : জার্মান গণিতবিদ ও দার্শনিক গটফ্রিড লিবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬), ফরাসি বিজ্ঞানী মেলশিসেডেক টেভেনট্, ইংরেজ গণিতজ্ঞ জন ওয়েলস (১৮৭৩-১৯৪৩), ওলন্দাজ গণিতবিদ ক্রিস্টিয়ান হাউজেনস (১৬২৯-১৬৯৫),স্কটিশ মিসনারি রবার্ট বার্কলে, জার্মান গণিতবিদ সেমুয়েল হার্টলিব (১৬০০-১৬৬২) এবং ফরাসি দার্শনিক ভলটেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮)।
দুর্ভাগ্যবশত হাঈ ইবনে ইয়াকজানকে নিয়ে আরবিতে গুটিকয়েকমাত্র পুস্তক রচনা করা হয়েছে এবং তার মাঝে কোন পদার্থবিদ, জ্যোর্তিবিদ, গণিতজ্ঞ কিংবা প্রকৃতি বিজ্ঞানী ছিলেন না। বেশিরভাগ গবেষণা হয়েছে দার্শনিক কিংবা ঐতিহাসিকদের দ্বারা। এমনকি তারাও ভাসা ভাসা দেখেছেন, কেউ এই গুরুত্বপূর্ণ পুস্তকটিকে পৃথিবীর দর্শনের মূল স্রোতে কিংবা বৃদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে স্থান করে দিতে সক্ষম হননি। তবে এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন লাইব্রেরিতে প্রাচীন আরবি পা-লিপি ছড়িয়ে আছে এবং প্রতীক্ষায় আছে প-িতব্যক্তিদের দ্বারা এগুলোর সম্পাদনা ও টীকাসহ প্রকাশের অপেক্ষায়। আবার অনেক পা-ুলিপি হারিয়ে গেছে। হয়তো সেখান থেকে এই মনীষীর আরো কিছু মূল্যবান রচনা আবিষ্কৃত হতে পারে।
সূত্র : ‘দি ভাইটাল রুটস অফ ইউরোপিয়ান এনলাইটেনমেন্ট : ইবনে তোফায়েল’স ইনফুয়েন্স অন ওয়েস্টার্ন থট’, অধ্যাপক সামার আতার, লেক্সিন্টন বুকস, ২০১০. ‘দি ডেজার্ট স্ক্রিপ্টস, দি গার্ডিয়ান, ২২ মার্চ ২০০০, সম্পাদক মার্টিন ওয়েনরাইট।

No comments:

Post a Comment