Thursday, July 17, 2014

নাদিন গর্ডিমার মহান মানবতাবাদী লেখক

নাদিন গর্ডিমার মহান মানবতাবাদী লেখক
নাজিব ওয়াদুদ
স্বদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের রূপকার হয়েও যে দেশ ও কালকে অতিক্রম করা যায় তার গুটিকয়েক উদাহরণের মধ্যে নাদিন গর্ডিমার অন্যতম। তিনি তাঁর কালের, তাঁর দেশের বর্ণবাদী বৈষম্য এবং অরাজক রাজনীতি ও সামাজিক অস্থিরতাকে তাঁর প্রায় সকল গল্প-উপন্যাসের বিষয় করেছেন, কিন্তু তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শৈল্পিক দক্ষতা তাঁকে দেশ-কাল অতিক্রম করতে সক্ষম করেছে, সঙ্কীর্ণ স্বাদেশিকতা বা জাতীয়তাবাদিতা, কিংবা সমকালীনতা বা বিষয়ানুগতা তাঁকে নিজ দেশ ও কালের খাঁচায় আবদ্ধ করে ফেলতে পারেনি। নাদিন গর্ডিমার বর্ণবাদ, বৈষম্য ও চরমপন্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁর দেশের বর্ণবাদ থেকে টালমাটাল গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রার ইতিহাস লিখেছেন আখ্যানের আবরণে, কিন্তু সেটা হয়ে উঠেছে সকল মানুষের গল্প, সকল দেশের ইতিহাস, সকল কালের অভিজ্ঞান। সেখানেই একইসঙ্গে একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী এবং কথাশিল্পী হিসেবে তাঁর সাফল্য। ১৯৯১ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দিতে গিয়ে বলা হয়, ‘প্রামাণিকতা এবং মানবিক প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে পাঠকের মধ্যে শক্তি সঞ্চারের মাধ্যমে তিনি বর্ণবাদী বৈষম্যের দুনিয়ায় চূড়ান্ত রকম জটিল এবং প্রকাশ্য অমানবিক জীবনযাপনকে দৃশ্যমান করেন। তিনি রাজনৈতিক দায় বোধ করেন এবং তার পরিণামকে এড়িয়ে যান না, কিন্তু একজন লেখক হিসেবে তাঁকে প্রভাবিত হতে দেন না : তাঁর কথাবস্তু আন্দোলন উসকে দেয় না, খোঁচা দেয় না, তার পরেও, তাঁর রচনা এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি বাস্তবতাকে আকৃত করে।’
নাদিন গর্ডিমার দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক, সেখানকার ভূমিজ সন্তান তিনি, যদিও তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন সেদেশে অভিবাসী। তাঁর জন্ম ১৯২৩ সালের ২০ নবেম্বর, দক্ষিণ আফ্রিকায়, জোহানেসবার্গ থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরের স্বর্ণখনি এলাকা ট্রান্সভালের স্প্রিংসে। তাঁর পিতা ইসিডোর গর্ডিমার ছিলেন তৎকালীন জার শাসিত রাশিয়ার লাটভিয়ার অধিবাসী। ইহুদী হওয়ার কারণে সেখানে তাঁরা ছিলেন নানাভাবে বঞ্চিত ও নিগৃহীত। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, তখন ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণবাদের স্বর্ণযুগ, ইউরোপের লোকরা দলে দলে ছুটে চলেছে আমেরিকা ও আফ্রিকায়। সৌভাগ্যের সন্ধানে ইসিডোর গর্ডিমার পাড়ি জমান দক্ষিণ আফ্রিকায়। তিনি সেখানে স্প্রিংসে সোনার খনি এলাকায় ঘড়ি মেরামতের দোকান দেন। অন্যদিকে তাঁর মা হান্না নান আফ্রিকায় যান লন্ডন থেকে। তিনিও ইহুদী বংশোদ্ভূত। নাদিন গর্ডিমারের পিতামাতা উভয়েই ইহুদী ঘরানার মানুষ হলেও জীবনযাপনে ছিলেন পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ। পরিবারের এই নৈতিক ও দার্শনিক পরিবেশ ও দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর জীবনবোধ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় তিন ধরনের নাগরিক মর্যাদা চালু ছিল। প্রথম দিককার বসতিস্থাপনকারী শ্বেতাঙ্গরা ভোগ করত প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা। দ্বিতীয় পর্যায়ের শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীরা ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। আর ভূমিজ সন্তান কৃষ্ণাঙ্গদের বলতে গেলে ছিল না কোন নাগরিক অধিকার, বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণে তারা যাপন করত মানবেতর জীবন। ইসিডোর গর্ডিমার ছিলেন, নাদিন গর্ডিমারের নিজ ভাষায়, ‘ব্যক্তিত্বহীন, পোষ মানা স্বভাবের মানুষ’, তিনি বর্ণবাদী বৈষম্যকে ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নান ছিলেন প্রতিবাদী মহিলা। তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ শাসকদের নিপীড়ন ও বৈষম্যকে মেনে নিতে পারেননি। সেজন্য তিনি কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের শিশুসন্তানদের জন্য শহরে একটা ডে-কেয়ার সেন্টার খোলেন। সেখানে তাঁর সহকারী ছিলেন এক কৃষ্ণাঙ্গী মহিলা। একবার পুলিশ সেখানে হামলা চালায়। নাদিন গর্ডিমার তখন কিশোরী, নিজ চোখে দেখা এই নিপীড়ন তাঁকে বর্ণবাদবিরোধী হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর রাজনৈতিক এবং লেখক জীবন মূলত এই বর্ণবাদী বৈষম্যকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
নাদিন গর্ডিমারের পিতা-মাতার দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। তাঁর মা সেজন্য নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন তাঁর সন্তানদের লালন-পালনের কাজে। নাদিন গর্ডিমার প্রাথমিক শিক্ষা নেন একটি শ্বেতাঙ্গ কনভেন্ট স্কুলে। এ সময় তিনি নাচ শিখতে শুরু করেন। নাচের প্রতি তাঁর অনুরাগ এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি বড় হয়ে নৃত্যশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ১০ বছর বয়সে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এতে তাঁর মা এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে তিনি তাঁকে আর স্কুলে পাঠাননি, বাড়িতেই তাঁর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন। তাঁর নৃত্যশিল্পী হওয়ার স্বপ্নেরও অপমৃত্যু ঘটে। এ নিয়ে সারাজীবন তাঁর আফসোস ছিল। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, এই গৃহবন্দী জীবন তাঁকে একদিকে যেমন স্বাভাবিক শৈশবিক সামাজিকতা থেকে বঞ্চিত করে, তেমনই, অন্যদিকে, তাঁকে সুযোগ করে দেয় স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠার। তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেন। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তাঁর সমবয়সীদের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হন, তাঁর ওঠা-বসা চলে তাঁর মায়ের বয়সী মানুষদের সঙ্গে। এর ফল এই হয় যে, তিনি হয়ে ওঠেন অন্তর্মুখী, চিন্তাশীল ও কল্পনাপ্রবণ। তবে, প্রকারান্তরে, এটাই তাঁকে সৃজনশীল লেখক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। তাঁর প্রথম রচনা, একটি শিশুতোষ ছোটগল্প, প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে। গল্পটির নাম ‘দ্য কোয়েস্ট অপর সিন গোল্ড’, প্রকাশিত হয় ‘চিলড্রেন্স সানডে এক্সপ্রেসে। প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হয় আরেকটি শিশুতোষ গল্প ‘কাম এগেইন টুমরো।’ তাঁর বড়দের উপযোগী প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় পরের বছর, ১৬ বছর বয়সে। তিনি ব্যাপকভাবে ইউরোপীয় সাহিত্য পাঠ করেন। প্রুস্ত, চেকভ এবং দস্তয়েভস্কি ছিলেন তাঁর প্রিয় লেখক। এঁদের লেখা তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।
নাদিন গর্ডিমার পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য উইটওয়াটার্সর‌্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। এই কোর্সটা ছিল বয়স্কদের জন্য, যারা সময় মতো লেখাপড়া করতে পারেননি। এখানে অনেক লেখক ও পেশাজীবীর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয় তাঁর, ভাব গড়ে ওঠে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের সঙ্গে। জোহান্সেবার্গের উপকণ্ঠ সোফিয়াটাউনে তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ লেখক-শিল্পীরা একত্রিত হতেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু লেখাপড়া অসম্পূর্ণ রেখে তিনি জোহান্সেবার্গে চলে যান। সেটা ১৯৪৮ সাল। তার পর থেকে তিনি সেখানেই বসবাস করতে শুরু করেন। ওই বছর শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসীন হয় এবং বর্ণবাদের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিভক্ত করার উদ্যোগ নেয়। কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত সোফিয়াটাউন এবং আশপাশের এলাকাগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয় এবং কৃষ্ণাঙ্গদের উচ্ছেদ করে শ্বেতাঙ্গদের বসতি স্থাপন করা হয়।
জোহান্সেবার্গে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক নেতা বেটি দু টয়েটের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এই কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতিকের চিন্তাধারা ও কর্মকা- তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে, এতদিন যাবৎ দেখে আসা বর্ণবাদী বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর মধ্যে যে বর্ণবাদবিরোধী মানবিক বোধ তৈরি করেছিল তা তাঁর এই বন্ধুর সাহচর্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও জন্ম দেয়। তিনি শ্বেতাঙ্গ নিয়ন্ত্রিত বর্ণবাদী শাসন, নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে ক্রমশ অধিকতর সক্রিয় হয়ে ওঠেন। একইসঙ্গে তিনি লেখালেখির কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ ছোটগল্পের সঙ্কলন ‘ফেস টু ফেস।’ ১৯৫১ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কারে তাঁর একটি ছোটগল্প ‘এ ওয়াচার অফ দি ডেড’ প্রকাশিত হয় এক এজেন্টের মাধ্যমে। তার পর থেকে নিউইয়র্কারের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সুসম্পর্ক তৈরি হয়। একের পর এক তাঁর গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিউইয়র্কার ছাড়াও, ভার্জিনিয়ার কোয়র্টার্লি রিভিয়্যু, দ্য ইয়েল রিভিয়্যু প্রভৃতি নামকরা পত্রিকায়। এভাবে তিনি দ্রুত আমেরিকা ও ইউরোপে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
নাদিন গর্ডিমার চঞ্চলমতি মানুষ ছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত, উদারনৈতিক পরিবেশের মধ্যে নিজেকে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। সামাজিক ক্ষেত্রের এই সীমাবদ্ধতা তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টির শক্তি এবং দুর্বলতা উভয়ের জন্যই দায়ী। দক্ষিণ আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গদের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্র্নীতি যে তাঁর প্রায় সকল রচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে তার কারণও সেটাই।
তাঁর প্রথম বিয়ে হয় জনৈক দন্ত চিকিৎসক জেরাল্ড গ্যাভ্রনস্কির সঙ্গে। তাঁদের এক কন্যাসন্তান হয়। কিন্তু বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায়, ১৯৫২ সালে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৫১ সালে আমেরিকায় তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল গল্পগ্রন্থ ‘দ্য সফট ভয়েস অফ দ্য সারপেন্ট’। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য লায়িং ডেজ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। তাঁর এই উপন্যাসের নায়িকা এক শ্বেতাঙ্গ মহিলা হেলেন শ, সে বর্ণবাদী গোঁড়ামির বিরোধী, কিন্তু তার সামনেই যখন বর্ণবাদী দাঙ্গা বাধে তখন সে তার গাড়ির মধ্যে নির্বিকার বসে থাকে। মানুষের মধ্যকার এই স্ববিরোধী চরিত্র তাঁর পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেও দৃশ্যমান।
১৯৫৪ সালে তিনি পুনরায় বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী রাইনহোল্ড ক্যাসিরার ছিলেন একজন শিল্প ব্যবসায়ী। তিনি নাজি শাসনের শিকার হয়ে জার্মানি থেকে পালিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছিলেন। তিনি নাদিন গর্ডিমারের কৃষ্ণাঙ্গপন্থী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকা-ের সমর্থক ছিলেন। শীঘ্রই তিনি কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক সংগঠন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (এএনসি) যোগ দেন। দলের প্রধান নেলসন ম্যান্ডেলা তখন কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন।
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘এ ওয়ার্ল্ড অফ স্ট্রেঞ্জার্স’, যার মূল চরিত্র পরিকল্পিত হয় তাঁর ইংলিশ প্রকাশক অ্যান্থনি স্যাম্পসনের জীবনকে সামনে রেখে। এই স্যাম্পসন ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত ‘ড্রাম’ ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। তাঁর মাধ্যমেই গর্ডিমারের পরিচয় হয় প্রধান প্রধান কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের সঙ্গে। এঁদের মধ্যে ছিলেন ক্যান থাম্বা, ব্লক মডিসেন এবং নেলসন ম্যান্ডেলা। ম্যান্ডেলার সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁর জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কয়েক দশক পরে, কারাগার থেকে মুক্তিলাভ এবং উইনি ম্যান্ডেলার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর, গর্ডিমারকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। পঞ্চাশের দশকে এএনসি ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে তার পরিচয়ের প্রাথমিক ফল হিসেবে তাঁর লেখা এবং চিন্তা চরমপন্থী হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁর চিন্তা তাঁর লেখার অগ্রগামী হয়েছে। একথা ঠিক যে ‘এ ওয়ার্ল্ড অফ স্ট্রেঞ্জার্স’ প্রচুর সামাজিক সমস্যা নিয়ে রচিত, কিন্তু তার সমাধান উপস্থাপিত হয়েছে সরল ও আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে।
প্রকৃত ঘটনাবলীর গভীর ব্যঞ্জনা শীঘ্রই তাঁর ঔপন্যাসিক উপস্থাপনায় অধিকতর জায়গা করে নিতে থাকে। ১৯৬০ সালে শার্পিভিলি ম্যাসাকার এবং জরুরী অবস্থা জারির পর তিনি এএনসির অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। কিন্তু তাঁর জগত ভেঙ্গে পড়ছিল। ‘সেটা এক সাংঘাতিক সময় গেছে,’ পরে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ‘তখন প্রায় সকলেই হয় জেলে, না হয় পলাতক।’ তিনি অকস্মাৎ নৈসঙ্গতার কবলে পতিত হন। এ অবস্থায়, ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘অকেশন ফর লাভিং।’ এই উপন্যাসে, প্রথম দুটির মতোই, সামাজিক ব্যর্থতার অনুধাবন বিষয়ে যুক্তিগ্রাহ্য উপসংহার টানা হয়। এতে, ‘দ্য লায়িং ডেজ’-এর হেলেন শ-এর মতো জেসি স্টিলওয়েল একই প্রধান চরিত্র, কিন্তু এখন অধিকতর বয়স্কা এবং সন্তানসমেত বিবাহিত। তার জগত ওলটপালট হয়ে যায় যখন তার বাড়িতে অসবর্ণ প্রেমের ঘটনা ঘটে। জেসি ব্যাপারটাকে ¯্রফে এড়িয়ে যেতে চায় এবং আদর্শবাদী উদারনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে।
নাদিন গর্ডিমার প্রায়শই বক্তব্য প্রদান করতে পছন্দ করতেন, বিশেষত সরকারী সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন মুখর। ১৯৬৬ সালে তিনি দুটো নিবন্ধ লেখেন শ্বেতাঙ্গ উদারবাদী নেতা ব্র্যাম ফিশারের গ্রেফতার বিচারের প্রতিবাদ জানিয়ে। এর তের বছর পরে, বিষয়টি আবার উপস্থাপিত হয় যখন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বার্জার্স ডটার’ প্রকাশিত হয়। এতে একটি চরিত্র রয়েছে ফিশারের চরিত্র অবলম্বনে। তবে, সে সময়, এই বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি তাঁর আগ্রহের ফল হিসেবে সৃষ্ট হয় ‘দ্য লেট বুর্জোয়া ওয়ার্ল্ড’ (১৯৬৬)। এতে, তাঁর পূর্ব-প্রকাশিত উপন্যাসগুলোর তুলনায়, প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র অধিকতর ঘনিষ্ঠভাবে উঠে আসে। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘সামাজিক পরিবেশের মধ্যকার বিশিষ্ট চরিত্রকে পর্যবেক্ষণ করার একটা প্রচেষ্টা ছিল এটা।’ এই উপন্যাসে প্রধান চরিত্র বর্ণবাদী সঙ্কীর্ণতার উর্ধে উঠে এক কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধুকে সাহার্য করতে গিয়ে নিজেকে বিপদাপন্ন করতেও পিছপা হয় না। এটিকে সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘এ গেস্ট অফ অনার’-এর পটভ’মি, এই প্রথমবারের মতো, তাঁর স্বদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার বদলে একটি কাল্পনিক কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত স্বাধীন দেশ। এখানে কৃষ্ণাঙ্গদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষকে উপজীব্য করা হয়েছে। নাদিন গর্ডিমার সব সময় নিজেকে একজন আফ্রিকান লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন।
১৯৭৪ সালে তিনি ‘দ্য কনজারভেশনিস্ট’ উপন্যাসের জন্য বুকার প্রাইজ লাভ করেন। এটিকে অনেকেই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ বলে গণ্য করেন। ব্যতিক্রমীভাবে, এই উপন্যাসের মূল চরিত্র এক পুরুষ, সে গোঁড়া বর্ণবাদী, সে কৃষ্ণাঙ্গ উত্তরাধিকারদের কাছ থেকে তাদের জমি কেড়ে নিতে চায়। কিন্তু এই ব্যক্তিগত লড়াইতে সে পরাজিত হয়।
১৯৭৬ সালের ১৬ জুন ১৫ হাজার স্কুলছাত্র আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমে আসে, এটা সোয়েটো বিদ্রোহ আখ্যা পায়। দুটি শিশু মারা যায়। এই ঘটনাকে প্রধান উপজীব্য করে তিনি রচনা করেন ‘বার্জার্স ডটার’ (১৯৭৯)। রোজা বার্জার এক রেডিক্যাল শ্বেতাঙ্গ নেতার মেয়ে, তার পিতা জেলে মারা যায়। পিতার অর্পিত আদর্শ ও কর্তব্যকে সে প্রত্যাখ্যান করে এবং এক ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে জীবনযাপন শুরু করে। ঘটনাক্রমে তাকে সোয়েটো বিদ্রোহে আহতদের চিকিৎসা দিতে হয়। বিদ্রোহীদের সঙ্গে তার যোগসূত্র রয়েছে এই অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ‘আমরা শ্বেতাঙ্গরা... পুরোপুরি দায়ী, তা আমরা শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যকে সমর্থন বা তার বিরোধিতা যাই করি, কারণ আমরা তার অপনোদন করতে পারি না,’ নাদিন গর্ডিমার লেখেন, আর ‘দ্য বার্জার্স ডটার’ও নিষিদ্ধ হয়।
এই নিপীড়ন সত্ত্বেও তিনি কখনও প্রবাস জীবনের প্রতি প্রলুব্ধ হননি, তা এই বিশ্বাসে যে, ভেতরে থেকেই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাঁর সাহিত্যিক দায়িত্ব। অবশ্য তিনি প্রবাসের বিরোধী নন, সেটা প্রকাশ পেয়েছে ‘জুলিজ পিপল’-এ (১৯৮১)। গৃহযুদ্ধ থেকে রেহাই পেতে পালিয়ে যাওয়া এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসটি রচিত। এটা তাঁর একমাত্র উপন্যাস যার পটভূমি ভবিষ্যতের দক্ষিণ আফ্রিকা। এটা তাঁর সবচেয়ে দুঃখবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।
‘এ স্পোর্ট অফ ন্যাচার’ (১৯৮৭) খুব একটা সফল উপন্যাস নয়, যদিও এটি শেষ হয়েছে তাঁর দেশের বর্ণবাদী যুগ থেকে স্বাধীনতার যুগে উত্তরণের চিত্র দিয়ে। পরে, ১৯৯০ সালে, যে তাঁর বন্ধু নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন তার পূর্বানুমানিক চিত্র রয়েছে এতে। এখানে তিনি তাঁর সাধারণ গদ্যভাষা থেকে সরে গিয়ে এক কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনকারী সনির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। সনি এক শ্বেতাঙ্গ মানবাধিকার কর্মীর প্রেমে পড়ে। প্রেম, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা আবার প্রাধান্য পায় তাঁর এই রচনায় এবং গ্রন্থটি বিশ্বব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।
‘নান টু এ্যাকমপেনি মি’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে, ততদিনে বর্ণবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। তথাপি গর্ডিমার অন্য অনেকের মতো একথা বিশ্বাস করতে চাননি যে দক্ষিণ আফ্রিকা কম আগ্রহের দেশে পরিণত হয়েছে। প্রধান চরিত্র ভেরা স্টার্ক একজন আইনজীবী, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। কথিত ‘শ্বেতাঙ্গ অপরাধবোধ’ থেকে নয়, বরং সে এই কাজ করে জন্মসূত্রে যে স্থানের সঙ্গে সে অপরিহার্যরূপে সম্পৃক্ত তার সঙ্গে লেগে থাকার প্রয়োজনীয়তার অনুভব থেকে, সে অনুধাবন করে যে এছাড়া তার সামনে কোন বিকল্প নেই। এতে সুবিচার এবং ক্ষমতায়নের মধ্যকার পার্থক্য ও দ্বন্দ্বকে তুল্যমূল্য করে দেখা হয়েছে। আগেকার নিপীড়িতরা যখন ক্ষমতা লাভ করে তখন নবার্জিত শক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা তাদের প্রায়শই জানা থাকে না।
১৯৯৪ সালে উদ্ভূত এই উদ্বেগ দেখেই বোঝা যায় যে তাঁর শেষ উপন্যাস ‘নো টাইম লাইক দ্য প্রেজেন্ট’-এ (২০১২) নাদিন গর্ডিমার এএনসি তথা কৃষ্ণাঙ্গ শাসকদের দুর্নীতি ও অপশাসনকে তাঁর উপন্যাসের বিষয় করবেন। উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, আমরা সরল ছিলাম, কারণ আমাদের লক্ষ্য ছিল বর্ণবাদী সরকারকে সরানো, কখনও আমরা যথেষ্ট গভীরভাবে ভেবে দেখিনি তার পরে কী হবে।’
‘নো টাইম লাইক দ্য প্রেজেন্ট’-এর আগে তাঁর আরও তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়Ñ ‘দ্য হাউস গান’ (১৯৯৮), ‘দ্য পিকআপ’ (২০০১) এবং ‘গেট এ লাইফ’ (২০০৫)। এই সময়ের মধ্যে তিনি সমকালীন লেখকদের নিয়ে অনেক প্রবন্ধও লিখেছেন। ‘দ্য হাউস গান’ প্রেমের অপরাধ নিয়ে লেখা, যাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে সম্পর্কের ওঠানামা হয়, যা সমকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্থান-পতন দ্বারা অব্যাহতভাবে প্রভাবিত হয়। ‘দ্য পিকআপ’-এ অভিবাসনের সমস্যাকে উপজীব্য করা হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান মহিলা জুলি সামার্স এক অবৈধ আরব অভিবাসীর সঙ্গে তার দেশে চলে যায়। সেখানে গিয়ে সে নিজে বহিরাগত হয়ে পড়ে। ‘গেট এ লাইফ’ ক্যান্সারের সঙ্গে যুযুধান এক মানুষের গল্প। এটা সম্পূর্ণ অন্য ধরনের গল্প যেখানে ব্যক্তিগত সমস্যা ও অনুভবই প্রধান, রাজনীতি নেই বললেই চলে।
নাদিন গর্ডিমার লক্ষ্য করেছেন যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘রাজনীতি নিজেই একটা চরিত্র।’ গর্ডিমার-বিশেষজ্ঞ, ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশের প্রফেসর, স্টিফেন ক্লিংম্যান বলেছেন, ‘তিনি জানতেন যে, আপনি যদি কোন চরিত্রকে বুঝতে চান, তা সে কৃষ্ণাঙ্গ বা শ্বেতাঙ্গ যাই হোক, আপনাকে বুঝতে হবে ওই বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে রাজনীতি প্রবেশ করছে কী উপায়ে।’
নাশকতা উসকে দেয়ার অভিযোগে বর্ণবাদী সরকার তাঁর চারটি উপন্যাস নিষিদ্ধ করেÑ ‘এ ওয়ার্ল্ড অফ স্ট্রেঞ্জার্স’, ‘দ্য লেট বুর্জোয়া ওয়ার্ল্ড’, ‘বার্জার্স ডটার’ এবং ‘জুলিজ পিপল।’ ‘আমাদের এই নন্দনতাত্ত্বিক উদ্যোগ তখনই নাশকতামূলক বলে চিহ্নিত হয়েছে যখন আমরা আমাদের সময়কার লজ্জাজনক গোপনতাগুলোকে গভীরভাবে খনন করি, শিল্পীসুলভ বিদ্রোহী সততার সঙ্গে। তখন লেখকের বিষয়বস্তু ও চরিত্ররা গড়ে ওঠে সেই সমাজের চাপ ও বিচ্যুতির ফলশ্রুতি হিসেবে, যেমন এক জেলের জীবনযাপন নির্ধারিত হয় সমুদ্রের শক্তির প্রেক্ষিতে।’
তিনি মনে করতেন, গল্প নীতি এবং রাজনীতি সম্পর্কে পরিষ্কার অন্তর্দৃষ্টি এবং মানবজীবনের ওপর তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে উপস্থাপন করে। ‘তিনি (নাদিন গর্ডিমার) আমাদের রাজনৈতিক বিশ্ব সম্পর্কে সেসব জিনিস দেখিয়েছেন যা রাজনৈতিক বিশ্ব সত্যিকার অর্থেই বলতে পারে না,’ ক্লিংম্যান বলেছেন।
নাদিন গর্ডিমার তাঁর দুই পুরনো বন্ধু নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ওয়াল্টার সিসুলুর মতের বিপরীতে তিনি নিজেকে কখনও সত্যিকারের বিপ্লবী মনে করতেন না, বলতেন তাঁর মধ্যে ছিল লেখকসুলভ স্বার্থপরতা, কিন্তু, তিনি তাঁর দেশের সমস্যা সম্পর্কে কখনও নীরব থাকেননি, যা দেখেছেন, যা বুঝেছেন তার সম্পর্কে অকপটে লিখে গেছেন, যতটা সম্ভব সততার সঙ্গে।
১৯৯১ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তাঁর ‘দ্য কনজারভেশনিস্ট’ এবং ‘বার্জার্স ডটার’ উপন্যাসের জন্য। ‘আপনি চারপাশের ঘটমান বিষয়াবলী সম্পর্কে উত্তেজিতও হতে পারেন, নিস্পৃহও থাকতে পারেন, আপনাকে সামাজিক বন্ধনের মধ্যে গড়ে উঠতে হয়, আপনি সব সময় বেড়ে চলেছেন,’ বর্ণবাদী শাসনের অবসানের এক দশকেরও পর তিনি একথা বলেন। ‘লেখক হতে গেলে গণমানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। লেখক হিসেবে আমাদের প্রক্রিয়াকে আমি জীবনের আবিষ্কার হিসেবে দেখি।
‘আমি অনেক কিছুতে ব্যর্থ হয়েছি,’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু কখনও ভয় পাইনি।’
তাঁর স্বামী রাইনহোল্ড ক্যাসিরার ২০০১ সালে মারা যান। আর তিনি, এই অকুতোভয় মানবতাবাদী, উদারপন্থী মহান লেখক, মৃত্যুবরণ করলেন গত ১৩ জুলাই। তাঁর প্রথম পক্ষের কন্যা এবং দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র জীবিত রয়েছেন।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment