
এ বার কার ঘরে সিঁদ কাটবে বিজেপি, ভাবনা বামেদেরও
ভোট-যন্ত্রের বোতামে প্রথম আঙুল পড়তে এখনও সপ্তাহখানেক বাকি। কিন্তু ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই এ রাজ্যে এ বার লোকসভা নির্বাচনে সব চেয়ে চর্চিত দল হিসাবে উঠে আসছে বিজেপি। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রচার-সভায় এখন নিয়মিতই বিজেপি-কে আক্রমণ করছেন। ভোট শুরুর আগে এ বার সিপিএমের শেষ রাজ্য কমিটির বৈঠকেও উঠে এল বিজেপি-র উত্থানের সম্ভাবনার কথা।
রাজ্যের বেশ কিছু আসনে বিজেপি যে এ বার আগের চেয়ে বেশি ভোট পেতে পারে, মঙ্গলবারই কলকাতা জার্নালিস্ট্স ক্লাবের অনুষ্ঠানে মেনে নিয়েছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বিমান বসু। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আলিমুদ্দিনে রাজ্য কমিটির বৈঠকে একাধিক জেলার নেতৃত্ব রিপোর্ট দিয়েছেন, বহু জায়গায় বিজেপি-র চোরা স্রোত বইছে। বিশেষত, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত বিজেপি নিজেদের ভোট বাড়াতে গিয়ে বাম না ডান, কার কত ভোট কাটবে বোঝা যাচ্ছে না! বিমানবাবুও তাঁর জবাবি ভাষণে ভোট কাটাকাটির উপরে নির্ভরশীল না হয়ে বামেদের ভোট রক্ষা করার জন্যই সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপাতে বলেছেন।
বস্তুত, এ বারের লোকসভা ভোটে যে ভাবে চতুর্মুখী লড়াই হচ্ছে, রাজ্যে অতীতে কখনও হয়নি। একক ভাবে লড়েই রাম মন্দিরের হাওয়ায় বিজেপি ১৯৯১ সালের ভোটে সর্বাধিক ১০% ভোট পেয়েছিল। প্রায় আড়াই দশক পরে এখন তাদের পালে জুটেছে নরেন্দ্র মোদী হাওয়া। সেই পরিস্থিতি আঁচ করেই বুধবার রাজ্য কমিটির বৈঠকে বেশ কিছু জেলার নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কোথায় কোথায় তলে তলে পদ্মফুল ফুটবে, বলা যাচ্ছে না! জনমত সমীক্ষার আভাস মেনে বিজেপি-র ভোট যদি শেষ পর্যন্ত ১৪-১৫% গিয়ে দাঁড়ায়, তা হলে তৃণমূল এবং বাম, দুই শিবিরের কপালেই দুঃখ আছে বলে দু’দলের নেতারাই দলে স্বীকার করছেন। গত বিধানসভায় পরিবর্তনের হাওয়ার মধ্যে রাজ্যে ৪১% ভোট পেয়েছিল বামফ্রন্ট। গত বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সন্ত্রাসের অভিযোগের মধ্যেই বামফ্রন্ট গড়ে ৩৮% ভোট পেয়েছিল। ভাসমান ভোটারদের সমর্থন একেবারে সরে গিয়ে ওই ভোটই প্রকৃতপক্ষে বামেদের ‘খাঁটি সমর্থনের ব্যাঙ্ক’ বলে যদি ধরে নেওয়া যায়, তা হলে এ বার তাদের চ্যালেঞ্জ ওই মূলধনকে রক্ষা করা। এবং সেখানেই বাড়তি বিপদ হয়ে দেখা দিচ্ছে বিজেপি!
বিমানবাবু আগের দিনই বলেছিলেন, “কোথাও কোথাও বিজেপি-তৃণমূল বোঝাপড়া করে লড়ছে। কিন্তু কিছু আসনে বিজেপি বেশি ভোট পাবে।” আপাতদৃষ্টিতে বাম-বিরোধী ভোটই বিজেপি-র পাওয়ার কথা। তা হলে বামেদের চিন্তা কোথায়? সিপিএমের রাজ্য কমিটির এক সদস্যের বক্তব্য, “ছবিটা এ বার আর তত সরল নেই! অনেক জায়গায় প্রচারে বেরিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখছি, ছাত্র-যুব অংশের মধ্যে মোদীর প্রতি দুর্বলতা কাজ করছে। এমনকী, কোথাও কোথাও হিন্দু ভোট মেরুকরণের পরিস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, জোর দিয়ে বলা যায় না!”
প্রচারে ব্যস্ত থাকায় উত্তর দিনাজপুর, মালদহের মতো কিছু জেলার প্রতিনিধিরা বৈঠকে আসেননি। ছিলেন না সূর্যকান্ত মিশ্র, মহম্মদ সেলিমের মতো নেতারাও। তবে কঠিন লড়াইয়ে নেমে দলের নেতা-কর্মীরা যে ভাবে প্রচার চালাচ্ছেন, তার সাংগঠনিক রিপোর্ট পেয়ে রাজ্য নেতৃত্ব মোটামুটি স্বস্তিতে। কিছু এলাকায় এখনও শাসক দলের সন্ত্রাসের অভিযোগ এসেছে বৈঠকে। বামেদের প্রচারের আগে-পরে ভয় দেখানো, আক্রমণের চেষ্টা চলছে। তবু সন্ত্রাসের মোকাবিলা করেই বহু এলাকায় বামেদের প্রচার চলছে। দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের কথায়, “কার্যত প্রতিদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে।”
এ দিনের বৈঠকে লক্ষ্মণ শেঠের বহিষ্কারের বিষয়টিও অনুমোদন করা হয়েছে। বিমানবাবু জানান, লক্ষ্মণবাবু যে ভাবে দল-বিরোধী কাজ করছিলেন, তাতে বহিষ্কার ছাড়া পথ ছিল না।
No comments:
Post a Comment