Thursday, July 24, 2014

মিথিলার রাজকন্যা আলমগীর সাত্তার

মিথিলার রাজকন্যা
আলমগীর সাত্তার
আবু আহাদ সাহেবের স্ত্রীর নাম ছিল প্রণতি। স্ত্রীর নাম অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর তিনি নামকরণ করেছেন। প্রণতি দেবী এখন থেকে পনেরো বছর আগে দু’টি সন্তান রেখে মারা গেছেন। বড় সন্তানটির নাম নীরজা। ছোটটি ছেলে, নাম : অয়ন। পুরো নাম অয়ন চৌধুরী। নীরজার বয়স এখন ত্রিশ আর অয়নের বয়স সাতাশ বছর। স্ত্রী প্রণতি যখন মারা যান তখন আবু আহাদ চৌধুরীর বয়স ছিল মধ্য চল্লিশ। তিনি আর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি।
নীরজা এবং অয়ন বাংলাদেশ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে আমেরিকায় গিয়েছে। দু’জনেই এখন ওই দেশের নাগরিক। নীরজা বিয়ে করেছে। সে এবং তার স্বামী ওই দেশে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে একসঙ্গে চাকরি করে। অয়ন সঙ্গীত বিষয়ে পড়াশোনা করেছে। কোথাও চাকরি করে না। নিউইয়র্ক শহরে কালো ছেলেমেয়েদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সঙ্গীত দলের সে সদস্য।
আবু আহাদ চৌধুরী নীরজাকে একটি এবং অয়নকেও একটি বাড়ি কিনে দিয়েছেন। এছাড়া ওই দেশে ছেলে এবং মেয়ের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অনেক অর্থ জমা রেখেছেন। এখন ছেলে অথবা মেয়ে দু’জনার একজনও বাংলাদেশে এসে পিতার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো দেখাশোনা করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায় না। ব্যাংক-বীমাগুলো অংশীদাররা চালিয়ে নিবেন। কিন্তু তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর বেলায় কি হবে? সবকিছু চিন্তা করে আবু আহাদ চৌধুরী পনেরো দিনের জন্য আমেরিকায় গেলেন।
আবু আহাদ চৌধুরী নিউইয়র্কের লং আইল্যাডে মেয়ে নীরজার বাসায় ছেলে, মেয়ে, মেয়ের স্বামী নওশেরকে নিয়ে বসলেন। তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, বাংলাদেশে এসে প্রণতি এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বভার গ্রহণ করতে। নীরজা এক কথায় পিতার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলল, আমরা এখানে খুব শান্তিতে আছি। বাড়তি ঝক্কিঝামেলায় জড়াতে চাই না। উল্টো সে পিতাকে প্রস্তাব করে বলল, বাবা, তুমি ওসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিয়ে এসে আমেরিকায় আমাদের সঙ্গে থাকো।
আবু আহাদ মেয়েকে বললেন, ওসব প্রতিষ্ঠান তোর মায়ের নামে। আমার প্রাণ থাকতে ওসব প্রতিষ্ঠান বিক্রি করতে পারব না। তাছাড়া প্রণতি এন্টারপ্রাইজে যারা চাকরি করে, তারা তো আমার সন্তানের মতো। ওদের প্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলো আমি অন্য লোকের হাতে তুলে দিতে পারব না। ওদের আমি যেভাবে ভালবাসি, অন্য কেউ কি তেমনভাবে ওদেরকে ভালবাসবে? ওদের সবার চাকরির কি নিশ্চয়তা থাকবে?
অনেক কথার শেষে অয়ন বাংলাদেশে এসে পিতার প্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আংশিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজি হলো। তবে শর্তারোপ করল, পিতার পছন্দের পাত্রীকে সে বিয়ে করবে। পিতা আহাদ চৌধুরী পুত্রবধূকে প্রণতি এন্টারপ্রাইজের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে সক্ষম হওয়ার জন্য শিখিয়ে পড়িয়ে গড়ে তুলবেন। দ্বিতীয় শর্ত হলো, অয়ন নিজেও ওসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বুঝে নেয়ার জন্য ছয়টি মাস চায়। এই ছয় মাসে তার পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। পরিচয় প্রকাশ না পেলে কাজ শিখতে সুবিধা হবে। অফিসের কর্মকর্তাদের আসল রূপ সহজে জানতে পারবে।
বোন নীরজা খুব খুশি হল যে, অয়নের মতো খেয়ালি চরিত্রের ভাইটি বিয়ে করতে সম্মতি হয়েছে এবং তাও পিতা যে মেয়েকে পছন্দ করবেন, তাকেই সে বিয়ে করবে। পনেরোটা দিন আনন্দে কাটিয়ে আহাদ চৌধুরী পুত্র অয়নকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওয়ানা করলেন।
বাংলাদেশে এসে অয়ন পিতার গুলশানের বাসায় না থেকে লালমাটিয়ায় একটি এ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করল। সঙ্গীত চর্চার যাতে সমস্যা না হয় সে জন্য এ্যাপার্টমেন্টের প্রতিটি জানালায় কাচের ডবল পাল্লা লাগিয়ে শব্দ নিরোধের ব্যবস্থা করল। এ্যাপার্টমেন্ট বাসাটা খুব মূল্যবান আসবাবপত্র দিয়ে করা হলো সুসজ্জিত। পিতার অফিস থেকে একজন লোক আনা হলো বাসার কেয়ারটেকার হিসেবে।
২.
সৈয়দ আবেদ হাসান এবং তার স্ত্রী সুচরিতা হাসান ভাল গান করেন। এক সময় দু’জনে এক সঙ্গে শান্তিনিকেতনে সঙ্গীত বিভাগে পড়াশোনা করতেন। সেখানেই তাদের পরিচয়, প্রণয় এবং পরিণামে পরিণয় ঘটে। আবেদ হাসান সাহেব অবশ্যই মুসলমান। অবশ্য তিনি ধর্মীয় আচরণবিধি পালন করেন না। সুচরিতা দেবী হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। ছিলেন সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিয়ের পর হলেন সুচরিতা হাসান।
আবেদ হাসান ও সুচরিতা হাসান ঢাকা এসে ঐকতান নাম দিয়ে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় খুলেছিলেন। ছোটদের বাংলাগানের মূলধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াটাই ছিল উদ্দেশ্য।
ঢাকার লালমাটিয়াতে চার রুমের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে দু’টি কক্ষে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করেন। অন্য দু’টি কক্ষ নির্দিষ্ট করা হলো সঙ্গীত বিদ্যালয়ের জন্য। দু’শিফ্টে পঁচিশ-ত্রিশজন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে সুনামের সঙ্গেই চলছিল স্কুলটি। ঢাকার মানিকগঞ্জের নিকটের বাড়ি থেকেও আবেদ হাসান ভাল অর্থকড়ি পেতেন। তাই ভালবাসবার মতো স্ত্রী, একটি কন্যাকে নিয়ে তিনি বেশ সুখেই ছিলেন। কিন্তু মানুষ তো চিরদিন সুখে থাকে না। মানুষের জীবন যেন সুখ-দুঃখের একটা চক্র। ৫২ বছর বয়সে আবেদ হাসান আকস্মিকভাবে মস্তিষ্কের স্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন। ওই স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের বাম দিকটা অনেকটা অচল হয়ে পড়ল। এছাড়া তার বলা কথাও জড়িয়ে যেতে লাগল।
এমন অবস্থায় হাসান সাহেব এবং তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত বিদ্যালয়টি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কমে এলো। তবু সুচরিতা দেবী একক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি চালিয়ে রাখলেন। কিন্তু সংসারের খরচ চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ল। হাসান সাহেবের চিকিৎসার খরচ, মেয়ে মিনতির পড়ার খরচ, সংসারের খরচ। সব রকমের খরচ সামলাতে গিয়ে প্রথমে বিক্রি করা হলো সুচরিতা দেবীর স্বর্ণালঙ্কার। তারপর মানিকগঞ্জের বাড়ির কিছু জায়গা-জমি।
আগেই বলেছি মানুষের জীবন হলো সুখ এবং দুঃখের একটি চক্র। হাসান সাহেবের দুঃখ-কষ্টের দিনও শেষ হয়ে এলো। তাদের একমাত্র মেয়ে মিনতি ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষায় খুব ভালভাবে উত্তীর্ণ হলো। হাসান সাহেব নিজেও এখন অনেকটা সুস্থ। নিজেই চলাফেরা করতে পারেন। গান গাওয়ার ব্যাপারে কিছুটা সমস্যা এখনও আছে। তবে গান লিখে কিছু উপার্জন করছেন। মিনতি একটি চাকরির সন্ধান করছে এবং সঙ্গীত বিদ্যালয় চালাতে মাকে সাহায্যও করছে। বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় আবেদ হাসান সাহেবের পরিবারের ওপর থেকে মেঘের অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। এখন মেঘের কিনারে সূর্যের আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে।
এমনি যখন অবস্থা, তখন মিনতি হাসান একটি প্রাইভেট ব্যাংকে প্রবেশনাল অফিসার পদের জন্য আবেদন করল। ওই ব্যাংকেরই পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান মেয়াদের চেয়ারম্যান হলেন আবু আহাদ চৌধুরী।
লিখিত পরীক্ষায় মিনতি উত্তীর্ণ হলো। এবার তাকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে উপস্থিত হয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হবে। ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যানও হলেন আবু আহাদ চৌধুরী।
অয়ন প্রতিদিন চেয়ারম্যান সাহেবের অফিস কক্ষের বাইরে তার সেক্রেটারির সামনে একটি চেয়ারে বসে থাকে। চেয়ারম্যান সাহেব তার সেক্রেটারিকে বলে দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে যেন অয়নকে তা দেখিয়ে নেয়। মিনতির ইন্টারভিউর দিন অয়ন অফিসে ছিল না।
মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার জন্য মিনতি উপস্থিত হয়ে বোর্ড কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করে রইল। সাত-আটজন পরীক্ষার্থীর পর মিনতির ডাক পড়ল।
আহাদ চৌধুরী সাহেব চাকরি প্রার্থীদের তেমন কোন প্রশ্ন করছিলেন না। দরজা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করার মুহূর্ত থেকে প্রার্থীদের হাঁটা-চলা, বসা, কথা বলার ভঙ্গিমা, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি নিগূঢ়ভাবে লক্ষ্য করছিলেন। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পেরেছেন, মানুষের দেহ ভঙ্গিমার ভাষা, চোখ-মুখের অভিব্যক্তি, পোশাক-পরিষদের রুচিবোধ ব্যক্তি চরিত্রের গুণাবলী, বিদ্যাবুদ্ধি, কী পরিবেশে মানুষ হয়েছে, এমন অনেক কিছুই প্রকাশ করে।
মিনতির পোশাক পরিচ্ছদে কোন বাহুল্য ছিল না। তার পরনে ছিল নীল রংয়ের একখানা তাঁতের শাড়ি। অতিশয় ফর্সা তার দেহের রংয়ের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করেছিল এবং একই সঙ্গে একটা শান্ত-স্নিগ্ধতার রূপ দিয়েছিল তাকে নীল রংয়ের শাড়িখানা। তার কণ্ঠে একগাদা স্বর্ণের চেইন ছিল। মুখে কোন রকমের মেকআপ ছিল না।
ইন্টারভিউ বোর্ডের অফিস ঘরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মিনতিকে দেখে আহাদ চৌধুরী চমকে উঠলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “কাহারে হেরিলাম, আহা! সে কি সত্য, সে কি মায়া।” মনে হলো তার স্ত্রী প্রণতি, আজ যেন তার মেয়ের রূপ নিয়ে তার সম্মুখে এসে হাজির হয়েছে। চিবুকের গঠন, কপাল, কপোল শরীরের রঙ সবই যেন একই রকম। তবে মিনতি যেন প্রণতির চেয়েও সুন্দর। নিজের মেয়ে নীরজার কথা মনে পড়ল। বুঝতে পারলেন, নীরজার চেয়েও সুন্দরী মেয়ে আছে। বুদ্ধিদীপ্ত স্নিগ্ধ চেহারার মিনতির চেহারায় আভিজাত্যের ছাপটা ছিল খুব স্পষ্ট। এটা চেষ্টা করে আয়ত্ত করা যায় না। এমন আভিজাত্য একান্ত সহজাত এবং কিছুটা জন্মসূত্রে পাওয়া। আবু আহাদ চৌধুরী ভাবলেন, তিনি পুত্রবধূ হিসেবে এমনই কাউকে খুঁজছিলেন।
আবু আহাদ চৌধুরী মিনতিকে জিগ্যেস করলেন, মা, তোমার বাবা-মা কি করেন? এমনই আরও দু’একটা প্রশ্ন। বোর্ডের অন্য কোন সদস্যকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ দিলেন না। কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় মিনতি যেন বিব্রত বোধ না করে, এটাই ছিল তার ইচ্ছা। তাই মাত্র দু’তিনটা কথা বলে আহাদ চৌধুরী মিনতিকে বললেন, মা, তুমি এবার যেতে পার।
বাসায় ফিরে এসে মিনতি চিন্তা করছিল এ কেমন ইন্টারভিউ? তার বিদ্যাবুদ্ধি যাচাই করার মতো প্রশ্ন কেউ করলেন না! অন্যান্য চাকরি প্রার্থীদের বেলায় পনেরো থেকে বিশ মিনিট সময় ধরে ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছে। আর তার বেলায় দু’মিনিটেরও কম সময়!
৩.
১ সপ্তাহ পরের কথা। মিনতি সন্ধের একটু আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণে মানিক মিয়া এ্যাভেনিউর ফুটপাত সংলগ্ন পেভমেন্টের ওপর অনেক লোকের মাঝে একা একা বসেছিল। তখন ফাল্গুন মাস। তাপমাত্রা ছিল আরামদায়ক। শহরের বড় উঁচু উঁচু ভবনগুলোর বাধা পেরিয়ে মৃদু দখিনা বাতাস এসে মিনতির চোখেমুখে পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিল। ভাবছিল, আরও খানিকটা সময় ওখানে বসে থেকে তারপর বাসায় চলে যাবে।
ওইদিন দুপুর বেলা আবু আহাদ চৌধুরী তার অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে অয়নকে কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর আবেদনপত্র দেখিয়ে বললেন, এই পাঁচজনকে ব্যাংকের প্রবেশনাল অফিসার হিসাবে নির্বাচন করা হয়েছে। ওই পাঁচজনের মধ্য থেকে মিনতির আবেদনপত্রখানা বের করে অয়নের হাতে দিয়ে বললেন, দেখ তো মেয়েটি কেমন? অয়ন পিতার ইঙ্গিতটা সহজেই বুঝতে পারল। তাই মেয়েটির ছবিখানা মনোযোগ দিয়ে দেখল এবং বাসার ঠিকানাটাও মুখস্থ করে নিল।
অয়ন সংসদ ভবনের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরে হাঁটছিল এবং ভাবছিল, কেমন করে মিনতির সাথে দেখা করা যায়? তাদের বাসায় যেতে পারলে, জানা যেত কেমন পরিবেশে সে মানুষ হয়েছে? ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের পরিবার উদারপন্থি না হলে পিতার পছন্দের মেয়েকেও সে বিয়ে করবে না। এমনি সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে করতে যখন হাঁটছিল তখন অয়ন দেখতে পেল, রাস্তার পেভমেন্টের ওপর একটি মেয়ে একা একা বসে আছে। চিনতে একটুও ভুল হলো না যে এই মেয়েই তো মিনতি হাসান।
অয়ন গিয়ে মিনতির পাশেই বসে পড়ল। পাশে এসে যে ছেলেটি বসেছে, তার দিকে মিনতি তাকিয়ে দেখে বুঝল ছেলেটির কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই। জিন্সের ট্রাউজার আর লাল গেঞ্জি বা টি শার্ট পরা ছেলেটি দেখতে সুদর্শন, বলিষ্ঠ এবং সুঠাম তার দেহ।
সামনে দিয়ে একজন বাদাম বিক্রেতা যাচ্ছিল। অয়ন বাদামঅলাকে বলল, কিছু বাদাম দেও। এরপর মুখ ঘুরিয়ে মিনতিকে জিজ্ঞেস করল, বাদাম খাবেন?
এমন প্রশ্নে মিনতি খানিকটা অবাক এবং একই সঙ্গে বিরক্ত বোধ করল। বলল, আপনি আমার পরিচিত না। আপনার অনুরোধ রক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই বলে সে উঠে দাঁড়াল এবং পথ চলতে উদ্যত হলো।
অয়ন বলল, একটু দাঁড়ান। আমি আপনার কাছে অপরিচিত হতে পারি। কিন্তু আপনি আমার পরিচিত। আপনার নাম মিনতি হাসান, পিতার নাম আবেদ হাসান, বাসা লালমাটিয়া। অপরিচিত যুবকের কাছ থেকে নিজের, নিজের পিতার নাম এবং বাসার সঠিক ঠিকানা শুনে বেশ কৌতূহলী হয়ে মিনতি বসে পড়ল। তারপর হাতবাড়িয়ে দিয়ে বাদাম চেয়ে নিল। অয়ন বলল, এখানেই শেষ নয়। আপনাকে একটি সুসংবাদ দেয়ার আছে।
আরও বেশি কৌতূহলী হয়ে বাদাম খেতে খেতে মিনতি বলল, এবার বলুন সুসংবাদটি কী?
অয়ন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এবার চলুন, আপনাদের বাসায় যাওয়া যাক! ওখানে গিয়ে আপনার মা-বাবার সামনেই সুসংবাদটি দিতে চাই।
মিনতি বাসায় যাওয়ার প্রস্তাব না করতে পারল না। সে বারবার অয়নকে দেখছিল। বুঝতে পারল, এমন ভদ্র যার চেহারা, এমন সহজ যার ব্যবহার সে মিথ্যা কথা বলতে পারে না। বাসায় যাওয়ার পথে অয়ন বেশ কিছু উৎকৃষ্ট মিষ্টি কিনল। তা দেখে মিনতি প্রশ্ন না করে পারল না, মিষ্টি কেন? অয়ন বলল, এটা তো আমাদের দেশের সামাজিক রীতি, কারও বাসায় খালি হাতে যাওয়া যায় না, এছাড়া সুসংবাদের পর তো মিষ্টিমুখ করতে হবে।
সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অয়ন সুচরিতা দেবী এবং আবেদ হাসান সাহেবকে বলল, এই মুহূর্তে আমার সকল পরিচয় দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাধা আছে। তবে এইটুকু বলতে পারি আমার নাম অয়ন, মিনতি যে ব্যাংকে চাকরির জন্য আবেদন করেছে, ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে শিক্ষানবিস হিসাবে আছি। চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে জানতে পারলাম, মিনতির চাকরি হয়েছে। কাল বা পরশু রেজিস্টার্ড চিঠির মাধ্যমে বাসায় পৌঁছে যাবে। আমার বাসা আপনাদের গলির পাশের গলিতেই। মিনতিকে সুসংবাদটি জানিয়ে যাওয়ার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না। তাই নিয়োগপত্রের একখানা ফটোকপি করে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এই বলে মিনতির হাতে সেটা তুলে দিল।
মিনতি নিয়োগপত্রখানা দেখে ভাবছিল, ইন্টারভিউর দিন চেয়ারম্যান সাহেব তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেছেন। অন্য কাউকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। চাকরিটা খুব সহজে হয়ে গেল। অথচ ইন্টারভিউর আগে সে বেশ নার্ভাস ছিল। কোথায় যেন একটা রহস্য আছে। সব রহস্যের ব্যাপার অবশ্যই অয়নের জানা আছে। কিন্তু সে নিজের থেকে না বললে তো এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা যায় না।
অয়ন যখন মিনতির বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল তখন সুচরিতা দেবী বললেন, বাবা, তুমি তো কাছেই থাক, তাই সময় পেলে মাঝে মধ্যে এসো কিন্তু।
অয়ন যাওয়ার আগে বলে গেল, মিনতি চাকরিতে যোগদান করার আগে যেন চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে দেখা করে তার পদধূলি গ্রহণ করে।
৪.
মিনতি চাকরিতে যোগ দিয়েছে প্রায় দু’মাস হলো। আবু আহাদ চৌধুরী সিসিটিভি-ক্যামেরায় চোখ রেখে মিনতির দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখেন। এ পর্যন্ত ওর কাজকর্মে, আচরণে তিনি কোন রকমের ত্রুটি দেখতে পাননি। দু’একদিন তিনি ওকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠান। ওর মা-বাবা কেমন আছেন সে সম্পর্কে খোঁজ নেন। চাকরি করতে গিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা তা জানতে চান। মাত্র দু’মাসের চাকরিতে ওর মাঝে যেন পরিপূর্ণতা এসেছে। রূপের প্রভা যেন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চেয়ারম্যান সাহেব তো অন্য কারও প্রতি এত সদয় নন। এ সবের মাঝে যে কিছু রহস্য আছে সে বিষয়ে মিনতি নিশ্চিত হয়েছে।
আবু আহাদ চৌধুরী একদিন তার কক্ষে ডেকে নিয়ে মিনতিকে বললেন, মা, তুমি ব্যাংকের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে প্রণতি এন্টারপ্রাইজের কর্পোরেট অফিসে যোগদান কর। তুমি হবে স্পেশাল এ্যাসিট্যান্ট টু দ্য চেয়ারম্যান। প্রণতি এন্টারপ্রাইজের অতগুলো প্রতিষ্ঠান কেমন করে চলছে, কোথায় কোথায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন সবকিছু তোমাকে জানতে হবে। আমি জানি সবকিছু আস্তে আস্তে শিখে নেয়ার মেধা তোমার আছে।
চেয়ারম্যানের উপদেশ মতো মিনতি প্রণতি এন্টারপ্রাইজের অফিসের চাকরিতে যোগদান করল। ওই চাকরিতে যোগদানের জন্য তার নিয়োগপত্রে মাইনের উল্লেখ্য পরিমাণটা শুধু মিনতি নয়, তার বাবা-মাকেও বিস্মিত করল। মিনতি বুঝতে পারল, এ সবের পেছনে নিশ্চয়ই অয়নের হাত আছে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে অয়নের সম্পর্কটা কি, সে সম্পর্কে তার ধারণা যে সঠিক এ কথাও বুঝতে পারল।
মিনতি যেদিন প্রণতি এন্টারপ্রাইজের চাকরিতে যোগদান করে, ওই দিন অফিসের ছুটির পর অয়ন এসে মিনতিকে বলল, চেয়ারম্যান সাহেবের নির্দেশ, প্রতিদিন আমি যেন তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই। শুধু তাই না, তুমি বাসা ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার আদেশ করলে আমি যেন তা পালন করি। তবে বাসা থেকে সকালে আনতে যাবে অন্য কোন ড্রাইভার।
কথামতো অফিসের ছুটি শেষে মিনতিকে বাসায় পৌঁছে দিতে অয়ন চেয়ারম্যান সাহেবের গাড়িখানা নিয়েই বেরোল। বাসায় যাওয়ার পথে অয়ন প্রশ্ন করল, আড়ংয়ে যাবে? যদি কিছু কিনতে চাও।
না, আজ না। আগামীকাল যাওয়া যাবে। তার চেয়ে চলো, আমাদের বাসায়। আজ তুমি আমাদের বাসায় খাবে। মিনতি এবং অয়ন খেয়ালও করেনি তারা একে অপরকে আপনি থেকে তুমি বলে সম্বোধন করছে। এই সম্বোধনের রূপান্তর খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটে গেল। মনের অজান্তেই একে অন্যকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে তারা।
মিনতিকে চাকরি দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসার কারণ, আবু আহাদ চৌধুরী মিনতিকে আরও একটু পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে চেষ্টা করছিলেন, মিনতি প্রণতি এন্টারপ্রাইজের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবে কিনা? দু’মাসের পর্যবেক্ষণের পর ছেলে অয়নকে গ্রীন সিগন্যাল দিলেন, মিনতি তার পুত্রবধূ হওয়ার উপযুক্ত পাত্রী।
৫.
অফিস ছুটির পর অয়ন প্রতিদিন মিনতিকে বাসায় পৌঁছে দেয়। কখনও কখনও শপিং করে বেড়ায়, কখনও ভাল রেস্তরাঁয় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে। মাঝেমধ্যে অয়ন যায় মিনতিদের বাসায়। ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে গল্প করে।
মিনতিও যায় অয়নের বাসায়। ওর বাসায় মিউজিকের বাদ্য-যন্ত্রের গুণগত মান এবং সংখ্যা ওকে অবাক করে। অয়নের বাসা থেকে মিনতি প্রায়ই রাতের বেলায় একটু দেরি করে ফিরে আসে। অয়নই পৌঁছে দিয়ে যায়।
মিনতি যে প্রায় রাতে একটু দেরি করে বাসায় ফিরে আসে সে জন্য সুচরিতা দেবী এমনকি তার স্বামীও খুব একটা উদ্বিগ্ন বোধ করেন না। ওরা দু’জনে কি করে সময় কাটায় তা নিয়ে চিন্তা করার কি আছে? বিয়ের পর মানুষ যা করে অথবা যা করার জন্য বিয়ে করে, সেই একই কাজ ২৩ বছরের একটি মেয়ে যদি বিয়ের আগেই করে, তাহলে দোষের কি থাকতে পারে! সুচরিতা দেবীর মনে আছে, এখন থেকে ২৬-২৭ বছর আগে তিনি এবং আবেদ হাসান বিয়ের আগেই ওই কাজটা করেছেন। সে সময়টাই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। শান্তি নিকেতনের সাঁওতালপাড়ায় গিয়ে মহুয়া ফুলের মধু দিয়ে তৈরি মদও তারা পান করেছেন। এখন ২৫-৩০ বছর পর দেশের সমাজ ব্যবস্থায় কতই না পরিবর্তন এসেছে। এখন ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশায় কেউ দোষের কিছু দেখেন না।
একদিন সন্ধ্যার পর মিনতি অয়নের বাসায় ছিল। সিডিপ্লেয়ারে গান শুনছিল। অয়ন বলল, তুমি হয়ত কিছু মনে করবে তাই এতদিন বলিনি। আমার কিন্তু একটু দ্রাহ্মারস পান করার অভ্যাস আছে। তুমি যদি সঙ্গ দেও তবে দ্রাহ্মারসের একটি বোতল খুলতে পারি।
মিনতি বলল, তুমি পান করলে আমি কিছু মনে করব না। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার তো অভ্যাস অথবা অভিজ্ঞতা নেই। অয়ন বলল, দেখ, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হাফিজ বলেছেন,

‘সুরা পান করা অতি সৎ কাজ
এ কথা মনে রেখো, হে হাফিজ
সঙ্কল্পের মুখাটা ঘোরাও
যেদিকে আছে ঐ ভালো চিজ।’

অয়ন বলছিল, অভ্যাস না থাকলে কি আসে যায়! পান করে দেখ, ভাল লাগলে পান করবে, নতুবা না। দ্রাহ্মারসের মদিরা মানুষের মনের দরজা খুলে দেয়। ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে,
‘লেট আচ হ্যাভ ওয়াইন এ্যান্ড লাফটার,
সার্মনস, এ্যান্ড সোডা ওয়াটার ডে আফটার।’
কথাগুলো বলতে বলতে অয়ন ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটি পানীয়র বোতল বের করল। দু’টি পানপাত্র এনে রক্তিম বর্ণের পানীয় তাতে ঢেলে একটি পানপাত্র মিনতির হাতে তুলে দিল।
মদিরা পানে মিনতিকে তেমন সাধাসাধি করতে হলো না। খুশি মনেই একটি পানপাত্র হাতে তুলে নিল সে। মিনতির সুরা পানে আপত্তি না থাকার কারণ, মায়ের কাছে শুনেছে, শান্তি নিকেতনে থাকতে মা-বাবা সাঁওতালপাড়ায় গিয়ে মহুয়া ফুলের মধু দিয়ে তৈরি মদ পান করার কথা।
পানপাত্র হাতে নিয়ে অয়ন অনুরোধ করে বলল, মিনতি একটা গান গেয়ে শোনাও। খুব একটা অনুরোধ করতে হলো না।
মিনতি শুরু করল।

‘রোদন ভরা এ বসন্ত সখী, কখনই আসেনি বুঝি আগে,
মোর বিরাহবেদনা রাঙানো কিংশুক রক্তিম রাগে॥
কুঞ্জে বনমল্লিকা সেজেছে পরিচয় নব পত্র মল্লিকা,
সারা দিন-রজনী অনিমিখা কার পথ চেয়ে-জাগে ॥’

গান শেষে অয়ন বলল, তুমি শুধু ভাল গাও না, তুমি দেখতেও অসাধারণ সুন্দরী। অয়ন বলল, জানো, আমার নানা এক সময় ছিলেন বিহারের বাসিন্দা। পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন। তাদের বাড়ি ছিল মগধের রাজধানী রাজগিরের (বর্তমানের পথ রাজগৃহ) কাছে। নানা রসিকতা করে বলেন, তার শরীরে হোমিওপ্যাথিক ডোজের হলেও মগধের রাজবংশের রক্ত আছে। নানা ভাই এখন আছেন আমেরিকায়। তার বয়স এখন ৮৫ বছর। তাকে দেখলে তোমার মনে হবে তিনি রাজ পুরুষই বটে! নানা ভাই, রসিকতা করে আমাকে মগধের রাজপুত্র এবং আমার বোনকে মগধের রাজকন্যা বলে ডাকেন। তোমাকে দেখলে তোমারও অমন কোন নামকরণ করবে। হয়ত তোমাকে ডাকবেন মিথিলার রাজকন্যা বলে।
অয়ন বলল, মৈথিলি ভাষায় লেখা একটা কবিতা শুনবে, যা তোমার ক্ষেত্রে খুবই প্রযোজ্য।

“স্বর্গ সুন্দরী শশী ষোড়শী-
সুনকর তব গুনÑগৌরব
আওয়েগী অনুপম দিখলাতে
আপন যৌবন বৈভব।”

মিনতি বলল, এতে, বাংলা-ভাষা থেকে খুব বেশি পার্থক্য নয়। সহজেই বুঝা যায়।
অয়ন বলল, মৈথিলি ভাষা হলো, বাংলাভাষার ক্লাসিক্যাল রূপ। রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা দেবী ছিলেন মিথিলা রাজ্যের রাজকন্যা। মিথিলা সাম্রাজ্য ছিল পশ্চিমবাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত। মগধ সাম্রাজ্য ছিল উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত। মৈথালী এবং মাগধী ভাষা থেকেই সষ্টি হয়েছে বাংলা ভাষা। তাই বাংলাভাষা এত সুন্দর। রাত তখন প্রায় এগারোটা। খুব সুন্দর একটা পরিবেশে মিনতির আরও কিছু সময় থাকার ইচ্ছা ছিল। দ্রাক্ষারসের মদিরা সে বেশ উপভোগ করছিল। মনটাকে খুব হাল্কা মনে হচ্ছিল। বুঝতে পারল দ্রাক্ষারসের মদিরা ঠিকই মনের দরজা খুলে দেয়। কিছুটা আবেশ বশে সে কথা বলছিল। অয়নই বলল, রাজকন্যা, এবার তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি, মিথিলায় নয়, লালমাটিয়ারই বাসায়।
বাসায় পৌঁছে মাকে সে বলল, মা আমি কিছুটা ওয়াইন পান করেছি। মা, তার সহজ স্বীকারোক্তিতে খুশিই হলেন। বুঝলেন, মেয়ের মাঝে কোন অপরাধ বোধ নেই, নেই কোন পকটতাও। তাই বললেন, অয়নকে বললি না কেন খেয়ে যেতে? মিনতি বলল, মা আমরা কিছু রুটি এবং কাবাব খেয়েছি। অয়ন তার বাসার কেয়ারটেকারকে দিয়ে খাবার আনিয়েছিল।
এরপর মিনতি প্রায় নিত্যদিন সন্ধ্যার পর অয়নের বাসায় আসত। মা-বাবা যাতে চিন্তিত না হন, সে জন্য টেলিফোন করে তাদের জানিয়ে দিত যে সে অয়নের বাসায় আছে।
একটি দিনের সন্ধ্যার কথা এখানে তুলে ধরছি।
মিনতি নিজের থেকেই গান গাইতে শুরু করল:

‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনেÑ
তুমি জান না, আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে ॥
সে সাধনায় মিশিয়া যায় বকুলগন্ধ,
সে সাধনায় মিলিয়া যায় কবির ছন্দ ॥”

নতুন একটি দ্রাহ্মারসের বোতলের ছিপি খোলা হয়েছে।
আজকে দু’জনে একটু বেশি পানীয় পান করল। অয়ন একদৃষ্টিতে মিনতির দিকে তাকিয়েছিল।
মিনতি জিগ্যেস করল অমন করে কি দেখছ?
অয়ন বলল, তোমার শাড়ির আঁচলে ঢাকা থাকলেও তোমার স্তনদ্বয়ের, ভুল বলেছি, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় পূজার ফুল দু’টির সমুন্নতভাব দেখতে পাচ্ছি। সুন্দর কিছু দৃশ্যমান হলে তা না দেখা মহাপাপ।
মিনতি কিছুটা কৃত্তিম রাগ দেখিয়ে বলল, আজ মনে হয় তুমি কিছুটা মাতাল হয়ে পড়েছে।
অয়ন বলল, সেই হাজার বছর আগে ভারত বর্ষের রাজকন্যারা ব্লাউজ পরত না। শুধু বক্ষবন্ধনী ব্যবহার করত। তুমি যদি ব্লাউজটা খুলে ফেল, তাহলে রাজকন্যার আসল রূপ দেখতে পেতাম।
মিনতি এর উত্তরে বলল, আমি জানি আবু আহাদ চৌধুরী তোমার পিতা। তিনি যেদিন আমাদের দু’জনকে আশীর্বাদ করবেন, তারপর দেখা, শুধু ব্লাউজ খোলা কেন, সম্পূর্ণ বিবসনা হতেও আমার আপত্তি থাকবে না। আজ তোমার যা যা ইচ্ছা করছে, তেমন তেমন ইচ্ছা আমারও আছে। নরনারী সবার মাঝেই এমন ইচ্ছা আছে বলেই তো শুধু মনুষ্যই নয়, অন্যসব প্রাণীর জীবনধারা রক্ষা পাচ্ছে। ইচ্ছাটাকে সংযমের নামে যত বাধা দিবে, ইচ্ছার তীব্রতা তত বৃদ্ধি পাবে। তাই আমি মনে করি, পিতার আশীর্বাদ না পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণই উত্তম কাজ হবে। ইচ্ছার তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাক।
অয়ন বলল, ঠিক আছে, তোমার কথাই মেনে নিলাম, তবে আবারও তোমাকে মৈথিলি ভাষার একটি কবিতার দু’টি লাইন শোনাচ্ছি।

‘দেখ্ তুমহারা বদন-চন্দ্রমা
সৌরভ-সুষমা-সাগর-
সুখ সে সহসা জাগ উঠে গা
সুমনো সে লহরা কর।’

শোন, মিনতি আমি মদ খেয়ে মাতাল হয়নি। মাতাল হয়েছি, তোমার অর্থাৎ মিথিলার রাজকন্যার রূপ দেখে। চল, এখন তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। অয়ন বলছিল, কাল কিন্তু সন্ধ্যার পর তুমি আর আমি তোমার মা-বাবার আশীর্বাদ নিয়ে আসব। এক সপ্তাহ পর আমার বোন নীরজা তার স্বামীকে নিয়ে ঢাকায় আসবে। নানা ভাইও আসতে পারেন। তারপর তোমার মা-বাবার অনুমতি নিয়ে আমার পিতা তোমাকে আশীর্বাদ করতে আসবেন। আবু আহাদ চৌধুরী জীবনে বেশি ভুল করেননি। গত চার-পাঁচ মাস যাবত তিনি তোমাকে কাছ থেকে দেখেছেন এবং তোমাকে মূল্যায়ন করেছেন। এখন এই সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন যে তুমি তার পুত্রবধূ হওয়ার মতো সর্বগুণসম্পন্ন। তার পুত্রেরও একই ধারণা।
একদিন পর অয়ন একটু ভিন্ন রকমের পোশাক পরল। গরদের পাঞ্জাবি, সিল্কের পায়জামা, নাগরাই সু পরনে দেখে মিনতি বলল, ভাল মানিয়েছে তোমাকে। এখন মনে হয় তুমি যেন অযোধ্যার নবাবপুত্র।
সন্ধ্যার পর মিনতি আর অয়ন গিয়ে সুচরিতা দেবী এবং আবেদ হাসানের পদধূলি গ্রহন করে ভবিষ্যত জীবনের জন্য তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করল।
অয়ন সুচরিতা দেবীকে বলল, আমার নাম অয়ন চৌধুরী। প্রণতি নামটা আমার মায়ের নাম। আশা করি-এবার বুঝতে পারছেন, আমার পিতাকে? আপনারা অনুমতি দিলে তিনি আপনাদের বাসায় আসবেন মিনতিকে আশীর্বাদ করতে। অয়ন আরও বলল, পনেরো বছর হয়েছে, আমার মা মারা গেছেন। এখন আপনিই (সুচরিতা দেবী) আমার মা।
সুচরিতা দেবী অয়নকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এতদিন জানতাম আমি একটি কন্যা সন্তান যার নাম মিনতি শুধু তার মা। আজ জানলাম, আমার দুুটি সন্তান।
সৈয়দ আবেদ হাসান পরিপূর্ণ সুস্থ মানুষের মতো এগিয়ে এসে মিনতি এবং অয়নকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বললেন, তোমরা জীবনে সুখী হবে এই প্রার্থনা করি। অতিরিক্ত আবেগ এবং আনন্দের কারণে তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে স্ট্রোকের সামান্য ক্ষতটুকুও সারিয়ে দিল। সবাই দেখল বিস্ময়কর ব্যাপার, এমন আনন্দের দিনে সৈয়দ আবেদ হাসানের কণ্ঠস্বরের সমস্ত জড়তা কেটে গেছে। এবার তিনি পরিষ্কার কণ্ঠস্বরে একটি গান গাইলেন।

“প্রভু তোমার বীণা বাজে
আঁধার মাঝে
অমনি ফোটে তারা।
যেন, সেই বীণাটি গভীর তানে
আমার প্রাণে
বাজে তেমনি ধারা।”
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment