যাত্রায় গণজাগরণ ॥ যুগে যুগে
মিলন কান্তি দে
যাত্রাপালায় গণজাগরণ বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি আছে। ১৯৯৯ সালের ৮ মে গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চ উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেছিলেন ‘আমাদের দেশে থিয়েটার আসার অনেক আগে থেকে যাত্রার জন্ম। যুগ যুগব্যাপী যাত্রাপালা অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আঙ্গিকে ও বিন্যাসে লোকায়ত জনপদকে আন্দোলিত করে আসছে।’ অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন ‘অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে’ গণজাগরণ সৃষ্টির একটি ঐতিহ্য বহন করে চলেছে বাংলার যাত্রাশিল্প।
যাত্রাবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, অশুভ ও দানব শক্তির বিরুদ্ধে যাত্রামঞ্চে বরাবরই ঝলসে উঠেছে সত্যের শাণিত কৃপাণ। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার যাত্রার বিবেকের যে শক্তি, এর কোন বিকল্প নেই। তাই তো একজন মুকুন্দ দাশ- সর্বকালে সবযুগে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন আমাদের কাছে। বিশ শতকের সূচনায় পরাধীন জাতিকে মুক্তির গান শোনালেন তিনি, নতুন যাত্রার নতুন যুবরাজ। তাঁর স্বদেশী যাত্রার বিস্ফোরণ ঘটল দেশজুড়ে। এই স্বদেশী যাত্রার মধ্যে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালী গণমানসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে এবং স্বাধীনতায় উন্মুখ বাঙালী প্রাণে বার বার প্রেরণা হয়ে আসে স্বদেশী যাত্রার গণজাগরণ।
স্বদেশী যাত্রার প্রেক্ষাপটটি ছিল এ রকম: ১৯০৫ সালের অক্টোবরে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ছিল এদেশের মিলিত হিন্দু-মুসলমানের সাম্য-সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য ইংরেজ বেনিয়াদের এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। শুরু হলো দেশব্যাপী বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। এই সময় থেকে বাঙালীর মানসভূমে স্বদেশ চেতনা এক ভিন্ন মাত্রায় রূপ নিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- বাংলার মাটি বাংলার জন, আমার সোনার বাংলা, রামেন্দু সুন্দর ত্রিবেদী লিখলেন, বঙ্গলক্ষীর ব্রতকথা। পাশাপাশি মঞ্চায়ন হতে লাগল- ‘পলাশীর পরে,’ ‘প্রায়শ্চিত্ত,’ ‘রানাপ্রতাপ’ প্রভৃতি দেশপ্রেমমূলক নাটক। বঙ্গভঙ্গ আইন জারির ওই বছরই (১৯০৫) আধুনিক রঙ্গমঞ্চের জনক গিরিশ ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে একটি উৎকৃষ্ট নাটক রচনা করেন। মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে ১৯০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সেই উত্তাল সময়ে জাতীয় জাগরণের এক সংগ্রামী নায়ক হিসেবে সিরাজকে মঞ্চে আনা গিরিশ ঘোষের এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে এ জন্য যে, বঙ্গভঙ্গ বিধানটি তো সরকারীভাবে ঘোষণা করা হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। তাহলে একমাস আগে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু না হতেই জাতীয় চেতনা সৃষ্টিকারী নাটক লেখার প্রয়াস কেন? আসলে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়েছিল ১৯০৩ সালে বাংলার ছোট লাট এন্ডু ফ্রেজার আর ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব রিজলের প্রস্তাবেই। তখন থেকেই ইংরেজ শাসকচক্রের অশুভ পাঁয়তারার বিরুদ্ধে জনরোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। আর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকেই ঐতিহ্যবাহী যাত্রার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হলো- ‘স্বদেশী যাত্রা।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এই নতুন যাত্রার অধিকর্তা মুকুন্দ দাশ গলা ছেড়ে গাইলেন :
‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম
তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি
অতলে জলে ডুবিয়ে দিতাম।’ (যাত্রাপালা মাতৃপূজা)
স্বদেশী যাত্রার প্রভাবে দেশপ্রেমমূলক ঐতিহাসিক যাত্রাপালা রচনার একটি ধারা গড়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলাদেশে। স্বদেশী আন্দোলনের চেতনা সাধারণ জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত করার দায়বোধ থেকে কোন কোন ঐতিহাসক চরিত্রকে জাতীয় নায়ক হিসেবে মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছেন পালা লেখক ও নাট্যকাররা। ১৯০৫ সালে মঞ্চায়িত গিরিশ ঘোষের সিরাজউদ্দৌলার কথা আগেই উল্লেখিত। এ ধারার পরবর্তী নাট্যরচনা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) ‘মেরার পতন,’ ‘রানী দুর্গাবতী,’ শচীন সেন গুপ্তের ‘গৈরিক পতাকা,’ নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং যাত্রাপালা শশাংক রায়ের ‘নবাব সিরাজ।’ এর মধ্যে শচীনের সিরাজই কালোত্তীর্ণ মঞ্চসাফল্য পেয়েছে। কারণ, এমন এক অভিনব নাট্য কৌশলে তিনি নাটকটি তৈরি করেছেন যাতে যাত্রার আসর ও নাট্যমঞ্চে দুই জায়গায়ই এটি অতিসহজে পরিবেশন করা যায়। আর এই নাটকটি রচনারও একটি পটভূমি আছে। ১৯৩৩ সালে একদিকে ক্যামব্রিজ গ্রুপের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ১৯৩৮ সালে মহাত্মা গান্ধী মনোনীত প্রার্থীকে হারিয়ে কংগ্রেসে নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের বিজয়। এরই মধ্যে চারদিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রচ- তাগিদÑসেই যুগসন্ধিক্ষণে শচীন সেন গুপ্তের সিরাজ দাঁড়িয়েছেন মঞ্চে। মুখে তার সাম্য সম্প্রীতির চিরায়ত সংলাপÑ ‘বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়। মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।’
এই ঐতিহাসক ঘটনার ছয় বছর আগে ১৯৩২ সালে বাংলাদেশের এক বিখ্যাত যাত্রাপালাকার ব্রজেন্দ্র কুমার দে’র (১৯০৭-১৯৭৬) আত্মপ্রকাশ। পেশাদার যাত্রাদল গণেশ অপেরা পার্টির জন্য প্রথম পালা লিখলেন ‘বজ্রনাভ।’ বিশিষ্ট যাত্রানট একুশে পদকপ্রাপ্ত অমলেন্দু বিশ্বাস এক নিবন্ধে লিখেছেন: ‘১৯৩২ সালে যাত্রাঙ্গনে আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। আধুনিক যুগের আদ্যভাগে ক্ষুরধার লেখনি হস্তে যাত্রাপালার রূপে আবির্ভূত হলেন পালাসম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে। শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থেকেও তিনি পঞ্চাশ বছর যাবৎ যাত্রাপালা রচনায় নিবেদিত ছিলেন। তাকে বলা হয় আধুনিক যাত্রাপালা রচনার পথিকৃৎ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিড়িক, ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৪৩-এর দুর্ভিক্ষ- এই পটভূমিতে প্রগতিশীল ধারার লেখক ও নাট্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠে সর্বভারতীয় গণনাট্য সংঘের নবনাট্য আন্দোলন। এই নতুন নাট্যধারার সূচনা বিজন ভট্টাচার্যের (১৯১৫-১৯৭৮) ‘নবান্ন’ নাটক দিয়ে। এর প্রভাব পড়ে যাত্রায়ও। দুর্ভিক্ষের জন্য মহাজন মজুতদার ও চোরাকারবারিদের দায়ী করে ব্রজেন্দ্র কুমার দে লিখলেন যাত্রাপালা ‘আকালের দেশ।’ অনেকে এই পালাটিকে সামাজিক পালা হিসেবে উল্লেখ করেন। পালাকার নিজেই বলেছেন এটি আধা সামাজিক পালা। প্রথম পূর্ণাঙ্গ সামাজিক পালা ‘নিষিদ্ধ ফল’ বা ‘দোষী কে’ তিনি রচনা করেন ১৯৬০ সালে। ‘আকালের দেশ’ অভিনীত হবার সঙ্গে সঙ্গে বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল ব্যবসায়ীরা পালাকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে নিজের জন্মভূমি (শরীয়তপুর জেলার গংগানগর গ্রাম) ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হন তিনি।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার এক বছর আগে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আতঙ্কিত ও অনিশ্চিত করে তুলল। ওই সময়ে রচিত হয় তার বিখ্যাত ‘বাঙালী’ পালা, যেখানে উঠে এসেছে বাঙালীর সম্প্রীতি, সমন্বয় ও স্বাজাত্যবোধ। এই পালার গানে গানে মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে মহা ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। যেমন:
পাগল ছেলে আয়
ডুব দিয়ে যা বাংলা মায়ের রূপের দরিয়ায়।
আমার খোদা, তোর নারায়ণ
এই মাটিতেই পাতল আসন
একের মাঝেই দুজন আছে, যে যারে চায়,- পায়।
পালাটি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্য শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ব্রজেন্দ্র কুমার দে ছিলেন আধুনিক যাত্রার সফল রূপকার। তিনি ‘যাত্রাপালা সম্রাট’ উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর অধিকাংশ পালার আবহ গড়ে উঠেছে গণজাগরণের মধ্য দিয়ে। যেমন: কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ না বলে সাম্র্রাজ্য দখলের লড়াই বলেছেন ‘প্রবীরার্জুন’ পালায়, যা প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখানো হয় ‘লীলাবসান’ পালায়, [১৯৩৪]। বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম চাঁদ রায়ের মেয়ে স্বর্ণলতাকে নিয়ে লেখা ‘চাঁদের মেয়ে’ [১৯৩৬] পালায় সংক্ষিপ্ত সংলাপ ব্যবহার করেন। যাত্রা জগতে এই পালা বিপ্লব নিয়ে আসে। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে শোষক-শোষিতের সংগ্রামের চিত্র এঁকেছেন ‘রাজনন্দিনী’ পালায় [১৯৪২]। প্রথম সামাজিক পালা ‘নিষিদ্ধ ফল’ (১৯৬০), যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য নিয়ে ‘সোহরাব-রুস্তম’ [১৯৬১)।
এ দেশে যাত্রাশিল্প আন্দোলনে সবদিক থেকেই অগ্রণী ভূমিকা ছিল চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার। এ দলের অধিকাংশ পালার মূল প্রতিপাদ্য ছিল সমকালীন সমাজচিত্র ও জাতীয় চেতনা। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সমগ্র দেশ যখন আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে ফেটে পড়েছিল তখন বাবুল অপেরা রাতের পর রাত যে পালাটির অভিনয় করে গণজোয়ারকে আরও তীব্র করে তুলেছিল, তার নাম ‘একটি পয়সা’। একটি পয়সার শাণিত সংলাপ তদানীন্তন শাসকচক্র ও তার তাঁবেদার দালালদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিক্ষেপ করেছিল। ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ও অমলেন্দু বিশ্বাস নির্দেশিত এ পালার একটি সংলাপ ছিল এ রকম: কেন্দ্রীয় চরিত্র দিবাকর বলছে, ‘যারা তোমার আমার মতো অজস্র মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে গড়ে তুলেছে সাত মহলা ইমারত, যারা আজ জীবন্ত মানুষের অস্থি দিয়ে বাজিয়ে চলেছে জলতরঙ্গের বাজনা, যারা বুটের ঠোক্করে সমাজ ব্যবস্থা তছনছ করে চালিয়ে যাচ্ছে কালো টাকার কারখানা, সেই পুঁজিপতিদের কাছে আর কোন আবেদন নয়, আর কোন প্রার্থনা নয়, মেহনতী মানুষের সংঘশক্তির প্রচ- আঘাতে তাদের খুশির অট্টালিকা ভেঙ্গে চুরমার করে কায়েম করতে হবে সংগ্রামী মানুষের ন্যায্য অধিকার।’
ঝিনাইদহ জেলার তদানীন্তন এমএনএ ইকবাল
আনোয়ারুল ইসলাম একটি পয়সার অভিনয় দেখে বলেছিলেন, ‘জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষায় যাত্রাশিল্পেও নতুন প্রাণের দোলা লেগেছে।’ ১৯৬৯ সালে ঝিনাইদহের ছবিঘর সিনেমা হলের পাশে এক যাত্রামঞ্চে তিনি এই পালাটি দেখেন। দুইপুত্রসহ তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীন হন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়েছিল, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- তখন সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি যাত্রাশিল্পীদের মধ্যেও জ্বলে উঠেছিল জাতীয় চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। সেই সময়ের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা, যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, মুজিব-ইয়াহিয়ার ব্যর্থ বৈঠক এবং অসহযোগ আন্দোলন যাত্রাশিল্পীদের আলোড়িত করেছিল প্রচ-ভাবে।
সেই সময় চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার অভিনয় চলছিল বর্তমান নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানা হাইস্কুল মাঠে। অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন থানার দারোগা রমেন দাশ। তখন এ দলের পক্ষ থেকে যাত্রাশিল্প বিষয়ক একটি নিয়মিত পাক্ষিক দেয়াল পত্রিকা বের হতো, নাম ছিল- ‘মঞ্চশ্রী’। বর্তমান লেখক ছিলেন স¤পাদনায়। পূর্বধলায় পত্রিকাটির ষষ্ঠ সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং দারোগা রমেন দাশের পরামর্শক্রমে এই সংখ্যার সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে- ‘এ দেশ ছাড়বি কি না বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ ২৫ মার্চ ঢাকায় বর্বর পাকসেনাদের নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। ওই রাতেই পূর্বধলায় অভিনীত হয় দেশাত্মবোধক একটি পালা। একটি দৃশ্যে অভিনেত্রী জাহানারা বলছেন: ‘জাঁহাপনা কি বাংলাকে আক্রমণ করতে চান? কোন্ বিবেকে আপনার দানব সেনাদের লেলিয়ে দিয়েছেন নিরীহ বাঙালীর ওপর? কত দোকান-পসার লুণ্ঠিত হয়েছে, কত গ্রাম ছারখার হয়েছে, কত মসজিদ-মন্দির ধ্বংস হয়েছে, খবর রাখেন কিছু?’
পরদিন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক বিভিন্ন এলাকার মতো পূর্বধলায়ও পৌঁছে। অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দলের সকল শিল্পী ক্রোধে ও উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। থানা প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় মিছিল ও সমাবেশের। শিল্পীরা এ বাড়ি সে বাড়ি থেকে বাঁশ ও লাঠি যোগাড় করে মিছিলে অংশ নেয় আর ব্যানারে বিদ্রোহী কবির ওই কবিতাটিই স্থান পেয়েছিল, ‘এ দেশ ছাড়বি কি না বল, নইলে কিলের ছোটে হাড় করিব জল’।
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়Ñ বিশ্বে এমনটি ঘটেনি কোথাও। এই সংগ্রামী চেতনা বিভিন্নভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে যাত্রাপালার ঐকতানে। এর একটি প্রেক্ষাপট আছে। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দেশের বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকরা যেমন পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালীদের একটি স্বাধীন ভূখ- প্রতিষ্ঠার ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা তেমনি একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পালা মঞ্চায়নের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কলকাতার বিভিন্ন যাত্রাদলে। স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থী শিল্পীরা এসব পালায় অভিনয় করেন। তবে এর মধ্যে গণজাগণমূলক একটি সংলাপ আছে ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’ যাত্রাপালায়। সংলাপটি হচ্ছে- সোনারগাঁয়ের অধিপতি সুলতান শামছুদ্দিন ইলিয়াছ শাহ্ বলছেন, ‘আমার জান কবুল। সোনারগাঁও, সাতগাঁও, ঢাকা-এই তিন অঞ্চলজুড়ে আমি গড়ে তুলব এক দেশ, যার নাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। যে দেশের মানুষ একই ভাষায় কথা বলবে, একই সুরে গান গাইবে, একই কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে জয়ধ্বনি দেবে- স্বাধীন বাংলার জয়।’
আইসেসকো কর্তৃক ২০১২ সালে ঢাকাকে এশীয় অঞ্চলের ইসলামী সংস্কৃতির রাজধানী ঘোষণা করা হয়। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় বাংলার গণজাগরণমূলক একটি যাত্রাপালা নির্বাচিত হয়, নাম ‘ঈশা খাঁ।’ যে ঈশা খাঁ সোনারগাঁওকে রক্ষার জন্য মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তিনি ছিলেন বারো ভূঁইয়ার অন্যতম শক্তিশালী পুরুষ।
দেশপ্রেম, জাতীয় জাগরণ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার শক্তি দিয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদী চক্রকে প্রতিহত করেছিলেন।
ঈশা খাঁর সঙ্গে মানসিংহের দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রায় ৫০০ বছর পর আবার ঝলসে উঠেছিল ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর মাটিতে। শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে সোনারগাঁওয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে প্রথমবারের মতো এক নতুন পদ্ধতিতে ঐতিহাসিক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়। পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ সেদিন পালাটি উপভোগ করেছিল।
দেশ ও জাতির বিভিন্ন ক্রান্তিকালে কিংবা শিল্পের সঙ্কট মুহুর্তে যাত্রার ঐকতানে বার বার বেজে উঠেছে গণজাগরণের সুর ও ছন্দ। তাই তো ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, ’৯১-এ যাত্রাশিল্পে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে এবং গত বছর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে যাত্রাশিল্পীরা ছিলেন সোচ্চারকণ্ঠ। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে যাত্রাশিল্পীরা আয়োজন করেছিল গণজাগরণমূলক পথযাত্রাপালা। এখান থেকেই শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলা হয়েছিল-
অবাক পৃথিবী তাকিয়ে দেখ
এত বিদ্রোহ দেখেনি কেউ।
’৭১-এর হাতিয়ার আবার গর্জে উঠেছে
’৭১-এর তারুণ্য আবার জ্বালিয়েছে
মুক্তির মশাল।
আবার লেখা হবে নয়া ইতিহাস।
শাহবাগ-টিএসটি-শহীদ মিনার
জ্বলছে অবিরাম।
যাত্রাবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, অশুভ ও দানব শক্তির বিরুদ্ধে যাত্রামঞ্চে বরাবরই ঝলসে উঠেছে সত্যের শাণিত কৃপাণ। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার যাত্রার বিবেকের যে শক্তি, এর কোন বিকল্প নেই। তাই তো একজন মুকুন্দ দাশ- সর্বকালে সবযুগে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন আমাদের কাছে। বিশ শতকের সূচনায় পরাধীন জাতিকে মুক্তির গান শোনালেন তিনি, নতুন যাত্রার নতুন যুবরাজ। তাঁর স্বদেশী যাত্রার বিস্ফোরণ ঘটল দেশজুড়ে। এই স্বদেশী যাত্রার মধ্যে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাঙালী গণমানসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে এবং স্বাধীনতায় উন্মুখ বাঙালী প্রাণে বার বার প্রেরণা হয়ে আসে স্বদেশী যাত্রার গণজাগরণ।
স্বদেশী যাত্রার প্রেক্ষাপটটি ছিল এ রকম: ১৯০৫ সালের অক্টোবরে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ছিল এদেশের মিলিত হিন্দু-মুসলমানের সাম্য-সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য ইংরেজ বেনিয়াদের এক পরিকল্পিত রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। শুরু হলো দেশব্যাপী বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। এই সময় থেকে বাঙালীর মানসভূমে স্বদেশ চেতনা এক ভিন্ন মাত্রায় রূপ নিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- বাংলার মাটি বাংলার জন, আমার সোনার বাংলা, রামেন্দু সুন্দর ত্রিবেদী লিখলেন, বঙ্গলক্ষীর ব্রতকথা। পাশাপাশি মঞ্চায়ন হতে লাগল- ‘পলাশীর পরে,’ ‘প্রায়শ্চিত্ত,’ ‘রানাপ্রতাপ’ প্রভৃতি দেশপ্রেমমূলক নাটক। বঙ্গভঙ্গ আইন জারির ওই বছরই (১৯০৫) আধুনিক রঙ্গমঞ্চের জনক গিরিশ ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে একটি উৎকৃষ্ট নাটক রচনা করেন। মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে ১৯০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সেই উত্তাল সময়ে জাতীয় জাগরণের এক সংগ্রামী নায়ক হিসেবে সিরাজকে মঞ্চে আনা গিরিশ ঘোষের এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে এ জন্য যে, বঙ্গভঙ্গ বিধানটি তো সরকারীভাবে ঘোষণা করা হয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। তাহলে একমাস আগে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু না হতেই জাতীয় চেতনা সৃষ্টিকারী নাটক লেখার প্রয়াস কেন? আসলে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়েছিল ১৯০৩ সালে বাংলার ছোট লাট এন্ডু ফ্রেজার আর ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব রিজলের প্রস্তাবেই। তখন থেকেই ইংরেজ শাসকচক্রের অশুভ পাঁয়তারার বিরুদ্ধে জনরোষ ধূমায়িত হচ্ছিল। আর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকেই ঐতিহ্যবাহী যাত্রার একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হলো- ‘স্বদেশী যাত্রা।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এই নতুন যাত্রার অধিকর্তা মুকুন্দ দাশ গলা ছেড়ে গাইলেন :
‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম
তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি
অতলে জলে ডুবিয়ে দিতাম।’ (যাত্রাপালা মাতৃপূজা)
স্বদেশী যাত্রার প্রভাবে দেশপ্রেমমূলক ঐতিহাসিক যাত্রাপালা রচনার একটি ধারা গড়ে ওঠে অবিভক্ত বাংলাদেশে। স্বদেশী আন্দোলনের চেতনা সাধারণ জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত করার দায়বোধ থেকে কোন কোন ঐতিহাসক চরিত্রকে জাতীয় নায়ক হিসেবে মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়েছেন পালা লেখক ও নাট্যকাররা। ১৯০৫ সালে মঞ্চায়িত গিরিশ ঘোষের সিরাজউদ্দৌলার কথা আগেই উল্লেখিত। এ ধারার পরবর্তী নাট্যরচনা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) ‘মেরার পতন,’ ‘রানী দুর্গাবতী,’ শচীন সেন গুপ্তের ‘গৈরিক পতাকা,’ নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং যাত্রাপালা শশাংক রায়ের ‘নবাব সিরাজ।’ এর মধ্যে শচীনের সিরাজই কালোত্তীর্ণ মঞ্চসাফল্য পেয়েছে। কারণ, এমন এক অভিনব নাট্য কৌশলে তিনি নাটকটি তৈরি করেছেন যাতে যাত্রার আসর ও নাট্যমঞ্চে দুই জায়গায়ই এটি অতিসহজে পরিবেশন করা যায়। আর এই নাটকটি রচনারও একটি পটভূমি আছে। ১৯৩৩ সালে একদিকে ক্যামব্রিজ গ্রুপের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ১৯৩৮ সালে মহাত্মা গান্ধী মনোনীত প্রার্থীকে হারিয়ে কংগ্রেসে নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের বিজয়। এরই মধ্যে চারদিকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রচ- তাগিদÑসেই যুগসন্ধিক্ষণে শচীন সেন গুপ্তের সিরাজ দাঁড়িয়েছেন মঞ্চে। মুখে তার সাম্য সম্প্রীতির চিরায়ত সংলাপÑ ‘বাংলা শুধু হিন্দুর নয়, বাংলা শুধু মুসলমানের নয়। মিলিত হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভূমি গুলবাগ এই বাংলা।’
এই ঐতিহাসক ঘটনার ছয় বছর আগে ১৯৩২ সালে বাংলাদেশের এক বিখ্যাত যাত্রাপালাকার ব্রজেন্দ্র কুমার দে’র (১৯০৭-১৯৭৬) আত্মপ্রকাশ। পেশাদার যাত্রাদল গণেশ অপেরা পার্টির জন্য প্রথম পালা লিখলেন ‘বজ্রনাভ।’ বিশিষ্ট যাত্রানট একুশে পদকপ্রাপ্ত অমলেন্দু বিশ্বাস এক নিবন্ধে লিখেছেন: ‘১৯৩২ সালে যাত্রাঙ্গনে আরেক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। আধুনিক যুগের আদ্যভাগে ক্ষুরধার লেখনি হস্তে যাত্রাপালার রূপে আবির্ভূত হলেন পালাসম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে। শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থেকেও তিনি পঞ্চাশ বছর যাবৎ যাত্রাপালা রচনায় নিবেদিত ছিলেন। তাকে বলা হয় আধুনিক যাত্রাপালা রচনার পথিকৃৎ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিড়িক, ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৪৩-এর দুর্ভিক্ষ- এই পটভূমিতে প্রগতিশীল ধারার লেখক ও নাট্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠে সর্বভারতীয় গণনাট্য সংঘের নবনাট্য আন্দোলন। এই নতুন নাট্যধারার সূচনা বিজন ভট্টাচার্যের (১৯১৫-১৯৭৮) ‘নবান্ন’ নাটক দিয়ে। এর প্রভাব পড়ে যাত্রায়ও। দুর্ভিক্ষের জন্য মহাজন মজুতদার ও চোরাকারবারিদের দায়ী করে ব্রজেন্দ্র কুমার দে লিখলেন যাত্রাপালা ‘আকালের দেশ।’ অনেকে এই পালাটিকে সামাজিক পালা হিসেবে উল্লেখ করেন। পালাকার নিজেই বলেছেন এটি আধা সামাজিক পালা। প্রথম পূর্ণাঙ্গ সামাজিক পালা ‘নিষিদ্ধ ফল’ বা ‘দোষী কে’ তিনি রচনা করেন ১৯৬০ সালে। ‘আকালের দেশ’ অভিনীত হবার সঙ্গে সঙ্গে বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল ব্যবসায়ীরা পালাকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে নিজের জন্মভূমি (শরীয়তপুর জেলার গংগানগর গ্রাম) ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হন তিনি।
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার এক বছর আগে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আতঙ্কিত ও অনিশ্চিত করে তুলল। ওই সময়ে রচিত হয় তার বিখ্যাত ‘বাঙালী’ পালা, যেখানে উঠে এসেছে বাঙালীর সম্প্রীতি, সমন্বয় ও স্বাজাত্যবোধ। এই পালার গানে গানে মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে মহা ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। যেমন:
পাগল ছেলে আয়
ডুব দিয়ে যা বাংলা মায়ের রূপের দরিয়ায়।
আমার খোদা, তোর নারায়ণ
এই মাটিতেই পাতল আসন
একের মাঝেই দুজন আছে, যে যারে চায়,- পায়।
পালাটি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্য শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ব্রজেন্দ্র কুমার দে ছিলেন আধুনিক যাত্রার সফল রূপকার। তিনি ‘যাত্রাপালা সম্রাট’ উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর অধিকাংশ পালার আবহ গড়ে উঠেছে গণজাগরণের মধ্য দিয়ে। যেমন: কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ না বলে সাম্র্রাজ্য দখলের লড়াই বলেছেন ‘প্রবীরার্জুন’ পালায়, যা প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখানো হয় ‘লীলাবসান’ পালায়, [১৯৩৪]। বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম চাঁদ রায়ের মেয়ে স্বর্ণলতাকে নিয়ে লেখা ‘চাঁদের মেয়ে’ [১৯৩৬] পালায় সংক্ষিপ্ত সংলাপ ব্যবহার করেন। যাত্রা জগতে এই পালা বিপ্লব নিয়ে আসে। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে শোষক-শোষিতের সংগ্রামের চিত্র এঁকেছেন ‘রাজনন্দিনী’ পালায় [১৯৪২]। প্রথম সামাজিক পালা ‘নিষিদ্ধ ফল’ (১৯৬০), যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য নিয়ে ‘সোহরাব-রুস্তম’ [১৯৬১)।
এ দেশে যাত্রাশিল্প আন্দোলনে সবদিক থেকেই অগ্রণী ভূমিকা ছিল চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার। এ দলের অধিকাংশ পালার মূল প্রতিপাদ্য ছিল সমকালীন সমাজচিত্র ও জাতীয় চেতনা। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সমগ্র দেশ যখন আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে ফেটে পড়েছিল তখন বাবুল অপেরা রাতের পর রাত যে পালাটির অভিনয় করে গণজোয়ারকে আরও তীব্র করে তুলেছিল, তার নাম ‘একটি পয়সা’। একটি পয়সার শাণিত সংলাপ তদানীন্তন শাসকচক্র ও তার তাঁবেদার দালালদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিক্ষেপ করেছিল। ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ও অমলেন্দু বিশ্বাস নির্দেশিত এ পালার একটি সংলাপ ছিল এ রকম: কেন্দ্রীয় চরিত্র দিবাকর বলছে, ‘যারা তোমার আমার মতো অজস্র মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে গড়ে তুলেছে সাত মহলা ইমারত, যারা আজ জীবন্ত মানুষের অস্থি দিয়ে বাজিয়ে চলেছে জলতরঙ্গের বাজনা, যারা বুটের ঠোক্করে সমাজ ব্যবস্থা তছনছ করে চালিয়ে যাচ্ছে কালো টাকার কারখানা, সেই পুঁজিপতিদের কাছে আর কোন আবেদন নয়, আর কোন প্রার্থনা নয়, মেহনতী মানুষের সংঘশক্তির প্রচ- আঘাতে তাদের খুশির অট্টালিকা ভেঙ্গে চুরমার করে কায়েম করতে হবে সংগ্রামী মানুষের ন্যায্য অধিকার।’
ঝিনাইদহ জেলার তদানীন্তন এমএনএ ইকবাল
আনোয়ারুল ইসলাম একটি পয়সার অভিনয় দেখে বলেছিলেন, ‘জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষায় যাত্রাশিল্পেও নতুন প্রাণের দোলা লেগেছে।’ ১৯৬৯ সালে ঝিনাইদহের ছবিঘর সিনেমা হলের পাশে এক যাত্রামঞ্চে তিনি এই পালাটি দেখেন। দুইপুত্রসহ তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীন হন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়েছিল, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- তখন সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি যাত্রাশিল্পীদের মধ্যেও জ্বলে উঠেছিল জাতীয় চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। সেই সময়ের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা, যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, মুজিব-ইয়াহিয়ার ব্যর্থ বৈঠক এবং অসহযোগ আন্দোলন যাত্রাশিল্পীদের আলোড়িত করেছিল প্রচ-ভাবে।
সেই সময় চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার অভিনয় চলছিল বর্তমান নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানা হাইস্কুল মাঠে। অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন থানার দারোগা রমেন দাশ। তখন এ দলের পক্ষ থেকে যাত্রাশিল্প বিষয়ক একটি নিয়মিত পাক্ষিক দেয়াল পত্রিকা বের হতো, নাম ছিল- ‘মঞ্চশ্রী’। বর্তমান লেখক ছিলেন স¤পাদনায়। পূর্বধলায় পত্রিকাটির ষষ্ঠ সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং দারোগা রমেন দাশের পরামর্শক্রমে এই সংখ্যার সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে- ‘এ দেশ ছাড়বি কি না বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ ২৫ মার্চ ঢাকায় বর্বর পাকসেনাদের নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। ওই রাতেই পূর্বধলায় অভিনীত হয় দেশাত্মবোধক একটি পালা। একটি দৃশ্যে অভিনেত্রী জাহানারা বলছেন: ‘জাঁহাপনা কি বাংলাকে আক্রমণ করতে চান? কোন্ বিবেকে আপনার দানব সেনাদের লেলিয়ে দিয়েছেন নিরীহ বাঙালীর ওপর? কত দোকান-পসার লুণ্ঠিত হয়েছে, কত গ্রাম ছারখার হয়েছে, কত মসজিদ-মন্দির ধ্বংস হয়েছে, খবর রাখেন কিছু?’
পরদিন ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক বিভিন্ন এলাকার মতো পূর্বধলায়ও পৌঁছে। অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দলের সকল শিল্পী ক্রোধে ও উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। থানা প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় মিছিল ও সমাবেশের। শিল্পীরা এ বাড়ি সে বাড়ি থেকে বাঁশ ও লাঠি যোগাড় করে মিছিলে অংশ নেয় আর ব্যানারে বিদ্রোহী কবির ওই কবিতাটিই স্থান পেয়েছিল, ‘এ দেশ ছাড়বি কি না বল, নইলে কিলের ছোটে হাড় করিব জল’।
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়Ñ বিশ্বে এমনটি ঘটেনি কোথাও। এই সংগ্রামী চেতনা বিভিন্নভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে যাত্রাপালার ঐকতানে। এর একটি প্রেক্ষাপট আছে। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দেশের বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকরা যেমন পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালীদের একটি স্বাধীন ভূখ- প্রতিষ্ঠার ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা তেমনি একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পালা মঞ্চায়নের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কলকাতার বিভিন্ন যাত্রাদলে। স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থী শিল্পীরা এসব পালায় অভিনয় করেন। তবে এর মধ্যে গণজাগণমূলক একটি সংলাপ আছে ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’ যাত্রাপালায়। সংলাপটি হচ্ছে- সোনারগাঁয়ের অধিপতি সুলতান শামছুদ্দিন ইলিয়াছ শাহ্ বলছেন, ‘আমার জান কবুল। সোনারগাঁও, সাতগাঁও, ঢাকা-এই তিন অঞ্চলজুড়ে আমি গড়ে তুলব এক দেশ, যার নাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। যে দেশের মানুষ একই ভাষায় কথা বলবে, একই সুরে গান গাইবে, একই কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে জয়ধ্বনি দেবে- স্বাধীন বাংলার জয়।’
আইসেসকো কর্তৃক ২০১২ সালে ঢাকাকে এশীয় অঞ্চলের ইসলামী সংস্কৃতির রাজধানী ঘোষণা করা হয়। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় বাংলার গণজাগরণমূলক একটি যাত্রাপালা নির্বাচিত হয়, নাম ‘ঈশা খাঁ।’ যে ঈশা খাঁ সোনারগাঁওকে রক্ষার জন্য মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তিনি ছিলেন বারো ভূঁইয়ার অন্যতম শক্তিশালী পুরুষ।
দেশপ্রেম, জাতীয় জাগরণ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার শক্তি দিয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদী চক্রকে প্রতিহত করেছিলেন।
ঈশা খাঁর সঙ্গে মানসিংহের দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রায় ৫০০ বছর পর আবার ঝলসে উঠেছিল ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর মাটিতে। শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে সোনারগাঁওয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে প্রথমবারের মতো এক নতুন পদ্ধতিতে ঐতিহাসিক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়। পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ সেদিন পালাটি উপভোগ করেছিল।
দেশ ও জাতির বিভিন্ন ক্রান্তিকালে কিংবা শিল্পের সঙ্কট মুহুর্তে যাত্রার ঐকতানে বার বার বেজে উঠেছে গণজাগরণের সুর ও ছন্দ। তাই তো ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, ’৯১-এ যাত্রাশিল্পে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে এবং গত বছর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে যাত্রাশিল্পীরা ছিলেন সোচ্চারকণ্ঠ। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে যাত্রাশিল্পীরা আয়োজন করেছিল গণজাগরণমূলক পথযাত্রাপালা। এখান থেকেই শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলা হয়েছিল-
অবাক পৃথিবী তাকিয়ে দেখ
এত বিদ্রোহ দেখেনি কেউ।
’৭১-এর হাতিয়ার আবার গর্জে উঠেছে
’৭১-এর তারুণ্য আবার জ্বালিয়েছে
মুক্তির মশাল।
আবার লেখা হবে নয়া ইতিহাস।
শাহবাগ-টিএসটি-শহীদ মিনার
জ্বলছে অবিরাম।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment