আর নয় ২০১৩ সালের ‘আন্দোলন’
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের বয়স ৬ মাস পূর্ণ হতে চলেছে। দেশে অনেকেই ভাবতে পারেননি শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার শান্তিতে কাজ করতে পারবে। তাদের ধারণা ছিল দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে একটি বড় ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে যা মোকাবেলা করতে সরকার মোটেও পারবে না। বিশেষত নাগরিক সমাজ বলে আলোচিত মহলটি মনে করেছিল যে, আন্তর্জাতিক মহলের চাপে সরকার একেবারেই কাবু হয়ে যাবে, দ্রুত আর একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। বিএনপি এবং জামায়াত রাজনীতিতে দাবার যে সব চাল দিয়েছিল তা দিয়ে তারা ভেবেছিল ২৯ ডিসেম্বরই তারা ঢাকা অবরোধ দিয়ে সরকারকে সচিবালয় থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিতে পারবে ঢাকার বাইরে থেকে লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক এসে ঢাকায় তাহ্রীর স্কোয়ারের মতো ঘটনা তৈরি করে ফেলবে, ঢাকার মানুষ শেষ পর্যন্ত নেমে আসবে। সাধারণ মানুষ না নামলেও জামায়াত-বিএনপি এবং হেফাজতের সমর্থকগণ ঢাকায় নেমে আসলে সরকারের পুলিশ, র্যাব তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে কিছুই রক্ষা করতে পারবে না। এর পর সরকারের নির্বাচনী খায়েশ বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করা সম্ভব হবে। ৫ জানুয়ারির আগেই দাবার রাজা, উজির, সৈন্য-সামন্ত খতম হয়ে যাবে। এমনটি জামায়াত-বিএনপির হিসাবে ছিল। কিন্তু ঢাকা অবরোধ সফল না হওয়ার পর সকল শক্তি নিয়ে জামায়াত-বিএনপির কর্মীরা নির্বাচন কেন্দ্র ভাংচুর ও পোড়াপুড়িতে আত্মনিয়োগ করে। তাদের ধারণা ছিল এতে অন্তত তারা পুরোপুরি সফল হবে। তবে তাদের ব্যাপক তা-বের ফলে নির্বাচনের পরিবেশে আঘাত পড়েছে, ভোটারের উপস্থিতির হার শহরগুলোতে ব্যাপকভাবে কমে যায়, তবে গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও সন্তোষজনক ছিল, কোথাও কোথাও তা হতে পারেনি। জামায়াত-বিএনপির ধারণা ছিল, নির্বাচনটি করা সম্পন্ন করতে সরকার শেষ পর্যন্ত পারবে না। ফলে ৬ তারিখ থেকে দেশে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি-উত্তর পরিস্থিতি তৈরি হবেই, জনগণ সেই পরিস্থিতিতে রাস্তায় নেমে আসবেই। কিন্তু সেটিও বাস্তবে ঘটেনি। কেননা, বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনটিকে নিয়ে সাধারণ মানুষকে যেভাবে পুড়িয়ে মারা, ঘরবন্দী করে রাখা, তাদের রুটি-রুজি বন্ধ করে দিয়ে না খাইয়ে মারার পরিস্থিতি তৈরি করেছিল তাতে মানুষ বিরোধী দলের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার চাইতে ক্ষুব্ধ বেশি হয়ে ছিল। মানুষের কাছে বিষয়টি সরকার উৎখাতে বিএনপি-জামায়াতের একটি নীলনক্সা হিসেবে ধরা পড়ে যায়। সে কারণে কোন স্তরেই মানুষ জামায়াত-বিএনপির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে চায়নি। বিএনপির শেষ ভরসা ছিল বিদেশী কূটনীতিবিদগণ, দাতা সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ওপর। মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহেরও কয়েক রাষ্ট্রদূত বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করলেও সরকারের কাছ থেকে কোন কিছু আদায় করতে পারেনি। ৫ জানুয়ারির আগে দেশে আন্দোলনের নামে যে ধরনের তাণ্ডব, সন্ত্রাস, মানুষ পোড়াপুড়ি, সম্পদ ধ্বংস এবং জঙ্গীপনা পরিলক্ষিত হয়েছিল সেটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহকেও কম-বেশি ভাবিত করেছে। সে কারণে তাদের কেউ কেউ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাংলাদেশে সন্ত্রাসের উত্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ক্রমেই বিদেশীদের সমর্থন লাভের ঘুঁটিটিও রাজাকে চেক দিতে পারেনি। ফলে একটি নিয়ম রক্ষার সাংবিধানিক নির্বাচন যে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থার ভেতর দিয়ে তীরে এনে সরকার তুলতে পেরেছিল সেটি বোধহয় শেখ হাসিনার সাহস ও দৃঢ়তার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। ১৯৯০ সালে হু. ম. এরশাদ তেমন দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারেননি, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০০৬-০৭ সালের জানুয়ারি মাসে বেগম খালেদা জিয়াও পারেননি। এবার শেখ হাসিনা পারবেন- তা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নানা ধরনের দোদুল্যমানতা পরিলক্ষিত হয়েছিল। বিষয়টি টেনে আনার আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং শেখ হাসিনার বর্তমান মেয়াদের সরকার নিয়ে যাঁরা অনেক বিরূপ মন্তব্য করেন তাঁদের কার উদ্দেশ্য কী তা আমি জানি না, তবে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন কোনভাবেই সম্পন্ন করা না গেলে দেশের রাজনীতি এগিয়ে যাওয়ার চাইতে একেবারে বিপরীত আদর্শের মেরুতে পিছিয়ে পড়ার শতভাগ সম্ভাবনায় ছিল। ১৯৯০ সালে যে শহুরে মধ্যবিত্তের অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছিল তার বড় অংশীদার ছিল তৎকালীন ৮ এবং ৫ দলীয় জোট। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারার বিরুদ্ধে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পূর্ণরূপে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে সেই পরিবর্তনকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ৮ দলীয় জোট বা ৫ দলীয় বাম জোট যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারার কারণে বিজয় শেষ পর্যন্ত তুলে নিয়েছিল বিএনপি এবং জামায়াত দলগতভাবে। ক্ষমতায় তারা অধিষ্ঠিত হয়েছিল বাহ্যিকভাবে দূরত্ব রেখে। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি-পরবর্তী আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাতে থাকার কারণে ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে পেরেছে। বাংলাদেশে ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসির এমন গভীর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা সম্পর্কে আমাদের নাগরিক সমাজ, গণতান্ত্রিক শক্তি কতটা সচেতন তা বিবেচনায় নিয়ে দেশের রাজনীতির ভেতরগত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অবস্থানকে দেখা জরুরী আর এবার ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ব্যর্থ হলে যে তথাকথিত আন্দোলন সফল হতো সেটি যেনতেন কোন আন্দোলন নামে পরিগণিত হতো না, হতো ‘আরব বসন্তের’ কথিত বিপ্লব নামে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় দক্ষিণপন্থী ভাবাদর্শের মিলিত শক্তি তথা বিএনপি-জামায়াত এবং হেফাজতের মতো শক্তির উত্থান ঘটত। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় সেটিকে একচ্ছত্রভাবে আনার পরিকল্পনা ছিল। ২০১৩ সালের ঘটনাবলি সে ধরনের ধারণাই প্রতিষ্ঠিত করে। ৬ মে তে ঢাকায় তাহ্রীর স্কোয়ার ঘটানোর জন্য ৫ মের দিন ও রাতের পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিল। সরকার সাউন্ড কামান দাগিয়ে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছিল। ৫ জানুয়ারিকে নিয়েও একই শক্তির যে পরিকল্পনা ছিল তাতে নির্বাচনে অংশ নেয়া নয়, ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগ সরকারকে উচ্ছেদ করার সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা আঁটা ছিল। এর পেছনে সকল দক্ষিণপন্থায় বিশ্বাসী শক্তির বৃহত্তর ঐক্য গড়ে ওঠার মাধ্যমে সরকারবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছিল তাতে সফল হলে এর ফলাফল কোন গণতান্ত্রিক কোন দল বা জোটের হাতে ছিটেফোঁটাও যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ফলে ৫ জানুয়ারির ভোট প্রতিহত করা সম্ভব হলে পরবর্তী ছক বাস্তবায়নে কোন সমস্যা হতো না, জনগণের রায় নেয়ার নামে দেশে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো তার ফলাফল ‘বিজয়ী জোটের’ ঘরেই একচেটিয়াভাবে উঠত। সেই নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কথা বলার সুযোগ আর কতটি অবশিষ্ট থাকত তা বলাই বাহুল্য। সকল যুদ্ধাপরাধী বন্দী একে একে বের হয়ে আসত জেলখানা থেকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নতুন ইতিহাস তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুনভাবে সম্পাদিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়া হতো। মুক্তিযুদ্ধকে নতুন সরকারের দৃষ্টিতে লেখা হতো, যেখানে শেখ মুজিবকে আত্মসমর্পণকারী, তাজউদ্দীনদের ভারতে পলায়নকারী মানুষ হিসেবে দেখানোর আয়োজন হতো। গোলাম আযমরা তেমন অপরাধ করেননি। ১৯৭১ সালে তাঁরা শুধু ভারতের বিরোধিতা করেছিলেন। একই সঙ্গে ২০১৪ সালের ‘শীত বিপ্লবের’ বন্দনাও শুরু হতো, বাংলাদেশ ইরানের মতো এক অভাবনীয় বিপ্লবী যুগে প্রবেশের কথা এখন শুনত। সেই বিপ্লবের মূল নেতৃত্বের দাবি বিএনপি কতটা করতে পারত জানি না, তবে জামায়াত-হেফাজতের অবস্থান একচ্ছত্র হতো- এতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন অসাম্প্রদায়িক ধারার অবস্থান কতটা দুর্বল তা সকলেরই বোধগম্য হওয়ার কথা। বাম শক্তি বলে কথিত দলগুলো বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান করে। তারা মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে অনেক তত্ত্ব প্রদান করে। কিন্তু তারা এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের ‘শীত বিপ্লবের’ পক্ষেই পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল। ১৪ দলে আওয়ামী লীগকে বাদ দিলে খুব বেশি কিছু থাকে না। আওয়ামী লীগকে কোন আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের অবস্থান কতটা জীবিত থাকবে- সেই হিসাব এককালের বাম দল, বুদ্ধিজীবী মহল, গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সুধীমহল কতটা ভেবে করেন বা দেখেন- জানি না। তবে ২০১৩ সালের তথাকথিত আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কবর রচনা করা। এই আন্দোলনে যুক্ত থাকা জামায়াত-শিবির-হেফাজতের নেতাকর্মীদের মুখে তখন যে সব কথা উচ্চারিত হতো তা হলো ২০০১-০৬ সালে যে ভুল করা হয়েছিল তা এবার আর করা হবে না। এমন বক্তব্যে যে বিষয়টি বোঝা যেত তা হচ্ছে এবার ক্ষমতা পেলে দেশে বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করা হতো- যেখানে মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর খুব বেশি মানুষকে জীবিত রাখা হতো না বিশেষত ৫ জানুয়ারির পর আওয়ামী লীগকে জিরো করা গেলে দেশে একটি ভয়াবহ তাণ্ডব অনিবার্যভাবে সংঘটিত করা সম্ভব হতো। দ্বিতীয় বিষয়টি ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত ৪ দলীয় জোট যে উন্মত্ততা দেখিয়েছিল এবার তার চেয়ে অনেক বেশি তারা দেখাত। তাদের সঙ্গে এবার সমাজের ভেতরে লুকিয়ে অনেক শক্তিই এতে যুক্ত হতো। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারটিকে ২০ দলীয় জোট যে সহজেই মেনে নিতে পারছে না তা অতীতে গোপন থাকেনি, ক্ষমতায় যেতে পারলে এর চরম প্রতিশোধ তারা নিত, ভবিষ্যতে নেবে না- এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই।
ওপরে যে বিষয়টি উল্লেখ করেছি তা আমার কোন কল্পনাপ্রসূত বিষয় নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতার গভীর পর্যবেক্ষণকে গতিপ্রবাহে উপস্থাপন করার প্রয়াস মাত্র। তা থেকে পাঠক আবার যেন ধারণা পোষণ না করেন যে, আমি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে বসে আছি। না, তা মোটেও নয়। আমার উদ্দেশ্যে হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সরলীকৃত ব্যাখ্যা একেবারেই বিপজ্জনক প্রচারণী হিসেবে চলছে। ফলে উৎসাহিত হচ্ছে পশ্চাৎপদ ও বিপরীত ধারার শক্তি যারা ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ দিতে শুরু করেছে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারাকে। বাংলাদেশে এখন রাজনীতিতে মতাদর্শগত শক্তির অবস্থানে সাম্প্রদায়িক শক্তির অবস্থার আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বেশ শক্তিশালী বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে আমরা সেই শক্তির উত্থান ও অবস্থান দেখেছি। এখন তারা সাময়িক বিরতি দিয়েছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না। তবে বিপদ বাড়ছে, অসাম্প্রদায়িক নানা শক্তির ক্ষয় হচ্ছে, নানা দিক থেকে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সংস্কৃতি সমাজ চেতনা দারুণভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সেদিকে মনোযোগ দেয়ার লক্ষণ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। যদি থাকত তা হলে নাগরিক সমাজের একটি বিরাট অংশ অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যে সব আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা সমস্যা ও দুর্বলতা রয়েছে সেগুলোকে দূর করার উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে দ্রুতই আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে যে সব মতামত দিচ্ছেন তা আবারও বাংলাদেশ ২০১৩-এর ভয়াবহ অবস্থাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, নতুনভাবে এর চাইতে বড় ধরনের দুর্যোগ ডেকে আনার সুযোগ তো করে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে যে বিষয়টি ভাববার মতো তা হচ্ছে, ৫ জানুয়ারির পর থেকে গত ৬ মাসে বিরোধী দল নতুন করে আন্দোলন সংগ্রামের কথা বললেও শক্তির কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি। বিএনপি ঈদের পর বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি প্রদান করেছে। জামায়াত আপাতত মাঠে নেই- এমন একটি আবহ তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগদান করছে। এটি তাদের নতুন একটি কৌশল হতে পারে। এর ফলে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিতে কালিমা লিপ্ত হতে পারে, সংগঠনের ভেতরের অনেক কিছুই এরা মূল সংগঠন জামায়াতকে জানাতে পারে। সামগ্রিকভাবে বিরোধী দল বা জোটে আগের মতো আন্দোলনের প্রস্তুতি নেই। তবে আন্দোলনের হুঙ্কার আছে। আন্দোলনের ক্ষেত্রে আসলে দিনক্ষণ ঘোষণা করে তা করা যায় না- এটি স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। বিএনপি ঈদের পরে আন্দোলনের যে আগাম ঘোষণা দিয়েছে তা নিয়ে সরকারী দল যে সব প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেগুলো একেবারেই রাজনৈতিক। তবে সাধারণ মানুষ মনে হয় না ২০১৩ সালের অভিজ্ঞতা থেকে দেশে নতুন করে কোন সংঘাত-সংঘর্ষের পরিস্থিতি দেখতে চায়। অনেক মানুষই সরকারী দলের কোন কোন অঙ্গ-সংগঠনের কোন নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডে হতাশ ও ক্ষুব্ধ। কোন কোন নেতা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার মতো কাজ করছেও। এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি হতাশা ও ক্ষোভ রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সরকার অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতি, বিদ্যুত, তথ্য-প্রযুক্তি ইত্যাদি খাতে যেভাবে প্রশংসনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখছে তাতে উন্নয়নের প্রশ্নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের নীরব সমর্থন রয়েছে। কিন্তু যত অভিযোগ তার সিংহভাগই হচ্ছে দলের জেলা, উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা জাপান, চীন সফর করে বিদেশীদের মনোভাব যে বাংলাদেশের প্রতি বা বর্তমান সরকারের প্রতি ইতিবাচক তা জানান দিতে পেরেছেন। ভারতের সুষমা স্বরাজের শুভেচ্ছা সফরের মধ্য দিয়ে মোদি সরকারও যে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী তা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির ভারতনীতির দোদুল্যমানতা, অস্পষ্টতা এবার আরও ধরা পড়েছে।
সব কিছু মিলিয়ে সরকারের প্রতি যাদের সমালোচনা বা ক্ষোভ রয়েছে তারা এখনই বিএনপির দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে- এমনটি মনে হয় না। মানুষ এখন স্বাভাবিক কাজকর্ম ও জীবনযাপন করার পরিবেশ চাচ্ছে। নির্বাচনের আগে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার বিষয় সকলে দেখতে চায়। দুই দলের মধ্যে ৫ জানুয়ারির আগে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চায়। সেই উদ্যোগ সহসাই হবে না এটি যেমন সত্য, তবে এটি একেবারেই সম্ভব নয়- এমনটিও কেউ কেউ দেখতে চায় না। সেটি দূর করতে বেশ সময় নেবে। সময় নিয়ে উভয় দলকেই ভবিষ্যত নির্বাচনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।
ওপরে যে বিষয়টি উল্লেখ করেছি তা আমার কোন কল্পনাপ্রসূত বিষয় নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতার গভীর পর্যবেক্ষণকে গতিপ্রবাহে উপস্থাপন করার প্রয়াস মাত্র। তা থেকে পাঠক আবার যেন ধারণা পোষণ না করেন যে, আমি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে বসে আছি। না, তা মোটেও নয়। আমার উদ্দেশ্যে হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সরলীকৃত ব্যাখ্যা একেবারেই বিপজ্জনক প্রচারণী হিসেবে চলছে। ফলে উৎসাহিত হচ্ছে পশ্চাৎপদ ও বিপরীত ধারার শক্তি যারা ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ দিতে শুরু করেছে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারাকে। বাংলাদেশে এখন রাজনীতিতে মতাদর্শগত শক্তির অবস্থানে সাম্প্রদায়িক শক্তির অবস্থার আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বেশ শক্তিশালী বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে আমরা সেই শক্তির উত্থান ও অবস্থান দেখেছি। এখন তারা সাময়িক বিরতি দিয়েছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না। তবে বিপদ বাড়ছে, অসাম্প্রদায়িক নানা শক্তির ক্ষয় হচ্ছে, নানা দিক থেকে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সংস্কৃতি সমাজ চেতনা দারুণভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সেদিকে মনোযোগ দেয়ার লক্ষণ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। যদি থাকত তা হলে নাগরিক সমাজের একটি বিরাট অংশ অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যে সব আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা সমস্যা ও দুর্বলতা রয়েছে সেগুলোকে দূর করার উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে দ্রুতই আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে যে সব মতামত দিচ্ছেন তা আবারও বাংলাদেশ ২০১৩-এর ভয়াবহ অবস্থাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, নতুনভাবে এর চাইতে বড় ধরনের দুর্যোগ ডেকে আনার সুযোগ তো করে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে যে বিষয়টি ভাববার মতো তা হচ্ছে, ৫ জানুয়ারির পর থেকে গত ৬ মাসে বিরোধী দল নতুন করে আন্দোলন সংগ্রামের কথা বললেও শক্তির কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি। বিএনপি ঈদের পর বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি প্রদান করেছে। জামায়াত আপাতত মাঠে নেই- এমন একটি আবহ তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগদান করছে। এটি তাদের নতুন একটি কৌশল হতে পারে। এর ফলে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিতে কালিমা লিপ্ত হতে পারে, সংগঠনের ভেতরের অনেক কিছুই এরা মূল সংগঠন জামায়াতকে জানাতে পারে। সামগ্রিকভাবে বিরোধী দল বা জোটে আগের মতো আন্দোলনের প্রস্তুতি নেই। তবে আন্দোলনের হুঙ্কার আছে। আন্দোলনের ক্ষেত্রে আসলে দিনক্ষণ ঘোষণা করে তা করা যায় না- এটি স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। বিএনপি ঈদের পরে আন্দোলনের যে আগাম ঘোষণা দিয়েছে তা নিয়ে সরকারী দল যে সব প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেগুলো একেবারেই রাজনৈতিক। তবে সাধারণ মানুষ মনে হয় না ২০১৩ সালের অভিজ্ঞতা থেকে দেশে নতুন করে কোন সংঘাত-সংঘর্ষের পরিস্থিতি দেখতে চায়। অনেক মানুষই সরকারী দলের কোন কোন অঙ্গ-সংগঠনের কোন নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডে হতাশ ও ক্ষুব্ধ। কোন কোন নেতা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার মতো কাজ করছেও। এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি হতাশা ও ক্ষোভ রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সরকার অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতি, বিদ্যুত, তথ্য-প্রযুক্তি ইত্যাদি খাতে যেভাবে প্রশংসনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখছে তাতে উন্নয়নের প্রশ্নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের নীরব সমর্থন রয়েছে। কিন্তু যত অভিযোগ তার সিংহভাগই হচ্ছে দলের জেলা, উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা জাপান, চীন সফর করে বিদেশীদের মনোভাব যে বাংলাদেশের প্রতি বা বর্তমান সরকারের প্রতি ইতিবাচক তা জানান দিতে পেরেছেন। ভারতের সুষমা স্বরাজের শুভেচ্ছা সফরের মধ্য দিয়ে মোদি সরকারও যে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী তা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির ভারতনীতির দোদুল্যমানতা, অস্পষ্টতা এবার আরও ধরা পড়েছে।
সব কিছু মিলিয়ে সরকারের প্রতি যাদের সমালোচনা বা ক্ষোভ রয়েছে তারা এখনই বিএনপির দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে- এমনটি মনে হয় না। মানুষ এখন স্বাভাবিক কাজকর্ম ও জীবনযাপন করার পরিবেশ চাচ্ছে। নির্বাচনের আগে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার বিষয় সকলে দেখতে চায়। দুই দলের মধ্যে ৫ জানুয়ারির আগে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চায়। সেই উদ্যোগ সহসাই হবে না এটি যেমন সত্য, তবে এটি একেবারেই সম্ভব নয়- এমনটিও কেউ কেউ দেখতে চায় না। সেটি দূর করতে বেশ সময় নেবে। সময় নিয়ে উভয় দলকেই ভবিষ্যত নির্বাচনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment