Sunday, March 30, 2014

১১ মাসে ২৪৫ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড

১১ মাসে ২৪৫ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড




গত ১১ মাসে ২৪৫ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ সময়ে কথিত ক্রসফায়ারে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫৩ জনকে হত্যার জন্য গুলি করা হয়। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বাঁচার অধিকার, মত প্রকাশের ও সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা শীর্ষক অধিকার আয়োজিত এক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। অনুষ্ঠানে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে বলেছেন, সরকার যদি এসব ঘটনা  অস্বীকার করে তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, যেখানে গণতন্ত্র নেই। যত্রতত্র লাশ পড়ে থাকে, লাশ খুঁজে পাওয়া যায় না। সেখানে মানবাধিকারের কথা বলে লাভ নেই। তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াত এসব কর্মকা-ে জড়িত থাকলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা হতে পারে। যদি সরকারের সৎ সাহস থাকে তারা তা করতে পারেন।

তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের কথা সরকার বরাবরই অস্বীকার করছে। প্রশ্ন হচ্ছে সরকারের বাইরের কেউ করে থাকলে তা প্রমাণ করার দায়িত্বও সরকারের। আর তা না করতে পারলে আমরা ধরে নেবো রাষ্ট্রই খুন করে। তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারি ভুয়া নির্বাচনের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। বিএনপি নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার করে খালেদা জিয়াকে মানসিক রোগী বানানোর চেষ্টা করছে সরকার। তিনি বলেন- আওয়ামী লীগের ওয়েব সাইটে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ২৩ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলে যে তথ্য দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ কি পারবে তার শতকরা ২০ ভাগের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে? তা যদি না পারে তাহলে এসব মিথ্যা তথ্যের জন্য আওয়ামী লীগের সম্পাদককে কারাগারে যেতে হয় না কেন? অথচ সত্য তথ্য প্রকাশ করার কারণে অধিকার সম্পাদককে জেলে যেতে হয়।

ইউপিআর কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, ইউপিআর পদ্ধতির ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। যেখানে গণতন্ত্রই নেই সেখানে ইউপিআর সম্পূর্ণ অকেজো। ইউপিআরকে শুধু কাগজের প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বলেন, সংবিধান সংশোধন করে বলা হয়েছে সংবিধানের সমালোচনা মৃত্যুদ-যোগ্য অপরাধ। এমন বিষয় পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। আওয়ামী লীগ বলছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ঘটছে না। অধিকার-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশে ৬১ জন মারা গেছে। আর পুলিশ বলছে, ১১ জন মারা গেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বলেছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জোট সরকারের আমলে ২৩ হাজার লোক মারা গেছে। তাহলে একই অপরাধে কেন শুধু আদিলুরের জেল হবে? আওয়ামী লীগের কারও হবে না?

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ৫ই জানুয়ারির এমন নির্বাচনের পর দেশে মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। সরকার প্রতিনিয়ত নির্জলা মিথ্যাচার করছে। সেটা প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভাল করেই জানেন। আদালতকে স্বাধীনতা দিলে বর্তমান সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে- এটা প্রধানমন্ত্রীও জানেন। এ সরকারের বৈধ কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতা অভিযোগ করে বলেন, ডিজিএফআই’র একটি সেল গঠন করা হয়েছে মিডিয়ার টকশোসহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এগুলো মনিটরিং করছেন।

তিনি বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রীর গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় মামলার প্রধান আসামিকে মেরে ফেলাসহ ক্রসফায়ার, গুম-অপহরণের সব ঘটনার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে দেয়া হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। বিরোধী দলও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ জন্য গ্রামগঞ্জের মানুষ কারও কাছে ভরসা রাখতে পারছে না। তিনি বলেন- মানুষ একসময় ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে। মানুষ প্রতিনিয়ত কিছু একটা খুঁজছে। রাস্তায় নামলে মানুষের নিশ্চিত সাড়া পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে বিরোধী দল ভূমিকা রাখতে না পারলে অধিকারসহ নাগরিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার অধিকার, সুজন, টিআইবি, মিডিয়াকে ভয় পাচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল সংবিধান রক্ষার নির্বাচন, এখন বলা হচ্ছে ৫ বছর তারা ক্ষমতায় থাকবেন। সরকারের আচরণে মনে হয় তারা অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকবেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম বলেন, রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু গণতন্ত্র হলেও বর্তমানে দেশে গণতন্ত্রের পক্ষে ও বিপক্ষে লড়াই চলছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অন্ধভক্ত ছাড়া কেউ বিশ্বাস করবে না যে, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে শতকরা ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষ ঢেলে দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংস্কৃতির কারণেই সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরে হামলায় চার আসামিকে বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে। এর জন্য সংস্কৃতিমন্ত্রী লজ্জিত হন না। কারণ তার লজ্জা চাপা পড়ে গেছে।

মানবাধিকার কর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন গুম-অপহরণ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন বন্ধে মানবাধিকার কর্মীদের ভূমিকা ও ইউপিআর-এর প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে হতাশা থাকলেও ইউপিআর-এর গুরুত্ব আছে। রাষ্ট্রের এসব কর্মকা-ের একটি চিত্র সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। আইসিটি অ্যাক্টের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ আইনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার কর্মীদের চেয়ে সাংবাদিকদের আরও বেশি প্রতিবাদ করতে হবে।

আমার দেশ-এর বার্তা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী বর্তমান সরকার আমার দেশ পত্রিকাকে দুই দফায় বন্ধ করে মাহমুদুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন আইনের তোয়াক্কা না করে সরকার পুলিশ দিয়ে আমার দেশ-এর প্রেস সিলগালা করে দিয়েছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দেশে বর্তমানে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ালেই শুধু দেশের প্রতি ভালবাসা দেখানো হয় না। একই সময়ে যখন বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়া হয় তখন সেটা কখনোই দেশকে ভালবাসা হতে পারে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখন এত বেশি যে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীনরা সব কিছুই করতে পারেন।

ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন এগেনেস্ট টর্চার-এর প্রেসিডেন্ট ইভস বার্থেলট বলেন, আইনের শাসন ও শাসনের আইন গোলমাল করে ফেলেছে সরকার। তিউনিসিয়ার শাসক গোষ্ঠীর নির্যাতনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার আগ্রহী হলে তারা কাজ করতে চান। পাশাপাশি এনজিওগুলোর এসব বিষয় নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার বলে মত দেন। অধিকার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালের মে মাস থেকে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪৫ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে ১২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫৩ জনকে হত্যার জন্য গুলি করা হয় এবং ৪ জন মারা যান।

 আন্তর্জাতিক কমিউনিটির কাছে মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেও সরকার তা মানছে না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের সহায়তায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আলোচনার শুরুতেই অধিকার-এর সভাপতি পি আর আবরার মানবাধিকার চিত্র তুলে ধরেন।

http://mzamin.com/details.php?mzamin=%20MTcwNjk=&s=Mg==
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2014/03/30/240086#.UzegR86_iSo
__._,_.___

No comments:

Post a Comment