ইরাক এবং পশ্চিমি গণতন্ত্র একটি অসমাপ্ত খোয়াবনামা
উন্নত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নাকি ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষা? ইরাকে পশ্চিমি দেশগুলি কী চায় ও চেয়ে এসেছে? প্রথম পর্ব৷ লিখছেন নীলাঞ্জন হাজরা
The effort to spread democracy is also dangerous...: it conveys to those who do not enjoy this form of government the illusion that it actually governs those who do. - এরিক হব্সবম
ইরাকে কী ঘটছে? এর কোনও সরল উত্তর নেই৷ কিন্ত্ত এই অঞ্চলের ঠিক একশো বছরের ইতিহাস নিয়ে খুঁচিয়ে প্রশ্ন করলে তার উত্তরে যে টুকরো টুকরো ছবি মিলবে সেগুলি জিগ্স পাজ্ল-এর মত মিলিয়ে নিলে বৃহত্তর ক্যানভাসে একটা ছবি ফুটে ওঠে৷ সে ছবির সঙ্গে পশ্চিমি শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকতার ধ্রুপদী সংজ্ঞার অদ্ভুত অস্বস্তিকর মিল৷ আর সেই ঔপনিবেশিক স্বার্থ ধারাবাহিক ভাবে বিশ্বের কাছে হাজির করা হয়েছে উন্নত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মোড়কে৷ কাজেই একটা সামগ্রিক ধারাভাষ্যের চেষ্টা না করে ছোট ছোট প্রশ্ন তুলে তার উত্তরগুলো খুঁজলে বিষয়টা কিছুটা প্রাঞ্জল হতে পারে৷
কী ঘটছে তা হলে?
'পশ্চিমি গণমাধ্যম' (এই শব্দবন্ধটি ঠিক ভৌগোলিক নয়) অনুযায়ী, গৃহযুদ্ধ৷ কেন এই গৃহযুদ্ধ? অল দওলা অল ইসলামিয়ে ফিল ইরাক ও অল শম (ইংরেজিতে - ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ত, আই এস আই এল) নামের আল-কায়দার একটি ছোট কিন্ত্ত বিপজ্জনক ভাবে সশস্ত্র জেহাদি সংগঠনের যোদ্ধারা সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে কিছু এলাকা এবং ইরাকের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিপুল এলাকা দখল করে নিয়ে পশ্চিমে এগোচ্ছেন৷ মোসুল, টিকরিট, রামাদি, ফালুদার মত গুরুত্বপূর্ণ শহর তাঁদের দখলে৷
কেন হঠাত্ এমনটা হল?
খুব সংক্ষেপে - ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বে, প্রধানত ব্রিটেন এবং আরও বেশ কিছু দেশ ইরাকের একনায়ক 'খুনি' সাদ্দাম হুসেনকে যুদ্ধে হারিয়ে, বাথ পার্টির স্বৈরতান্ত্রিক শাসন শেষ করে সে দেশে 'গণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠা করে৷ ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রশাসন ও সেনার তত্ত্বাবধানে 'গণতান্ত্রিক নির্বাচন' হয়৷ সে নির্বাচনে সব থেকে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে ইউনাইটেড ইরাকি অ্যালায়েন্স৷ প্রধানমন্ত্রী হন ইব্রাহিম অল-জাফরি৷ মাস চারেকের মধ্যেই সংখ্যালঘু সুন্নি গোষ্ঠী ও কুর্দদের বিদ্রোহে তাঁকে সরিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সক্রিয় সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হলেন নুরি অল-মালিকি৷ আজও তিনি এই পদেই বহাল৷ তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ২০০৬-এর ডিসেম্বরে সাদ্দাম হুসেনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশে সই করা৷ কিন্ত্ত ক্রমাগত তিনি একটি 'জাতীয় সরকার' গঠনের মার্কিন উপদেশ অগ্রাহ্য করে পরিকল্পিত ভাবে সুন্নিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে থাকেন৷ এর ফলে সুন্নিদের মধ্যে ক্রোধ জমে উঠতে থাকে৷ ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা অপসারিত হয়৷ এর পরেই মাথা তুলতে শুরু করে সুন্নি উগ্রপন্থী আই এস আই এল৷ বিগত কয়েক মাসে অল-মালিকি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র অভিযান চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে৷ তাদের লক্ষ্য বাগদাদ সহ গোটা ইরাক দখল করে একটি বৃহত্তর ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন৷ আই এস আই এল-এর প্রধান আবু বকর অল-বাগদাদি এর মধ্যেই দখল করা এলাকাগুলি নিয়ে একটি নতুন 'খিলাফত' গঠন করার কথা ঘোষণা করেছেন৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাতিল করে শ'তিনেক সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে দিয়েছে৷ আর ইরাকের আকাশে উড়িয়েছে মিসাইল-সজ্জিত কিছু ড্রোন বা ছোট স্বয়ংক্রিয় বিমান৷ এই হল মোটামুটি 'পশ্চিমি গণমাধ্যমের' ইরাকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর নির্মাণ৷ এই নির্মাণের মূল কথা - পশ্চিমি দেশগুলি (পড়ুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন) ইরাকে উদার গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক চেষ্টা করেছে৷ ইরাকের মানুষ তার মূল্য না বুঝে প্রাচীন ধর্মীয় ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বেই লিপ্ত থেকেছে৷
তা হলে এ বার কী হবে?
পশ্চিমি বিশেষজ্ঞরা জনসমক্ষে যা বলছেন (তাঁরা যে জনসমক্ষে এক কথা বলেন আর প্রশাসন ও কর্পোরেট দুনিয়ার উচ্চতম পর্যায়ের কানে কানে অন্য কথা বলে আসেন - এর অজস্র প্রমাণ আছে) তা ঠিক হলে ইরাকের অখণ্ডতা আর বজায় রাখা অসম্ভব৷ ব্রুকিংস্ ইনস্টিটিউট-এর এফ গ্রেগরি গাউস-এর মতে আই এস আই এল গোটা ইরাক দখল করার যুদ্ধে জিতবে না৷ এত সামরিক ক্ষমতা তাদের নেই৷ হয়তো সরকারি ভাবে কিছু দিন ইরাকের মানচিত্রও বদলাবে না৷ কিন্ত্ত আই এস আই এল ও অন্যান্য সুন্নি জঙ্গিরা এক দিকে এবং কুর্দরা নিজ নিজ এলাকায় প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে৷ তাঁর কথায়, 'ইরাকের রাজনৈতিক শ্রেণি সে দেশের আশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে'৷ সম্ভাব্য পরিণতি মার্কিন লক্ষ্যের পরাজয়?
মোটেই না৷ আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্তত বছর সাতেক আগেই বুঝে ফেলেছিল বাগদাদ থেকে রাজনৈতিক ভাবে সারা ইরাক শাসন করা অসম্ভব৷ ২০০৭ সালেই, মানে ইরাকে একটি সার্বভৌম অখন্ড গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য ২০০৩ সালের মার্কিন যুদ্ধের বছর চারেকের মধ্যেই, সেনেটর জো বিডেন এবং লেসলি এইচ গেল্্ব সেনেটে ইরাকে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব আনেন যার ফলে ইরাকের উত্তরাঞ্চল থাকবে কুর্দদের দখলে, মধ্যাঞ্চল সুন্নি গোষ্ঠীদের এবং দক্ষিণাঞ্চল শিয়া গোষ্ঠীদের দখলে৷ মার্কিন সেনেট তা পাশও করেছিল৷ অর্থাত্ যা ঘটতে চলেছে বলে পশ্চিমি বিশেষজ্ঞরা এখন 'আশঙ্কা' করছেন, তার সঙ্গে মার্কিন রাজনৈতিক শ্রেণির পরিকল্পনার বেশ মিল দেখা যাচ্ছে৷ কাজেই একে মার্কিন লক্ষ্যের পরাজয় কি বলা যায়? একটি কেন্দ্র-শাসিত অখণ্ড গণতান্ত্রিক ইরাকের প্রতিষ্ঠা, এমনটাই যে মার্কিন লক্ষ্য, তা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না৷ আসলে ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই৷ থাকার কোনও কারণও নেই৷ এ অঞ্চলে গত একশো বছরে মার্কিন রাজনৈতিক লক্ষ্য বার বার বদলেছে৷
তা হলে ইরাকে মার্কিন লক্ষ্যটা ঠিক কী?
একুশ শতকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশের মানুষের স্বার্থে গণতন্ত্র রফতানি করার জন্য সব থেকে বড়ো যুদ্ধটির দিকে তাকানো যাক৷ এর মধ্যে বেশ একটা চ্যাপলিনেস্ক নির্মমতাও আছে৷ ২০০৩ সালে মার্কিন-ব্রিটেন অভিযানের মাধ্যমে ২০০৩ সালে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বকে বিপন্মুক্ত করার অভিযান ও তার আগের অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে ইরাক নামক ধ্বংসস্তূপটিকে গণতন্ত্রের পায়ে দাঁড় করাতে দরকার পরিকাঠামোর ব্যাপক পুনর্নিমাণ৷ ২০০৪-এর ৬ জানুয়ারি মার্কিন সরকারি ত্রাণ সংস্থা ইউএসএআইডি-র প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এ জন্য মার্কিন বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থা পেল ১৮০ কোটি ডলারের বরাত৷ 'কিড' কাচ ভাঙছে৷ 'ট্র্যাম্প' সারিয়ে রোজগার করছে৷ কিন্ত্ত এ সামান্যই৷ পরিকাঠামো গড়ে তোলার মত ছোটখাটো অর্থনৈতিক অঙ্কের যোগফলে ইরাকে মার্কিন স্বাথের্র বাঁও মিলবে না৷ এখানে একটা কথা চট করে বলে রাখা ভালো৷ আসলে এ সবই কর্পোরেট দুনিয়ার ছক্কা-পাঞ্জা, এর সঙ্গে সাধারণ আম মার্কিনির কোনও যোগাযোগ নেই - এ যুক্তি সম্পূর্ণ বকোয়াস৷ মার্কিন সরকারের হিসাব বলছে ইরাক যুদ্বের মূল রাজনৈতিক-প্রশাসনিক প্রবক্তা জর্জ বুশ ২০০০ সালে প্রথম বার প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী হয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাল গোরকে হারিয়ে ছিলেন কোনও ক্রমে লেংচে লেংচে৷
আসলে ভোটের হিসাবে তিনি গোর-এর থেকে ৫৪৩৮৯৫ কম ভোট পেয়ে ছিলেন৷ কিন্ত্ত ইলেক্টোরাল কলেজে গোর পান ২৬৬টি ভোট, আর বুশ ২৭১ টি ভোট৷ বুশ জিতেছিলেন ২৯টি প্রদেশে৷ কিন্ত্ত ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে জেতার পর ২০০৪ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে মার্কিন নাগরিকরা তাঁকে মাথায় তুলে নেচে ছিলেন৷ জিতলেন ৩১টি প্রদেশে৷ পেলেন ৫০.৭ শতাংশ ভোটারের ভোট৷ তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেস-এর দুটি 'হাউস'-এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল৷ এ কাণ্ড ১৯২৮ সালের পর আর মার্কিন মুলুকে ঘটেনি৷ ইরাক যুদ্ধের পর এমনই আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছিলেন আম মার্কিনিরা৷
(চলবে)
The effort to spread democracy is also dangerous...: it conveys to those who do not enjoy this form of government the illusion that it actually governs those who do. - এরিক হব্সবম
ইরাকে কী ঘটছে? এর কোনও সরল উত্তর নেই৷ কিন্ত্ত এই অঞ্চলের ঠিক একশো বছরের ইতিহাস নিয়ে খুঁচিয়ে প্রশ্ন করলে তার উত্তরে যে টুকরো টুকরো ছবি মিলবে সেগুলি জিগ্স পাজ্ল-এর মত মিলিয়ে নিলে বৃহত্তর ক্যানভাসে একটা ছবি ফুটে ওঠে৷ সে ছবির সঙ্গে পশ্চিমি শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকতার ধ্রুপদী সংজ্ঞার অদ্ভুত অস্বস্তিকর মিল৷ আর সেই ঔপনিবেশিক স্বার্থ ধারাবাহিক ভাবে বিশ্বের কাছে হাজির করা হয়েছে উন্নত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মোড়কে৷ কাজেই একটা সামগ্রিক ধারাভাষ্যের চেষ্টা না করে ছোট ছোট প্রশ্ন তুলে তার উত্তরগুলো খুঁজলে বিষয়টা কিছুটা প্রাঞ্জল হতে পারে৷
কী ঘটছে তা হলে?
'পশ্চিমি গণমাধ্যম' (এই শব্দবন্ধটি ঠিক ভৌগোলিক নয়) অনুযায়ী, গৃহযুদ্ধ৷ কেন এই গৃহযুদ্ধ? অল দওলা অল ইসলামিয়ে ফিল ইরাক ও অল শম (ইংরেজিতে - ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ত, আই এস আই এল) নামের আল-কায়দার একটি ছোট কিন্ত্ত বিপজ্জনক ভাবে সশস্ত্র জেহাদি সংগঠনের যোদ্ধারা সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে কিছু এলাকা এবং ইরাকের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিপুল এলাকা দখল করে নিয়ে পশ্চিমে এগোচ্ছেন৷ মোসুল, টিকরিট, রামাদি, ফালুদার মত গুরুত্বপূর্ণ শহর তাঁদের দখলে৷
কেন হঠাত্ এমনটা হল?
খুব সংক্ষেপে - ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বে, প্রধানত ব্রিটেন এবং আরও বেশ কিছু দেশ ইরাকের একনায়ক 'খুনি' সাদ্দাম হুসেনকে যুদ্ধে হারিয়ে, বাথ পার্টির স্বৈরতান্ত্রিক শাসন শেষ করে সে দেশে 'গণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠা করে৷ ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রশাসন ও সেনার তত্ত্বাবধানে 'গণতান্ত্রিক নির্বাচন' হয়৷ সে নির্বাচনে সব থেকে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে ইউনাইটেড ইরাকি অ্যালায়েন্স৷ প্রধানমন্ত্রী হন ইব্রাহিম অল-জাফরি৷ মাস চারেকের মধ্যেই সংখ্যালঘু সুন্নি গোষ্ঠী ও কুর্দদের বিদ্রোহে তাঁকে সরিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সক্রিয় সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হলেন নুরি অল-মালিকি৷ আজও তিনি এই পদেই বহাল৷ তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ২০০৬-এর ডিসেম্বরে সাদ্দাম হুসেনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশে সই করা৷ কিন্ত্ত ক্রমাগত তিনি একটি 'জাতীয় সরকার' গঠনের মার্কিন উপদেশ অগ্রাহ্য করে পরিকল্পিত ভাবে সুন্নিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে থাকেন৷ এর ফলে সুন্নিদের মধ্যে ক্রোধ জমে উঠতে থাকে৷ ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন সেনা অপসারিত হয়৷ এর পরেই মাথা তুলতে শুরু করে সুন্নি উগ্রপন্থী আই এস আই এল৷ বিগত কয়েক মাসে অল-মালিকি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র অভিযান চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে৷ তাদের লক্ষ্য বাগদাদ সহ গোটা ইরাক দখল করে একটি বৃহত্তর ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন৷ আই এস আই এল-এর প্রধান আবু বকর অল-বাগদাদি এর মধ্যেই দখল করা এলাকাগুলি নিয়ে একটি নতুন 'খিলাফত' গঠন করার কথা ঘোষণা করেছেন৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাতিল করে শ'তিনেক সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে দিয়েছে৷ আর ইরাকের আকাশে উড়িয়েছে মিসাইল-সজ্জিত কিছু ড্রোন বা ছোট স্বয়ংক্রিয় বিমান৷ এই হল মোটামুটি 'পশ্চিমি গণমাধ্যমের' ইরাকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর নির্মাণ৷ এই নির্মাণের মূল কথা - পশ্চিমি দেশগুলি (পড়ুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন) ইরাকে উদার গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক চেষ্টা করেছে৷ ইরাকের মানুষ তার মূল্য না বুঝে প্রাচীন ধর্মীয় ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্বেই লিপ্ত থেকেছে৷
তা হলে এ বার কী হবে?
পশ্চিমি বিশেষজ্ঞরা জনসমক্ষে যা বলছেন (তাঁরা যে জনসমক্ষে এক কথা বলেন আর প্রশাসন ও কর্পোরেট দুনিয়ার উচ্চতম পর্যায়ের কানে কানে অন্য কথা বলে আসেন - এর অজস্র প্রমাণ আছে) তা ঠিক হলে ইরাকের অখণ্ডতা আর বজায় রাখা অসম্ভব৷ ব্রুকিংস্ ইনস্টিটিউট-এর এফ গ্রেগরি গাউস-এর মতে আই এস আই এল গোটা ইরাক দখল করার যুদ্ধে জিতবে না৷ এত সামরিক ক্ষমতা তাদের নেই৷ হয়তো সরকারি ভাবে কিছু দিন ইরাকের মানচিত্রও বদলাবে না৷ কিন্ত্ত আই এস আই এল ও অন্যান্য সুন্নি জঙ্গিরা এক দিকে এবং কুর্দরা নিজ নিজ এলাকায় প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে৷ তাঁর কথায়, 'ইরাকের রাজনৈতিক শ্রেণি সে দেশের আশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে'৷ সম্ভাব্য পরিণতি মার্কিন লক্ষ্যের পরাজয়?
মোটেই না৷ আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্তত বছর সাতেক আগেই বুঝে ফেলেছিল বাগদাদ থেকে রাজনৈতিক ভাবে সারা ইরাক শাসন করা অসম্ভব৷ ২০০৭ সালেই, মানে ইরাকে একটি সার্বভৌম অখন্ড গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য ২০০৩ সালের মার্কিন যুদ্ধের বছর চারেকের মধ্যেই, সেনেটর জো বিডেন এবং লেসলি এইচ গেল্্ব সেনেটে ইরাকে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব আনেন যার ফলে ইরাকের উত্তরাঞ্চল থাকবে কুর্দদের দখলে, মধ্যাঞ্চল সুন্নি গোষ্ঠীদের এবং দক্ষিণাঞ্চল শিয়া গোষ্ঠীদের দখলে৷ মার্কিন সেনেট তা পাশও করেছিল৷ অর্থাত্ যা ঘটতে চলেছে বলে পশ্চিমি বিশেষজ্ঞরা এখন 'আশঙ্কা' করছেন, তার সঙ্গে মার্কিন রাজনৈতিক শ্রেণির পরিকল্পনার বেশ মিল দেখা যাচ্ছে৷ কাজেই একে মার্কিন লক্ষ্যের পরাজয় কি বলা যায়? একটি কেন্দ্র-শাসিত অখণ্ড গণতান্ত্রিক ইরাকের প্রতিষ্ঠা, এমনটাই যে মার্কিন লক্ষ্য, তা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না৷ আসলে ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই৷ থাকার কোনও কারণও নেই৷ এ অঞ্চলে গত একশো বছরে মার্কিন রাজনৈতিক লক্ষ্য বার বার বদলেছে৷
তা হলে ইরাকে মার্কিন লক্ষ্যটা ঠিক কী?
একুশ শতকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশের মানুষের স্বার্থে গণতন্ত্র রফতানি করার জন্য সব থেকে বড়ো যুদ্ধটির দিকে তাকানো যাক৷ এর মধ্যে বেশ একটা চ্যাপলিনেস্ক নির্মমতাও আছে৷ ২০০৩ সালে মার্কিন-ব্রিটেন অভিযানের মাধ্যমে ২০০৩ সালে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বকে বিপন্মুক্ত করার অভিযান ও তার আগের অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে ইরাক নামক ধ্বংসস্তূপটিকে গণতন্ত্রের পায়ে দাঁড় করাতে দরকার পরিকাঠামোর ব্যাপক পুনর্নিমাণ৷ ২০০৪-এর ৬ জানুয়ারি মার্কিন সরকারি ত্রাণ সংস্থা ইউএসএআইডি-র প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এ জন্য মার্কিন বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থা পেল ১৮০ কোটি ডলারের বরাত৷ 'কিড' কাচ ভাঙছে৷ 'ট্র্যাম্প' সারিয়ে রোজগার করছে৷ কিন্ত্ত এ সামান্যই৷ পরিকাঠামো গড়ে তোলার মত ছোটখাটো অর্থনৈতিক অঙ্কের যোগফলে ইরাকে মার্কিন স্বাথের্র বাঁও মিলবে না৷ এখানে একটা কথা চট করে বলে রাখা ভালো৷ আসলে এ সবই কর্পোরেট দুনিয়ার ছক্কা-পাঞ্জা, এর সঙ্গে সাধারণ আম মার্কিনির কোনও যোগাযোগ নেই - এ যুক্তি সম্পূর্ণ বকোয়াস৷ মার্কিন সরকারের হিসাব বলছে ইরাক যুদ্বের মূল রাজনৈতিক-প্রশাসনিক প্রবক্তা জর্জ বুশ ২০০০ সালে প্রথম বার প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী হয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাল গোরকে হারিয়ে ছিলেন কোনও ক্রমে লেংচে লেংচে৷
আসলে ভোটের হিসাবে তিনি গোর-এর থেকে ৫৪৩৮৯৫ কম ভোট পেয়ে ছিলেন৷ কিন্ত্ত ইলেক্টোরাল কলেজে গোর পান ২৬৬টি ভোট, আর বুশ ২৭১ টি ভোট৷ বুশ জিতেছিলেন ২৯টি প্রদেশে৷ কিন্ত্ত ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে জেতার পর ২০০৪ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে মার্কিন নাগরিকরা তাঁকে মাথায় তুলে নেচে ছিলেন৷ জিতলেন ৩১টি প্রদেশে৷ পেলেন ৫০.৭ শতাংশ ভোটারের ভোট৷ তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেস-এর দুটি 'হাউস'-এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল৷ এ কাণ্ড ১৯২৮ সালের পর আর মার্কিন মুলুকে ঘটেনি৷ ইরাক যুদ্ধের পর এমনই আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছিলেন আম মার্কিনিরা৷
(চলবে)
http://eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/iraq-and-western-democracy-is-a-distant-dream/articleshow/37624379.cms
No comments:
Post a Comment