Thursday, July 24, 2014

বাংলা সাহিত্য ও বইমেলা দাউদ হায়দার

বাংলা সাহিত্য ও বইমেলা
দাউদ হায়দার
বলতেই হবে, বিশ্বজিত সাহা কর্মী ও উদ্যোগী পুরুষ এবং সুপুরুষ। ওঁর স্ত্রী রুমা সাহা যতটা গৃহিণী, সংসারী, আরও বেশি সংগঠক ও কবি। চুল বাঁধেন, ভালো তরকারি, ডাল রান্না করেন, সুস্বাদু কেক এবং পুডিঙও বানান। সন্তানদের রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায় পড়ান, নাচগানও শেখান। কি করে বিশ্বমানব-মানবিক হতে হয়, তালিমও দেন। বিশ্বজিত সাহার সঙ্গে রুমাও মুক্তধারা পরিচালনায় যুক্ত, নেপথ্য তবে। বিশ্বজিত সাহার ফার্স্ট কাজিন চিত্তরঞ্জন সাহা, বাংলাদেশে প্রকাশনার ভুবনে বহু মান্য, স্বর্গ থাকলে বছর কয়েক আগে স্বর্গত। চিত্তবাবুই বাংলাদেশে প্রথম বইমেলার আয়োজক, নিজের প্রচেষ্টায়। এখন না কি মহামিলনমেলা। চিত্তবাবুর ভাইপো বিশ্বজিত, রক্তে বইমেলা ও বইয়ের ব্যবসা থাকবেই। বই প্রকাশের ঝুঁকি নিতে নারাজ, বিস্তর ঝামেলা। বরং ঢাকা-কলকাতা থেকে পছন্দমতো এবং পাঠকপ্রিয় বই এনে বিক্রি করেন, দাম একটু চড়া, এই যা। কারণও আছে। ঢাকা-কলকাতা নিউইয়র্কের বিমানভাড়া কম নয়। গুনতে হয় ডলারে। বই ছেঁড়াফাটা হলে সৌখিন পাঠক কেনে না। চায় ঝকঝকে, আনকোড়া।
পুরোনো হলে গুদামে। দেখলুম, বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গ : নিঃসঙ্গতা রবীন্দ্রনাথ (দ্বিতীয় মুদ্রণ : মে ১৯৭৭। এম.সি.সরকার। কলকাতা।) স্তূপের একেবারে নিচে। কেউ বোধহয় হাতিয়েও দেখে নি। কেবল বই নয়, বাংলা-হিন্দি সিনেমা, বাংলা নাটক (সিরিয়ালও), ডিভিডি, গানের সিডি (সব রকম) সুলভ। ঢাকা-কলকাতার সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক- ত্রৈমাসিক-বার্ষিক পত্রিকাও। গোটা মার্কিন মুল¬ুকে মুক্তধারাই বইপত্র, সিডি, ডিভিডি সাপ্লাই করে। বিশ্বজিত বললেন, এমন অনেক বই আছে ঢাকা-কলকাতায় পাবেন না, নিউইয়র্কের মুক্তধারায় দেখবেন। নায্য দামেই বিক্রি করি। মুক্তধারা প্রতিদিনই খোলা। সন্ধ্যার পরে জমজমাট আড্ডা। পাঠক-লেখকের। খোদ নিউইয়র্কেই শতাধিক লেখক। স্থানীয় লেখক বল্লে গোস্বা করেন। কারোর ধারণা বড়ো কবি এবং আন্তর্জাতিকমানের কবি। গলা চেঁচিয়ে বলেনও সে বারতা। বলতেই পারেন, গলা আছে। কেনই-বা বলবেন না, নিজের কড়ি দিয়ে বই ছাপেন, ইংরেজি অনুবাদ (অতীব জঘন্য। ইংরেজিও শুদ্ধ নয়।), বিনি-পয়সায় বিতরণ করেন। পড়ে না বললে খবর আছে। সাহিত্যিক-মস্তান পাবেন নিউইয়র্কের বাঙালি-অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস, আস্টোরিয়া, জ্যামাইকায়। নিউইয়র্কে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশির বাস, অনেক আসিলাম (অ্যাসিইলাম)-এর বৈধ কাগজপত্র নেই। দিব্যি আছে। ব্ল্যাকে কাজ করছে। পুলিশ কিছু বলছে না। নিউইয়র্কের শাসক (মেয়র) না কি বলেছেন, থাকুক গে। তৃতীয় বিশ্ব গরিব মানুষ। যতক্ষণ ক্রাইম না করছে, থাক বহাল তবিয়তে। ক্রাইম করলে নাড়িভুঁড়িসুদ্ধ টানাটানি। হরিণবাড়িতে বছরের পর বছর। আছে অনেকেই। যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, দেশেও যেতে পারবে না, গেলে ফিরতে পারবে না। বাংলাদেশের বহু উচ্চপদ সরকারি কর্মচারী, কোম্পানির বড়ো কর্তা, বড়ো ব্যবসায়ী ডলারের লোভে আমেরিকায় গিয়ে ফেঁসে গেছে। দিনমজুরের কাজ করে। কেউ- কেউ বিস্তর টাকা, জমিজমা করেছে, ঘুষ খেয়েছে, বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত ডলার এনে রকফেলারের মেজাজে। কেউ কেউ, যেদিন বৃষ্টি হয়, যেদিন হয় না মদ গিলতেন বাড়িতে বা ক্লাবে (ঘুষের টাকায়), নিউইয়র্কে এসে সাচ্চা মুসলমান, নামাজ পড়েন, মসজিদে যান, রোজা রাখেন, তারাবি নামাজও পড়েন, যেমন দেখলুম রোজার মাসে।
নিউইয়র্কে একডজনের বেশি সাপ্তাহিক বাংলা। নামও মনে রাখা দুষ্কর। ঠিকানা নামের সাপ্তাহিক কিনতে হয়, বাকি বিনে পয়সায় ফ্রি। চলে বিজ্ঞাপনে। আমেরিকার যে কোনও বড়ো শহরে এবং কানাডার বড়ো-বড়ো শহরে অনায়াসেই পাওয়া যায়। ফিলাডেলফিয়ায় একজন বাংলাদেশি দোকানদার (দোকানের নাম: সিটি অব জয়) বলেন, ভাইজান, একশ গ্রাম কঁাঁচামরিচ লইয়া যান, ঠিকানা ফিরি (ফ্রি)। বলা হয়নি, আমেরিকার বহু শহরে ২০-৩০ বছর আছেন (বাঙালি এলাকায়), সঠিক ইংরেজিও বলতে পারে না। তামিল, শিখ, হিন্দিভাষীরাও। দরকার নেই। স্প্যানিশরাও। ওরা থাকে স্বভাষীর মহল্লায়। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় (নিউইয়র্ক, শিকাগো, টরেন্টো) নানা কিসিমের খবরাখবর। স্থানীয় এবং বাংলাদেশের। অধিকাংশই রাজনৈতিক। বাংলাদেশের পত্রিকার রাজনৈতিক কলাম পুনর্মুদিত। ঠিকানা- সাপ্তাহিক বিএনপিঘেঁষা, অন্তত, বিএনপি-মার্কা বুদ্ধিবদমাইশ-বুদ্ধিজীবীদের লেখা পুনর্মুদ্রণে। সম্পাদক বললেন, আমরা নিরপেক্ষ। মুক্তধারা আয়োজিত ২৩ বাংলা সাহিত্য উৎসব এবং বইমেলা। বিশাল আয়োজন। আয়োজনের মূলে কেবল বিশ্বজিত, রুমা সাহাই নন, হাসান ফেরদৌস, রানু ফেরদৌস, নিনা, গোপাল স্যানাল প্রমুখ।
হাসান ফেরদৌস নামী লেখক, বহু গন্থের প্রণেতা, জাতিসংঘের মিডিয়ার অ্যান্ড কম্যুনিকশনের বড়ো কর্তা, কয়েকটি অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। রানু ফেরদৌসও লেখিকা। তিনিও সঞ্চচালক। অনুষ্ঠান জমজমাট। অনুষ্ঠান তিন দিনের। বাংলাদেশ থেকে হাজির সুলেখিকা, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক মাসুদা ভাট্টিও। কতটা জনপ্রিয়, লক্ষ করলুম পাঠকের নানা প্রশ্নে। এক সুন্দরী, তবে ঘোরতর নারীবাদী। চাঁছাছোলা কথা বলতে পোক্ত। পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের নারীবাদীরা বোধহয় এখনো মাসুদা ভাট্টি সম্পর্কে বিশদ জানেন না। ওঁর কথা শুনুন। জ্ঞান হবে।
১৩ জুন নিউইয়র্কের সাহিত্য উৎসব ও বইমেলা উদ্বোধন। ঠিক ছিল, উদ্বোধন করবেন কলকাতার সমরেশ মজুমদার। অসু। আসেন নি। না আসায় দর্শকের হাহাকার শুনি। উদ্বোধক বাংলাদেশের কবি মহাদেব সাহা। উত্তরীয় পেলেন (সমরেশ মজুমদার না আসায়। সমরেশ মজুমদারও অতিশয় বাজে লেখক। শুদ্ধ বাংলাও লিখতে শেখেন নি, কিন্তু পাঠকপ্রিয়।) মহাদেব সাহা। হাততালি দিলুম। ‘ইজ হি ফ্রম বাংলাদেশ ?।’ জানতে চাইলেন নিনা আহমেদে। চিনতুন না, নিজেই পরিচয় দেন, বারাক ওবামার।
সাহিত্য উৎসব ও বইমেলায় গোটা ইস্ট এবং ওয়েস্ট কোস্ট (আমেরিকা-কানাডা)-এর নানা অঞ্চলের লেখকলেখিকা, গায়কগায়িকা, অভিনেতাআভিনেত্রীও। টরেন্টোর শিখা রউফের গান অনেকের প্রিয়। বাদ নেই বাউল, ভাটিয়ালি গানও। রেজোয়ানা চৌধুরী বন্যা তো মধ্যমণি। গান গাইলেন শেষে। বললেন, অসু। হয়তো। কিন্তু গানের চেয়ে কথা বেশি। কণ্ঠে গায়কী আছে, মাদকতা নেই আর। বন্যার পুত্রকন্যা নিউইয়র্কের বাসিন্দা। নিউইয়র্কে বাড়ি আছে বন্যার। গানের স্কুলও খুলেছেন। ছাত্রছাত্রী কত, জিজ্ঞেস করি নি। উৎসব-মেলা মানেই ভ্যারাইটি শো। বাদ নেই ফ্যাশন শো-ও। ভিড়ভাট্টা, খাবার ও শাড়ি-গহনার স্টলেই বেশি। উপচে পড়ছে। কে আর বই কেনে (দুই বাংলার বহু প্রকাশক বই নিয়ে হাজির। স্টলও সাজিয়েছেন। বই বিক্রি করে যাতায়াতের ভাড়া, হোটেলের খরচও বোধহয় ওঠেনি।), সাহিত্য-অনুষ্ঠান শোনে।
গত ২৩ বছর ধরে মুক্তধারা সাহিত্য উৎসব এবং বইমেলা করছে। ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়। তপন রায় চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, আনিসুজ্জামান, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী, জিয়া হায়দার, রফিক আজাদ, রশীদ হায়দার, নির্মলেন্দু গুণ, জয় গোস্বামী প্রমুখ যোগ দিয়েছেন ইতিপূর্বে। নিউইয়র্কের দুই সপ্তাহ পরে ফ্লোরিডায় পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন। ওখানেও দুই বাংলার মিলন। গানের আসরেই শ্রোতার মুখ বেশি।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment