Thursday, July 17, 2014

সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে রুখসানা কাজল

সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে
রুখসানা কাজল
নারীই কি নারীর অগ্রগতির পথে কখনও কখনও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ? এমন কোন আচরণ করে বসে যার ফলে এক নারীর জীবনে তার মা, বোন, বান্ধবীরা শত্রুতে পরিণত হয়? সামাজিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীর মধ্যে চিরন্তন হয়ে আছে ভয়, মান্যতা, একাগ্রতা, যে কোন পরিবর্তনে দ্বিধা, অনীহা বা শঙ্কা, গতানুগতা, প্রতিরোধ, গৃহস্থালি নিয়মানুবর্তিতা, ভালবাসা, ঈর্ষা ইত্যাদি। যে কোন পরিস্থিতিতে নারী যদি বুঝতে পারে ব্যক্তিগত বা সাংসারিক জীবনে কোন পরিবর্তন আসছে তাহলে সে সর্বপ্রথমেই সন্দিহান হয়ে উঠে তা গ্রহণ করতে। কেননা তার রচিত সামাজিক জীবনের ছন্দিত গ-িতে এই পরিবর্তন কোন ক্ষতি আনছে না কি লাভ আনছে সে বিষয়টি নিয়ে নারী সর্ব প্রথম ভাবিত হয় পড়ে। নারীর জীবনে প্রগতিশীল পরিবর্তন একান্তই তার ভালোর জন্য হচ্ছে এ ব্যাপারটি বুঝতে অনেক সময় লেগেছে তাদের। অবশ্য এজন্য নারীকে দোষারোপ করে এককভাবে দায়ী করা যায়না। যে জটিল সুসংঘবদ্ধ মানসিকতা আজও নারী ধারণ করে রেখেছে তার জন্য যে তার নিজের যথেষ্ট ক্ষতি হচ্ছে তা বোঝার মনকে, উপলব্ধিকে রুদ্ধ করে রেখেছে পুরুষ রচিত নিয়মের সুকঠিন নামাবলী।
এক সময়ে নারীর জীবন সম্পূর্ণ আবর্তিত হত বা হয় পুরুষের ভাবনার অলিগলি ধরে। পুরুষ শক্তিশালী, নারী দুর্বল, পুরুষ আয় করে নারী বেকার, পুরুষের জন্য বহির্জগত নারী অন্দরের শোভা এই সব ধারণা বহু বছর ধরে এমনভাবে নারীর মনকে কুণ্ঠিত অবগুনণ্ঠনে ঢেকে রেখেছিল যে নারী মনে করত, তাদের সুরক্ষার হেফাজত করার লক্ষ্যেই পুরুষের আজীবন যতœ প্রচেষ্টা। তাই নারীর কাছে পুরুষ রচিত এই সব নিয়মাবলীর শৃঙ্খল ভেঙ্গে সহসা বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। নারীর নিজস্ব সত্ত্বা আর তার নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার কথা ছিল পুরুষ রচিত নিয়মের প্রতিধ্বনি মাত্র। বিশ্বের মুষ্টিমেয় কিছু নারী নিজের কথা বলার শক্তি অর্জন করেছে মাত্র। অধিকাংশ নারীই রয়েছে সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত। শিক্ষা, বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল কাজে অংশগ্রহণ, নেতৃত, সংগঠন, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয়তার অভাবে একটি বৃহৎ নারীসমাজ এখনও মানসিকতায় অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। আর ঠিক এই সকল কারণে একজন নারী অন্য একজন প্রগতিশীল অগ্রগামী নারীকে সমর্থন দিতে দ্বিধাবোধ করে। এমন কি নিজ পরিবারেই যদি কোন বোন, খালা, ফুপু, চাচি, মামি গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের পছন্দের জীবনকে বেছে নেয় তাতেও তারা সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠে। অনেকেই উদ্ধত বলে নিজের পরিবারের মেয়েদের তিরস্কার করে দূরে সরিয়ে রাখে আজীবন। যদিও সামাজিক পরিবর্তনের ধারায় আজ নারী সমাজ অনেকদুর এগিয়ে এসেছে কিন্তু নারীদের মধ্যে অজানাকে জানার কৌতূহল যা তাকে নতুন রূপে নতুন করে ভাবতে শেখাবে তা গ্রহণ করার মানসিকতা এখনও স্পষ্টভাবে গড়ে ওঠেনি। এই কারণে নিজেদের গপিাড়ন । ফলে পরিবারে গড়ে উঠেছে বউ-শাশুড়ি দ্বন্দ্ব। বধূ নির্যাতন আমাদের বাঙালী সমাজে এক স্বাভাবিক ঘটনা মাত্র। একবার আনন্দ বাজার পত্রিকা মেয়েদের বিবাহিত জীবনের উপর চিঠি ছেপেছিল। তাতে চমকে ওঠার মতো কিছু কাহিনী বেরিয়ে আসে। অনেক শাশুড়ি আছে যারা ছেলেবৌকে আলাদা করে স্বামীর সাথে কোথাও বেড়াতে বা ঘুরতে যেতে দিত না। তারা বলত, আগে আমি মরে যাই তারপর ঘুরো ফেরো যা খুশী তাই করো। একজন বৌমা লিখেছিল তার আর কোনদিন স্বামীর সাথে আলাদা করে ঘুরে বেড়ানো সাধ পূর্ণ হয়নি জীবনে। কেননা তার স্বামী মারা গেছিল বিয়ের অল্পদিনেই। এটাও নারীদের এক ধরনের মানসিক অবস্থার বহিপ্রকাশ। ছেলের উপর মায়ের অধিকার কমে যাওয়ার ভয় থেকেই এমন বিরূপ ব্যবহার করেছিল শাশুড়ি। এখনও অনেক শাশুড়ি ছেলেবৌকে নানাভাবে অত্যাচার করে। কেন একজন নারী হয়ে অন্য একজন নারীর উপর এই আচরণ তার কারণ যে হারানোর নিরাপত্তা হীনতা তা স্পষ্ট বোঝা যায়। অন্যদিকে এক সমাজ সেবিকা এক শাশুড়ি ছেলেবৌকে যতই আপন করে নেয়ার চেষ্টা করে না কেন, ছেলেবৌ শাশুড়িকে মোটেই গুরুত্ব দেয় না। বৌমা নিজে নিজের জগত নিয়ে থাকতে ভালবাসে। একজন উচ্চপদস্থ চিকিৎসক ভদ্রমহিলা দুটি শিশু সন্তানকে সংসার সমুদ্রে ভাসিয়ে সুইসাইড করে ফেলে। কারণ স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত বলে। অর্থাৎ নারী যতই শিক্ষিত, স্বাবলম্বী হোক না কেন তার মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠেনি যথাযথভাবে।
এ ছাড়াও রয়েছে ধর্ম। বিশ্বের প্রতিটি ধর্ম গ্রন্থে নারীর জন্য অনুশাসনের ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। ধর্ম নারীকে শৃঙ্খলিত করেছে। নারীর মন এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে সঙ্কুচিত করে রেখেছে। দেখা যায় যে ধর্ম এবং ধর্মীয় স্থানগুলোর প্রতি যথাযথভাবে এক দুর্নিবার আকর্ষণ কাজ করে নারীদের মধ্যে। ধর্ম কখনই নারীর নেতৃত্বের গুণের কথা স্বীকার করেনি। সকল ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের দায়ভার পুরুষকে দেয়া হয়েছে। বীর পিতা, বীর স্বামী, বীর ভ্রাতা, বীর প্রণয়ীর পূজা দিতে নারীর ভূমিকা পূজারিণীর উর্ধে নয় কিছুতেই। প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও নারীর কোন ভূমিকা নেই। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত নবী এসেছে তার মধ্যে নারী নবী নেই একজনও। সৃষ্টিকর্তার আপন হাতে তৈরি নারী। যার মধ্যে তিনি বিশ্ব জননীকে তুলে ধরেছেন। সাম্য, ক্ষমা, ভালবাসায় নারী সদ্গুণের অধিকারী। যুদ্ধ, কলহ, হত্যা, খুন, জবর দখল ইত্যাদি নেগেটিভ মানসিকতার বিপক্ষে নারী। তা হলে কেন তিনি একজন নারী নবী দিলেন না এই পৃথিবিতে? পুরুষরা কিন্তু কারণে অকারণে এই উদাহরণটি দিয়ে নারীদের ঘায়েল করে প্রায়শ। নারী যদি এই বাক্যটিকে কখনও তলিয়ে ভাবে দেখবে যে এটি নারীর প্রতি একটি অবমাননাকর উক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে ধর্ম গ্রন্থগুলো পুরুষের স্বার্থ পূরণ করতেই রচনা করা হয়েছে। তাই প্রতিটি নবী হয়েছেন পুরুষ। এই সকল ধর্ম গ্রন্থের অনুশাসন কেবল স্ত্রীলোকের জন্য। কিন্তু এই কথাগুলো বুঝতে গেলে নারীদের পর্যাপ্ত শিক্ষা, উদার পরিবেশ, অধিকারবোধ, বাস্তব বুদ্ধি এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করাতে হবে। বর্তমান বিশ্ব অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এই পরবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে নারীরা এগিয়ে চলেছে সমান তালে। কিন্তু এখনও পারিবারিক সহিংসতা রয়ে গেছে। এখনও শাশুড়ির কাছে বধূ নির্যাতিত হচ্ছে। গ্রামীণ সমাজে এখনও টিকে আছে বাল্যবিবাহ। এখনও ডিভোর্সি নারীকে সইতে হয় নিজ পরিবারে পারিবারিক গঞ্জনা। এ সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে প্রতিবাদ করতে হবে।
নারীর প্রতি নারীর সম্মানের, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। নারীদের জন্য এটা জানাই বড় কথা যে ধর্ম, রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার কেউই নারীর প্রতি সম্পূর্ণ সহায়ক বন্ধু নয়। অতীতে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারের রক্ষণশীল মন ও নারীর বিপক্ষে ভূমিকা রাখার কারণে নারীরা অবরুদ্ধ জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে বলেই নারীরা পশ্চাৎপদ থেকে গেছে।
কিন্তু আজ সময় বদলে গেছে। তাই নারীদের জন্য রাষ্ট্র আজ যে উদারনীতি গ্রহণ করেছে তার সুযোগ গ্রহণ করে নারীর মনকে উদার এবং প্রগতিশীল করে গড়ে তুলতে হবে। কেবল তাই নয়, নারী হয়ে আরও একজন নারীর প্রতি আহ্বান এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যেন একজন নারীর বিপক্ষে আরও একজন নারী কখনও প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায় ।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment