নির্বিচার হামলা চলছেই
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ জুলাই, ২০১৪
দশ দিন ধরে বিমান ও স্থল হামলার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার ৫ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি দেখল গাজা। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে ইসরাইল ও হামাস বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এ ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয়। ওষুধপত্র সংগ্রহ ও দরকারি কাজ সেরে নিতে এ সময় তাই সংশ্লিষ্ট স্থানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অধিবাসীরা। জনজীবনে নেমে আসে সাময়িক স্বস্তি।
এ স্বস্তিকে আরও স্ফীত করে ‘স্থায়ী যুদ্ধবিরতি’র খবর। আজ শুক্রবার থেকে ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরু হচ্ছে। দু’পক্ষই এতে সম্মত হয়েছে- দুপুরে এমনটি দাবি করে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী। তাদের মতে, মিসরে এ বিষয়ে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের কর্মকর্তাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। তবে এমন কোনো চুক্তির কথা অস্বীকার করে হামাস। পরে নিজেদের দেয়া খবর ‘ঠিক নয়’ বলে উড়িয়ে দেয় ইসরাইলও।
ফলে আতংক আর উদ্বেগ নিয়েই সময় গুনতে শুরু করে ফিলিস্তিনিরা। বিকালে আবারও হামলা শুরু করে ইসরাইল।
দশম দিনে এসে গাজায় নিহতের সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ২২৭-এ। আহতের ক্ষেত্রে তা ১৮শ’ ছাড়িয়েছে। ওপারের ডাকে সারা দেয়া আর হাসপাতালের বিছানায় কাতরানো এসব মানুষের অধিকাংশই নিরীহ নারী ও শিশু। এ সময় ধুলোয় মিশে গেছে ১৪শ’র বেশি ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। সব হারিয়ে ১৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ছেড়েছেন গাজা।
পাঁচ ঘণ্টার মানবিক যুদ্ধবিরতি : ইসরাইলি হামলায় গাজায় নেমে এসেছিল মানবিক বিপর্যয়। দেখা দিয়েছিল তীব্র পানি সংকট। হামলায় আহতদের চিকিৎসাসেবাও দেয়া যাচ্ছিল না যথাযথভাবে। হামলায় বিধ্বস্ত বাড়িঘর ছেড়ে ফিলিস্তিনিরা যে নিরাপদ আশ্রয়ে যাবেন, পারছিলেন না তাও। জরুরি যোগাযোগের অবকাঠামোও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন স্থানে। এমনকি জাতিসংঘের ত্রাণ ও ওষুধবাহী গাড়িও যথাস্থানে যেতে পারছিল না। এ অবস্থায় মানবিক স্বার্থে ও জরুরি অবকাঠামো সংস্কারে পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
এতে সম্মত হয় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোয়াভ মরদেশাই জানান, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় বেলা ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা) গাজায় কোনো ধরনের হামলা চালানো হবে না। গাজার অধিবাসীরা এ সময়ের মধ্যে খাবার ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করে নিতে পারবেন। আর সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, অস্ত্রবিরতির নির্ধারিত সময়ে হামাস কোনো ধরনের হামলা চালালে ইসরাইল তার কঠিন জবাব দেবে।
হামাসের মুখপাত্র সামি আবু জুখারিও অনুরূপ কথাই জানান। তিনি বলেন, ওই সময়ে তার সংগঠন ইসরাইলের দিকে কোনো রকেট ছুড়বে না। এতে জনজীবনে নেমে আসে সাময়িক স্বস্তি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধসহ বিভিন্ন দরকারি সামগ্রী কেনাকাটায় ফিলিস্তিনিরা ছুটে যান দোকানে দোকানে। ব্যাংকের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ সারি।
যুদ্ধবিরতি শুরুর দু’ঘণ্টা পর ইসরাইল দাবি করে, হামাস ইসরাইলকে লক্ষ্য করে তিনটি রকেট ছুড়েছে।
আজ থেকে যুদ্ধবিরতি? : এর কিছুক্ষণ পরই ইসরাইলের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, ‘কাল (আজ শুক্রবার) সকাল ১০টা (বাংলাদেশে বেলা ১টা) থেকে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি চলবে। মিসরের মধ্যস্থতায় কায়রোতে এ বিষয়ে ইসরাইলি কর্মকর্তা ও হামাস নেতাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছে।’
কিন্তু ঘণ্টাখানিক পরই হামাসের পক্ষ থেকে বক্তব্য আসে- ‘এ বিষয়ে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি। তবে এ বিষয়ে কথা হচ্ছে।’ আর এ সংক্রান্ত কোনো বক্তব্যই পাওয়া যায়নি মিসরের পক্ষ থেকে। অবশ্য যুদ্ধবিরতির জন্য সোমবার প্রস্তাব দিয়েছিল মিসর। প্রস্তাব মেনে ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার ৬ ঘণ্টার মাথায় আবারও গাজায় হামলা চালায় ইসরাইল।
বৃহস্পতিবার বিকালে (বাংলাদেশে রাত) ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এভিগডোর লিভারমেন জানান, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আগের দেয়া খবর ঠিক নয়। আরেক কর্মকর্তা পিটার লার্নার বলেন, জঙ্গি শত্র“দের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলবে।
আবার হামলা শুরু : মানবিক যুদ্ধবিরতি শেষে আবারও বিমান হামলা চালাতে শুরু করেছে ইসরাইল। প্রাথমিক খবরে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ও রাতে তারা গাজায় ৩৯ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। বিপরীতে সাতটি রকেট হামলা চালিয়ে জবাব দেয়ার চেষ্টা করে হামাস।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, কিব্বুজ সুফায় বৃহস্পতিবার ইসরাইলের হামলায় ১৩ হামাস যোদ্ধা নিহত হয়েছে। এর মধ্যে আটজন বিমান হামলায় এবং পাঁচজন সৈন্যদের গুলিতে মারা যান। তবে এ খবরকে ভুয়া বলে দাবি করেছে হামাস। হামাসের যুদ্ধ শাখা কাশেম ব্রিগেড জানিয়েছে, তাদের একজন যোদ্ধাও মারা যাননি এদিন। যারা মারা গেছেন তারা সবাই নিরীহ নাগরিক।
চার কিশোরকে হত্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব : বুধবার গাজা সৈকতে চার কিশোরকে গুলি করে হত্যা করে ইসরাইলি নৌবাহিনী। এটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে দাবি করে হামাস। তবে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ বলেছেন, এটি কোনো উদ্দেশ্যমূলক হামলা নয়। শিশুদের হত্যার জন্য আমরা দুঃখিত। ইসরাইলের নিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এ ঘটনায় তিন নৌসেনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তও হবে।
ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরাইলের সর্বশেষ হামলার সূত্রপাত ইসরাইলি তিন কিশোরকে সম্প্রতি অপহরণ ও হত্যা নিয়ে। হামাসই ওই ঘটনা ঘটায় বলে মনে করে ইসরাইল। তবে হামাস তা অস্বীকার করে আসছে। পরে ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে একইভাবে হত্যা ও অপহরণের পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে- এমন দাবি তুলে ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ শুরু করে ইসরাইল। ইসরাইলের পক্ষ থেকে হামাসের রকেট হামলা বন্ধের উদ্দেশ্যে এই অভিযানের কথা বলা হলেও জাতিসংঘ বলছে, ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহতদের বেশির ভাগই সাধারণ নাগরিক। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজা দখলে নেয়াই ইসরাইলের লক্ষ্য।
No comments:
Post a Comment