Wednesday, July 2, 2014

দুই ভাগে বিভক্ত মার্কিন সমাজ অনুবাদ : এনামুল হক

দুই ভাগে বিভক্ত মার্কিন সমাজ
অনুবাদ : এনামুল হক
আমেরিকান সমাজে প্রচলিত অসাম্যের ওপর ‘ইন ইকোয়ালিটি ইজ নট ইনএভিটেবল’ শীর্ষক নিবন্ধটি লিখেছেন স্বনামধন্য মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী জোসেফ ই স্টিগলিজ। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এই বিষয়ের ওপর গত দেড় বছর ধরে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সুচিন্তিত অভিমত সিরিজ আকারে ছাপা হয়েছে। স্টিগলিজের এই নিবন্ধ সেই সিরিজের সর্বশেষ রচনা।]

গত এক শ’ বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময়ে গোপনে ও সূক্ষ্মভাবে এক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সে দেশটার সুষম প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়তে শুরু করেছে এবং সেটা এত বেশি মাত্রায় হচ্ছে যে ২০০৭ সালে মহামন্দার আঘাত নেমে আসলে আমেরিকার অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে সে সব ফাটল ধরা দিতে শুরু করেছিল সেগুলোকে আর উপেক্ষা করা কারোর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ‘পাহাড়চূড়ার এই আলোকোজ্জ্বল নগরী’ কিভাবে এমন একটা অগ্রবর্তী দেশে পরিণত হলো সেখানে সর্বাধিক মাত্রায় অসাম্য বিরাজমান?
টমাস পিকেটির সময়োচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ক্যাপিটেল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’কে কেন্দ্র করে সূচিত বিশেষ আলোচনার একটি ধারা এই ধারণায় এসে স্থিতি লাভ করেছে যে সম্পদ ও আয়ের দুই চরম প্রান্তের অবস্থান পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। এই প্রকল্পে আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশকে অসাম্য দ্রুত হ্রাস পাওয়ার অধ্যায়টিকে একটা অস্বাভাবিকতা হিসেবে দেখতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে এটা হলো মি: পিকেটির গ্রন্থের একটা ভাসাভাসা পাঠবিশেষ যা থেকে একটা নির্দিষ্ট সময়জুড়ে অসাম্য গভীরতর রূপলাভ অনুধাবনের প্রতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর বিশ্লেষণের এই অংশটা বাহ্যত অধিকতর অদৃষ্টবাদী দিকগুলোর তুলনায় কতকটা কম মনোযোগ আকর্ষণ লাভ করেছে।
গত দেড় বছরে দি নিউইয়র্ক টাইমস এ ‘দি গ্রেট ডিভাইড’ সিরিজের বেশ কিছু অভিমত নিবন্ধ ছাপা হয়েছে সেখানে আমি মডারেটর হিসেবে কাজ করেছি। এ সব নিবন্ধেও বেশকিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের সত্যিকার অর্থে কোন মৌলিক নিয়মকানুন আছে এমন ধারণাটি অসার প্রতিপন্ন হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্যিক পুঁজিবাদের নিয়মসূত্রগুলো একবিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক সমাজে প্রযোজ্য হওয়ার দরকার নেই। আমাদের আমেরিকায় এত বেশি অসাম্য থাকার প্রয়োজন নেই।
আমাদের বর্তমান ধাচের পুঁজিবাদ হলো বদলী পুঁজিবাদ। এর প্রমাণ পেতে চাইলে মহামন্দার সময় সঙ্কট মোকাবেলায় আমরা কিভাবে সাড়া দিয়েছিলাম সেখানে ফিরে যান। দেখতে পাবেন যে লাভ বা মুনাফাকে আমরা ব্যক্তিক রূপ দিলেও লোকসানকে সামাজিকীকরণ বা সামাজিক রূপ দিয়েছিলাম। নিখাদ প্রতিযোগিতায় মুনাফা শূন্যের কোঠায় নেমে আসা উচিত, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও তাই হওয়া উচিত। অথচ আমাদের মনোপলি ও অলিগোপলিগুলো অবিরত মোটা অঙ্কের মুনাফা করে চলেছে। সিইওদের আয় একজন গতানুগুতিক শ্রমিকের আয়ের গড়ে ২৯৫ গুণ। অতীতের তুলনায় এই আনুপাতিক হারটা অনেক বেশি। অথচ সেই অনুপাতে যে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে তার কোন প্রমাণ নেই।
আমেরিকার এই সুবিশাল বিভাজন বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য অর্থনীতির অপ্রতিরোধ্য নিয়ম সূত্রগুলোই যদি দায়ী না হয় তাহলে কোনটা দায়ী? এর সোজাসাপটা জবাব হলো- আমাদের নীতি ও আমাদের রাজনীতি। স্ক্যান্ডিনেভীয়দের সাফল্যের কাহিনী শুনতে শুনতে লোকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তথাপি বাস্তব সত্য হলো এই যে সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে এদের সকলের মাথাপিছু আয় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে এবং দ্রুতগতিতে বেড়েছে অথচ এরা সমাজের অনেক বেশি মাত্রায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
তাই প্রশ্ন উঠে যে, আমেরিকা নিজ সমাজে অসাম্য বাড়িয়ে তোমার এই নীতিগুলো কেন বেছে নিয়েছে? এর আংশিক জবাব হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি যেমন ফিকে হয়ে গেছে তেমনি এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা সংহতিও হয়ে পড়েছে ম্লান। স্নায়ুযুদ্ধে আমেরিকার বিজয় অর্জিত হওয়ায় আমাদের অর্থনৈতিক মডেলের যুতসই কোন প্রতিযোগীর অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয়নি। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী না থাকায় আমাদের আর প্রমাণ দিয়ে দেখানোর দরকার পড়েনি যে, আমাদের অনুসৃত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই অধিকাংশ নাগরিককে সুফল এনে দিতে সক্ষম।
মতাদর্শ ও স্বার্থ হীনউদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। সোভিয়েত ব্যবস্থার পতন থেকে কেউ কেউ ভুল পাঠ গ্রহণ করল। ওখানে সরকারী নিয়ন্ত্রণ অতিমাত্রায় বেশি ছিল এবং এখানে সেই নিয়ন্ত্রণ অতিমাত্রায় কম আছেÑ এই দুই বক্তব্যের মধ্যে অভিমতের দোলক দুলতে লাগল। কর্পোরেট স্বার্থগুলো নিয়ন্ত্রণের বজ্রমুষ্ঠি থেকে মুক্ত হওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখাল যদিও এ সব নিয়ন্ত্রণ আমাদের পরিবেশ, আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের স্বাস্থ্য এবং খোদ অর্থনীতির রক্ষা ও উন্নয়নে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
কিন্তু এই মতাদর্শটা ছিল ভণ্ডামিপূর্ণ। অর্থনীতিতে অবাধনীতির প্রবলতম সমর্থকদের মধ্যে ব্যাংকাররা সঙ্কট থেকে পরিত্রাণে সরকারের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার গ্রহণ করতে অতিমাত্রায় আগ্রহী ছিল এবং এই ধরনের সঙ্কটটা মুক্তবাজার ও নিয়ন্ত্রণ শিথিলের থ্যাচার-রিগ্যানীয় যুগের শুরু থেকে বিশ্ব অর্থনীতির একটা পৌনপৌনিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা অর্থের দ্বারা দলিতমথিত ও বিপর্যস্ত। অর্থনৈতিক অসাম্য রাজনৈতিক অসাম্য রূপায়িত হয় এবং রাজনৈতিক অসাম্য বর্ধিত মাত্রায় অর্থনৈতিক অসাম্য সৃষ্টি করে। বস্তুত পক্ষে মিঃ পিকেটির যুক্তির ভিত্তি হলো এই যে, সম্পদের মালিকরা তাদের কর পরিশোধন করার পরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনুপাতে প্রাপ্তির উচ্চ হার বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছেন এবং সে কথাটা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু তারা ওটা কিভাবে করতে পারছে? পারছে এই প্রাপ্তিটা সুনিশ্চিত করার জন্য খেলার নিয়মকানুন নির্ধারণ করে, অর্থাৎ রাজনীতির মাধ্যমে।
তাই গরিবদের কল্যাণমূলক সুবিধা কাটছাট করলেও কর্পোরেটগুলোর লাভের অঙ্ক বেড়ে যায়। দুস্থদের জন্য পুষ্টি সহায়তা কমিয়ে দেয়া হলেও কংগ্রেস ধনী কৃষকদের জন্য ভর্তুকি বজায় রাখে। আমরা চিকিৎসা সুবিধা সীমিত করে দিচ্ছি অন্যদিকে ওষুধ কোম্পানিগুলোকে শত শত কোটি ডলার দেয়া হয়েছে। যেসব ব্যাংক বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কট ডেকে এনেছে সেগুলো শত শত কোটি ডলার পেয়েছে আর যৎকিঞ্চিত দেয়া হয়েছে বাড়ির মালিকদের ও সেই সব ব্যক্তিকে যারা একই ব্যাংকের লুটেরা ঋণদান কৌশলের শিকার হয়েছে। এই শেষের সিদ্ধান্তটা ছিল বিশেষভাবে নিবুর্দ্ধিতার পরিচায়ক। ব্যাংকগুলোকে টাকা দেয়ার বিকল্প উপায়ও ছিল এবং আশা করা যেতে পারত যে, ক্রমাবর্ধমান ঋণদানের মধ্য দিয়ে এই টাকা ছড়িয়ে পড়বে। আমরা বিপন্ন বাড়ির মালিকদের এবং যারা ব্যাংকের লুটেরা কারসাজির শিকার হয়েছিল তাদের সরাসরি সাহায্য করতে পারতাম। এতে শুধু অর্থনীতিরই সাহায্য হতো না, আমরা বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথেও দাঁড়াতে পারতাম।
আমাদের বিভাজনগুলো সুগভীর। অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক দিক দিয়ে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হয়ে থাকার কারণে সমাজের শীর্ষে যাদের অবস্থান তারা একজন নিচের দিকের মানুষগুলোর সমস্যার স্পর্শ থেকে মুক্ত। প্রাচীন যুগের রাজাবাদশাদের মত তাঁরা তাদের বিশেষ সুবিধাভোগী অবস্থানটিকে একান্তই স্বাভাবিক অধিকার বলে মনে করেন। ভেনচার পুঁজিপতি টম পার্কিনস সম্প্রতি বলেছেন যে, শতকরা ১ ভাগ মানুষের সমালোচনা করা নাৎসি ফ্যাসিবাদের সমতুল্য। আর প্রাইভেট ইকুইটি ব্যবসার মহারথী স্টিপেন এ সোয়ার্জম্যান জীবিকা নির্বাহের জন্য যারা কাজ করে তাদের মতো একই হারে অর্থলগ্নিকারীদের কর দিতে বলাকে হিলটলারের পোল্যান্ড আগ্রাসনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের এ সব মন্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করা ছাড়া আর কি উপায় আছে?
আমাদের অর্থনীতি, আমাদের গণতন্ত্র ও আমাদের সমাজ এ সব চরম অসাম্যের জন্য মাসুল দিয়েছে। সমাজের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ ট্যাস্ক হেভেনগুলোতে কি পরিমাণ সম্পদ জমা করতে পারছে সেটা অর্থনীতির সত্যিকারের পরীক্ষা নয়, সত্যিকারের পরীক্ষা হলো সাধারণ নাগরিকরা কতটা ভাল অবস্থায় আছে। কথাটা আমেরিকার বেলায় আরও বেশি সত্য যেখানে আমাদের আপন ভাবমূর্তিটা আমাদের এই দাবির মধ্যেই গ্রথিত যে, এই সমাজ হলো এক সুবিশাল মধ্যবিত্তের সমাজ। অথচ মধ্যবিত্তের আয় সিকি শতাব্দী আগে যা ছিল তার চেয়েও আজ কম। প্রবৃদ্ধি চলে গেছে সমাজের অতি অতি শীর্ষভাগের মানুষগুলোর পকেটে, যাদের আয় ১৯৮০ সালের পর থেকে প্রায় চতুর্গুণ হয়েছে। যে অর্থ নিচের দিকে চুইয়ে পড়ার কথা তা না হয়ে কেইম্যান দ্বীপের সৌরভময় আবহাওয়ায় উবে গেছে।
আমেরিকায় যেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে, সেখানে দেশটির গরিবদের জন্য তেমন কিছুই করা হচ্ছে বা সেখানে এক প্রজন্মের বঞ্চনার জের পরবর্তী প্রজন্মকে বহন করতে হচ্ছে। অবশ্য কোন দেশই কখনও জনগণকে সম্পূর্ণ সমান সুযোগ প্রদানের কাছাকাছি উপনীত হয়নি। তাহলে আমেরিকা কেন সেই অগ্রবর্তী দেশগুলোর একটি যেখানে তরুণ সমাজের জীবনের সম্ভাবনাগুলো তাদের পিতামাতার আয় ও শিক্ষার দ্বারা অতি চরম আকারে নির্ধারিত।
মহাবিভাজন বা বৈষম্যের অতি যন্ত্রনাদহন কাহিনীগুলোর মধ্যে এমন কাহিনীও আছে যেখানে আমাদের সংকোচনশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে প্রবেশ করার জন্য আকুল আকুতি নিয়ে থাকা তরুণ সমাজের হতাশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখাপড়ার খরচ বেডে যাওয়া ও আয় হ্রাস পাওয়ার কারণে ছাত্রদের কাঁধে ঋণের বোঝা বেড়ে গেছে। শুধু হাইস্কুলের ডিপ্লোমা আছে এমন তরুণদের আয় গত ৩৫ বছরে ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেখানে জড়িত সেখানেও বৈষম্য বা বিভাজন মুখব্যাদান করে আছে। বিশ্বের বাকি অংশের এবং নিজ জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের চোখে গণকারাবাস আমেরিকার একটা বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। আমেরিকায় বিশ্বের জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫ শতাংশের বাস। অথচ বিশ্বে যত কারাবন্দী আছে তার প্রায় এক-চতুর্থাংশই রয়েছে সেখানে। ন্যায়বিচার একটা পণ্যে পরিণত হয়েছে যা শুধু গুটিকয়েক মানুষের সাধ্যায়ত্ত। ২০০৮ সালের সঙ্কট কাদের দুষ্কর্মের ফল তা লেখচিত্রে অতি পরিষ্কারভাবে প্রকাশ পেলেও ওয়াল স্ট্রীটের কর্মকর্তারা সেই সব দুষ্কর্মের জন্য তাদের যাতে দায়ী করা না হয় তা নিশ্চিত করতে মোটা পারিশ্রমিকের আইনজীবীদের কাজে লাগিয়েছে। আর অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ঋণ পরিশোধের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বন্ধকী সম্পত্তি খালাস করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ক্লায়েন্টদের সেই সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য আমাদের আইন ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে। অথচ এ সব ব্যক্তির কারোর কারোর কাছে এক পয়সাও পাওনা ছিল না।
অর্ধ শতাব্দীরও বেশি আগে আমেরিকা ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের গৃহীত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা প্রচারে নেতৃত্ব দিয়েছিল। আজ স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুযোগ লাভ সর্বাধিক মাত্রায় সর্বজনীনভাবে গৃহীত অধিকারগুলোর অন্যতম। অন্তত পক্ষে উন্নত দেশগুলোতে তো বটেই সাধ্যায়ত্ত স্বাস্থ্য পরিচর্যা আইনের বাস্তবায়ন সত্ত্বেও আমেরিকা এদিক দিয়ে একটা ব্যতিক্রম। আমেরিকা আজ স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুযোগ লাভ, আয়ু ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ক্ষেত্রে বিরাট বৈষম্যপূর্ণ একটি পরিণত হয়েছে।
সুপ্রীমকোর্ট সাধ্যায়ত্ত পরিচর্যা আইনটি নাচক করে না দেয়ায় অনেকে স্বস্তিবোধ করেছেন বটে, তবে মেডিকেইডের সিদ্ধান্তের তাৎপর্যটি পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করা হয়নি। ওবামাকেয়ারের লক্ষ্য ছিল সকল আমেরিকান যাতে স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই লক্ষ্যটি সমস্যায় পড়ে গেছে। ২৪টি অঙ্গরাজ্য সম্প্রসারিত মেডিকেইড কর্মসূচী বাস্তবায়িত করেনি। অথচ দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর কিছু অংশকে যার দ্বারা ওবামাকেয়ারের প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা ছিল, ঐ কর্মসূচী ছিল সেই মাধ্যম। আমাদের শুধু যে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ ঘোষণা প্রয়োজন তা-ই নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে রক্ষা করার জন্যও যুদ্ধ প্রয়োজন। এ সব সমস্যার সমাধানের জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে হবে তা নয়। মোটেই তার প্রয়োজন নেই। শুরুতে যদি বাজারকে বাজারের মতো আচরণ করতে দেয়া হয় তাহলে উত্তম। আমরা খাজনার সন্ধান করে বেড়ানো সমাজের দিকে ঝুঁকে পড়েছি। যেখানে সম্পদশালীরা প্রচলিত ব্যবস্থার কারসাজি করে মুনাফা করায়ত্ত করে। এমন অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।
অসাম্যের সমস্যাটি টেকনিক্যাল অর্থনীতির সমস্যা এতটা নয়। সত্যিকার অর্থে এটা হলো ব্যবহারিক রাজনীতির সমস্যা। সমাজের শীর্ষে যাদের অবস্থান তাদের করের যথাযথ অংশটুকু পরিশোধ সুনিশ্চিত করতে পারা এবং এইভাবে ফটকাবাজ, কর্পোরেশন ও ধনীদের বিশেষ সুবিধা ভোগের অবসান ঘটানো হলে একই সঙ্গে তা হবে বাস্তবানুগ ও ন্যায়সঙ্গত। আমরা যদি লোভ লালসার রাজনীতিকে পাল্টে দেই তাহলে ঈর্ষার রাজনীতিকে আলিঙ্গন করা বুঝাবে না। অসাম্যের বিষয়টি শুধু শীর্ষসারির প্রান্তিক করহারের বিষয়ই নয়, উপরন্তু আমাদের সন্তানদের খাদ্যের সুযোগ লাভ এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচারের অধিকার লাভের বিষয়ও বটে। আমরা যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠানোর পিছনে আরও অর্থ ব্যয় করি তাহলে বর্তমানের ও ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে জোরদার করে তুলব। এমন কথা আপনারা আগেও শুনেছেন। মানে এই নয় যে, আমাদের আবার চেষ্টা করে দেখা উচিত নয়।
আমরা সমস্যার অন্তর্নিহিত উৎসটি নির্ণয় করতে পেরেছি। সেটা হলো রাজনৈতিক অসাম্য ও নীতি যা আমাদের গণতন্ত্রকে পণ্যে পরিণত করেছে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছে। শুধু সংকল্পবদ্ধ নাগরিকরাই একটা সুষ্ঠুভিত্তিক ও ন্যায়ানুগ আমেরিকা পুনর্প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে পারে এবং চ্যালেঞ্জের গভীরতা ও মাত্রা অনুধাবন করতে পারলেই কেবল তারা সেই লড়াই চালাতে পারবে। বিশ্বে আমাদের অবস্থান পুনর্প্রতিষ্ঠা করা এবং জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় কি সেই বোধ বা উপলব্ধি পুনরুদ্ধার করার ব্যাপারে এখনও খুব বেশি বিলম্ব হয়ে যায়নি। অসাম্য প্রসারিত হওয়া ও গভীরতর রূপ লাভ করার বিষয়টি অর্থনীতির অপরিবর্তনীয় নিয়মসূত্র দ্বারা নির্ধারিত নয় বরং আমাদের নিজেদেরই রচিত নিয়মসূত্র দ্বারা নির্ধারিত।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment