Thursday, July 3, 2014

ইরাকের দুর্ভাগ্যের শেষ কবে?

ইরাকের দুর্ভাগ্যের শেষ কবে?

IRAQ2_REUTERS
মামেলুক পাশাদের রাজত্ব থেকে ব্রিটিশ ম্যানডেট, অতঃপর সাদ্দাম হুসেন এবং সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধ- সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে৷ লিখছেননিখিলেশ রায়চৌধুরী

আইএসআইএল যে শুধু একটা সন্ত্রাসবাদী অশনি সংকেত, ঠিক যেমনটা কিছু দিন আগে পর্যন্তও আল-কায়দা'র একচেটিয়া ছিল- তা কিন্ত্ত নয়৷ এই শক্তি ইরাক তো বটেই, সেই সঙ্গে গোটা পশ্চিম এশিয়া জুড়েই ক্ষমতার সমীকরণে একটা তালগোল পাকিয়ে দিয়েছে৷ এমনকী, তার ঝাপটা ভারতের উপরেও এসে পড়েছে৷ শুধুমাত্র অপহূত ভারতীয় নির্মাণকর্মী কিংবা আটকে-পড়া নার্সদের ভবিষ্যত্‍‌ ‍-চিন্তা নয়, ভারতের এখন মূল ভাবনা হল- সে কার পক্ষ নেবে?

আপাতদৃষ্টিতে আইএসআইএল-এর সঙ্গে ইরাকি সেনাবাহিনীর লড়াই চললেও, বাস্তবিক ইরাকে কিন্ত্ত একাধিক ফ্রন্টের সৃষ্টি হয়েছে৷ আপাতত যুদ্ধ চলছে সুন্নিপন্থী কট্টর জেহাদিদের বিরুদ্ধে৷ কিন্ত্ত সেই যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই ইরাকের দক্ষিণে এবং পূর্বাঞ্চলে গড়ে উঠেছে শিয়াপন্থী গণপ্রতিরোধ বাহিনী৷ ঠিক একই ভাবে উত্তরে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে পৃথক কুর্দ বাহিনী৷ এক-এক পক্ষকে বাইরে থেকে মদত জোগাচ্ছে এক-এক শক্তি৷ শিয়াপন্থী মিলিসিয়াকে খোলাখুলিই মদত জোগাচ্ছে ইরান৷ পক্ষান্তরে কুর্দদের পিছনে আছে ন্যাটোভুক্ত তুরস্ক এবং সেই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ আবার আইএসআইএল-কে তোয়াজ করছে পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল ভিন্ন আমেরিকার সব চাইতে বিশ্বস্ত মিত্র সৌদি আরব৷ যা মিলিয়ে ইরাক যেন সেই অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর মোসুল, বাগদাদ আর বসরা-র তিনটি খণ্ডরাজ্যের সমাহারে ফিরে যাওয়ার রাস্তায় চলেছে৷

ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে মোসুল, বাগদাদ এবং বসরা এই তিনটি শহরকে কেন্দ্র করে যে তিনটি তল্লাট প্রদেশ হিসাবে তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, আধুনিক ইরাকের জন্ম তাদের নিয়েই৷ 'আল-ইরাক'-এর মানে হল একটি মহানদীর দুই কূল এবং তার লাগোয়া চারণভূমি৷ অন্তত খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দী থেকে এই নামেই টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের পলিতে উর্বর বিস্তীর্ণ সমভূমিকে আরব ভৌগোলিকেরা চিহ্নিত করে করে এসেছেন৷ পরবর্তীকালে ইউরোপের কাছে সেই অঞ্চল মেসোপটেমিয়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে৷ মোসুল, বাগদাদ এবং বসরা- এই তিন রাজ্য কার তাঁবে থাকবে, তা নিয়ে পারস্যের (এখনকার ইরান) শিয়াপন্থী সাফাভিদ শাহ্দের সঙ্গে সুন্নিপন্থী অটোমান তুর্কদের দুই শতক-ব্যাপী সংঘাত চলেছিল৷ শেষ পর্যন্ত তাতে অটোমান সুলতানদেরই জিত হয়৷

যদিও সাম্রাজ্যের এত দূরবর্তী অঞ্চলকে তাঁরা কখনই সে ভাবে সরাসরি কবজায় রাখতে পারেননি৷ প্রাদেশিক শাসনকর্তা বা মামেলুক পাশারাই ছিলেন এই তিন রাজ্যের আসল কর্তা৷ যে যার এলাকার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে শাসনকার্য চালাতেন৷ মিলিটারি এলিটদেরই বলা হত মামেলুক৷ এখন ইরাকের যা পরিস্থিতি, তাতে সেখানে দিকে দিকে এমন সব 'মামেলুক'দেরই না আবার অভ্যুদয় ঘটে৷

তবে ইরাকের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সব থেকে চমকপ্রদ পদক্ষেপটি দেখা গিয়েছে ইরানের তরফ থেকে৷ তারা ইরাক সংকট মোকাবিলার জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব পাঠিয়েছে৷ ১৯৭৯ সালে রেজা শাহ পহলভির উত্‍খাতের পর যে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আর কোনও দিনই মধুর হয়নি, সেই ইরান নিজে থেকে ইরাক সংকট মোকাবিলার জন্য আমেরিকার কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে, এটা ভাবা যায় না৷ হতে পারে, এ ভাবে তেহরান তাদের পরমাণু গবেষণার উপর থেকে চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করতে চাইছে৷ কিন্ত্ত ইরাক নিয়ে ইরানের দুর্বলতার একটা ঐতিহাসিক জায়গাও রয়েছে৷ বাগদাদের অদূরেই শিয়াদের চার-চারটি পবিত্র তীর্থস্থান৷ নাজাফ, কারবালা, আল-কাজিমিয়া এবং সামারা৷ চারটি স্থানকে একত্রে 'আতাবাদ' বা 'দেউড়ি' বলে উল্লেখ করা হয়৷ খলিফা আলি বিন আবি তালিব ও তাঁর উত্তরসূরিদের সঙ্গে এই চার তীর্থস্থানের মহিমা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত৷ এখনও হাজার হাজার শিয়া মতাবলম্বী মুসলিম এই চারটি স্থান পরিক্রমা করার জন্য সারা বিশ্ব থেকে সেখানে হাজির হন৷ ভারতেরও বহু শিয়াপন্থী মুসলিম নাজাফে গিয়ে আটকে পড়েছেন বলে খবরে জানা গিয়েছে৷ তখন সেই 'আতাবাদ' এবং সেই সঙ্গে ইরানের বিশাল সংখ্যক শিয়াপন্থী মুসলিমের ভবিষ্যতকে কোনও ভাবেই আল-কায়দার থেকে সাংঘাতিক এই কট্টরবাদী জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএল-এর কবলে ঠেলে দিতে রাজি নয় তেহরান৷ আর ঠিক সেই কারণেই তারা সরাসরি ওয়াশিংটনের কাছে যৌথ অভিযানের বার্তা পাঠাতে দেরি করেনি৷

কিন্তু ওবামা প্রশাসনের পক্ষে কি সরাসরি এই প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া সম্ভব? সৌদি আরবকে চটিয়ে? রিয়াধ এর মধ্যেই তেহরানকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা যেন ইরানের ঘটনার গতিপ্রকৃতির মধ্যে নাক না গলায়৷ এই অবস্থায় ব্রিটেন ফের তেহরানে তার দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও, আমেরিকার পক্ষে ইরানের বাড়ানো হাতে হাত মেলানো মুশকিল৷ অতএব? অতএব, ইরাককে কেন্দ্র করে আবার হয়তো আসরে নামতে দেখা যাবে ১৯৫০-এর দশকের 'সুপারস্পাই' কারমিট রুজভেল্ট বা 'কিম'-এর মতো চরিত্রদের৷ এর মধ্যেই যে ধরনের তত্‍পরতা শুরু হয়ে গিয়েছে কি না, তাই বা কে জানে!

http://eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/when-will-iraq-see-better-days/articleshow/37624590.cms

No comments:

Post a Comment