Thursday, July 17, 2014

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গেলিয়ানো

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গেলিয়ানো
মোঃ আরিফুর রহমান
আজকের এই সময়টাতে লাতিন আমেরিকানদের সুকৌশলে পোস্ট মর্ডানিজম-কলোনিয়ালিজমের মাধ্যেমে পোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনকে ব্যবহার করে পোস্ট ইম্পেরিয়ালিজম আর পোস্ট ন্যাশনালিজমের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সামাজ্র্যবাদী শক্তি বিশ্বায়নের কথা বলে তাদেরকে ঔপনিবেসিক আমলের মতোই শুধু নতুন মোড়কে করতলগত করে রেখেছে অথবা চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেখাচ্ছে নানা লোভ আর রঙিন জীবনের হাতছানি। অনেকেই সেই খপ্পরে লালুস হয়ে সা¤্রাজ্যবাদীদের প্রলোভনের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছেন। নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারছেন অনেকেই। বিকিয়ে দিচ্ছেন নিজেদের সত্তাকে। এমনতর পরিস্থিতিতে বিশ্বায়ন ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী উরুগুয়ান লেখক এদুয়ার্দো গেলিয়ানো লাতিন আমেরিকানদের হুঁশ ফেরাতে লিখে চলছেন অনবরত। শোষনের বিরুদ্ধে কলম যুদ্ধে অবর্তীন এই কলম সৈনিক লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনগণের পক্ষে কথা বলছেন। লড়ছেন বৈষম্যর বিরুদ্ধে,অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বর্তমান বাস্তবতায় মার্কসীয় সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলেও তিনি স্বপ্ন দেখেন স্বকীয় সত্তায় বলীয়ান এমন এক সমাজব্যবসথা যেখানে বৈষম্য থাকবে না। সেখানে জনগণ ভোগ করবে প্রাপ্য অধিকার। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই লিখে চলছেন।
রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি,লেখার শক্তি অনেকেরই থাকে না। থাকে না সাহসও। কিন্তু এই দুটো জিনিসই এদুয়ার্দো গেলিয়ানোর মাঝে আছে। নির্বাসন,কারারুদ্ধ জীবন কোন কিছুই তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরা থেকে বিরত রাখতে পারে নি। তিনি তাঁর বইগুলোতে স্বাধীনতার পক্ষে লিখেছেন। দাসত্ব আর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন। তাঁর লেখনী লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের গন্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের নিপীড়িত,লাঞ্চিত-বঞ্চিত-শোষিত মানুষের কথা বলে। সারাবিশ্বের যেখানেই সামরিক শাসন,স্বৈরশাসনের নিষ্ঠুরতা বহমান সেখানকার মানুষদের জন্যই যেন রচিত হয়েছে তাঁর এক একটি বই। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তিনি শোষক আর নিপীড়িত দুই দলকেই বেশ কাছ থেকে দেখেছেন। শুনেছেন শোষনের যাঁতাকলে পিষ্ট নিপীড়িত জনগণের আর্তনাত। আর সেই বিষয়গুলোকেই তিনি শৈল্পিকতা আর কাব্যিকতার ছোঁয়ায় তুলে এনেছেন তাঁর লেখনীতে। সামরিক শাসন আর অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি এই দুটি বিষয় পুরো পৃথিবীকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। সম্পদশালীদের শক্তিমত্তা দিন দিন বেড়ে যাচেছ। গরীব আরও গরীব হচ্ছে। এই বিষয়গুলোকেই ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করেছেন তিনি। আর সেই সঙ্গে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গিকে যুক্ত করেছেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা সাহিত্যের অংশ বলেই বিবেচিত। সাংবাদিকতাই তাকে সাহিত্যিক বানিয়েছে বলে তার অভিমত।
এদুয়ার্দো গেলিয়ানোর সাহিত্যকর্মগুলোতে ডকুমেন্টারী,ফিকশন,সাংবাদিকতা,রাজনৈতিক বিশ্লেষন আর ইতিহাসের সমন্বয় দেখতে পাওয়া যায়। তিনি লেখার ক্ষেত্রে নিজের জীবন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে অন্যের জীবন অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেন। এই বিষয়ে তিনি নিজেই বলেন,‘‘ আমি নিজে সবকিছু সর্ম্পকে সবার সর্ম্পকে আগ্রহী এক লোক। আমি অন্যদের সবকিছু তথা তাদের কন্ঠ,তাদের গোপনতর বিষয়গুলো,তাদের গল্প,তাদের বর্ণ এই সবকিছুই গোগ্রোসে গিলি। আমি তাদের কথাগুলোকে,শব্দগুলোকে চুরি করি। এজন্য আমাকে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে।’’ এভাবেই গেলিয়ানো নিজের লেখার অনুপ্রেরণা, নিজের লেখার খোরাক সর্ম্পকে মন্তব্যে করেন। তাঁর লেখার ধরণ স্বচ্ছ সাধারণ,কাব্যিক এবং অর্থবাহী। তাঁর লেখনীতে উপকথা,রুপকথা,পৌরণিকতা,কাব্য,সাংবাদিকতা, নীতিগর্ভ রুপকাহিনী,ধোঁয়াশা, ইতিহাস,স্বপ্ন ইত্যাদির অভ’তপূর্ব সমন্বয় ঘটে। থাকে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। তার লেখনীর এই স্টাইলের কারণে অনেকেই তাঁকে বিখ্যাত প্রাবন্ধিক সিমন ওয়েল,থিওডর আডোরনো এবং ওয়াল্টার বেনজামিনের সঙ্গে তুলনা করেন। সান্ড্রা সিজনেরোজ গেলিয়ানোকে নিজের সাহিত্যে শিক্ষক বলে অভিহিত করেন। আর জন লিউনার্ড তাকে একজন মারাত্মক রেডিক্যালিস্ট গল্পকথক হিসেবে অভিহিত করেছেন। এইসব প্রশংসা গেলিয়ানোর প্রতি কোন স্তুতি কিন্তু নয়,এগুলো তাঁর কর্মের স্বীকৃতি।
পুরো নাম এদুয়ার্দো হাগিস গেলিয়ানো। উরুগুয়ের মন্ডিভিডিওতে ক্যাথলিক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৪০ সালে জন্ম। বাবা এদুয়ার্দো হাগিস রোসেন আর মা লিসিয়া ইসথার গেলিয়ানো মানজফ। ছোট বেলায় লাতিন আমেরিকার অন্যসব তরুনের মতো তিনিও ফুটবল খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলেন। সেই ইচ্ছারই প্রতিধ্বনি আমরা তার বই ‘ফুটবল ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’তে দেখতে পাই। তিনি স্কুলে লেখাপড়া করেননি কারণ স্কুলের লেখাপড়াকে তিনি পছন্দ করতেন না। কিশোর বয়সে জীবিকার তাগিদে তাঁকে ফ্যাক্টরী শ্রমিক, বিল কালেক্টর, সাইন পেইন্টার,ম্যাসেঞ্জার,টাইপিস্ট,ব্যাংক টেলার প্রভৃতি ওড জব করতে হয়। আর এগুলো করতে গিয়ে তিনি শোষণ আর নির্যাতনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন যা তার মধ্যে ক্ষোভ আর পরবর্তীতে প্রতিবাদী চেতনাকে জাগ্রত করে। নিজের জীবনের বিরুপ অভিজ্ঞতা পরবর্তী সাহিত্যে জীবনকে প্রভাবিত করে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি সোশালিস্ট পার্টির সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে রাজনৈতিক ব্যঙ্গাতœক কার্টুন এঁকে নিজের প্রতিবাদী চেতনার বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়ে ছিলেন। ঐ বছরই তিনি কাঁচা হাতে প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ওড জব করতে করতেই মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে গেলিয়ানো প্রথমবারের মতো বিয়ে করেন। এরপর পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ষাটের দশকের শুরুতে তিনি মার্চা নামক প্রভাবশালী এক ম্যাগাজিনের সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ঐ ম্যাগাজিনে সেই সময় মারিয়ো ভার্গাস লোসা,মারিও বেনেডেট্টি,ম্যানুয়েল মালডোনাডো ডেনিস এবং রবার্টো ফারনানদেজ রেটামার প্রমুখ খ্যাতিমান ব্যক্তি লিখতেন। এরপর তিনি দৈনিক ইপোচার সম্পাদক এবং ইউনিভার্সিটি প্রেসের এডিটর-ইন চিফ হিসেবে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। বিয়ের তিন বছরের মাথায় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বিয়ের একবছরের মাথায় তিনি প্রথম বই হিসেবে লেখেন ‘দ্য ফলোয়িং ডেইজস’। এরপর একে একে অনেকগুলো বই লিখে ফেলেন। এই বইগুলোর মূল থিম রাষ্ট্রীয় অন্যায় অবিচারের বিরদ্ধাচারণ। ১৯৭৩ সালে উরুগুয়েতে সামরিক শাসন জারী হয়। সামরিক শাসন জারীর আগ পর্যন্ত তিনি লিখেছিলেন বারোটি বই। এগুলোতে রাজনৈতিক নির্মমতার চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছিল। এই বইগুলোর মধ্যে ‘গুয়েতমালা: অকুপায়িড কান্ট্রি’ আর ‘ওপেন ভেইনস অফ লাতিন আমেরিকা’র মতো বইও ছিল। এগুলোতে ঐতিহাসিক তথ্যের উপস্থাপনের মধ্যে দিয়ে তিনি শাসকের শোষন আর নির্যাতনের চিত্রকে তুলে ধরে মানুষের মাঝে প্রতিবাদী চেতনা সৃষ্টি করছিলেন। এই কারণে সামরিক সরকার গেলিয়ানোকে হুমকি হিসেবেই চিহ্নিত করে। তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। ‘ওপেন ভেইনস অব লাতিন আমেরিকা’ বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। গেলিয়ানো কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়ে আর্জেন্টিনায় থিতু হন। সেখানে তিনি ক্রাইসিস নামক একটি ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো হেলেনা ভিলাগ্রাকে বিয়ে করেন। এখন পর্যন্ত হেলেনাই তাঁর সঙ্গে আছেন। সেই যাই হোক হেলেনাকে বিয়ে করার বছরটিতে আর্জেন্টিনাতে এক রক্তক্ষয়ী মিলিটারী ক্যুতে ভাইডেলা ক্ষমতাসীন হয়। ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ডেথ স্কোয়াড গঠন করে ভাইডেলা। মৃত্যুর লিস্টে গেলিয়ানোর নাম সামনের সারিতেই থাকে। আবার পালাতে হয় গেলিয়ানোকে। এবার যান স্পেনে। এখানেই তিনি তার বিখ্যাত ট্রিলজী মেমোরি অব ফায়ার বইটি লিখেছেন।
জন্মস্থান ছেড়ে দীর্ঘদিন দূরে থাকা চরম কষ্টের। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখে আবার তিনি ১৯৮৫ সালে ফিরে যান মন্টিভিডিওতে। এখন পর্যন্ত সেখানেই আছেন। লিখছেন। বামপন্থী রাজনীতিবিদদের সমর্থন দিচ্ছেন,অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। ২০০৪ সালে উরুগুয়েতে প্রথমবারের মতো বামপন্থী তাবারে ভেঝকুইজ এবং দ্য ব্রড ফ্রন্ট এই জোট সরকার গঠন করে। এই সরকারের প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে তিনি লেখেন,‘ হোয়ার দ্য পিপল ভোটেড অ্যাগেইন্সট ফিয়ার’ প্রবন্ধ। তিনি উরুগুয়ের ছত্রিশ সদস্যের বাম বুদ্ধিজীবিদের উপদেষ্টা কমিটির একজন। বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী এই লেখক রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও লেখা লেখি থেমে নেই। লিখে চলছেন অনবরত নিরলস।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো ‘দ্য ফোলোয়িং ডেইজস’, ‘গুয়েতমালা: ওকুপাইড কান্ট্রি’, ‘ওপেন ভেইনস অফ লাতিন আমেরিকা’, ‘ডেইজস অ্যান্ড নাইটস অব লাভ অ্যান্ড ওয়ার’, ‘মেমোরি অব ফায়ার’, ‘দ্য বুক অব অ্যামব্রেসেস’, ‘উই সে নো’, ‘অ্যান আনসার্টেইন গ্রেইস’, ‘ওয়াকিং ওয়ার্ডস’, ‘ফুটবল ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’, ‘আপসাইড ডাউন: এ প্রিমিয়ার ফর দ্য লুকিং গ্লাস ওর্য়াল্ড’, ‘ভয়েসেস অব টাইমস: এ লাইফ ইন স্টোরিজ’, ‘মিররস: স্টোরিজ অব অলমোস্ট ইভরিওয়ান’, ‘চিল্ড্রেন অব দ্য ডেইজস: এ ক্যালেন্ডার অব হিউম্যান হ্রিস্ট্রি’। এই বইগুলোর ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে। এছাড়া তিনি আরো অনেকগুলো বই স্প্যানিশ ভাষায় রচনা করেন যেগুলো এখন পর্যন্ত অনুবাদ হয়নি।
‘ওপেন ভেইনস অব লাতিন আমেরিকা’ বইটি গেলিয়ানোর সেরা বই। এটি তিনি মাত্র তিন মাসে লিখেছিলেন। এই বইটিই তাকে লাতিন আমেরিকার জনপ্রিয় একজন সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই বইতে তিনি লাতিন আমেরিকার পনের শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসা ইতিহাসতে তুলে এনেছেন। আলোচনা করেছেন সামগ্রিক দৃষ্টিকোন থেকে। বইটিতে লাতিন আমেরিকার প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতার বিষয়ে লিখেছেন। লিখেছেন ইউরোপের সান্নিধ্য লাভের কথা। এরমধ্যে দিয়ে লাতিনদের সম্পূর্ণ নতুন এক জগতে প্রবেশ করার কথা তুলে এনেছেন। লিখেছেন সেই ইউরোপীয়াদের বিরুদ্ধেই লাতিনদের ক্ষোভের কথা,শোষণের কথা। ইউরোপীয়ানদের সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকানদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বারোপের বিষয় বইটিতে তুলে ধরেছেন। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বইটি এক জ্বালাময়ী বই হিসেবেই পুরো লাতিন আমেরিকায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশেষ করে সা¤্রাজ্যবাদীদের কাছে। বইটি ক্লাসিক বই হিসেবে পরিচিত লাভ করে। তবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে উপহার হিসেবে দিলে বইটি সমধিক পরিচিতি লাভ করে। উপহার দেয়ার একদিনের মধ্যে আমাজনের ৫৪২৯৫ তম অবস্থান থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে আসে বইটির বিক্রি। বই প্রকাশের তেতাল্লিশ বছর পর এখন তিনি বইটিকে গুরুত্বহীন বলে মনে করছেন। এই ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে এই যুক্তি দেখান। লাতিন আমেরিকানরা এখন বিশ্বায়নের দিকেই ঝুঁকে পড়ছে। তারা তাদের ঔপনিবেশিক নির্যাতনকারী শাসকদের ক্ষমা করে দিয়েছে। এই সব কারণে গেলিয়ানোর কাছে এই বইটিকে এখন গুরুত্বহীন মনে হলেও কিন্তু ইসাবেলা আলেন্দে,মাইকেল ইয়েটসের মতো লেখকরা মনে করেন বইটি সবসময়ের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ।
মেমোরি অব ফায়ার বইটি তিন ভলিউমের একটি বই। এতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। শিল্পী,বিপ্লবী,কর্মী,বিজেতা ইত্যাদি চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। বইটির শুরু হয়েছে প্রাক-কলম্বিয়ান মিথের মধ্যে দিয়ে আর শেষ হয়েছে ১৯৮০ সালের বিরাজমান পরিস্থিতি বর্ণনায়। বইটিতে ঔপনিবেশিক শোষণের বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিরোধে ব্যক্তিগত হিরোইজমের সঙ্গে সঙ্গে গণ বিপ্লবের কথা তুলে এনেছেন অত্যন্ত নিপুনতার সঙ্গে। বইটিকে সমালোচকরা ব্যাপক প্রশংসা করেন। বইটির জন্য অনেকেই তাকে জন ডোস পাসোস আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সঙ্গে তুলনাও করেন। রোনাল্ড রাইট টাইমস লিটারেরী সাপ্লিমেন্টে গেলিয়ানোকে এই বইটি রচনার জন্য সর্বকালের অন্যতম এক মহৎ লেখক হিসেবে অভিহিত করেন যিনি অতীতকে খুঁেড় তরুণ প্রজন্মের সামনে সত্যকে হাজির করেছেন।
গেলিয়ানোর ‘মিররস’ বইটিও একটি জনপ্রিয় বই। মেমোরি অব ফায়ারের পর এই বইতেও ইতিহাসের প্রাধান্য দেখা যায়। বইটিতে শিল্পী,লেখক,দ্রষ্টা,¯্রষ্টার মধ্যে দিয়ে মানবতাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। ‘দ্য নো বডিস’ বইতে তিনি ফ্লিয়াসের মধ্যে দিয়ে গরীব মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়া,ব্যর্থতাকে শৈল্পিকভাবে চিত্রায়িত করেছেন। ফ্লিয়াসের স্বপ্ন তাদের জন্য একটি কুকুর কেনা। কিন্তু কেউই দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে না। এক জাদুকরী দিনে সুসময় আসবে,বৃষ্টি নামবে। এটাই বিশ্বাস। কিন্তু সুসময় আসেনি গতকাল,আজ। আসবে না আগামীকাল অথবা চিরদিনই। এমনতরই সত্যকে গেলিয়ানো প্রকাশ করেছেন এই বইতে।
আরেকটি বিখ্যাত বই ‘অ্যান আনসার্টেইন গ্রেইস’ এ তিনি বৃহৎ যোগাযোগের এই যুগে মানবতাই যে যোগাযোগহীন হয়ে পড়েছে তা তুলে ধরেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তৃতীয় শ্রেনীর আধিবাসীরা বাস করে। তবে পশুর সঙ্গে এদের তফাৎ এরা দু পায়ে হাটতে পারে। তাদের সমস্যা ইতিহাস নয়,সমস্যা ক্ষুধা,মহামারী,সংর্ঘষ। এই চরম সত্যকে লেখক বইটিতে তুলে আনেন। এরপর বলতে হয় তাঁর রচিত ‘দ্য বুক অব এ্যামব্রেসেস’ বইটির কথা। এটি অনেকগুলো ছোট গল্পের সমন্বয়ে গড়ে ওঠেছে। এই গল্পগুলোতে আবেগ,শিল্পকলা,রাজনীতির বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আধুনিক পুজিঁবাদী সমাজের সমালোচনা করা হয়েছে। তাঁর ওয়াকিং ওর্য়াডস বইটিতে নগর ও গ্রামের ঐতিহ্য তুলে ধরে লাতিন আমেরিকার বর্তমান বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে। গেলিয়ানোর সব রচনার মাঝে ভিন্ন ধর্মী একটি বই সকার ইন সান এন্ড শ্যাডো বইটি। গেলিয়ানো ফুটবল প্রিয়। শৈশবে ফুটবল খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলেন। ফুটবল প্রীতির কারণে তিনি এই বইটি লেখেন। এতে খেলার ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়েছে। বইতে তিনি বামপন্থীদের সমালোচনা করেছেন এই খেলাকে বর্জন করায়।
এদুয়ার্দো গেলিয়ানো তাঁর অনবদ্য রচনাগুলোর জন্য জনপ্রিয়তা,খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি অনেক পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেন। গ্লোবাল একচেঞ্জ কর্তৃক ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়াড, স্টিগ ডেগারম্যান অ্যাওয়ার্ড, কাসা ডি লাস আমেরিকাস প্রাইজ, আমেরিকান বুক অ্যাওর্য়াড, কালচারাল ফ্রিডম অ্যাওর্য়াডসহ আরো অনেক পুরস্কার লাভ করেন। লাতিন আমেরিকার খ্যাতিমান এই লেখকের জীবন ছিল ঝঞ্চাক্ষুব্ধ। তিনি আত্ম হত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। ম্যালেরিয়া,হার্ট অ্যাটাক,কারাগারের বন্দী জীবন,নির্বাসন, স্বৈরচারের রোষানালসহ নানা ঝামেলার মাঝেই জীবন কেটেছে তাঁর। আর এরই মাঝে তিনি রচনা করেছেন এক একটি অনবদ্য সাহিত্যে কর্ম। এখন এই চুয়াত্তর বছর বয়সেও নিয়মিত লিখে চলছেন। আর প্রতিবাদ করে চলছেন সা¤্রাজ্যবাদ,নির্যাতন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment