তুফান কেন, বুদ্বুদ তুলতেই ঘেমেনেয়ে কাহিল ইন্দ্র-গায়েন
টেলিফোনে ইন্দ্রনীল সেন জানিয়েছিলেন, সভা শুরু হয়ে যাবে বিকেল সাড়ে চারটে থেকে, তিনি ঢুকবেন পাঁচটা নাগাদ৷ সাবধানের মার নেই বলে পৌঁছে যাই সময়ের আগেই৷
সভাস্থল: বেলডাঙার নেতাজি পার্ক৷ রেলের ক্রসিং পেরিয়ে দু'দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়া দোকানের মাঝখানে সরু ঘিঞ্জি রাস্তা দিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয়৷ নামেই পার্ক, আসলে এক খণ্ড ধুলোয় ঢাকা চৌহদ্দি৷ একপাশে একটি দোতলা বাড়ির গায়ে লেখা নেতাজি ক্লাব৷ মঞ্চের সামনে মাটিতে বসা বড়জোর এক-দেড়শো মানুষ, যাদের মধ্যে কচিকাঁচার সংখ্যা বড় একটা কম নয়৷ মঞ্চে বসা তৃণমূলের নানা স্তরের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সকলের বুকে ব্যাজ, সকলেই বক্তা, সকলেই 'সবজান্তা'৷ ভাষণ নয়, বারেবারেই মনে হল যেন ননসেন্স রাইমস শুনছি৷ অধীর চৌধুরী থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদী হয়ে বারাক ওবামা পর্যন্ত তাঁদের চিত্কৃত আক্রমণের লক্ষ্য সকলেই৷ চোখে-মুখে রুমাল চাপা দিয়ে বাধ্য শ্রোতার মতো আবোলতাবোল শুনেই যাচ্ছি, মাঠে অল্প অল্প করে কৌতূহলী পড়শিদের ভিড় বাড়ছে, সাঁঝের অন্ধকারে গেরস্তের বাড়ি থেকে শোনা যাচ্ছে শাঁখের আওয়াজ৷ মুসলিমপ্রধান এলাকা হলেও এখানে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ ভাইচারা সত্যিই চোখে পড়ার মতো৷
মাথার ওপরে দুটো শিংয়ের মতো দুটো বিরাট ফগলাইট লাগানো একটা এসইউভি চড়ে ইন্দ্রনীল সেনের যখন প্রবেশ ঘটল, ঘোর অন্ধকারে তার অনেক আগে থেকেই মশককুলের অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে গিয়েছে৷ তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীকে দেখে ধুলোয় বসে ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়া শ্রোতা বা মঞ্চের বচনবাগীশদের মধ্যে যে বিশেষ একটা চিত্তচাঞ্চল্য দেখা দিল, তা নয়৷ হেডলাইটের আলোয় ইন্দ্রনীলের গাড়ির রংটা দেখেই পিলে চমকে উঠল৷ লাল৷ তার মানে তো 'দিদি'র পছন্দ-অপছন্দের প্রাইমারটুকুও ভালো করে জেনে ওঠা হয়নি, পাকিস্তান ছেড়ে সবে ভারতের হয়ে খেলতে নামা ইন্দ্র-গায়েনের৷ না-হলে তিনি বিলক্ষণ জানতেন, সিপিএমের ঝান্ডার এই রং নেত্রীর কতটা না-পসন্দ!
হঠাত্ কান দুটো খাড়া হয়ে গেল একজনের বক্তৃতা শুনে৷ বাঃ, বেশ চমত্কার, গুছিয়ে কথা বলেন তো ভদ্রলোক! কাজের কথা, কর্মীদের কর্তব্যের কথা, প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কথা৷ কাক্কেশ্বরদের জটলায় হঠাত্ ময়ূরের পেখম মেলে ধরলেন কে? পাশেই দাঁড়ানো এক স্থানীয় যুবক কৌতূহল নিরসন করে দিলেন৷ 'আরে বাবা, ইনি হলেন হুমায়ুন কবীর৷ অধীরবাবুর দল ভেঙে তৃণমূলে এসেছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, ভোটে লড়েছেন, আবার হেরেও গেছেন৷' তা হোক, হেরো পার্টি হলেও মনে হচ্ছে বেশ দম আছে লোকটার! যোগ্য গুরুর যোগ্য চেলা দেখছি!
বাবর-পুত্রের নামের প্রতি মনে হয় বিশেষ দুর্বলতা আছে এই মুর্শিদাবাদের মানুষের৷ তৃণমূলী হুমায়ুন কবীর ছাড়াও নাকি আরও চারজন কম-বেশি পরিচিত হুমায়ুন কবীর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন৷ তবে সবচেয়ে বিখ্যাত দু'জনের মধ্যে একজন সদ্য অপসৃত জেলার পুলিশ সুপার, অন্য জন এই তৃণমূল নেতা৷ অধীরের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গিয়ে রেজিনগর বিধানসভার উপনির্বাচনে প্রবল বেইজ্জত হয়েছে তাঁর৷ তবু নতুন দলের নেত্রীর মতো তিনিও 'রাফ অ্যান্ড টাফ', ভাঙেন কিন্ত্ত মচকান না৷
বহরমপুর লোকসভা আসনে বিপুল ভোটে তিন-তিনবার বিজয়ী হওয়া অধীর চৌধুরীকে বেকায়দায় ফেলাটা যে সিপিএম থেকে তৃণমূল হওয়ার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ, জলবত্ তরলং করে হুমায়ুন সেটা বুঝিয়ে দিলেন৷ পাশে বসা প্রার্থীকে একই সঙ্গে তিনি এই বার্তাটিও পৌঁছে দিলেন যে, একমাত্র অধীরের রাস্তা ধরেই অধীরের মোকাবিলা করতে হবে৷ 'কর্মিসভায় দাঁড়িয়ে বুলি কপচালে চলবে না, কোথায় কোন নরেন্দ্র মোদী বা রাহুল গান্ধী কী করছেন, তা নিয়ে সময় নষ্ট করলেও হবে না৷' বোঝা গেল, এতক্ষণ ধরে মঞ্চে বসে মশার কামড় খেয়ে দলের চুনোপুঁটিদের বাকতাল্লা শুনতে শুনতে হুমায়ুনও বেজায় বিরক্ত হয়েছেন৷ সে জন্য তিনি বলেই ফেললেন, 'কংগ্রেসে যখন ছিলাম, তখন এই ধরনের কর্মিসভা হত দু'ঘণ্টার৷ আধ ঘণ্টা বরাদ্দ থাকত লোকাল ট্যালেন্টদের জন্য, বাকি দেড় ঘণ্টায় বড় নেতারা বুঝিয়ে বলতেন, কর্মীদের কী করতে হবে৷ এখানে দেখছি, হচ্ছে ঠিক তার উল্টো৷ এমন হলে ফলও উল্টো হবে অবধারিত ভাবেই৷'
১৯৯৯ সালে অধীর যখন প্রথমবার বহরমপুরে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন, তাঁর অবস্থা ছিল ঠিক আজকের ইন্দ্রনীল সেনের মতোই৷ অর্থাত্, তার আগের ভোটের ফলাফলের নিরিখে কংগ্রেসের স্থান ছিল তিন নম্বরে, বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় দু'লাখ৷ সেই ঘাটতি পুরোটা মেক-আপ করে অধীরবাবু কেন ও কী ভাবে আরও অনেক বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন, সংক্ষেপে তা বুঝিয়ে বললেন হুমায়ুন৷ 'বুথস্তরে কমিটি গড়ে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলাম আমরা৷ একবার নয়, দু'-তিনবার করে৷ কলকাতায় কী হচ্ছে, দিল্লিতে কী হচ্ছে, লন্ডনে কী হচ্ছে, এ সব নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না৷ শুধু মানুষের স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতাম৷ কোথায় জল নেই, কোথায় আলো নেই, কোথায় শৌচাগার নেই-- এই সব৷ এই ভাবে নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত সুস্পষ্ট দায়বদ্ধতা না-বেঁধে দিয়ে ভোটের মেশিনারি তৈরি হয় না৷ অন্তত, এই বহরমপুর কেন্দ্রে তো নয়ই৷'
বেশ বোঝা গেল, অভিমান করে দল ছাড়লেও এত দিনের 'দাদা' সম্পর্কে ব্যক্তিগত দুর্বলতা এতটুকুও কাটেনি হুমায়ুনের৷ প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার ভাষণে একটিবারের জন্যও তিনি অধীরবাবুর বিরুদ্ধে একটিও কটু কথা বললেন না, অযথা আস্ফালন করে নিজেকে দাদার সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা তো দূরস্থান৷ কিন্ত্ত হুমায়ুনের সদুপদেশের একটি শব্দও কি ইন্দ্র-গায়েনের 'কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল'?
বক্তা হিসেবে অর্পিতা, বাবুল সুপ্রিয় মায় সৌমিত্রর সঙ্গেও একই বন্ধনীতে কোনও মতেই রাখা যাবে না ইন্দ্রনীল সেনের নাম৷ সবার শেষে মাইক হাতে উঠে তিনি দিদির ঢঙে মঞ্চের এপার থেকে ওপারে কয়েক বার পায়চারি করলেন ঠিকই৷ কিন্ত্ত যত্পরোনাস্তি সংক্ষেপে যা বললেন, তা শুনে ঘোড়াও হাসবে৷ 'এখানে তো আমি দাঁড়াইনি, দিদি দাঁড়িয়েছেন৷ তাই এখানে জয়লাভ করা সম্পর্কে আমি টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত৷' তার পর শ্রোতাদের একাংশের অস্ফুট আবদারে গাইলেন 'দরিয়ায় আইল তুফান৷'
দরিয়া কেন, এমন প্রার্থীকে সামনে রেখে চৌবাচ্চাতে বুদ্বুদ তোলাও যে দুঃসাধ্য, প্রকাশ্যে না-বললেও বহরমপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা তা মনে মনে স্বীকার করেই নিয়েছেন৷ এমনিতেই যেখানে কর্মিসভা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দেখে প্রার্থীর ভিরমি খাওয়ার জোগাড়৷ তার ওপরে আবার রয়েছে প্রশ্নবাণের অবিরত খোঁচা৷ পলাশির প্রান্তর পেরিয়ে এই বহরমপুরে হঠাত্ এসে অধীরের মহড়া নেওয়ার চেষ্টা কি পণ্ডশ্রম নয়? তৃণমূল প্রার্থী কি পাগল না লোকদল?
তিনি যে গভীর গাড্ডায় পড়েছেন, বুদ্ধিমান ইন্দ্র-গায়েন নিজেও সম্ভবত সেটা ভালোই বুঝেছেন৷ অতএব, ৫ মার্চের পরে এ পর্যন্ত কলকাতা থেকে বার কয়েক এসে কয়েকটি কর্মিসভায় কয়েক ঘণ্টা কাটানো ছাড়া তিনি আর অযথা সময় ব্যয় করেননি৷ কলকাতা থেকে বহরমপুরের তৃণমূল নেতাদের কাছে অর্ডার এসেছে, প্রার্থীকে অযথা পরিশ্রম করানো যাবে না, রোদে বেশি হাঁটানোও যাবে না৷ কর্মিসভায় প্রার্থী পৌঁছলে আর কোনও স্থানীয় নেতা ভাষণ দিতেও পারবেন না৷ তার মানে, কলকাতার বার্তাটিতেও রয়েছে দান ছেড়ে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন সঙ্কেত৷ হারবই যখন, তখন এই ঠা ঠা রোদে অযথা ঘাম ঝরানোই বা কেন!
প্রার্থী যে 'ফ্র্যাজাইল মেটিরিয়াল' তাই 'হ্যান্ডল উইথ কেয়ার' প্রয়োজন, তাঁর মতো করে সেই ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছেন হুমায়ুন কবীর৷ দিদি হাঁটেন এত জোরে জোরে যে, তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেওয়াই ভার৷ দাদাও হাঁটেন অবিশ্বাস্য গতিতে৷ ভোট এলে নিজের কেন্দ্রে হাঁটেন সবাই৷ অতএব, কিছু দিন আগেই রেজিনগরে ইন্দ্র-গায়েনকে রাজপথে নামিয়ে হাঁটতে একরকম বাধ্য করেছিলেন হুমায়ুন৷ তার পর কী হল? শুনুন হুমায়ুনের কথাতেই৷
'দাদা, কী বলব, পনেরো মিনিট হাঁটার পরে দেখি, আমাদের প্রার্থী লোহা গলানোর হাঁপরের মতো জোরে জোরে হাঁফাচ্ছেন৷ সঙ্গে দরদর ঘাম৷ আমি তো দাদা দারুণ ভয় পেয়ে গেলাম৷ ভাবলাম, প্রার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তো আমার হয়ে গেল৷ মমতাদির কানে গেলে তো আমায় দল থেকে বেরই করে দেবে! আর আমি কোনও রিস্ক নিই না দাদা!'
সভাস্থল: বেলডাঙার নেতাজি পার্ক৷ রেলের ক্রসিং পেরিয়ে দু'দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়া দোকানের মাঝখানে সরু ঘিঞ্জি রাস্তা দিয়ে সেখানে পৌঁছতে হয়৷ নামেই পার্ক, আসলে এক খণ্ড ধুলোয় ঢাকা চৌহদ্দি৷ একপাশে একটি দোতলা বাড়ির গায়ে লেখা নেতাজি ক্লাব৷ মঞ্চের সামনে মাটিতে বসা বড়জোর এক-দেড়শো মানুষ, যাদের মধ্যে কচিকাঁচার সংখ্যা বড় একটা কম নয়৷ মঞ্চে বসা তৃণমূলের নানা স্তরের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সকলের বুকে ব্যাজ, সকলেই বক্তা, সকলেই 'সবজান্তা'৷ ভাষণ নয়, বারেবারেই মনে হল যেন ননসেন্স রাইমস শুনছি৷ অধীর চৌধুরী থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদী হয়ে বারাক ওবামা পর্যন্ত তাঁদের চিত্কৃত আক্রমণের লক্ষ্য সকলেই৷ চোখে-মুখে রুমাল চাপা দিয়ে বাধ্য শ্রোতার মতো আবোলতাবোল শুনেই যাচ্ছি, মাঠে অল্প অল্প করে কৌতূহলী পড়শিদের ভিড় বাড়ছে, সাঁঝের অন্ধকারে গেরস্তের বাড়ি থেকে শোনা যাচ্ছে শাঁখের আওয়াজ৷ মুসলিমপ্রধান এলাকা হলেও এখানে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ ভাইচারা সত্যিই চোখে পড়ার মতো৷
মাথার ওপরে দুটো শিংয়ের মতো দুটো বিরাট ফগলাইট লাগানো একটা এসইউভি চড়ে ইন্দ্রনীল সেনের যখন প্রবেশ ঘটল, ঘোর অন্ধকারে তার অনেক আগে থেকেই মশককুলের অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে গিয়েছে৷ তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীকে দেখে ধুলোয় বসে ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়া শ্রোতা বা মঞ্চের বচনবাগীশদের মধ্যে যে বিশেষ একটা চিত্তচাঞ্চল্য দেখা দিল, তা নয়৷ হেডলাইটের আলোয় ইন্দ্রনীলের গাড়ির রংটা দেখেই পিলে চমকে উঠল৷ লাল৷ তার মানে তো 'দিদি'র পছন্দ-অপছন্দের প্রাইমারটুকুও ভালো করে জেনে ওঠা হয়নি, পাকিস্তান ছেড়ে সবে ভারতের হয়ে খেলতে নামা ইন্দ্র-গায়েনের৷ না-হলে তিনি বিলক্ষণ জানতেন, সিপিএমের ঝান্ডার এই রং নেত্রীর কতটা না-পসন্দ!
হঠাত্ কান দুটো খাড়া হয়ে গেল একজনের বক্তৃতা শুনে৷ বাঃ, বেশ চমত্কার, গুছিয়ে কথা বলেন তো ভদ্রলোক! কাজের কথা, কর্মীদের কর্তব্যের কথা, প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কথা৷ কাক্কেশ্বরদের জটলায় হঠাত্ ময়ূরের পেখম মেলে ধরলেন কে? পাশেই দাঁড়ানো এক স্থানীয় যুবক কৌতূহল নিরসন করে দিলেন৷ 'আরে বাবা, ইনি হলেন হুমায়ুন কবীর৷ অধীরবাবুর দল ভেঙে তৃণমূলে এসেছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, ভোটে লড়েছেন, আবার হেরেও গেছেন৷' তা হোক, হেরো পার্টি হলেও মনে হচ্ছে বেশ দম আছে লোকটার! যোগ্য গুরুর যোগ্য চেলা দেখছি!
বাবর-পুত্রের নামের প্রতি মনে হয় বিশেষ দুর্বলতা আছে এই মুর্শিদাবাদের মানুষের৷ তৃণমূলী হুমায়ুন কবীর ছাড়াও নাকি আরও চারজন কম-বেশি পরিচিত হুমায়ুন কবীর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন৷ তবে সবচেয়ে বিখ্যাত দু'জনের মধ্যে একজন সদ্য অপসৃত জেলার পুলিশ সুপার, অন্য জন এই তৃণমূল নেতা৷ অধীরের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে গিয়ে রেজিনগর বিধানসভার উপনির্বাচনে প্রবল বেইজ্জত হয়েছে তাঁর৷ তবু নতুন দলের নেত্রীর মতো তিনিও 'রাফ অ্যান্ড টাফ', ভাঙেন কিন্ত্ত মচকান না৷
বহরমপুর লোকসভা আসনে বিপুল ভোটে তিন-তিনবার বিজয়ী হওয়া অধীর চৌধুরীকে বেকায়দায় ফেলাটা যে সিপিএম থেকে তৃণমূল হওয়ার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ, জলবত্ তরলং করে হুমায়ুন সেটা বুঝিয়ে দিলেন৷ পাশে বসা প্রার্থীকে একই সঙ্গে তিনি এই বার্তাটিও পৌঁছে দিলেন যে, একমাত্র অধীরের রাস্তা ধরেই অধীরের মোকাবিলা করতে হবে৷ 'কর্মিসভায় দাঁড়িয়ে বুলি কপচালে চলবে না, কোথায় কোন নরেন্দ্র মোদী বা রাহুল গান্ধী কী করছেন, তা নিয়ে সময় নষ্ট করলেও হবে না৷' বোঝা গেল, এতক্ষণ ধরে মঞ্চে বসে মশার কামড় খেয়ে দলের চুনোপুঁটিদের বাকতাল্লা শুনতে শুনতে হুমায়ুনও বেজায় বিরক্ত হয়েছেন৷ সে জন্য তিনি বলেই ফেললেন, 'কংগ্রেসে যখন ছিলাম, তখন এই ধরনের কর্মিসভা হত দু'ঘণ্টার৷ আধ ঘণ্টা বরাদ্দ থাকত লোকাল ট্যালেন্টদের জন্য, বাকি দেড় ঘণ্টায় বড় নেতারা বুঝিয়ে বলতেন, কর্মীদের কী করতে হবে৷ এখানে দেখছি, হচ্ছে ঠিক তার উল্টো৷ এমন হলে ফলও উল্টো হবে অবধারিত ভাবেই৷'
১৯৯৯ সালে অধীর যখন প্রথমবার বহরমপুরে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন, তাঁর অবস্থা ছিল ঠিক আজকের ইন্দ্রনীল সেনের মতোই৷ অর্থাত্, তার আগের ভোটের ফলাফলের নিরিখে কংগ্রেসের স্থান ছিল তিন নম্বরে, বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় দু'লাখ৷ সেই ঘাটতি পুরোটা মেক-আপ করে অধীরবাবু কেন ও কী ভাবে আরও অনেক বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন, সংক্ষেপে তা বুঝিয়ে বললেন হুমায়ুন৷ 'বুথস্তরে কমিটি গড়ে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলাম আমরা৷ একবার নয়, দু'-তিনবার করে৷ কলকাতায় কী হচ্ছে, দিল্লিতে কী হচ্ছে, লন্ডনে কী হচ্ছে, এ সব নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতাম না৷ শুধু মানুষের স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতাম৷ কোথায় জল নেই, কোথায় আলো নেই, কোথায় শৌচাগার নেই-- এই সব৷ এই ভাবে নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত সুস্পষ্ট দায়বদ্ধতা না-বেঁধে দিয়ে ভোটের মেশিনারি তৈরি হয় না৷ অন্তত, এই বহরমপুর কেন্দ্রে তো নয়ই৷'
বেশ বোঝা গেল, অভিমান করে দল ছাড়লেও এত দিনের 'দাদা' সম্পর্কে ব্যক্তিগত দুর্বলতা এতটুকুও কাটেনি হুমায়ুনের৷ প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার ভাষণে একটিবারের জন্যও তিনি অধীরবাবুর বিরুদ্ধে একটিও কটু কথা বললেন না, অযথা আস্ফালন করে নিজেকে দাদার সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা তো দূরস্থান৷ কিন্ত্ত হুমায়ুনের সদুপদেশের একটি শব্দও কি ইন্দ্র-গায়েনের 'কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল'?
বক্তা হিসেবে অর্পিতা, বাবুল সুপ্রিয় মায় সৌমিত্রর সঙ্গেও একই বন্ধনীতে কোনও মতেই রাখা যাবে না ইন্দ্রনীল সেনের নাম৷ সবার শেষে মাইক হাতে উঠে তিনি দিদির ঢঙে মঞ্চের এপার থেকে ওপারে কয়েক বার পায়চারি করলেন ঠিকই৷ কিন্ত্ত যত্পরোনাস্তি সংক্ষেপে যা বললেন, তা শুনে ঘোড়াও হাসবে৷ 'এখানে তো আমি দাঁড়াইনি, দিদি দাঁড়িয়েছেন৷ তাই এখানে জয়লাভ করা সম্পর্কে আমি টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত৷' তার পর শ্রোতাদের একাংশের অস্ফুট আবদারে গাইলেন 'দরিয়ায় আইল তুফান৷'
দরিয়া কেন, এমন প্রার্থীকে সামনে রেখে চৌবাচ্চাতে বুদ্বুদ তোলাও যে দুঃসাধ্য, প্রকাশ্যে না-বললেও বহরমপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা তা মনে মনে স্বীকার করেই নিয়েছেন৷ এমনিতেই যেখানে কর্মিসভা করতে যাচ্ছেন, সেখানেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দেখে প্রার্থীর ভিরমি খাওয়ার জোগাড়৷ তার ওপরে আবার রয়েছে প্রশ্নবাণের অবিরত খোঁচা৷ পলাশির প্রান্তর পেরিয়ে এই বহরমপুরে হঠাত্ এসে অধীরের মহড়া নেওয়ার চেষ্টা কি পণ্ডশ্রম নয়? তৃণমূল প্রার্থী কি পাগল না লোকদল?
তিনি যে গভীর গাড্ডায় পড়েছেন, বুদ্ধিমান ইন্দ্র-গায়েন নিজেও সম্ভবত সেটা ভালোই বুঝেছেন৷ অতএব, ৫ মার্চের পরে এ পর্যন্ত কলকাতা থেকে বার কয়েক এসে কয়েকটি কর্মিসভায় কয়েক ঘণ্টা কাটানো ছাড়া তিনি আর অযথা সময় ব্যয় করেননি৷ কলকাতা থেকে বহরমপুরের তৃণমূল নেতাদের কাছে অর্ডার এসেছে, প্রার্থীকে অযথা পরিশ্রম করানো যাবে না, রোদে বেশি হাঁটানোও যাবে না৷ কর্মিসভায় প্রার্থী পৌঁছলে আর কোনও স্থানীয় নেতা ভাষণ দিতেও পারবেন না৷ তার মানে, কলকাতার বার্তাটিতেও রয়েছে দান ছেড়ে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন সঙ্কেত৷ হারবই যখন, তখন এই ঠা ঠা রোদে অযথা ঘাম ঝরানোই বা কেন!
প্রার্থী যে 'ফ্র্যাজাইল মেটিরিয়াল' তাই 'হ্যান্ডল উইথ কেয়ার' প্রয়োজন, তাঁর মতো করে সেই ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছেন হুমায়ুন কবীর৷ দিদি হাঁটেন এত জোরে জোরে যে, তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেওয়াই ভার৷ দাদাও হাঁটেন অবিশ্বাস্য গতিতে৷ ভোট এলে নিজের কেন্দ্রে হাঁটেন সবাই৷ অতএব, কিছু দিন আগেই রেজিনগরে ইন্দ্র-গায়েনকে রাজপথে নামিয়ে হাঁটতে একরকম বাধ্য করেছিলেন হুমায়ুন৷ তার পর কী হল? শুনুন হুমায়ুনের কথাতেই৷
'দাদা, কী বলব, পনেরো মিনিট হাঁটার পরে দেখি, আমাদের প্রার্থী লোহা গলানোর হাঁপরের মতো জোরে জোরে হাঁফাচ্ছেন৷ সঙ্গে দরদর ঘাম৷ আমি তো দাদা দারুণ ভয় পেয়ে গেলাম৷ ভাবলাম, প্রার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তো আমার হয়ে গেল৷ মমতাদির কানে গেলে তো আমায় দল থেকে বেরই করে দেবে! আর আমি কোনও রিস্ক নিই না দাদা!'
http://eisamay.indiatimes.com/election-news/poll-campaign-of-indranil-sen/articleshow/33590237.cms
No comments:
Post a Comment