Tuesday, July 22, 2014

ব্রিকস ব্যাংক বৈষম্যহীন বিশ্বের স্বপ্ন

ব্রিকস ব্যাংক বৈষম্যহীন বিশ্বের স্বপ্ন
কামরুল হাসান
বিশ্বকাপের আমেজ না ফুরাতেই ব্রাজিল আয়োজন করল ব্রিকস জোটের এক ঐতিহাসিক সম্মেলন। ফুটবলের দেশে এবার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠনের ঘোষণা। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর পাঁচটি রাষ্ট্রের ৬ষ্ঠ বৈঠকে এমন প্রত্যয় সত্যিকার অর্থে বিকল্প অর্থনৈতিক প্রবর্তনের এক নবযুগ। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষার যে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্য তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নতুন এই পরিকল্পনা। এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, “আমরা মনে প্রাণে বহু মেরুর বিশ্ব চাই, যেখানে কোন বৈষম্য থাকবে না।”
তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়নের সহযোগী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচনেও ভূমিকা রাখবে এমন আশাবাদ অর্থনীতিক বিশ্লেষকদের। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় এই ব্যাংক ন্যাটো তথা আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহের আধিপত্যের প্রতিও এক হুঁশিয়ারী, যা ডলারের সম্প্রসারণমূলক নীতির জন্যও ভয়ঙ্কর এক দুঃসংবাদ। সেই সঙ্গে মার্কিন নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের অবসান। ডলার-ইউরোর পর শীঘ্রই নতুন বিশ্বমুদ্রা প্রচলনেরও আভাস। যার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর মার্কিন খবরদারি এবং আধিপত্যের অবসান ঘটার সম্ভাবনা।
ব্রাজিল-রাশিয়া-ভারত-চীন-দক্ষিণ আফ্রিকা পাঁচটি রাষ্ট্রের আদ্যক্ষর দিয়ে গঠিত হয় জোট ব্রিকস (ইজওঈঝ)। এই জোটের পাঁচটি রাষ্ট্রই অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুই বিবেচনায় বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক। এবং আগামী বিশ্বের অর্থনীতি এইসব রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে। ভারত-চীনের যেমন বিশাল জনগোষ্ঠী এবং বাজার তেমনি রাশিয়া এবং ব্রাজিলের রয়েছে শিল্পের কাঁচামালের মজুদ। সেই সঙ্গে তেল গ্যাসের যোগানও দিতে পারবে এই দুই দেশ।
বেশ উচ্চাশা নিয়ে পাঁচ অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশ এই ব্যাংক গঠনের ঘোষণা দেয়। পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের সমান অংশীদার ও ভোটাধিকার থাকবে। সেই সঙ্গে উন্নয়নশীল অন্যান্য রাষ্ট্রকেও এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হবে। বাড়ানো হবে ব্যাংকের মূলধন এবং সদস্য সংখ্যা। মোট ১০ হাজার কোটি ডলারের পুঁজি নিয়ে গড়ে তোলা হবে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তবে প্রাথমিকভাবে পুঁজি হবে পাঁচ হাজার কোটি ডলার। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা প্রত্যেক রাষ্ট্র এক হাজার কোটি ডলার করে দেবে।
অনুমোদিত মূলধনের বাইরে ১০ হাজার কোটি ডলারের সঙ্কট মোকাবেলার তহবিলও গঠন করা হয়েছে, যা কনটিনজেন্ট রিজার্ভ এ্যারেঞ্জমেন্ট নামেও পরিচিত। এই ধরনের ব্যবস্থা বিশ্ব আর্থিক বাজারের সঙ্কট থেকে নিজেদের জাতীয় অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা দিবে এমনটাই ভাবছেন জোট নেতারা।
মূলত আইএমএফ উদীয়মান দেশগুলোর গুরুত্ব মূল্যায়ন করেনি বলেই ব্রিকস ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করবে এমনটাই আভাস।
আইএমএফ প্রতিষ্ঠার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলো প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থায়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে এমন কতৃত্বের বিষয়টি অনেক আগে থেকেই ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল গরিব রাষ্ট্রগুলোকে। তাই ব্রিকস ব্যাংক গঠনের ফলে তাদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগায় রাশিয়া-চীনসহ বিকল্প নেতৃত্বের রাষ্ট্রগুলো। তাই এখন নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতেও এই ব্যাংক ব্যবহার হবে নতুন আঙ্গিকে। আইএমএফ এবং ব্রিকস দুই ব্যাংকের মাধ্যমে রাজনীতি এবং অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারসাম্য ফিরে আসবে। বাড়বে ন্যাটো এবং ব্রিকস জোটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী এক মেরুকরণের যে বিশ্ব ব্যবস্থা তা চিরতরে অবসান ঘটবে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে রাশিয়া জ্বালানি জোট গঠনেরও একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যা ফুয়েল রিজার্ভ ব্যাংক ও ব্রিকস এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত হবে। এই জ্বালানি জোটে বিশ্বের তেল সমৃদ্ধ কিছু দেশ যোগ দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এ ক্ষেত্রে ইরান, ভেনিজুয়েলা এবং ইরাক হবে অন্যতম। জ্বালানি জোট গঠন করা হলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো রাশিয়া এবং চীনের প্রভাবে নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতেও বাধ্য হবে। জ্বালানি শিল্পে মার্কিন প্রভাব কমাতে পারলেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অর্থনীতি ক্রমাগত সংকোচনের পথে হাঁটছে, কমছে প্রবৃদ্ধির হার। অন্যদিকে বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ ব্যয়ের ফলে মার্কিন যে ঋণ তা ক্রমেই দেশটিকে দেউলিয়াপনার দিকে ঠেলে দেবে।
এবারের সম্মেলনের পূর্বে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রে সফর করেন। মার্কিনবিরোধী লাতিন আমেরিকার এই সব রাষ্ট্র ইতোপূর্বে নিজেরাই একটি আঞ্চলিক ব্যাংক গঠন করেছিল। এই ব্যাংকের সদস্য হলো লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারাবিয়ান অঞ্চলের মোট ১৮টি রাষ্ট্র। নিজেদের অর্থায়নে অবকাঠামো তৈরির এক অসাধারণ উদ্যোগ। ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র আইএমএফের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেরাই অর্থায়নের ব্যবস্থা করছে। সেই সঙ্গে কমছে পশ্চিমা সাহায্যের প্রতি নির্ভরশীলতার মানসিকতা। বিশ্ব অর্থনীতির নব দুয়ার উন্মোচন হচ্ছে বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশে।
ব্রিকস ব্যাংক বিশ্বের অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মিত্ররাষ্ট্র নিয়ে রাশিয়ার নবজাগরণ। মার্কিন অর্থনৈতিক মন্দার ফলে এ সকল রাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় বর্তমানে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা অনেক কাটিয়ে উঠবে। ডলারের উপর নির্ভরশীলতাও কমবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে। এই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় চীনের সাংহাই শহরে হলেও প্রতিনিধিদের চেয়ারম্যান থাকবে রাশিয়া।
আর ভারত হবে ব্যাংকের প্রথম সভাপতি। ২০১৬ সাল থেকে এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হবে। এই ব্যাংকের সদস্য হতে ইতোমধ্যে মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যুক্ত হতে পারে এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। ব্যাংক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ঘোষণা আসতে পারে নতুন মুদ্রার, যা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ডলারের বিকল্প হিসেবে গণ্য হবে।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment