Thursday, July 17, 2014

ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ উদ্দীপ্ত কালের মূর্ছনা

ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ উদ্দীপ্ত কালের মূর্ছনা
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
৭১-থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপাদান। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে এ প্রেক্ষাপটকে ঘিরে লেখা শুরু হয়েছিল উপন্যাস, গল্প, শব্দশৈলীর কবিতা, নাটক প্রভৃতি। সাহিত্যের সব শাখাতেই এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে যুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ছোটগল্পও বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ। আশির দশকের গোড়া থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ছোটগল্প লেখা প্রচুর হয়েছে। তা না বলার অবকাশ নেই। সব গল্প যে শিল্পসম্মত, খাদ্য হিসেবে সরস, পাঠকের সুখাদ্য- তা অবশ্যই বলা চলে না। কিছু কিছু গল্প পাঠকদের হৃদয়ে যেমন আশ্বিনী ঝড় তুলেছে, তেমনি অনেক গল্পতে দেখা মিলেছে সরল-সহজ গ্রাম বাংলার মানুষের আত্মত্যাগ, দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ টান আর অদ্ভুত অদ্ভুত সব চরিত্র। অধিকাংশ গল্পেতেই উঠে এসেছে আত্মদানভিত্তিক কাহিনী। স্বল্পসংখ্যক গল্পকারই এসবের বাইরে গিয়ে গল্পের ডালপালা মেলেছেন। তাঁদের প্রতিভার কথা স্বীকার করতেই হয়।
মুক্তিযুদ্ধে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলেই অংশগ্রহণ করেছে। সে সময়ে পুরুষের পাশাপাশি লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নারীরাও। সেদিন সেসব রক্ত ঝরা মাসে দীর্ঘদিনের নিয়মনীতি, কুসংস্কার, আবদ্ধ জানালা ভেঙ্গে দেশমাতৃকার টানে ছুটে এসেছিল বাংলার লাখ লাখ নারী। তাদের মধ্যে কেউ মা ছিল, কেউ ছিল মেহেদী পাতার রঙে হাত রাঙ্গানো নববধূ, ছিল ভার্সিটির মেধাবী ছাত্রটি, ছিল পড়া না পারা ছাত্রীটি; শৈশব থেকে সদ্য কৈশরে পা দেয়া স্কুল বালিকাও এসেছিল থ্রি-নট রাইফেল হাতে। তাঁরা সেবিকা হয়েছিল, তাঁরা প্রীতিলতা হয়েছিল, তাঁরা হয়েছিল ক্ষুধার্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গৃহিণীর সঞ্চিত অন্নভা-ার। তাঁরা নির্যাতিত হয়েছিল, তাঁরা মৃত্যুর মুখোমুখি, চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিল বহুবার। তৎকালীন নারীদের আজন্ম স্থান ছিল গৃহে (পিতা বা স্বামী গৃহ!)- বাইরে নয়। সভ্য মেয়েদের কি আন্দোলন নিয়ে মাতামাতি করা সাজে-এমনই মনোভাব ছিল সে সময়ের গৃহকর্তাদের। কিন্তু সেদিন যে চিরায়ত নিয়ম ভেঙ্গে, সকল বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে, এক মাকে বাঁচাতে ছুটে এসেছিল কোমল সৌন্দর্যের প্রতীক আরেক মা! কিন্তু তখনও পুরুষদের পক্ষ থেকে বাধা এসেছিল। এমনই ঘটনা চাক্ষুস দেখা পাই আমরা সত্যেন সেনের ‘পরিবানুর কাহিনী’ গল্পে। এই গল্পের প্রধান নারী চরিত্র পরিবানুর কথার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে যুদ্ধ সময়কার নারীর বাধা-বিঘ্ন। গল্পে স্বামী হারুনের প্রতি ক্ষুব্ধ পরিবানুর প্রশ্ন-‘আচ্ছা এই বাংলাদেশটা কি তোমাদের পুরুষদেরই, মেয়েদের কিছু নয়? আমাদের মেয়েদের নামগুলো কি শুধু সেন্সাস রিপোর্টের পাতাভর্তি করে রাখার জন্য?...আপনারা সভা করছেন, মিছিল করছেন, কিন্তু আমাদের মেয়েদের কোনদিন কোন কাজে ডাক দিয়েছেন? ...মেয়েরা কি আপনাদের মতো এ দেশের মানুষ নয়?’ তার কথায় পুরুষ সমাজের ভুল শুধরিয়ে নেয়া হলো। পরীর মতো মেয়ে পরীবানু যুদ্ধে গেলো। রণক্লান্ত সাজে তার শেষ আশ্রয় হলো বাংলার উদার অশ্রুসিক্ত জমিন।
বর্বর হানাদাররা মুখে আওড়িয়ে ছিল ধর্মের বাণী অথচ কর্মে, রণক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের নাম করে তারা চালিয়েছিল বিশ্বের ঘৃণ্যতম গণহত্যা। ধর্মের খোলসে সাধু সাজা পশ্চিম পাকিস্তানীদের কূটচালের দৃশ্য আমরা দেখতে পাই বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ‘আমার আল্লারে’ গল্পের অলি-গলিতে। গল্পটিতে গল্পকথকের বার বার মনে হয়েছে আল্লাকে নিয়ে পাকিস্তানীরা তামাশা করছে। তাদের ক্ষমতা প্রাপ্তির লড়াইয়ে বাঙালী জাতি বীভৎস ঘটনার সাক্ষী যেন! কথকের তাই এমন সরল উক্তি-‘জেনারেলদের ক্ষমতা ছাড়া আর কোন বোধ নেই। তারা যুদ্ধ করছে ক্ষমতা দখলের জন্য। আর আমরা (বাঙালীরা) যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থেকেছি যুদ্ধ কত কদর্য তার সাক্ষী দেয়ার জন্য। ...পাকিস্তান আর্মি নিজেদের মনে করল আল্লার আর্মি বলে। আর জেনারেলরা ক্ষমতায় এসে আল্লার আইন চালু করতে চায়। বাউলের কথাটা মনে পড়ে আবার : আমার আল্লারে নিয়া মশকরা কেন কর তুমি।’ খোদার কথা বলে, ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা মানুষ মেরেছিল কুকুরের মতো, যারা হয়ে উঠেছিল রক্তলোলুপ, বাঙালীরা তাদের ছাড়েনি। তাই তাদের (পাকিস্তানীদের) হাতের মুঠোয় পেয়ে জ্বলে উঠেছিল ঘৃণার বারুদ, দাউ দাউ প্রতিশোধের আগুন ছিল অনির্বাপিত। তাদের বাংলা থেকে মুছে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলো বাংলার নিষ্পেষিত জনগণ। কথা সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পে হানাদারদের প্রতি এমনই চরম ঘৃণা, আক্রোশ ফুটে উঠেছে এভাবে-‘...এসে দেখি আশপাশের গ্রাম থেকে অসংখ্য ছেলে-বুড়ো-মেয়ে, গেরস্ত বাড়ির বউ ছুটে এসেছে এখানে। কারও হাতে ঝাঁটা। দা। কুড়াল। খুন্তি। মৃত দেহগুলোর মুখে ঝাঁটা মারছে তারা। কুড়োল দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে ওদের হাত। পা। মাথা। বুকের পাঁজর। দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে একটি মৃতদেহের শত টুকরো করতে করতে জনৈক বৃদ্ধ চিৎকার করে কাঁদছিল। আমার পুলাডারে মারছস্। বউডারে নিয় গেছস্। মাইয়াডারে পাগল করছস্। ...আল্লার গজব পড়বো। আল্লার গজব পড়বো। ঘৃণা। ক্রোধ। যন্ত্রণা। গল্পের ‘জনৈক বৃদ্ধের’ চরিত্র যেন সংসার-ধর্ম-জাত-কুল হারানো অসংখ্য পিতার শোকার্ত আর্তনাদ, ভাষাহীন অবয়বের কথাই জানান দিচ্ছে। যুদ্ধে পিতা যেমন হারিয়েছেন তার প্রাণাধিক সন্তানদের তেমনি সন্তানরাও হারিয়েছে তাদের পিতাকে। আশ্চর্য! যুদ্ধের মাহাত্ম্য, প্রতিশোধের আগুন জ্বলেছিল শিশু-কিশোরদের হৃদয়েও। তারাও নানাভাবে সাহায্য করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। কেউ কেউ অংশগ্রহণ করেছে সম্মুখ যুদ্ধেও। এ যেন এক রূপকথার কল্পকাহিনী।
কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ‘ময়ূরমুখীর নিশান’ গল্পে পাকিস্তানী হানাদারদের বর্বরতার চিত্রপটের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার আত্মদানের কথা। গল্পকথক নিশান ক্লাস ফাইভে পড়ে। সে পিপুল পাতা তোলে, গাঙ থেকে নলা মাছ ধরে। সে অপেক্ষা করে তার বাবার জন্য, যিনি তার জন্য ‘ছিট কাপড়ের রঙিন শার্ট’, ‘সুবাসী বিস্কুট...চাক চাক করে কাটা পাউরুটি’ আনবেন। কিন্তু তার বাবাও যুদ্ধে শহীদ হলো। স্বাধীন বাংলা আনতে ছোট্ট নিশানও বাবার মতো যুদ্ধে যেতে চায়। গল্পে মাকে বলা তার স্পষ্ট অভিব্যক্তি- ‘মা আমি যুদ্ধে যামু। ...নিশান ডান হাতের মুঠিতে বুকে চাপড় মেরে, গলায় আর একটু জোর দিয়ে বললো, যুদ্ধে যামু। এই তুফান আলীর পোলা নিশান আলী যুদ্ধে যাইবো। বাপের পক্ষী শিকারের গুলাই দিয়া দুশমন শিকার করবো।’ গল্পের শেষে পাঠকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয় যখন দেখা যায় হানাদারদের লঞ্চ ডুবাতে গিয়ে কিশোর নিশান চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লো শৈশবের নদীটির বুকে...।
যেই সময়ে কিশোররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে, নারীরা এসেছিল রণসাজে, একই সময়ে সৃষ্টি হলো বাংলার দেশদ্রোহী ‘আল বদর’, ‘আলশামস’ আর ‘রাজাকার’ বাহিনী। তারা ভাই হয়ে ভাইকে, বাংলার মানুষ হয়ে বাংলার মানুষকে হত্যা করতে শত্রুদের সাহায্য করলো। নিজেরা চালালো লুটপাট, হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ। তারা হলো ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ।’ ওরা নারীদের তুলে দিলো পাকিস্তানী ক্যাম্পে, চিনিয়ে দিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ডেরা। এরা যেন মীরজাফরের উত্তরসূরি। অনেকে যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজাকার হয়েছে, (খাঁটি রাজাকার?), তেমনি নেহাৎ পেটের দায়ে না জেনে শুনে সহজ-সরল ক্ষেতমজুর বাঙালীরাও নিজেদের অজান্তেই ভর্তি হয়েছিল রাজাকার বাহিনীতে। এমনি এক দৃশ্যকে কলমের আঁচড়ে গল্প করে তুলে ধরেছেন ইমদাদুল হক মিলন। ‘লোকটি রাজাকার ছিলো’ গল্পে ইমদাদুল হক এমনই একটি চিত্রকল্প এনেছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মিজান অন্ন-বস্ত্রের লোভে রাজাকার হয়। পেটের ধান্ধায় থাকায় মিজান তখনো জানেনি সে কী অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু একদিন মিজান মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়লো। মুক্তিযোদ্ধাদের কথায় মিজানের হুঁশ ফিরে। তখন মিজানের আফসোস, মারাত্মক ভুলের জন্য সচকিত হুঁশিয়ারি উক্তি-‘হায় হায় কিছু না বুইজা, পেটের দায়ে এইডা কী করছি আমি! রাজাকার হইছি কেন? আমার মতোন বেঈমান তো তা হলে কেউ নাই!’
মুক্তিযুদ্ধ কারও কারও জীবন এনে দিয়েছে গভীর খাদের দিকে। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরাটা রূপ নিয়েছিল সুখ-দুঃখের অদ্ভুত অনুভূতিতে। যুদ্ধ শেষে যোদ্ধা ঘরে ফিরলো। মায়ের বুকে ফিরে আসবে তার আদুরে সন্তানটি- অন্তত এমনই কথা ছিল। কিন্তু মা তো বেঁচে নেই। ঘর? সে কি আর আছে? জ্বলে পুড়ে সেই কবে ছাই! মুক্তিযুদ্ধের ছোটগল্প লিখতে গিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ কাগজ খুঁড়ে তুলে এনেছেন ব্যতিক্রমী এক মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ পরবর্তীকালীন জীবন। ‘আমাকে একটি ফুল দাও’ গল্পের প্রধান চরিত্র ওমর। যুদ্ধে ওমর শহীদ হয়েছে-এমন ভুল সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ওমরের পরিবার তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ওমরের অনুজ ফয়সালের সঙ্গে বিয়ে দেয়। কিন্তু যাকে মৃত বলা হয়েছিল সেই ওমর স্বাধীনতার এক বছর তিন মাস পর ফিরে আসে। কিন্তু ততদিনে স্বপ্নার পেটে ফয়সালের সন্তান। ওমর ছদ্মবেশ নিয়ে বাড়ি ফেরে। সব দুঃখ পাষাণের মতো হজম করে দৃষ্টি বুলোয় তার মেয়ে সোনিয়াকে নিয়ে স্বপ্না-ফয়সালের সংসারে। নিজের দুভাগ্যের জন্য ওমর কাউকে দায়ী করে না। ছদ্মবেশধারী ওমরকে তার পরিবারও চিনতে পারেনি। ঘটনাচক্রে মেয়ে সোনিয়ার হাতে তখন স্বপ্নার জন্য ফয়সালের আনা ফুলের তোড়া। ছদ্মবেশী ওমর সেখান থেকে একটি ফুল চায়। এ যেন তার শেষ চাওয়া। গল্পে তার আকুতি-‘আমাকে একটি ফুল দাও মা আমাকে একটি ফুল দাও।’ গল্পের এ উক্তিটি মুহূর্তেই পাঠক হৃদয়ে করুণার ঝড় তোলে। সঙ্গে শ্রদ্ধা মিশ্রিত সালাম বৈকি! সর্বহারা মুক্তিযোদ্ধা ওমর যেন পাঠকের চোখের সামনে এসে মনের দরজায় টোকা দিয়ে বার বার বলছেন-‘আমাকে একটি ফুল দাও মা...।’ আলাউদ্দিন আল আজাদ অতি সূক্ষèভাবেই যোদ্ধা ওমরের দুর্ভাগ্য তুলে ধরেছেন। আবার কথাকার আনোয়ারা সৈয়দ হক ‘মুক্তিযোদ্ধার মা’ গল্পে যুদ্ধে পা হারা মুক্তিযোদ্ধার নিগৃহীত, অবহেলিত জীবন, স্বপ্ন-প্রত্যাশা বিধৃত হয়েছে। পা হারানো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধের পরপরই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কালামকে সবাই শ্রদ্ধা করত, তার খোঁজ-খবর নিতো। কিন্তু সময়ের পালাক্রমে এখন আর গল্পের নায়ক কালামকে দেখতে কেউ আসে না অথচ কালাম আজও বিজয় দিবস এলে স্বপ্ন দেখে-‘...আজ কেউ না কেউ নিশ্চয় তার বাড়িতে আসবে, এসে তার কুশল জিজ্ঞাসা করবে। এমনও হতে পারে কেউ হয়ত খুশি হয়ে তাকে একটা বিজয় দিবসের গান গেয়ে শোনাবে অথবা হতে পারে টাউন হল থেকে একটা হুইল চেয়ার ভাড়া করে নিয়ে যাবে তাকে চেয়ারম্যানের বাড়িতে। অনেক লোকজনের মাঝে সকলে তাকে জিজ্ঞেস করবে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা, তার গেরিলা জীবনের বীরত্বের কথা। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে হা করে তার কথা শুনবে, ভয়ে শিউরে উঠবে...’ অথচ বেলা বয়ে যায়। কেউ কালামের বাড়ি আসে না। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা যেন কালক্রমে ভুলে যাচ্ছে সকলে। তাই তো কালামের মার খেদোক্তি-‘দ্যাশের লোক ভুললেও মুক্তিযোদ্ধার মা কি তার ছাবালরে ভোলতে পারে, বাজান?’ অথচ একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিল তারা বাড়ি ফিরে যাবে। তারা অন্যদের যুদ্ধের বীরত্ব কাহিনী বলবে। বুঝিয়ে দেবে স্বাধীনতার মহত্ত্ব। রণাঙ্গনে বসে তারা কত কি-ই না ভেবেছিল ঘরে ফেরা নিয়ে। ভেবেছিল দেশের স্বাধীনতা নিয়ে যখন বাড়ি ফিরবে তখন কি পুরনো দিনগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে? দেখা মিলবে পুরনো বন্ধু-বান্ধব কিংবা যাকে তারা ভালবেসেছিল একদিন? কেমন হবে বিজয়ীর প্রত্যাবর্তন? ‘সময়ের প্রয়োজনে’র গল্পটিতে জহির রায়হান এমনই প্রশ্নগুলো চিত্রকল্প এঁকেছেন-‘একদিন আমি আবার ফিরে যাব। আমার শহরে, আমার গ্রামে। তখন হয়ত পরিচিত অনেক মুখ সেখানে থাকবে না। তাদের আর দেখতে পাবো না আমি। যাদের পাবো তাদের প্রাণভরে ভালবাসবো। যারা নেই কিন্তু একদিন ছিল, তাদের গল্প আমি শোনাব ওদের।’
মানুষ কি দিনকে দিন ভুলে যাচ্ছে স্বাধীনতার ইতিহাস? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্রমেই কি বিলীন হওয়ার পথে? আমরা কি প্রকৃতই ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করতে পেরেছি? স্বাধীনতা পরবর্তী এসব প্রশ্নের উত্তরও মেলে কয়েকটি ছোটগল্পে। সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য বাঙালীকে আবার নামতে হবে যুদ্ধে। এ যুদ্ধ হবে দেশ গড়ার। স্বাধীনতা সপক্ষ-বিপক্ষ লড়াই যখন চূড়ান্ত, দেশে হানাহানি, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতির মাত্রা যখন ক্রমশ বেড়েই চলছে-এসব থেকে উত্তরণের জন্য ফের যুদ্ধে আভাস পাওয়া যায় সৈয়দ শামসুল হকের ‘ভাল করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে’ গল্পে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিতে এই ছোটগল্পের আদলে বলা চলে- ‘কন, বাহে, শুনি হামরা। মুক্তিযুদ্ধ কি ফির শুরু হয়া গেইছে!’
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ছোটগল্পগুলো বাংলা সাহিত্য ও ঐতিহ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এক সময় মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু তাঁদের লড়াই-সংগ্রাম, বীরত্বগাঁথা গল্পগুলো লেখকের কলমে-কাগজে জিইয়ে থাকবে হাজার হাজার বছর ধরে-এই বা কম কিসের?
’৭১ লেখা যেমন পূর্বেও অজস্র হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। গল্প লেখক এমনটা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর- যারা মুক্তিযুদ্ধের গল্প লেখেননি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত ছোটগল্পগুলোর মধ্যে আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘কলিমদ্দি দফাদার’, শওকত ওসমানের ‘দুই ব্রিগেডিয়ার’, আবু ইসহাকের ‘ময়না কেন কয় না কথা’, জাহানারা ইমামের ‘উপলব্ধি’, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘রোদের অন্ধকারে বৃষ্টি’, শওকত আলীর ‘পুনর্বার বেয়নেট’, হাসান আজিজুল হকের ‘ভূষণের একদিন’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইন কোট’, জ্যোতি প্রকাশ দত্তের ‘মুক্তিযোদ্ধারা’, আবদুশ শাকুরের ‘ইশু’, আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘ব্লাক আউট’, নাসরিন জাহানের ‘বিশ্বাস খুনী’, পূরবী বসুর ‘দুঃসময়ের এ্যালবাম’, বুলবুল চৌধুরীর ‘নদী জানে’, মাহমুদুল হকের ‘বেওয়ারিশ লাশ’, হাসানাত আবদুল হাইয়ের ‘একাত্তরে মোপাসাঁ’, রাহাত খানের ‘মধ্যিখানে চর’, রশীদ হায়দারের ‘আপনজন’, সেলিনা হোসেনের ‘আমিনা ও মদিনার গল্প’, হুমায়ূন আহমেদের ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘গ্লানি’, কবি অসীম সাহার ‘ভ্রুণ’, মঞ্জু সরকারের ‘রাজাকারের ভূত’, মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘নূরুল এবং তার নোট বই’, সৈয়দ ইকবালের ‘সুরুজ মিঞার চাবি’, মঈনুল আহসান সাবেরের ‘কবেজ লেঠেল’, শাহাদুজ্জামানের ‘অগল্প’, বিপ্রদাশ বড়–য়ার ‘বাবার স্বপ্ন ও এক রাজকন্যে’ গল্পের নাম না বললেই নয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনির্মাণে ছোটগল্প তার যথার্থ ভূমিকা রেখে চলছে ঠিকই, তবে বোধহয় গত এক দশকে গল্পকারদের লেখায় স্বাধীনতারস্বরূপ, প্রখরতা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষায় জন্যই লেখকদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প লেখায় উৎসাহিত হতে হবে। কেননা এর মাধ্যমেই আগামী প্রজন্ম গল্পকারদের কাছ থেকে নিজস্ব ঐতিহ্য আর গৌরবের প্রতিবিম্বতুল্য ছোটগল্পগুলোর স্বাদ আস্বাদন করা সুযোগ পাবে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment