Thursday, July 17, 2014

সন্দেশখালির মেছোঘেরিতে বাবার পায়ের জুতো দেখেই শনাক্ত করলেন মেয়ে

সন্দেশখালির মেছোঘেরিতে বাবার পায়ের জুতো দেখেই শনাক্ত করলেন মেয়ে

Aajkaal: the leading bengali daily newspaper from Kolkata

স্বদেশ ভট্টাচার্য: কানমারি (সন্দেশখালি), ১৬ জুলাই– সোনালি ঘড়িটা তখনও চলছে৷‌ সময় বলছে ১২টা ৫৭৷‌ পায়ের জুতোটা তেমনই বাঁধা৷‌ দেখে মাথাটা ঘুরে গেল তরুণীর৷‌ সামলে নিয়ে বসে পড়লেন৷‌ ঘড়ি, জুতো, বেল্ট দেখে বাবার দেহ শনাক্ত করলেন রণিতা মুখার্জি৷‌ শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ার রজতশুভ্র মুখার্জির পচাগলা দেহ উদ্ধার হল উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি কানমারি গ্রামের একটি মেছোঘেরি থেকে৷‌ আজ, বুধবার হাওড়া সিটি পুলিসের একটি দল সন্দেশখালি থানার পুলিসের সাহায্যে দেহটি উদ্ধার করে৷‌ বসিরহাটের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কওসার আলম উপস্হিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারের দেহ উদ্ধারের সময়৷‌ এমনিতে দেহটি চেনার উপায় নেই৷‌ মেছোঘেরির মধ্যে জলকাদায় ৫৪ দিন আগে পুঁতে রাখা রজতশুভ্র মুখার্জির দেহ পচেগলে একশা৷‌ গত ২৩ মে অফিস যাওয়ার পথে অপহূত হন রজতশুভ্র মুখার্জি (৫২)৷‌ তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় গাড়িতে তুলে খুন করা হয়৷‌ হাওড়া পুলিস কমিশনারেটের তদম্তে হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার হয়৷‌ ধৃতরা হল পার্থ দে ওরফে শুভেন্দু, সন্তু সর্দার, গৌতম সাহু, রণজিৎ মাইতি, বাবলু জানা৷‌ পার্থ নিহত ইঞ্জিনিয়ারের দূর সম্পর্কের শ্যালক৷‌ রজতশুভ্রবাবুর বড় মেয়ে রণিতাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল৷‌ বাধা দিয়েছিলেন রজতবাবু৷‌ তার পরিণতিতেই খুন৷‌ শুভেন্দু, সন্তু, গৌতমকে পুলিস হাওড়া থেকে গ্রেপ্তার করে৷‌ রণজিৎ মাইতি, বাবলু জানার বাড়ি সন্দেশখালির উত্তর কানমারি গ্রামে খড়িহাট সর্দারপাড়ায়৷‌ পুলিস সোমবার সন্দেশখালি থেকে গ্রেপ্তার করে৷‌ রণজিতের ডেকোরেটরের ব্যবসা কানমারি বাজারে৷‌ বাবলু জানার ৫৷‌৭ বিঘের মেছোঘেরি আছে৷‌ মাঝে মধ্যে মজুর খাটতে যায় কলকাতায়৷‌ খুনের প্রধান চক্রী পার্থ ওরফে শুভেন্দুর গারমেন্টসের ব্যবসা আছে৷‌ কানমারি বাজারে গারমেন্টস সরবরাহ করে পার্থ৷‌ সেই সূত্রে যাতায়াত৷‌ রণজিৎ, বাবলুর সঙ্গে পরিচয়৷‌ ২৩ মে নিজের গাড়ির মধ্যে রজতশুভ্রকে খুন করে মৃতদেহ গায়েব করতে পার্থ রণজিৎ, বাবলুর শরণাপন্ন হয়৷‌ বাবলুর বাড়ির পাশেই মেছোঘেরিতে গর্ত খোঁড়া হয়েছিল৷‌ ওই দিন রাত ৩টের সময় মৃতদেহ নিয়ে গাড়ি চলে আসে কানমারিতে৷‌ মৃতদেহ পুঁতে ফেলা হয়৷‌ কাজ সেরে রুটি মাংস, বাগদা চিংড়ি মাছ ভাজার বন্দোবস্ত রেখেছিল রণজিৎ৷‌ খাওয়া দাওয়া সেরে পার্থরা ফিরে যায়৷‌ এত কাণ্ডের পর বাবলু, রণজিতের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি৷‌ সে কথা জানিয়েছে বাবলুর স্ত্রী সুলেখা জানা, রণজিতের স্ত্রী শেফালি মাইতি৷‌ দু’জনের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না তাদের স্বামীরা এই কাজ করতে পারে৷‌ তবে দু’জনেই বলেছেন, যদি সত্যিই তাদের স্বামীরা এই জঘন্য কাজে যুক্ত থাকে তা হলে অন্যদের মতো যেন একই সাজা হয়৷‌ সুলেখা, শেফালিরা বলেন, যেভাবে আমাদের মুখ পুড়ল তাতে ছেলেদের নিয়ে গ্রামে থাকব কী করে৷‌ বাবলুর ছেলে লব জানা ক্ষোভে ফুঁসছেন৷‌ বলেন, বাবা এমন কাজ করে থাকলে চরম শাস্তি দাবি করছি৷‌ ঘটনা দেখে শুনে হতবাক কানমারি গ্রাম৷‌ গত সোমবার প্রথম পুলিস এসেছিল বাবলু জানা ও রণজিৎ মাইতির বাড়ি৷‌ বাবলুর স্ত্রী পুলিসকে একটা কোদাল তুলে দিয়েছিল৷‌ গ্রামের মানুষ সেই কোদাল নিয়ে যেতে দেখেছেন পুলিসকে৷‌ কিন্তু তার পেছনে যে এত বড় রহস্য রয়েছে কেউ আঁচ করেনি৷‌ আজ সকাল থেকে কানমারি গ্রামে কয়েক হাজার লোক৷‌ পুলিস মেছোঘেরি এলাকাটা ঘিরে রেখেছিল৷‌ এদিন বেলা ১২টা নাগাদ হাওড়া পুলিস কমিশনারেটের দুই অফিসার সোমদেব ব্যানার্জি, বিদিত কুমার মণ্ডলের নেতৃত্বে পুলিস বাহিনী কানমারি গ্রামে ঢোকে৷‌ হাটগাছি পঞ্চায়েত রেখে লকাই প্রামাণিকের বাড়ির ভেতর দিয়ে পুলিস আলপথ ধরে অকুস্হলে পৌঁছয়৷‌ স্হানীয় মানুষের কাছে সর্দারপাড়া শ্শান বলে এলাকাটার পরিচিতি৷‌ ঘটনাস্হলে পৌঁছন বসিরহাটের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কওসার আলম৷‌ রণজিৎ, বাবলু জায়গাটা দেখিয়ে দেয়৷‌ শুরু হয় খোঁড়াখুঁড়ি৷‌ কয়েক কোদাল মাটি সরাতেই মাথার চুল, খুলি বেরিয়ে আসে নিহত ইঞ্জিনিয়ারের৷‌ দেহ শনাক্ত করার জন্য রণিতাকে সঙ্গে এনেছিল পুলিস৷‌ ধৃত পার্থ, সন্তু, গৌতমকেও এনেছিল৷‌ তবে তাদের ঘটনাস্হল থেকে একটু দূরে রাখা হয়েছিল জনরোষের আশঙ্কায়৷‌ কারণ কানমারির মানুষ তাদের ওপর খেপে আছে, এরকম একটা ঘটনার সঙ্গে এলাকার নাম জড়ানোয়৷‌ হাটগাছি পঞ্চায়েতের প্রধান সুকুমার মাহাতো বলেন, ওদের জন্যই আজ কলঙ্কিত কানমারি৷‌ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাদের গ্রামের ২ জনকে জড়িয়েছে জঘন্য কাজে৷‌ রজতশুভ্র মুখার্জির মেয়ে রণিতা এদিন ভেঙে পড়েন৷‌ তাঁকে সাম্ত্বনা দিচ্ছিলেন তাঁর বন্ধু শৌনক দাশগুপ্ত৷‌ দোষীদের চরম সাজা দাবি করে রণিতা বলেন, ভেবেছিলাম ওরা বাবাকে প্রাণে মারবে না৷‌ ওদেরও তো ঘরে সম্তান আছে৷‌ এমন কেউ করতে পারে? রণিতা বলেন, পুলিসের ওপর আস্হা আছে৷‌ আমরা চাই চরম শাস্তি৷‌ মৃতদেহ ময়নাতদম্তে পাঠানো হয়েছে বসিরহাট জেলা হাসপাতালে৷‌

No comments:

Post a Comment