ঈদে পরিবারপ্রতি খরচ বেড়েছে ৫ থেকে ২০ গুণ
০ শুধু ঈদ-উল-ফিতরে অর্থনৈতিক আকার দাঁড়াচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা
০ প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা
০ ঈদে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিচ্ছে ৫ কোটি পরিবার
০ এবার খুচরা পর্যায়ে বিক্রি বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ গুণ
০ প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা
০ ঈদে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিচ্ছে ৫ কোটি পরিবার
০ এবার খুচরা পর্যায়ে বিক্রি বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ গুণ
এম শাহজাহান ॥ স্ত্রী সালমা বেগমের কাছ থেকে ঈদ কেনাকাটার একটি তালিকা পেয়েছেন সরকারী কর্মকর্তা মান্নান চৌধুরী। ওই তালিকা হাতে আসার পর ঈদ বাজেট তৈরি করা হয়েছে। এবার চূড়ান্ত কেনাকাটার পালা। এই উৎসব রাঙিয়ে তুলতেই এই মুহূর্তে তাঁর যত আয়োজন। উৎসব সামনে রেখে কেনাকাটার জন্য যে বাজেট তৈরি করেছেন মান্নান সাহেব তা বছরের অন্য যে কোন মাসের চেয়ে ৫ গুণ বেশি। তারপরও স্ত্রী সালমা বেগম কেনাকাটা শেষ করতে পারবেন কিনা সন্দেহ তাঁর। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার এখন ঈদ উৎসবের প্রস্তুতি রয়েছে। ঈদে পরিবার প্রতি খরচ বেড়েছে ৫ থেকে ২০ গুণ। বাড়তি এই ব্যয়ের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়ছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ের পরিমাণও। ঈদে এ ব্যয় আরও বেড়েছে। তারপরও খুশি ঈদ বাজারে ক্রেতারা। খরচ বাড়লেও ঈদ আনন্দে ভাটা পড়েনি। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং ঈদ বাজারের ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এ তথ্য। ঈদে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। খুচরা পর্যায়ে এবারে বিক্রি বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ গুণ।
জানা গেছে, ঈদকেন্দ্রিক উৎসব পালনে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়ছে। কেনাকাটার জন্য যে বাজেট করা হয় শেষ পর্যন্ত তাতে কুলিয়ে ওঠা যায় না। সূত্রগুলো বলছে, ঈদের সময় কোন কোন পরিবারে সর্বনিম্ন ৫ থেকে ২০ গুণ অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, এই ঈদে সবার খরচ বেড়েছে। দেশের ৫ কোটি পরিবার এই উৎসবে যোগ দেবে। তবে সবার খরচ এক রকম নয়, সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্তের পরিবার ঈদ বোনাস ও বেতনের পুরো টাকা এই ঈদে খরচ করবে। সেক্ষেত্রে খরচ বাড়বে ৫ গুণ পর্যন্ত। মধ্যবিত্তের পরিবারগুলো যাঁরা চাকরি করেন তাঁরা বেতন, বোনাস ও জমানো সঞ্চিত টাকাও খরচ করে ঈদের বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করবেন। এক্ষেত্রে এসব পরিবারে খরচ বাড়বে ১০-১৫ গুণ পর্যন্ত।
আর উচ্চবিত্তের খরচ হবে ২০ গুণ পর্যন্ত। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়ায় ঈদ বাজারের ব্যাপ্তিও বেড়েছে। শুধু রোজার ঈদের অর্থনৈতিক আকার হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। পুরো টাকাটাই এই উৎসবে বাড়তি ব্যয় করা হচ্ছে। এই অর্থনীতিবিদের মতে, দেশের উচ্চবিত্তের লোকজন সোনারগাঁ, শেরাটন ও ওয়েস্টিন হোটেলে ইফতার করছেন। সেক্ষেত্রে প্রতিপ্লেট ইফতার তাদের কিনতে হচ্ছে সাড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায়। এছাড়া উচ্চবিত্তের পরিবারগুলো দেশের বাইরে ঈদ কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য যাচ্ছেন।
জানা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারে নতুন কাপড়-চোপড়, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার সামগ্রী কেনাকাটা, গরিব মানুষদের যাকাত ও দান-খয়রাত, ইফতার ও সেহরি বাবদ বাড়তি খরচই প্রধান। এছাড়া উচ্চবিত্তের মানুষদের খরচের শেষ নেই। এসব পরিবারে খরচ বাড়বে ২০ গুণ পর্যন্ত। উচ্চবিত্তের এসব পরিবারে জনপ্রতি ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ বাড়বে। নতুন কাপড়, স্বর্ণ, ডায়মন্ড, বিলাসী পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও উপহার প্রদান, যাকাত-ফিতরা আদায়, দান-খয়রাত, ঈদে বিদেশ ভ্রমণ ও দামী ফার্নিচার ও গাড়ি পরিবর্তন করবেন কোন কোন পরিবার।
অপর একটি সূত্র বলছে, এবারে ৫ কোটি পরিবার ঈদ কেনাকাটায় যোগ দিচ্ছে। দেশে ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ধনীর সংখ্যা মাত্র ৪১ লাখ। ঈদবাজারে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশই ব্যয় হয় এই উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষের কেনাকাটায়। এর বাইরে ঈদ কেনাকাটায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় আরও ২ কোটি ১৬ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ১ কোটি ৪৬ লাখ মধ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাধারণ মানুষ।
এর মধ্যে ধনীদের অস্বাভাবিক আর মধ্যবিত্তের বাড়তি ব্যয়ের জুড়ি নেই। আবার ঘরে টানাপোড়েন থাকলেও সাধ আর সাধ্যের লড়াইয়ের ঈদ কেনাকাটায় পিছিয়ে নেই নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষও। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি রেখে তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেন ঈদ কেনাকাটায় শামিল হতে।
মামুন রশীদ রচিত ‘বাঙালীর উৎসবের অর্থনীতি’ নামক একটি গবেষণায় আরও বলা হয়েছে ঈদের ব্যাপ্তি প্রতিবছর বাড়ছে। মানুষের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে ক্রয় ক্ষমতা। একই সঙ্গে তাদের বাড়তি পরিশ্রম ও কাজ করতে হচ্ছে। ফলে অবসরের তেমন সুযোগ না পাওয়ায় যে কোন উৎসবে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতি দৃঢ় হওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলো কাজ করছে। বিশেষ করে বোনাস, বেতন ও জমানো টাকা খরচ করেও উৎসব পালনে মেতে ওঠেন ৫ কোটি পরিবার। অর্থাৎ শুধু রোজার ঈদে অর্থনীতির ন্যূনতম আকার হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা।
অপর একটি সূত্র দাবি করেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে থাকে। কোন কোন পরিবারের ব্যয় এর চেয়েও বেশি। অন্যদিকে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ব্যয় হয় সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা। মধ্য মধ্যবিত্তের ঈদ বাজেট সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা ধরা হয় আর নিম্নমধ্যবিত্তের ব্যয় ১০-১৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
ঈদ কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী পণ্যের বিপুল সমাহার ঘটলেও উচ্চবিত্তদের অনেকেই ঈদের বাজার করেন দেশের বাইরে গিয়ে। রোজার মাসের শুরু থেকেই এরা সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে সফরে যান। মূলত আভিজাত্য বজায় রাখতেই এরা বিদেশের বাজার থেকে হাল-ফ্যাশনের পোশাক ও অন্যান্য বিলাসসামগ্রী নিয়ে আসেন। এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণও প্রায় হাজার কোটি টাকা বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে সপরিবারে ঈদ কেনাকাটা করতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আকতার হোসেন। জানতে চাইলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এই ঈদে বাড়তি খরচের শেষ নেই। নিজের পরিবার, বাবা-মা, গ্রামের আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুর-শাশুড়ি সবার জন্য কেনাকাটা করতে হচ্ছে। এছাড়া এলাকার গরিবের জন্য যাকাতের কাপড়ও কেনাকাটা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের অন্য যে কোন মাসের চেয়ে এ মাসে তাঁর খরচ ৫ থেকে ৮ গুণ বেড়েছে।
একই কথা বললেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঈদ কেনাকাটায় তাঁর অন্য মাসের চেয়ে ১০ গুণ খরচ বেড়েছে। তারপরও সবাইকে সন্তুষ্ট করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে জাহিদের।
বেসরকারী কর্মকর্তা শামীমা শারমিন বলেন, সবার জন্য কেনাকাটা করতে গিয়ে বোনাস ও বেতনের টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন জমানো টাকায় হাত দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই মাসে আত্মীয়-স্বজনসহ তাঁর পরিবারের কেনাকাটা করতে গিয়ে ১৫ গুণ বেশি খরচ করতে হয়েছে। তারপরও কেনাকাটা এখন শেষ হয়নি বলে জানালেন তিনি। এই কর্মকর্তার মতে, খরচ বাড়লেও তিনি খুশি। কারণ ঈদ তো আর সব সময় আসে না। বছরে একবারই রোজার ঈদ। তাই খরচ বাড়লেও আনন্দে ভাটা পড়েনি।
বাড়তি কেনাকাটা হওয়ায় সারাদেশে ঈদকেন্দ্রিক প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে। গত বছর পোশাকের বাজারে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা। এবার আরও ১০-১৫ শতাংশ কেনাকাটা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন এই লেনদেন শেষ পর্যন্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আর সব মিলিয়ে ঈদে কেনাকাটা ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ জনকণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় খুচরা পর্যায়ে গতবছরের তুলনায় এ বছর ১০-১৫ শতাংশ বেচাবিক্রি বেশি হবে। তিনি বলেন, ঈদে ঠিক কী পরিমাণ বেচাবিক্রি হয়ে থাকে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে ব্যাংক ঋণ, দোকানের সংখ্যা এবং আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যে অনুমান করা হয় তাতে শুধু পোশাক বিক্রি হবে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য শিল্পে প্রায় আরও ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার বেচাবিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, ঈদে মানুষ আনন্দের জন্য বাড়তি ব্যয় করে। এটাই সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশাসন। কারণ এ মাসে শুধু নিজেদের জন্য নয়, আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেয়া থেকে শুরু করে গরিব মানুষদের যাকাত-ফিতরা দেয়া হয়। সেদিক থেকে এ বছর যাকাতের শাড়ি বিক্রিতেও নতুন রেকর্ড হবে।
জানা গেছে, ঈদকেন্দ্রিক উৎসব পালনে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়ছে। কেনাকাটার জন্য যে বাজেট করা হয় শেষ পর্যন্ত তাতে কুলিয়ে ওঠা যায় না। সূত্রগুলো বলছে, ঈদের সময় কোন কোন পরিবারে সর্বনিম্ন ৫ থেকে ২০ গুণ অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, এই ঈদে সবার খরচ বেড়েছে। দেশের ৫ কোটি পরিবার এই উৎসবে যোগ দেবে। তবে সবার খরচ এক রকম নয়, সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্তের পরিবার ঈদ বোনাস ও বেতনের পুরো টাকা এই ঈদে খরচ করবে। সেক্ষেত্রে খরচ বাড়বে ৫ গুণ পর্যন্ত। মধ্যবিত্তের পরিবারগুলো যাঁরা চাকরি করেন তাঁরা বেতন, বোনাস ও জমানো সঞ্চিত টাকাও খরচ করে ঈদের বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করবেন। এক্ষেত্রে এসব পরিবারে খরচ বাড়বে ১০-১৫ গুণ পর্যন্ত।
আর উচ্চবিত্তের খরচ হবে ২০ গুণ পর্যন্ত। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়ায় ঈদ বাজারের ব্যাপ্তিও বেড়েছে। শুধু রোজার ঈদের অর্থনৈতিক আকার হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। পুরো টাকাটাই এই উৎসবে বাড়তি ব্যয় করা হচ্ছে। এই অর্থনীতিবিদের মতে, দেশের উচ্চবিত্তের লোকজন সোনারগাঁ, শেরাটন ও ওয়েস্টিন হোটেলে ইফতার করছেন। সেক্ষেত্রে প্রতিপ্লেট ইফতার তাদের কিনতে হচ্ছে সাড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায়। এছাড়া উচ্চবিত্তের পরিবারগুলো দেশের বাইরে ঈদ কেনাকাটা ও ভ্রমণের জন্য যাচ্ছেন।
জানা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারে নতুন কাপড়-চোপড়, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার সামগ্রী কেনাকাটা, গরিব মানুষদের যাকাত ও দান-খয়রাত, ইফতার ও সেহরি বাবদ বাড়তি খরচই প্রধান। এছাড়া উচ্চবিত্তের মানুষদের খরচের শেষ নেই। এসব পরিবারে খরচ বাড়বে ২০ গুণ পর্যন্ত। উচ্চবিত্তের এসব পরিবারে জনপ্রতি ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ বাড়বে। নতুন কাপড়, স্বর্ণ, ডায়মন্ড, বিলাসী পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও উপহার প্রদান, যাকাত-ফিতরা আদায়, দান-খয়রাত, ঈদে বিদেশ ভ্রমণ ও দামী ফার্নিচার ও গাড়ি পরিবর্তন করবেন কোন কোন পরিবার।
অপর একটি সূত্র বলছে, এবারে ৫ কোটি পরিবার ঈদ কেনাকাটায় যোগ দিচ্ছে। দেশে ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ধনীর সংখ্যা মাত্র ৪১ লাখ। ঈদবাজারে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশই ব্যয় হয় এই উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষের কেনাকাটায়। এর বাইরে ঈদ কেনাকাটায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় আরও ২ কোটি ১৬ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ১ কোটি ৪৬ লাখ মধ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাধারণ মানুষ।
এর মধ্যে ধনীদের অস্বাভাবিক আর মধ্যবিত্তের বাড়তি ব্যয়ের জুড়ি নেই। আবার ঘরে টানাপোড়েন থাকলেও সাধ আর সাধ্যের লড়াইয়ের ঈদ কেনাকাটায় পিছিয়ে নেই নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষও। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি রেখে তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেন ঈদ কেনাকাটায় শামিল হতে।
মামুন রশীদ রচিত ‘বাঙালীর উৎসবের অর্থনীতি’ নামক একটি গবেষণায় আরও বলা হয়েছে ঈদের ব্যাপ্তি প্রতিবছর বাড়ছে। মানুষের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে ক্রয় ক্ষমতা। একই সঙ্গে তাদের বাড়তি পরিশ্রম ও কাজ করতে হচ্ছে। ফলে অবসরের তেমন সুযোগ না পাওয়ায় যে কোন উৎসবে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতি দৃঢ় হওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলো কাজ করছে। বিশেষ করে বোনাস, বেতন ও জমানো টাকা খরচ করেও উৎসব পালনে মেতে ওঠেন ৫ কোটি পরিবার। অর্থাৎ শুধু রোজার ঈদে অর্থনীতির ন্যূনতম আকার হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা।
অপর একটি সূত্র দাবি করেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে থাকে। কোন কোন পরিবারের ব্যয় এর চেয়েও বেশি। অন্যদিকে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ব্যয় হয় সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা। মধ্য মধ্যবিত্তের ঈদ বাজেট সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা ধরা হয় আর নিম্নমধ্যবিত্তের ব্যয় ১০-১৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
ঈদ কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী পণ্যের বিপুল সমাহার ঘটলেও উচ্চবিত্তদের অনেকেই ঈদের বাজার করেন দেশের বাইরে গিয়ে। রোজার মাসের শুরু থেকেই এরা সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে সফরে যান। মূলত আভিজাত্য বজায় রাখতেই এরা বিদেশের বাজার থেকে হাল-ফ্যাশনের পোশাক ও অন্যান্য বিলাসসামগ্রী নিয়ে আসেন। এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণও প্রায় হাজার কোটি টাকা বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে সপরিবারে ঈদ কেনাকাটা করতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আকতার হোসেন। জানতে চাইলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এই ঈদে বাড়তি খরচের শেষ নেই। নিজের পরিবার, বাবা-মা, গ্রামের আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুর-শাশুড়ি সবার জন্য কেনাকাটা করতে হচ্ছে। এছাড়া এলাকার গরিবের জন্য যাকাতের কাপড়ও কেনাকাটা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের অন্য যে কোন মাসের চেয়ে এ মাসে তাঁর খরচ ৫ থেকে ৮ গুণ বেড়েছে।
একই কথা বললেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঈদ কেনাকাটায় তাঁর অন্য মাসের চেয়ে ১০ গুণ খরচ বেড়েছে। তারপরও সবাইকে সন্তুষ্ট করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে জাহিদের।
বেসরকারী কর্মকর্তা শামীমা শারমিন বলেন, সবার জন্য কেনাকাটা করতে গিয়ে বোনাস ও বেতনের টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন জমানো টাকায় হাত দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই মাসে আত্মীয়-স্বজনসহ তাঁর পরিবারের কেনাকাটা করতে গিয়ে ১৫ গুণ বেশি খরচ করতে হয়েছে। তারপরও কেনাকাটা এখন শেষ হয়নি বলে জানালেন তিনি। এই কর্মকর্তার মতে, খরচ বাড়লেও তিনি খুশি। কারণ ঈদ তো আর সব সময় আসে না। বছরে একবারই রোজার ঈদ। তাই খরচ বাড়লেও আনন্দে ভাটা পড়েনি।
বাড়তি কেনাকাটা হওয়ায় সারাদেশে ঈদকেন্দ্রিক প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে। গত বছর পোশাকের বাজারে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা। এবার আরও ১০-১৫ শতাংশ কেনাকাটা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন এই লেনদেন শেষ পর্যন্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আর সব মিলিয়ে ঈদে কেনাকাটা ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ জনকণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় খুচরা পর্যায়ে গতবছরের তুলনায় এ বছর ১০-১৫ শতাংশ বেচাবিক্রি বেশি হবে। তিনি বলেন, ঈদে ঠিক কী পরিমাণ বেচাবিক্রি হয়ে থাকে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে ব্যাংক ঋণ, দোকানের সংখ্যা এবং আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যে অনুমান করা হয় তাতে শুধু পোশাক বিক্রি হবে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য শিল্পে প্রায় আরও ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার বেচাবিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, ঈদে মানুষ আনন্দের জন্য বাড়তি ব্যয় করে। এটাই সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুশাসন। কারণ এ মাসে শুধু নিজেদের জন্য নয়, আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেয়া থেকে শুরু করে গরিব মানুষদের যাকাত-ফিতরা দেয়া হয়। সেদিক থেকে এ বছর যাকাতের শাড়ি বিক্রিতেও নতুন রেকর্ড হবে।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment