কলকাতা আরও সুন্দর হচ্ছে কিন্তু পরিবেশের কী অবস্থা?
ধর্ষণ কিংবা দুর্নীতির প্রতিবাদে রাজপথে মিছিল হয়, কিন্ত্ত পরিবেশ দূষণের এই বিষয়টি কখনও উঠে আসে না৷ কেন? প্রশ্ন তুললেন কৌস্তুভ বসু
রাজনীতির পরিচিত নিয়ম মেনে সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যায় এখন সব দলই 'ব্যথিত'৷ অসুবিধের মধ্যে 'দুর্নীতি' ও 'নিরাপত্তা'র টিআরপি ইদানিংকালে সব থেকে বেশি৷ এ ছাড়া তো রয়েইছে 'দারিদ্র্য', 'বেকারত্ব', 'নিরক্ষরতা'র মতো চিরকালের চিরযুবক চিরপরিচিত সমস্যাকুল৷ আশ্চর্য লাগে, ভোটের বাজারে প্রচারে সব সমস্যাই গুরুত্ব পায়, ব্যতিক্রম কেবল 'পরিবেশ'৷ যদি খুব ভালো করে লক্ষ্য করি, গত পাঁচ বছরে দেশের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো সমস্যাগুলি ঠিক কী, সে ক্ষেত্রে 'দুর্নীতি' ও 'মেয়েদের নিরাপত্তা'র পাশাপাশি একটা ঘটনাই সবার আগে মনে পড়ে, গত বছর উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়৷ এর পরেও এ পোড়া আর্যদেশে 'পরিবেশ' ব্রাত্যই৷ সে ভোট যাঁরা চাইছেন তাঁদেরও যেমন এ বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই, তেমনই ভোট যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরাও অসীম নির্লিপ্ত৷ তা না হলে এক জন ভদ্রমহিলার ধর্ষণ কিংবা দুর্নীতির প্রতিবাদে রাজপথে যে স্বতঃস্ফূর্ততায় মিছিল নামে, কখনও কোনও নদী বা জলাশয় বাঁচাতে কিংবা পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে বা পরিবেশ নিয়ে রাজনীতিকের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কেন তেমন প্রতিবাদী ভিড় পথে দেখা যায় না? কোনও সমস্যাকে লঘু না করেই জানাই, সব থেকে দূষিত দেশগুলির মধ্যে এই মুহূর্তে ভারত বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই (আর্থ পলিসি ইনস্টিটিউট, ২০১৩), এবং, দূষণ প্রতিরোধে ভারতের অবস্থান বিশ্বে ১২৫ (ইয়েল ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, ২০১২)৷ রাজনীতির কারবারিদের কাছে নির্বাচনের প্রচারে জন-সমস্যা চয়নের যুক্তিটা খুব পরিষ্কার৷ যে 'সমস্যা'র কথায় জন-সাধারণের ক্ষোভ বেশি উগড়ে ওঠে, সে জটিলতাই বেশি প্রচারিত হয়, কারণ সাধারণের ক্ষোভ ও ভোটের অঙ্ক সমানুপাতিক সম্বন্ধে যুক্ত৷ কিন্ত্ত প্রশ্ন, আপনার-আমার মতো আম-আদমি কেন সব বুঝেও মেনে নিই? যে সাধারণের দরদে নেতারা শহরকে স্তব্ধ করে ব্রিগেডের আকাশ ধুলোয় ঢাকেন, কেন তাঁদের কাছে জবাব চাওয়া হয় না, কোন অধিকারে আপনি ভোট কুড়োতে আমাদের বাতাস বিষোচ্ছেন? কেনই বা সংবিধান-বিরোধী কর্মের জন্য এই জন-দরদী দেশ-সেবকেরা শাস্তি পান না?
সৌন্দর্যায়নের ঘটায় ইদানীং কালে কল্লোলিনী ক্রমশ নতুন সাজে সেজে উঠেছে! মিডিয়ান স্ট্রিপ, গ্রিন ফ্ল্যাঙ্ক, রোডসাইড আইল্যান্ড বা পেভার ব্লকে অনেক সবুজের সমারোহে প্রাথমিক ভাবে চমকে গেলেও খুঁতখুঁতে মন বিস্মৃত হয় না রাস্তা-প্রসারণের নামে ভিআইপি রোড কিংবা বাইপাসের মতো রাজপথের ধারে মৃত উদ্ভিদের লাশ৷ শহরে সবুজের ঘনত্বের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে কি না, সে বিতর্ক পাশে রেখে চারপাশের রঙিন মোড়কের গভীরে ঢুকলে ধাক্কা খেতে হয়৷ প্রিন্সেপ ঘাট যেমন ঘন বীথিতে ঢেকেছে, টেমসের ধারেও বুঝি অত সবুজ নেই৷ কিন্তু এতে গঙ্গার কী উন্নতি হয়েছে? একটুক্ষণ ধারে দাঁড়ালে দুর্গন্ধ নাকে আসে, ঘোলা জলে তাকালে দেখা যায় প্লাস্টিক, আবর্জনার পানসি ভাসছে, জলের মানের কথা আর নাই বা বললাম! ময়দানে নতুন বৃক্ষরোপণ হচ্ছে, কিন্তু যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক, কাগজ, নোংরা৷ অনেক জলাশয়ের চারপাশে দেখলাম সবুজের বলয়, কিন্তু জল ময়লা, কলিফর্মের আঁতুড়ঘর, ডাস্টবিন! শহরে যথাযথ শৌচালয় নেই৷ অনেক রাস্তার ধারে লোকে এখনও সেই মধ্যযুগীয় প্রথায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়৷ একটা সমীক্ষা জানাচ্ছে কলকাতা পুরসভার অধীনে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে রয়েছে মাত্র একটি করে শৌচালয়! আর যে শৌচালয়গুলি রয়েছে সেগুলিও সব সঠিক ভাবে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, যেন ছোটোখাটো রোগের আড়ত! আবর্জনা ফেলার জন্য নতুন সরকার ঢাকা দেওয়া ভ্যাট ও কম্প্যাক্টর আমদানী করলেও বাস্তবে সমস্যার সমাধান হয়নি৷ এখনও শহরের অনেক রাস্তার ধারে দেখা যায় ময়লার ভ্যাট নিয়মিত পরিষ্কার হয় না, দুর্গন্ধে টেকা দায়! প্রশ্নটা এখানেই, বাথরুমের শুদ্ধিকরণে প্রাথমিক ভাবে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কমোডের নোংরা পরিষ্কার নাকি দেওয়ালে নতুন রং করা? সঠিক উত্তরটি অবশ্যই হওয়া উচিত প্রথমটি, কিন্ত্ত বাস্তবে হচ্ছে দ্বিতীয়টি৷ বসন্তের গুটি ঢাকতে আপনি মুখে যতই দামি ফেস পাউডার মাখুন না কেন, রোগ কখনও নির্মূল হয় না৷ কোটি কোটি অর্থ ব্যয় হচ্ছে শহরের সৌন্দর্যায়নে, 'আলেয়ার পিছে ধাবমান মূর্খ হরিণ'-এর দল 'তবু কিছু তো হচ্ছে' সান্ত্বনা বাক্যে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যতই উদাসীন থাকুক, এতে কলকাতার পরিবেশের কতটা উন্নতি হচ্ছে, সে বিষয়ে রয়েছে ঘোর সন্দেহ৷
কলকাতার জলপথগুলির হাল সব থেকে শোচনীয়৷ ভৌগোলিক ভাবে কলকাতা পূর্ব দিকে ঢালু, এই স্বাভাবিক চরিত্রকে মাথায় রেখে ব্রিটিশ প্রযুক্তিবিদ মূলত তিনটি প্রধান জলপথে বা ক্যানাল তন্ত্রে (বাগবাজার, বাগজোলা ও টালিগঞ্জ) গোটা শহরটাকে একটা নীল বলয়ে বেঁধে রেখেছিল৷ খালগুলি কেবল এক কালের অন্যতম পরিবহণ-মাধ্যম ছিল না, শহরের বর্জ্য-জল নিষ্কাশনেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ কিন্তু এখন এরা মৃতপ্রায়, মশা-মাছির আড়ত৷ কেষ্টপুর খালে তা-ও দেখলাম কিছু নৌকা নেমেছে৷ সময় বলবে এটি লোক দেখানো না আন্তরিক উদ্যোগ৷ বাকি জলপথগুলির অবস্থা কহতব্য নয়৷ আদিগঙ্গার কথাই ভাবুন৷ পূর্ব বাংলা (অধুনা বাংলাদেশ) ও পশ্চিমবাংলার ভিতর একদা প্রধান বাণিজ্য-যোগপথ মেট্রোরেলের তলায় চাপা পড়ে দিনের পর দিন ধুঁকতে ধুঁকতে আজ কেবলমাত্র একটি কালো নর্দমাতে পরিণত হয়েছে৷ মজার কথা, এই নদী সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রক থেকে প্রতি বছর চব্বিশ কোটি চুরানব্বই লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হয়৷ খোদ পরিবেশ ও বন দপ্তরের গত তিন বছরের (২০০৯-১০, ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২) বার্ষিক রিপোর্টে 'ন্যাশনাল লেক কনজারভেশন প্ল্যান'-র আওতায় এই তথ্যের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে৷ কিন্ত্ত নদী সংস্কারের কোনও বালাই নেই৷ প্রশ্ন, এই প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা যায় কোথায়? এই দুর্নীতি নিয়ে 'নীতিবাগীশ'-এর দেশে কারও কোনও তাপ-উত্তাপ আছে বলেও মনে হয় না৷
সাধারণ মানুষ খুশি মেট্রোরেলে৷ কিন্ত্ত হলফ করে বলতে পারি, যদি কোনও এক প্রবল বর্ষণে জল নিষ্কাশনের সমস্যায় দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যা কবলিত হয়, এই মৃত নদী আবার সকলের আলোচনায় বেঁচে উঠবে৷ কালো মরা নদী ও তার উপর সেতুর দেওয়ালে মনীষীর ছবির হিড়িক অন্ধের দেশে লোক-ঠকানি ও ছলনা আঙুল দিয়ে দেখায়৷ উন্নয়ন, বিশেষ করে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের নামে কলকাতায় যে ভাবে পরিবেশকে খুন করার তাণ্ডব চলেছে তা বোধ করি প্রোমোটার-ব্যবসায়ী পুষ্ট কোনও নির্বোধ তৃতীয় বিশ্বের পক্ষেই একমাত্র সম্ভব৷ কেবল 'আদিগঙ্গা' নয়, ইদানীং পাটুলিতে মত্স্যজীবী সমবায়ের সুবিশাল জলাশয় বুজিয়ে নগরোন্নয়নের ক্ষ্যাপামোয় তাজ্জব বনতে হয়৷ এক দিকে মত্স্য দপ্তরের কাছ থেকে এই জলাশয় সরকারি ভাবে অধিগ্রহণের ফলে রেলের নিজের স্বার্থে এই জলা বোজানোয় আইনত বাধা দানে যেমন রয়েছে কিছুটা অন্তরায়, তেমনই জলাশয়কে বিশেষ ক্ষতি না করে মেট্রোরেল লাইন প্রসারণে বিকল্প পথ থাকা সত্ত্বেও সুপরিকল্পিত ভাবে সে পথে না গিয়ে জলাশয় বোজানোয় সুবিশেষ আগ্রহ-প্রদর্শন পরোক্ষে এক শ্রেণির জমি-লোভী প্রোমোটার-মাফিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ারই ইঙ্গিত বহন করে৷ প্রশ্ন জাগে সেই সব বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর যোগ্যতা নিয়ে যাঁরা প্রথমে মাটি ফেলে জলা বুজিয়ে মাঝে সুবিশাল গম্বুজ স্থাপনে মেট্রোরেল লাইন সম্প্রসারণ করে কাজ শেষ হওয়ার ছ'মাসের মধ্যে ফের ওই মাটি তুলে জলা উদ্ধারের অবৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেন৷ মেট্রোরেল সম্প্রসারণে এ দেশের এক অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ-নীতির পরিচয় মেলে৷ সাধারণত, কোনও জমি বা জলাশয়ে কোনও নির্মাণকাজ বা প্রকল্প শুরু করার আগে ওই অঞ্চলের পরিবেশের উপর ওই প্রকল্পের কী প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ অনুযায়ী আগাম গবেষণা করা হয় ও তার ভিত্তিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের ছাড়পত্র (নো অবজেকশন) মিললে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়৷ কেন্দ্রীয় সরকারের ২০০৬-র এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট নোটিফিকেশন অনুসারে, এই বিষয়ে সকলকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অনুমতি নিতে হয়, ব্যতিক্রমী কেবল ভারতীয় রেল৷ কোন যুক্তিতে এই বৈমাত্রেয় নিয়ম, সাধারণ বুদ্ধিতে সঠিক বোধগম্য নয়৷
এই দেশটা চলে প্রোমোটার ও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও স্বার্থপর তিমিঙ্গিল বেআইনি কালো টাকার কারবারির দাপটে৷ এদের পুষে রাজা ছিপে মাছ ধরতে চান৷ আর এই মাছ ধরার সেরা 'টোপ' অবশ্যই 'পরিবেশ'৷ ক্ষমতার রং যতই পাল্টাক, এই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রবণতার কোনও পরিবর্তন নেই৷ সেই কারণে বাম জমানায় প্রায় ছয় থেকে সাতটি সরকারি দপ্তরকে রীতিমতো পকেটে পুরে জলার চারধারের বাসিন্দারা সকলের নাকের ডগায় দিনে দুপুরে যে সুবিশাল জলাশয় গিলে খাবার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, প্রায় এক দশক পরে আজও সেই বিক্রমগড় ঝিল মুক্তি পেল না! যদিও, সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা থেকে এক কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে এই ঝিল সংস্কারের জন্য৷ সময় বলবে, এটি কেবল ভোট কুড়োনোর ঘোষণা নাকি বাস্তবিক প্রয়াস৷ এ পোড়া দেশে 'পরিবেশ' চিরকালই রাজনীতির অস্ত্র, পরিবেশের স্বার্থে রাজনীতি কখনও ব্যবহূত হয় না৷ সেই কারণে পাটুলিতে এক দিকে যেমন নির্বিচারে জলা বুজিয়ে মেট্রোরেল প্রসারণের সিদ্ধান্তকে মদত দেওয়া হয়, অন্য দিকে কৃত্রিম ভাবে জলা সাজিয়ে বাঙালি সেন্টিমেন্টকে উস্কে পরিবেশদরদী ভোট কুড়োনোর পালা চলে৷ পরিষ্কার বলি, লোক দেখানো কৌশলে আদতে পরিবেশের উন্নয়ন হয় না, বরং অর্থের অপচয়ে প্রশ্রয় পায় প্রোমোটার ও এক শ্রেণির স্বার্থপর ব্যবসায়ী ও পেশি শক্তি৷ অস্তিত্ব সংকটের মুহূর্তে 'পরিবেশ'-এর স্বার্থে এ দেশে রাজনীতির প্রয়োজন৷ মনে রাখবেন, 'পরিবেশ'কে মূলধন করে দেশ যেমন দেখতে পারে পর্যটন শিল্পে আর্থিক উন্নয়নের পথ তেমনই নাগরিক পেতে পারে সুস্থ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা৷
লেখক উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
http://eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/post-edit/articleshow/32349786.cms
ধর্ষণ কিংবা দুর্নীতির প্রতিবাদে রাজপথে মিছিল হয়, কিন্ত্ত পরিবেশ দূষণের এই বিষয়টি কখনও উঠে আসে না৷ কেন? প্রশ্ন তুললেন কৌস্তুভ বসু
রাজনীতির পরিচিত নিয়ম মেনে সাধারণ মানুষের রোজকার সমস্যায় এখন সব দলই 'ব্যথিত'৷ অসুবিধের মধ্যে 'দুর্নীতি' ও 'নিরাপত্তা'র টিআরপি ইদানিংকালে সব থেকে বেশি৷ এ ছাড়া তো রয়েইছে 'দারিদ্র্য', 'বেকারত্ব', 'নিরক্ষরতা'র মতো চিরকালের চিরযুবক চিরপরিচিত সমস্যাকুল৷ আশ্চর্য লাগে, ভোটের বাজারে প্রচারে সব সমস্যাই গুরুত্ব পায়, ব্যতিক্রম কেবল 'পরিবেশ'৷ যদি খুব ভালো করে লক্ষ্য করি, গত পাঁচ বছরে দেশের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো সমস্যাগুলি ঠিক কী, সে ক্ষেত্রে 'দুর্নীতি' ও 'মেয়েদের নিরাপত্তা'র পাশাপাশি একটা ঘটনাই সবার আগে মনে পড়ে, গত বছর উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়৷ এর পরেও এ পোড়া আর্যদেশে 'পরিবেশ' ব্রাত্যই৷ সে ভোট যাঁরা চাইছেন তাঁদেরও যেমন এ বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই, তেমনই ভোট যাঁরা দিচ্ছেন তাঁরাও অসীম নির্লিপ্ত৷ তা না হলে এক জন ভদ্রমহিলার ধর্ষণ কিংবা দুর্নীতির প্রতিবাদে রাজপথে যে স্বতঃস্ফূর্ততায় মিছিল নামে, কখনও কোনও নদী বা জলাশয় বাঁচাতে কিংবা পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে বা পরিবেশ নিয়ে রাজনীতিকের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কেন তেমন প্রতিবাদী ভিড় পথে দেখা যায় না? কোনও সমস্যাকে লঘু না করেই জানাই, সব থেকে দূষিত দেশগুলির মধ্যে এই মুহূর্তে ভারত বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই (আর্থ পলিসি ইনস্টিটিউট, ২০১৩), এবং, দূষণ প্রতিরোধে ভারতের অবস্থান বিশ্বে ১২৫ (ইয়েল ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, ২০১২)৷ রাজনীতির কারবারিদের কাছে নির্বাচনের প্রচারে জন-সমস্যা চয়নের যুক্তিটা খুব পরিষ্কার৷ যে 'সমস্যা'র কথায় জন-সাধারণের ক্ষোভ বেশি উগড়ে ওঠে, সে জটিলতাই বেশি প্রচারিত হয়, কারণ সাধারণের ক্ষোভ ও ভোটের অঙ্ক সমানুপাতিক সম্বন্ধে যুক্ত৷ কিন্ত্ত প্রশ্ন, আপনার-আমার মতো আম-আদমি কেন সব বুঝেও মেনে নিই? যে সাধারণের দরদে নেতারা শহরকে স্তব্ধ করে ব্রিগেডের আকাশ ধুলোয় ঢাকেন, কেন তাঁদের কাছে জবাব চাওয়া হয় না, কোন অধিকারে আপনি ভোট কুড়োতে আমাদের বাতাস বিষোচ্ছেন? কেনই বা সংবিধান-বিরোধী কর্মের জন্য এই জন-দরদী দেশ-সেবকেরা শাস্তি পান না?
সৌন্দর্যায়নের ঘটায় ইদানীং কালে কল্লোলিনী ক্রমশ নতুন সাজে সেজে উঠেছে! মিডিয়ান স্ট্রিপ, গ্রিন ফ্ল্যাঙ্ক, রোডসাইড আইল্যান্ড বা পেভার ব্লকে অনেক সবুজের সমারোহে প্রাথমিক ভাবে চমকে গেলেও খুঁতখুঁতে মন বিস্মৃত হয় না রাস্তা-প্রসারণের নামে ভিআইপি রোড কিংবা বাইপাসের মতো রাজপথের ধারে মৃত উদ্ভিদের লাশ৷ শহরে সবুজের ঘনত্বের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে কি না, সে বিতর্ক পাশে রেখে চারপাশের রঙিন মোড়কের গভীরে ঢুকলে ধাক্কা খেতে হয়৷ প্রিন্সেপ ঘাট যেমন ঘন বীথিতে ঢেকেছে, টেমসের ধারেও বুঝি অত সবুজ নেই৷ কিন্তু এতে গঙ্গার কী উন্নতি হয়েছে? একটুক্ষণ ধারে দাঁড়ালে দুর্গন্ধ নাকে আসে, ঘোলা জলে তাকালে দেখা যায় প্লাস্টিক, আবর্জনার পানসি ভাসছে, জলের মানের কথা আর নাই বা বললাম! ময়দানে নতুন বৃক্ষরোপণ হচ্ছে, কিন্তু যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক, কাগজ, নোংরা৷ অনেক জলাশয়ের চারপাশে দেখলাম সবুজের বলয়, কিন্তু জল ময়লা, কলিফর্মের আঁতুড়ঘর, ডাস্টবিন! শহরে যথাযথ শৌচালয় নেই৷ অনেক রাস্তার ধারে লোকে এখনও সেই মধ্যযুগীয় প্রথায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়৷ একটা সমীক্ষা জানাচ্ছে কলকাতা পুরসভার অধীনে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে রয়েছে মাত্র একটি করে শৌচালয়! আর যে শৌচালয়গুলি রয়েছে সেগুলিও সব সঠিক ভাবে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, যেন ছোটোখাটো রোগের আড়ত! আবর্জনা ফেলার জন্য নতুন সরকার ঢাকা দেওয়া ভ্যাট ও কম্প্যাক্টর আমদানী করলেও বাস্তবে সমস্যার সমাধান হয়নি৷ এখনও শহরের অনেক রাস্তার ধারে দেখা যায় ময়লার ভ্যাট নিয়মিত পরিষ্কার হয় না, দুর্গন্ধে টেকা দায়! প্রশ্নটা এখানেই, বাথরুমের শুদ্ধিকরণে প্রাথমিক ভাবে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কমোডের নোংরা পরিষ্কার নাকি দেওয়ালে নতুন রং করা? সঠিক উত্তরটি অবশ্যই হওয়া উচিত প্রথমটি, কিন্ত্ত বাস্তবে হচ্ছে দ্বিতীয়টি৷ বসন্তের গুটি ঢাকতে আপনি মুখে যতই দামি ফেস পাউডার মাখুন না কেন, রোগ কখনও নির্মূল হয় না৷ কোটি কোটি অর্থ ব্যয় হচ্ছে শহরের সৌন্দর্যায়নে, 'আলেয়ার পিছে ধাবমান মূর্খ হরিণ'-এর দল 'তবু কিছু তো হচ্ছে' সান্ত্বনা বাক্যে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যতই উদাসীন থাকুক, এতে কলকাতার পরিবেশের কতটা উন্নতি হচ্ছে, সে বিষয়ে রয়েছে ঘোর সন্দেহ৷
কলকাতার জলপথগুলির হাল সব থেকে শোচনীয়৷ ভৌগোলিক ভাবে কলকাতা পূর্ব দিকে ঢালু, এই স্বাভাবিক চরিত্রকে মাথায় রেখে ব্রিটিশ প্রযুক্তিবিদ মূলত তিনটি প্রধান জলপথে বা ক্যানাল তন্ত্রে (বাগবাজার, বাগজোলা ও টালিগঞ্জ) গোটা শহরটাকে একটা নীল বলয়ে বেঁধে রেখেছিল৷ খালগুলি কেবল এক কালের অন্যতম পরিবহণ-মাধ্যম ছিল না, শহরের বর্জ্য-জল নিষ্কাশনেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ কিন্তু এখন এরা মৃতপ্রায়, মশা-মাছির আড়ত৷ কেষ্টপুর খালে তা-ও দেখলাম কিছু নৌকা নেমেছে৷ সময় বলবে এটি লোক দেখানো না আন্তরিক উদ্যোগ৷ বাকি জলপথগুলির অবস্থা কহতব্য নয়৷ আদিগঙ্গার কথাই ভাবুন৷ পূর্ব বাংলা (অধুনা বাংলাদেশ) ও পশ্চিমবাংলার ভিতর একদা প্রধান বাণিজ্য-যোগপথ মেট্রোরেলের তলায় চাপা পড়ে দিনের পর দিন ধুঁকতে ধুঁকতে আজ কেবলমাত্র একটি কালো নর্দমাতে পরিণত হয়েছে৷ মজার কথা, এই নদী সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রক থেকে প্রতি বছর চব্বিশ কোটি চুরানব্বই লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হয়৷ খোদ পরিবেশ ও বন দপ্তরের গত তিন বছরের (২০০৯-১০, ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২) বার্ষিক রিপোর্টে 'ন্যাশনাল লেক কনজারভেশন প্ল্যান'-র আওতায় এই তথ্যের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে৷ কিন্ত্ত নদী সংস্কারের কোনও বালাই নেই৷ প্রশ্ন, এই প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা যায় কোথায়? এই দুর্নীতি নিয়ে 'নীতিবাগীশ'-এর দেশে কারও কোনও তাপ-উত্তাপ আছে বলেও মনে হয় না৷
সাধারণ মানুষ খুশি মেট্রোরেলে৷ কিন্ত্ত হলফ করে বলতে পারি, যদি কোনও এক প্রবল বর্ষণে জল নিষ্কাশনের সমস্যায় দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যা কবলিত হয়, এই মৃত নদী আবার সকলের আলোচনায় বেঁচে উঠবে৷ কালো মরা নদী ও তার উপর সেতুর দেওয়ালে মনীষীর ছবির হিড়িক অন্ধের দেশে লোক-ঠকানি ও ছলনা আঙুল দিয়ে দেখায়৷ উন্নয়ন, বিশেষ করে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের নামে কলকাতায় যে ভাবে পরিবেশকে খুন করার তাণ্ডব চলেছে তা বোধ করি প্রোমোটার-ব্যবসায়ী পুষ্ট কোনও নির্বোধ তৃতীয় বিশ্বের পক্ষেই একমাত্র সম্ভব৷ কেবল 'আদিগঙ্গা' নয়, ইদানীং পাটুলিতে মত্স্যজীবী সমবায়ের সুবিশাল জলাশয় বুজিয়ে নগরোন্নয়নের ক্ষ্যাপামোয় তাজ্জব বনতে হয়৷ এক দিকে মত্স্য দপ্তরের কাছ থেকে এই জলাশয় সরকারি ভাবে অধিগ্রহণের ফলে রেলের নিজের স্বার্থে এই জলা বোজানোয় আইনত বাধা দানে যেমন রয়েছে কিছুটা অন্তরায়, তেমনই জলাশয়কে বিশেষ ক্ষতি না করে মেট্রোরেল লাইন প্রসারণে বিকল্প পথ থাকা সত্ত্বেও সুপরিকল্পিত ভাবে সে পথে না গিয়ে জলাশয় বোজানোয় সুবিশেষ আগ্রহ-প্রদর্শন পরোক্ষে এক শ্রেণির জমি-লোভী প্রোমোটার-মাফিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ারই ইঙ্গিত বহন করে৷ প্রশ্ন জাগে সেই সব বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর যোগ্যতা নিয়ে যাঁরা প্রথমে মাটি ফেলে জলা বুজিয়ে মাঝে সুবিশাল গম্বুজ স্থাপনে মেট্রোরেল লাইন সম্প্রসারণ করে কাজ শেষ হওয়ার ছ'মাসের মধ্যে ফের ওই মাটি তুলে জলা উদ্ধারের অবৈজ্ঞানিক পরামর্শ দেন৷ মেট্রোরেল সম্প্রসারণে এ দেশের এক অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ-নীতির পরিচয় মেলে৷ সাধারণত, কোনও জমি বা জলাশয়ে কোনও নির্মাণকাজ বা প্রকল্প শুরু করার আগে ওই অঞ্চলের পরিবেশের উপর ওই প্রকল্পের কী প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ অনুযায়ী আগাম গবেষণা করা হয় ও তার ভিত্তিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের ছাড়পত্র (নো অবজেকশন) মিললে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়৷ কেন্দ্রীয় সরকারের ২০০৬-র এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট নোটিফিকেশন অনুসারে, এই বিষয়ে সকলকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের অনুমতি নিতে হয়, ব্যতিক্রমী কেবল ভারতীয় রেল৷ কোন যুক্তিতে এই বৈমাত্রেয় নিয়ম, সাধারণ বুদ্ধিতে সঠিক বোধগম্য নয়৷
এই দেশটা চলে প্রোমোটার ও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও স্বার্থপর তিমিঙ্গিল বেআইনি কালো টাকার কারবারির দাপটে৷ এদের পুষে রাজা ছিপে মাছ ধরতে চান৷ আর এই মাছ ধরার সেরা 'টোপ' অবশ্যই 'পরিবেশ'৷ ক্ষমতার রং যতই পাল্টাক, এই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রবণতার কোনও পরিবর্তন নেই৷ সেই কারণে বাম জমানায় প্রায় ছয় থেকে সাতটি সরকারি দপ্তরকে রীতিমতো পকেটে পুরে জলার চারধারের বাসিন্দারা সকলের নাকের ডগায় দিনে দুপুরে যে সুবিশাল জলাশয় গিলে খাবার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, প্রায় এক দশক পরে আজও সেই বিক্রমগড় ঝিল মুক্তি পেল না! যদিও, সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা থেকে এক কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে এই ঝিল সংস্কারের জন্য৷ সময় বলবে, এটি কেবল ভোট কুড়োনোর ঘোষণা নাকি বাস্তবিক প্রয়াস৷ এ পোড়া দেশে 'পরিবেশ' চিরকালই রাজনীতির অস্ত্র, পরিবেশের স্বার্থে রাজনীতি কখনও ব্যবহূত হয় না৷ সেই কারণে পাটুলিতে এক দিকে যেমন নির্বিচারে জলা বুজিয়ে মেট্রোরেল প্রসারণের সিদ্ধান্তকে মদত দেওয়া হয়, অন্য দিকে কৃত্রিম ভাবে জলা সাজিয়ে বাঙালি সেন্টিমেন্টকে উস্কে পরিবেশদরদী ভোট কুড়োনোর পালা চলে৷ পরিষ্কার বলি, লোক দেখানো কৌশলে আদতে পরিবেশের উন্নয়ন হয় না, বরং অর্থের অপচয়ে প্রশ্রয় পায় প্রোমোটার ও এক শ্রেণির স্বার্থপর ব্যবসায়ী ও পেশি শক্তি৷ অস্তিত্ব সংকটের মুহূর্তে 'পরিবেশ'-এর স্বার্থে এ দেশে রাজনীতির প্রয়োজন৷ মনে রাখবেন, 'পরিবেশ'কে মূলধন করে দেশ যেমন দেখতে পারে পর্যটন শিল্পে আর্থিক উন্নয়নের পথ তেমনই নাগরিক পেতে পারে সুস্থ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা৷
লেখক উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
http://eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/post-edit/articleshow/32349786.cms
No comments:
Post a Comment