Thursday, July 17, 2014

নিরাপত্তাহীনতায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা

নিরাপত্তাহীনতায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা
শাহ আকবর আহমেদ
নারী আজ সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। নারী আজ শুধু শিক্ষা নয়, সমাজের প্রতিটি কাজে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই দেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর সমান অংশগ্রহণ থাকা উচিত। এমনকি কৃষিতেও নারীদের ভূমিকা ব্যাপক। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও নারীদের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতে হয়। 
গার্মেন্ট শিল্পের প্রতি চোখ বুলালে দেখা যাবে এই খাত থেকে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে এবং এখানে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৮০ ভাগের বেশি। এ ছাড়া আবাসন ক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ কৃষি কাজে নারীর রয়েছে সক্রিয় অংশগ্রহণ। আবার গার্মেন্টস শ্রমিকের ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিকই বলছে তাদের কারখানায় যথাযথ নিরাপত্তা নেই। আবার বেশিরভাগই মনে করে তাদের নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তাও নেই। তাদের মনে ভয় থাকে যে, যে কোন সময় তারা কাজ হারাতে পারেন। যে সমাজে নারী-পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে সেখানে নারী-পুরুষের এই ধরনের বৈষম্য কোনমতেই কাম্য নয়। পোশাক কারখানার যে কোন দুর্ঘটনায় নারী শ্রমিকরাই প্রাণ হারায় বেশি। কারখানার অবকাঠামো সঠিকভাবে গড়ে না ওঠা, দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের জরুরী বহিঃগমন পথ না থাকা, দুর্ঘটনার সময় নারী শ্রমিকরা আতঙ্কিত না হয়ে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে সে বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকা, কিছু গার্মেন্টসের ছোট কুঠরিতে অধিক সংখ্যক নারী শ্রমিকের কর্মকালীন অবস্থান ইত্যাদি বহুবিধ কারণে নারী শ্রমিকদের জীবন আজ ঝুঁকির মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের নারী রাজনীতি, শিক্ষা, আইন, ব্যাংকিং, প্রতিরক্ষা, বিমান চালনা, ট্রেন চালনা, কর্পোরেট, সাহিত্য রচনা-সাংবাদিকতা, চলচ্চিত্র-নাটক নির্মাণ, শিল্পকলাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে দেশকে একটি গতিশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করছে। যেটা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) সাম্প্রতিক এক জরিপে বলছে, গত বছর বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও নৃশংসতার শিকার হয়ে করুণ মৃত্যু হয়েছে ৫৪৭ জনের ও মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে ৭১৩ জন শ্রমিক। এদিকে বিজিএমইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী রানা প্লাজার বিল্ডিং ধসে নিহতের সংখ্যা ১১৩৩ জন। এর মধ্যে ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছে ১১১৫ জন। বাকি ১৮ জন মারা গেছে হাসপাতালে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ করা হয় নারী শ্রমিককে। এর সংখ্যাও নিহায়ত কম নয়। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী নিম্ন মজুরি, পুরুষ সহকর্মী দ্বারা যৌন হয়রানি এবং পারিবারিকভাবেও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় এসব পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকেরা। শুধু ধর্ষণই নয়, এর সঙ্গে আছে নারী অপহরণ, আত্মহত্যা, শারীরিক নির্যাতনের মতোও ঘটনা। বিলস এক জরিপে বলছে, সম্প্রতি অপহরণ হয়েছে ৪২৬ জন, আত্মহত্যা করেছে ৯ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৮ জন ও এসিডে ঝলছে গেছে ৩ শ্রমিকের মুখ। এর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে নির্মাণ সেক্টরে। এর পরই রয়েছে মৎস্য সেক্টরে, ধান মাড়াই কারখানা, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প, বিদ্যুত ও পরিচ্ছন্ন ক্ষেত্রে। বিভিন্ন দাবিদাওয়া পূরণে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে এমন শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। বিলস একই জরিপে বলছে, গত বছর আন্দোলন করার অপরাধে রাস্তায় কিংবা ফ্যাক্টরির সামনে পুলিশের প্রহারের শিকার হয়েছে ২ হাজার ৩৯৫ জন। ১৪ হাজার ১শ’ শ্রমিকের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিয়েছে মালিকপক্ষ। ৯৬ শ্রমিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও চাকরি হারিয়েছে ৩৩৭ জন। এছাড়া গত বছরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বেড়িবাঁধের পাশে স্মার্ট এক্সপোর্ট লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাত নারী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। কেন এই মৃত্যু হলো? এর জন্য অনেক শ্রমিক অভিযোগ করেছিল যে জরুরী বহির্গমন সিঁড়ির ফটকে তালা লাগানো থাকায় তারা বের হতে সক্ষম হননি। চিকিৎসকের অভিমতও ছিল এমন যে ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়ে শ্রমিকেরা শ্বাসরোধে মারা গেছেন। 
এমস্টামভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে যে, কেবলমাত্র ২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দেশের গার্মেন্টসগুলোতে আগুনে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০০ জন। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ১০০ জন শ্রমিক আগুনে পুড়েই মারা যায়। ২০১০ সালে আশুলিয়াতেই হামিম গার্মেন্টসে অগ্নিকা-ে নিহত হয় ২৬ জন। ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে এক গার্মেন্টসে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল ৫৪ জন। তেজগাঁওয়ে অবৈধভাবে সংস্কার চালানোর সময়ে ফিনিক্স ভবন ধসে মারা গিয়েছিল ১৮ জন শ্রমিক। সাভারের ঘটনার কারণ ছিল অবৈধভাবে অনুমোদিত নক্সার উপরেও দুই তলা অতিরিক্ত বাড়ানো। আবার অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সেবা নিয়েও রয়েছে নানা ধরনের অভিযোগ। এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৬ শতাংশ নারী শ্রমিকই ভাগাভাগি করে টয়লেট, রান্নাঘর ব্যবহার করে। আবার প্রতি ৬৫ জনে একটি চুলা এবং গড়ে সাড়ে তিন জন একটি রুমে থাকে। এ থেকেই বোঝা যায় নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা কতটা মারাত্মক আর ঝুঁকির মধ্যে। আবার অনেকেই বলছেন গার্মেন্ট কারখানায় এখনও শিশু শ্রমিক রয়েছে। 
বাংলাদেশের গার্মেন্টস ব্যবসায় তেমন লোকসান না থাকলেও এ দেশে নিবন্ধিত ৫ হাজার ৫০০ গার্মেন্ট কারখানা এবং এদের শ্রমিকদের ভবিষ্যত এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment