বিদায় কবি আবুল হোসেন
ইকবাল আজিজ
পৃথিবী থেকে একদিন সবাইকে বিদায় নিতেই হবে। জীবনের এ এক অনিবার্য পরিণতি। কবি আবুল হোসেন দীর্ঘকাল বার্ধক্যজনিত কারণে ক্লান্ত ও স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন; শেষদিকে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হয়েছিল চোখে ভালো দেখতেন না, কানেও তেমন শুনতেন না। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের সৃজনশীল চিন্তা ক্ষমতাও অনেকখানি লোপ পেয়েছিল গত প্রায় এক বছর থেকে। তবু এক ধরনের ভারসাম্য ছিল, এক ধরনের সচেতনতা ছিল : নিজের অসহায়তার অবস্থাটা বুঝতে পারতেন। এই অসহায়তার উপলব্ধি নিয়েই ২৯ জুন রাতের বেলা তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। পরদিন পত্রিকায় এ শোকসংবাদটি দেখে বাংলাদেশের সমকালীন কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীরা গভীরভাবে অনুভব করলেন, একজন সত্যিকার শুদ্ধ কবির মহাপ্রয়াণের বাস্তবতাকে। জন্মালে যেতেই হবে একদিন : আমাদের কাব্যাঙ্গনের অভিভাবক ও বটবৃক্ষ চলে গেলেন ৯২ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে। পরিণত বয়সে তাঁর এ প্রয়াণ কারও কাছেই অপ্রত্যাশিত ও অনাক্সিক্ষত নয়। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় আগে শেষবার যখন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল যেন খুব অস্থির হয়ে উঠেছেন। বলেছিলেন, ‘ইকবাল, একে কি আর বেঁচে থাকা বলে? কোন কিছু দেখতে পাই না, শুনতে পাই না। এ জীবন রীতিমতো অসহ্য বলে মনে হয়। সম্প্রতি সহসাই তাঁর এ অস্থিরতার অবসান হয়েছে। কবি আবুল হোসেন প্রচলিত অর্থে ধর্মীয় আচরণবিধি মানতেন না; তবে বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রক একটি কল্যাণকর শক্তিতে, আত্মার অস্তিত্ব ও পরকালে। তবে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘এসব যে আসলে কিভাবে আছে তা জানি না। কারণ আমি কিছুই দেখিনি। সবই অমার একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস।’ তাঁর এসব কথাবার্তার মধ্য দিয়ে একজন আধুনিক, মানবতাবাদী ও কল্যাণকামী মানুষকেই আবিষ্কার করেছি বারবার। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন সুশিক্ষিত, পরিশীলিত, মিতভাষী, ভদ্র ও যুক্তিবাদী মানুষ। আমার ধারণা, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তিবাদী আধুনিক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এক ধরনের সার্বজনীন ঈশ্বরের বিশ্বাস তাঁর কল্যাণকামী কাব্যিক বোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। এসব মিলে তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ রাবীন্দ্রিক মানুষ, রবীন্দ্রনাথের ভাবচেতনা তাঁর চেতনাকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, আবার চল্লিশের দশকের একজন বাঙালী মুসলমান কবি হিসাবে সেই সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘাত প্রতিঘাতও কবির চেতনার বিকাশে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছিল। মৃত্যুর পরে আমরা সেই মানুষটির সমগ্র জীবনের দিকে তাকানোর অবকাশ পাই। কবিতার পাশাপাশি কবি আবুল হোসেন আত্মজীবনীও লিখেছেন চারখণ্ডে। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতা ও ফেলে আসা দীর্ঘজীবনের নানা রঙের সুখ-দুঃখকে গভীরভাবে অনুভব করা যায়। এ যেন আবার ফিরে দেখা এক চিন্তাশীল কবি ও তাঁর সময়কে।
॥ ২ ॥
কবি আবুল হোসেনের জন্ম হয়েছিল ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ-ভারতের অবিভক্ত বাংলায় এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। তাঁর শৈশব ও তারুণ্য এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে কেটেছে, যখন বাঙালী মুসলমানদের বড়ই দুর্দশা। শিক্ষা সংস্কৃতি চাকরি ব্যবসা বাণিজ্য রাজনীতি প্রভৃতি সবদিক দিয়ে তারা প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। পিছিয়ে থাকার কারণেই তাদের মনের ভেতর জন্ম নিয়েছিল গভীর হীনম্মন্যতা ও দুঃখবোধ। কবি আবুল হোসেন তাঁর শৈশব থেকেই একটি সমাজের বিকাশ ও বিবর্তনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। শৈশবে কৃষ্ণনগরে থাকার সময় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দূর থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। একজন অগ্রজ বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন কবির কথা। কিন্তু তখন কবি আবুল জানতেন না ‘কবি’ বলতে কী বোঝায়। পরে অবশ্য স্কুলের পাঠ্যবইয়ে নজরুলের একটি বিখ্যাত ছড়া পড়ে তিনি মুগ্ধ হন। সেই ছড়াটি হলো, ‘ভোর হলো, দোর খোলো/ খুকুমণি ওঠ রে।’ কৈশোরে কৃষ্ণনগর থেকে কুষ্টিয়ায় এসে তাঁর মধ্যে সাহিত্যপ্রেম গড়ে ওঠে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য কুষ্টিয়া শহর বহু আগে থেকেই বিখ্যাত ছিল। এখানে ছেঁউড়িয়ায় বাউল কবি লালন শাহর মাজার, সেখানে বাউলদের আনাগোনা সর্বদা। কয়েক মাইল দূরে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ। আবুল হোসেন এসব জায়গায় ঘুরতেন; ঘুরে বেড়াতে ভালবাসতেন গড়াই নদীর ধার দিয়ে। তখন বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারার লেখক অন্নদা শঙ্কর রায় কুষ্টিয়ার এসডিও। তাঁর আগমনে কৃষ্টিয়ায় সংস্কৃতিচর্চার জোয়ার এসেছিল। কুষ্টিয়া হাইস্কুলে পড়ার সময় কবি আবুল হোসেনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় পরবর্তীকালের বিপ্লবী কবি গোলাম কুদ্দুসের। দু‘জনে প্রায়ই একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন, সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতেন। সেই সময় কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দীপিকা ও জাগরণ প্রভৃতি সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাঁর ও গোলাম কুদ্দুসের প্রথম লেখাগুলো ছাপা হয়েছিল। কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির টেনিস কোর্টে টেনিস খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন আবুল হোসেন। এখানে টেনিস খেলতে আসতেন কুষ্টিয়ার এসডিও অন্নদা শঙ্কর রায়। কুষ্টিয়া হাইস্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করে আবুল হোসেন ভর্তি হন কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। কলকাতায় এসে তাঁর সঙ্গে সেই সময়ের বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে। এ সময় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে দু’বার আসার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল তাঁর। দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল দার্জিলিংয়ের কাছে গৌরিপুর লজে। মহানগরীর সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাঁর মনে এক পরিশীলিত সাহিত্যবোধের জন্ম নিয়েছিল। এখানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আবু সয়ীদ আইয়ুব, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সখ্য গড়ে উঠেছিল। সমকালীন সাহিত্যসঙ্গী হিসাবে পেয়েছিলেন আহসান হাবীব, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, ফররুখ আহমদসহ অনেককে। সারাজীবন ধরেই এঁদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ১৯৪০ সালে সাহিত্যিক ও সম্পাদক হাবীবুল্লাহ বাহারের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল কবি আবুল হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নববসন্ত।’ এ সময় সারাদেশেই মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তাঁর বন্ধুরা বেশিরভাগ ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। কিন্তু তিনি এ রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট হতাশায় ভুগছিলেন। সেই দ্বন্দ্ব ও হতাশার দিনগুলো নিয়ে লিখেছিলেন কবিতা ‘শেষযুক্তি’-
‘আশা নাই, ভাষা নাই
প্রতিবাদ করবার।
বহ্নি বিদ্রোহীর।
আছে শুধু দাহ।
এবার হয়েছি নিঃসংশয়
মৃত্যুই মৃত্যুকে করে ক্ষয়।’
তবু দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আসেন তিনি ও তাঁর সাহিত্যিক বন্ধুরা। শুরু হয় নতুন দেশে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নতুন অভিযাত্রা। কলকাতার তুলনায় আধুনিক জীবনযাপনের কোন উপকরণই তখন ছিল না এ শহরে; চারদিকে অশিক্ষা, অসংস্কৃতি, অব্যবস্থা ও বিশৃঙ্খলা। এ সময় মনে প্রাণে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একদল সাহিত্যিকের, আবির্ভাব ঘটেছিল ঢাকায়। কিন্তু ‘নববসন্তের’ কবি আবুল হোসেন শুরু থেকেই ছিলেন আধুনিকতার ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে।
॥ ৩ ॥
চল্লিশের দশকের প্রতিভাবান কবি ফররুখ আহমদ ও তাঁর অনুসারীরা ইসলামের ধর্মীয় চেতনা, আবেগ ও গৌরবগাথাকে কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন; তখন আবুল হোসেন পথ চলেছেন আধুনিক জীবনবোধ ও চিত্রকল্প সঙ্গে নিয়ে। সেই বোদলেয়ারের যুগ থেকে নগরজীবন আধুনিক বোধের প্রধান ভিত্তি। টিএস এলিয়ট নগরজীবনের অসহায়তা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে তাঁর কবিতায় নানা ধরনের প্রতীক ও চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। এখানে জীবন অন্য কোনো মানবিক বোধের মাধ্যমে নয়; বরং কফির চামচ দিয়ে পরিমাপ করা হয়। কবি আবুল হোসেন প্রথম থেকে নগরযন্ত্রণার সেই আধুনিক বোধকে উপলব্ধি করেছেন। এদিক দিয়ে তিনি জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু কিংবা সমর সেনের সার্থক অনুসারী। তবে তাঁর কবিতা চল্লিশের সাম্যবাদী চেতনায় বিশ্বাসী কবিদের মতো শ্রেণীচেতনা বা বিপ্লব দ্বারা প্রভাবিত নয়। আবুল হোসেনের সহযাত্রী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যয় কিংবা গোলাম কুদ্দুস যখন কবিতায় জনমুক্তি ও বামপন্থী আদর্শের জয়গান গেয়েছেন; সেখানে আবুল হোসেন আধুনিক নগরজীবনকে তাঁর কবিতার উপজীব্য করেছেন।। দ্বন্দ্ব, নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা আধুনিক নগরজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। হয়ত নগরীর মধ্যবিত্তের মধ্যে তা আরও বেশি পুষ্ট :
‘মাঝে মাঝে মনে হয়
একটু একটু করে এই প্রাণ ক্ষয়
না করলেই নয়।
দিনে দিনে তিলে তিলে মরে মরে এই বেঁচে থাকা
এর মানে কী? ’ (মধ্যবিত্ত)
নগরজীবনে নিজেদের বেঁচে থাকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্ন আধুনিক বোধ থেকে উৎসারিত। কারণ সংশয় ও দ্বন্দ্বে জর্জরিত আধুনিক মানুষ সর্বদা নিজেকে প্রশ্ন করে। আবুল হোসেন কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন।-
‘আমরা কি বেঁচে আছি? এই কি জীবন?
বন্ধ ঘরে কানামাছি এ জীবন নিরুপায় খেলা।
নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর।’
পরবর্তীকালে নগরজীবনের এই ক্ষতবিক্ষত বোধ শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরীসহ অন্য আরও কিছু কবির কবিতায় সুস্পষ্ট। অনেক সময় মনে হয় আবুল হোসেন বাংলাদেশের কবিতায় নগরযন্ত্রণার বোধের দিক দিয়ে অনেকের পূর্বসূরী। এছাড়া কবিতায় অনাকাক্সিক্ষত আবেগ ও অতিকথনকে তিনি প্রথম থেকেই পরিহার করেছেন। তিনি কবিতায় প্রতিটি শব্দ ব্যবহার করেন অনেক ভেবেচিন্তে। বাংলাদেশের সকমালীন তরুণ কবিদের জন্যে তাঁর এ পরিমিতিবোধ অবশ্যই অনুসরণযোগ্য। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর এখানে ধীরে ধীরে নগরজীবনের বিকাশ শুরু হয়। আজিমপুর কলোনির মতো ফ্ল্যাটবাড়ি গড়ে উঠতে থাকে। ঢাকার সরল মন্থর নগরজীবনে এ ছিল একটি ব্যতিক্রমী জটিল অভিজ্ঞতা। আধুনিক উপমা প্রতীক চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে এই বোধ একটি কবিতার খুবই সাবলীলভাবে প্রস্ফুটিত :
‘ধারালো ছুরির নদী ফ্ল্যাটের আকাশ।
দিনের কারখানায় কাটা ভাঙ্গা দিন-
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছাদে গাছে ঘাসে।’
(ফাল্গুুন ওগো ফাল্গুুন)
মনে হয় বহু আগে রচিত এই কবিতাটির অন্তর্নিহিত বোধ সমকালীন ঢাকার নগরজীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হয়ত আবুল হোসেন, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ কবির কবিতা এখনকার তরুণ কবিরা তেমন পড়েন না। হয়ত তাঁদের কিছু কবিতার বই এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। কিন্তু অতীতের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান ও ভবিষ্যত দাঁড়িয়ে। বর্তমানের সঠিক মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার উচিত অতীতের মুখোমুখি হওয়া। প্রবীণ কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম গভীর আগ্রহ নিয়ে পাঠ করা। আশা করি, সমকালীন তরুণদের মধ্যে একদিন নিষ্ঠাবান সাহিত্যসাধক ও গবেষকদের আবির্ভাব হবে। তাঁরা ফেলে আসা সময়ের সাহিত্যকর্ম গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়বেন। তখন হয়ত কবি আবুল হোসেনের কবিতা, আত্মজীবনী ও অন্যান্য গদ্য পাঠ করে তাদের চিন্তা ও চেতনায় ব্যতিক্রমী বোধের সঞ্চার হবে।
॥ ৪ ॥
আজ থেকে প্রায় সত্তর বছরের বেশি সময় আগে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত আবুল হোসেনের একটি কবিতা পড়ে বিস্মিত হয়েছি। বাংলা সাহিত্যে এমন প্রাণবন্ত প্রেমের কবিতা বাস্তবিকই দুর্লভ। যথাযথ শব্দ ব্যবহার ও স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ এই কবিতাকে একটি আশ্চর্য সাফল্য এনে দিয়েছে। ভাল কবিতা চেনার ক্ষেত্রে সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু যে অবিস্মরণীয় তার প্রমাণ আবার পেলাম। সেই সঙ্গে আমার মনে হয়েছে, এমন সর্বাঙ্গীণ সুন্দর কবিতা আমরা ক’জন লিখতে পারব? তবে সত্যিকার ভাল কবিতা সবসময়ই দুর্লভ। মহৎ কবিতার একটি বড় লক্ষণ হলো, তা সব সময় মনে হবে সদ্যলেখা বা তরতাজা। অবশ্য এ কথাটিও বুদ্ধদেব বসুর; সম্ভবত তিনি ইঙ্গমার্কিন কোন কবি-প্রবন্ধকারের লেখা থেকে তা অবলীলায় ধার করেছেন। যাহোক, এবার বহু বছর আগের সেই কবিতাটি পাঠ করছি:
‘তোমাকে চাই তোমাকে চাই ওগো দুর্লভা বল্লভা আমার
রূপ নয় সাজ নয়, সায়াহ্নের অন্ধকারে অস্পষ্ট আধো আধো
পরিচয় স্বপ্নের মতো, রহস্যনিবিড় বসন্তের লাবণ্যবিলাসে
তৃপ্ত দেহ আকাশে মেলে পাখা, সে প্রণয় আমার তো নয়।’
(মেহেদীর জন্য কবিতা)
এ কবিতাটি লেখার পর বহুদিন চলে গেছে। মৃত্যুর মাত্র চার বছর আগে প্রকাশিত কবির একটি বই পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম। এ বইয়ের কবিতাগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, তা বাইশ বছর বয়সের এক ডিজিটাল স্মার্ট অভিমানী তরুণের লেখা। বইটির নাম ‘যাবার আগে।’ প্রথম কবিতাটিই বৃষ্টি নিয়ে :
‘এসো বৃষ্টি, এসে ঝম ঝম করে আকাশ বাতাস
ভেঙে নামো শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জে, মাঠে ঘাটে
অলিগলি, সদর সড়কে। অসহ্য গরম আর
গুমোটে মানুষ মর মর, ঝিমোয় পশু পাখি;
গাছপালা, বাড়িঘর সারাদিন সেদ্ধ হয় রোদে।’
এমন সরল, স্মার্ট, অথচ এমন সুন্দর কবিতা আমি বহুকাল পড়িনি। শহীদ কাদরীর বিখ্যাত ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ নামের কবিতায় যথেষ্ট অতিকথন আছে; কিন্তু এই কবিতায় একটি শব্দও অতিরিক্ত নয়। শব্দ ব্যবহারের এমন মুনশিয়ানা বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় কবির মধ্যেই নেই। আমার ধারণা, নিদেনপক্ষে এদিক দিয়ে তিনি এজরা পাউন্ড ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সমতুল্য। আমার এ কথাটি কারও কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে; কিন্তু আমি আমার অন্তরের বিশ্বাস থেকে এ কথাটি উচ্চারণ করছি। ‘যাবার আগে’ এই বইটিতে মৌলিক কবিতার সঙ্গে কিছু বিখ্যাত বিদেশী কবির কবিতার তরজমা রয়েছে। এসব কবিতা পড়ে আমার এক বারও মনে হয়নি এগুলো অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করা। মনে হয়েছে একটি মহৎ কবিতা থেকে যেন অন্য একটি মহৎ কবিতার জন্ম হয়েছে। রবার্ট ফ্রস্টের চার লাইনের যে কবিতাটির অনুবাদ করেছেন আবুল হোসেন, সেটাকে আমি অবশ্যই একটি মহৎ সুন্দর মৌলিক কবিতার মর্যাদা দেব:
‘তোমাকে নিয়ে যে ছোটখাটো তামাশা করেছি
ক্ষমা করো হে বিধাতা;
আমাকে নিয়ে তোমার যে বিরাট ঠাট্টা
ক্ষমা করে দেব আমিও তা।’
(তুমি ও আমি)
কবি আবুল হোসেন পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয়ার পর খুব বেশি সময় যায়নি; কিন্তু ইতোমধ্যে এই মহৎ কবি ও মানুষের মূল্যায়ন শুরু হয়ে গেছে। হারমান হেইস বলেছিলেন, মৃত্যু মানেই শেষ নয়, মৃত্যু জীবনের অন্য এক রূপান্তর। আমার ধারণা, সারাজীবনের অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ শেষে এই কবির অভিযাত্রা এক পার্থিব জগতের দিকে। তবে সে জগৎ বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের নয়; তা সকল মানুষের। কবি আবুল হোসেন ছিলেন সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে এক কল্যাণকামী মানুষ। এ বিস্ময়ের জগৎ ছেড়ে তিনি চলে গেছেন অন্য এক মহাবিস্ময়ের দিকেÑ যা আমরা জানি না, যা আমরা বুঝি না।
॥ ৫ ॥
এই মহৎ কবির মহাপ্রয়াণের পর আমার ভাবতে ভাল লাগছে, গত তিরিশ বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আমি তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলাম। তিনি যেমন যুক্তিবাদী, শিক্ষিত ও ভাল মানুষ ছিলেন; তেমনই আমি তাঁর মতো সুখী ও ভাগ্যবান মানুষ খুব কম দেখেছি। যা পাননি তা নিয়ে কখনও হাহুতাশ করেননি বরং এ সুদীর্ঘজীবনে যা পেয়েছেন তা নিয়ে গভীর সুখ ও তৃপ্তিবোধ করেছেন। যতবারই তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় বসেছি, তিনি কথা প্রসঙ্গে অনেকবার বলেছেন, তাঁর সমগ্র জীবন বড় আনন্দে কেটেছে। বলতেন, ‘বড় আনন্দে আমি জীবনটা কাটিয়েছি’। এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের সুখের কথা বলতে খুব কম লোককেই দেখেছি। এদিক দিয়ে তাঁর মতো একমাত্র দেখেছি পরলোকগত স্পীকার হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীকে। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁর সাতাশ নম্বর রোডের বাড়িতে তিনি আমাকে একবার উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এত কিছু পেয়েছি, জীবনে এত সুখ, শান্তি ও সম্মান পেয়েছি যে, আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’ তারপর একমাত্র আবুল হোসেনের মধ্যে দেখেছি, পরিপূর্ণ সুখী জীবনের স্বীকারোক্তি। আসলে ভাগ্যবানও বটে। ধানমণ্ডি আবাহনী মাঠের পাশে ‘সাহানা’ নামের বাড়িতে যতবার গিয়েছি, ততবার দেখেছি পুত্র-কন্যা ও পুত্রবধূরা সর্বদা তাঁর সুখ ও শান্তি নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত। এমন ভাল ও দায়িত্বশীল পুত্র-কন্যা ও পুত্রবধূ পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যায়। সব দিক দিয়ে কবি আবুল হোসেন ছিলেন একজন পরিপূর্ণ সুখী মানুষ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। আমি কখনোই তাঁকে দুর্নীতি করতে বা অসাধু পন্থা অবলম্বন করতে দেখিনি। বলতেন, ‘সব সময় নিজের কাজ করে যাবে। কিন্তু কখনও অন্যায় করবে না। কেউ শত্রুতা করলে দূরে সরে থাকবে, সাবধানে থাকবে। কিন্তু তুমি তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করবে না। দরকার হলে তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করবে। পারলে ক্ষমা করে দেবে।’
কবি আবুল হোসেনের প্রিয় কবি ছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট। বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রিয় উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা।’ এর পরই ছিল শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সেরা কবি। তবে তিনি প্রায়ই বলতেন, গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে দুই বাংলায় কোন ভাল কবিতা, গল্প বা উপন্যাস রচিত হয়নি। মনে মনে সর্বদা একটি ক্লাসিক জগতে বিচরণ করতেন। রুচির একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিচে নামতে চাইতেন না। সুস্থিরতা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বড় গুণ। স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন, তাঁর নামেই বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘সাহানা’। ধানমণ্ডির ‘সাহানা’ নামের এই বাড়িতে কতবার গেছি; যতবার গেছি, গভীর শান্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরে এসেছি। কবি আবুল হোসেনের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন কবি শামসুর রাহমান ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। এদের মৃত্যুতে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। আমাকে বেশ কয়েকবার বলেছেন, ‘এখনকার সাহিত্যে প্রতিভাবান কাউকেই দেখছি না। তবে এ অন্ধকারের অবসান একদিন নিশ্চয়ই হবে। সত্যিকারের প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকের আগমন আবার হবে এ দেশে।’ তবে দেশের দুরবস্থার জন্য তিনি নীতিহীন রাজনীতিকদের বেশি দায়ী করতেন।
মানুষের চিরতরে চলে যাওয়া নিয়ে কবি আবুল হোসেন একটি অনবদ্য কবিতা লিখেছেন :
‘যে যাবার সে-ই শুধু যায়।
পড়ে থাকে বিষয়-আশয়
ঘরবাড়ি সহায়-সম্বল
বন্ধুবান্ধব স্ত্রী ছেলেমেয়ে।
একবারও কারও মনে হয়
না কখনো তাঁরাও যখন
যাবেন, তাঁদের পথ চেয়ে
থাকবে না কেউ তো দাঁড়িয়ে।’
(যে যায় সেই শুধু যায়)
কবির এ কথাগুলো হয়ত সত্য। কিন্তু তা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কবির বিদায়ে আমার মনে হয়েছে, আমরা সবাই একদিন চলে যাব। কিন্তু এমন সৃজনশীল, শান্তিপূর্ণ ও সফল জীবন কাটানোর সৌভাগ্য ক’জনার হবে?
॥ ২ ॥
কবি আবুল হোসেনের জন্ম হয়েছিল ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ-ভারতের অবিভক্ত বাংলায় এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। তাঁর শৈশব ও তারুণ্য এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে কেটেছে, যখন বাঙালী মুসলমানদের বড়ই দুর্দশা। শিক্ষা সংস্কৃতি চাকরি ব্যবসা বাণিজ্য রাজনীতি প্রভৃতি সবদিক দিয়ে তারা প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। পিছিয়ে থাকার কারণেই তাদের মনের ভেতর জন্ম নিয়েছিল গভীর হীনম্মন্যতা ও দুঃখবোধ। কবি আবুল হোসেন তাঁর শৈশব থেকেই একটি সমাজের বিকাশ ও বিবর্তনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। শৈশবে কৃষ্ণনগরে থাকার সময় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দূর থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। একজন অগ্রজ বন্ধু তাঁকে বলেছিলেন কবির কথা। কিন্তু তখন কবি আবুল জানতেন না ‘কবি’ বলতে কী বোঝায়। পরে অবশ্য স্কুলের পাঠ্যবইয়ে নজরুলের একটি বিখ্যাত ছড়া পড়ে তিনি মুগ্ধ হন। সেই ছড়াটি হলো, ‘ভোর হলো, দোর খোলো/ খুকুমণি ওঠ রে।’ কৈশোরে কৃষ্ণনগর থেকে কুষ্টিয়ায় এসে তাঁর মধ্যে সাহিত্যপ্রেম গড়ে ওঠে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য কুষ্টিয়া শহর বহু আগে থেকেই বিখ্যাত ছিল। এখানে ছেঁউড়িয়ায় বাউল কবি লালন শাহর মাজার, সেখানে বাউলদের আনাগোনা সর্বদা। কয়েক মাইল দূরে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ। আবুল হোসেন এসব জায়গায় ঘুরতেন; ঘুরে বেড়াতে ভালবাসতেন গড়াই নদীর ধার দিয়ে। তখন বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারার লেখক অন্নদা শঙ্কর রায় কুষ্টিয়ার এসডিও। তাঁর আগমনে কৃষ্টিয়ায় সংস্কৃতিচর্চার জোয়ার এসেছিল। কুষ্টিয়া হাইস্কুলে পড়ার সময় কবি আবুল হোসেনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় পরবর্তীকালের বিপ্লবী কবি গোলাম কুদ্দুসের। দু‘জনে প্রায়ই একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন, সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতেন। সেই সময় কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দীপিকা ও জাগরণ প্রভৃতি সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাঁর ও গোলাম কুদ্দুসের প্রথম লেখাগুলো ছাপা হয়েছিল। কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির টেনিস কোর্টে টেনিস খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন আবুল হোসেন। এখানে টেনিস খেলতে আসতেন কুষ্টিয়ার এসডিও অন্নদা শঙ্কর রায়। কুষ্টিয়া হাইস্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাস করে আবুল হোসেন ভর্তি হন কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। কলকাতায় এসে তাঁর সঙ্গে সেই সময়ের বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে। এ সময় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে দু’বার আসার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল তাঁর। দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল দার্জিলিংয়ের কাছে গৌরিপুর লজে। মহানগরীর সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাঁর মনে এক পরিশীলিত সাহিত্যবোধের জন্ম নিয়েছিল। এখানে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, আবু সয়ীদ আইয়ুব, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সখ্য গড়ে উঠেছিল। সমকালীন সাহিত্যসঙ্গী হিসাবে পেয়েছিলেন আহসান হাবীব, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, ফররুখ আহমদসহ অনেককে। সারাজীবন ধরেই এঁদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ১৯৪০ সালে সাহিত্যিক ও সম্পাদক হাবীবুল্লাহ বাহারের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল কবি আবুল হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নববসন্ত।’ এ সময় সারাদেশেই মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তাঁর বন্ধুরা বেশিরভাগ ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। কিন্তু তিনি এ রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট হতাশায় ভুগছিলেন। সেই দ্বন্দ্ব ও হতাশার দিনগুলো নিয়ে লিখেছিলেন কবিতা ‘শেষযুক্তি’-
‘আশা নাই, ভাষা নাই
প্রতিবাদ করবার।
বহ্নি বিদ্রোহীর।
আছে শুধু দাহ।
এবার হয়েছি নিঃসংশয়
মৃত্যুই মৃত্যুকে করে ক্ষয়।’
তবু দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আসেন তিনি ও তাঁর সাহিত্যিক বন্ধুরা। শুরু হয় নতুন দেশে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নতুন অভিযাত্রা। কলকাতার তুলনায় আধুনিক জীবনযাপনের কোন উপকরণই তখন ছিল না এ শহরে; চারদিকে অশিক্ষা, অসংস্কৃতি, অব্যবস্থা ও বিশৃঙ্খলা। এ সময় মনে প্রাণে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একদল সাহিত্যিকের, আবির্ভাব ঘটেছিল ঢাকায়। কিন্তু ‘নববসন্তের’ কবি আবুল হোসেন শুরু থেকেই ছিলেন আধুনিকতার ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে।
॥ ৩ ॥
চল্লিশের দশকের প্রতিভাবান কবি ফররুখ আহমদ ও তাঁর অনুসারীরা ইসলামের ধর্মীয় চেতনা, আবেগ ও গৌরবগাথাকে কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন; তখন আবুল হোসেন পথ চলেছেন আধুনিক জীবনবোধ ও চিত্রকল্প সঙ্গে নিয়ে। সেই বোদলেয়ারের যুগ থেকে নগরজীবন আধুনিক বোধের প্রধান ভিত্তি। টিএস এলিয়ট নগরজীবনের অসহায়তা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে তাঁর কবিতায় নানা ধরনের প্রতীক ও চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। এখানে জীবন অন্য কোনো মানবিক বোধের মাধ্যমে নয়; বরং কফির চামচ দিয়ে পরিমাপ করা হয়। কবি আবুল হোসেন প্রথম থেকে নগরযন্ত্রণার সেই আধুনিক বোধকে উপলব্ধি করেছেন। এদিক দিয়ে তিনি জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু কিংবা সমর সেনের সার্থক অনুসারী। তবে তাঁর কবিতা চল্লিশের সাম্যবাদী চেতনায় বিশ্বাসী কবিদের মতো শ্রেণীচেতনা বা বিপ্লব দ্বারা প্রভাবিত নয়। আবুল হোসেনের সহযাত্রী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যয় কিংবা গোলাম কুদ্দুস যখন কবিতায় জনমুক্তি ও বামপন্থী আদর্শের জয়গান গেয়েছেন; সেখানে আবুল হোসেন আধুনিক নগরজীবনকে তাঁর কবিতার উপজীব্য করেছেন।। দ্বন্দ্ব, নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা আধুনিক নগরজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। হয়ত নগরীর মধ্যবিত্তের মধ্যে তা আরও বেশি পুষ্ট :
‘মাঝে মাঝে মনে হয়
একটু একটু করে এই প্রাণ ক্ষয়
না করলেই নয়।
দিনে দিনে তিলে তিলে মরে মরে এই বেঁচে থাকা
এর মানে কী? ’ (মধ্যবিত্ত)
নগরজীবনে নিজেদের বেঁচে থাকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্ন আধুনিক বোধ থেকে উৎসারিত। কারণ সংশয় ও দ্বন্দ্বে জর্জরিত আধুনিক মানুষ সর্বদা নিজেকে প্রশ্ন করে। আবুল হোসেন কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন।-
‘আমরা কি বেঁচে আছি? এই কি জীবন?
বন্ধ ঘরে কানামাছি এ জীবন নিরুপায় খেলা।
নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর।’
পরবর্তীকালে নগরজীবনের এই ক্ষতবিক্ষত বোধ শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরীসহ অন্য আরও কিছু কবির কবিতায় সুস্পষ্ট। অনেক সময় মনে হয় আবুল হোসেন বাংলাদেশের কবিতায় নগরযন্ত্রণার বোধের দিক দিয়ে অনেকের পূর্বসূরী। এছাড়া কবিতায় অনাকাক্সিক্ষত আবেগ ও অতিকথনকে তিনি প্রথম থেকেই পরিহার করেছেন। তিনি কবিতায় প্রতিটি শব্দ ব্যবহার করেন অনেক ভেবেচিন্তে। বাংলাদেশের সকমালীন তরুণ কবিদের জন্যে তাঁর এ পরিমিতিবোধ অবশ্যই অনুসরণযোগ্য। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর এখানে ধীরে ধীরে নগরজীবনের বিকাশ শুরু হয়। আজিমপুর কলোনির মতো ফ্ল্যাটবাড়ি গড়ে উঠতে থাকে। ঢাকার সরল মন্থর নগরজীবনে এ ছিল একটি ব্যতিক্রমী জটিল অভিজ্ঞতা। আধুনিক উপমা প্রতীক চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে এই বোধ একটি কবিতার খুবই সাবলীলভাবে প্রস্ফুটিত :
‘ধারালো ছুরির নদী ফ্ল্যাটের আকাশ।
দিনের কারখানায় কাটা ভাঙ্গা দিন-
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছাদে গাছে ঘাসে।’
(ফাল্গুুন ওগো ফাল্গুুন)
মনে হয় বহু আগে রচিত এই কবিতাটির অন্তর্নিহিত বোধ সমকালীন ঢাকার নগরজীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হয়ত আবুল হোসেন, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর প্রমুখ কবির কবিতা এখনকার তরুণ কবিরা তেমন পড়েন না। হয়ত তাঁদের কিছু কবিতার বই এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। কিন্তু অতীতের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান ও ভবিষ্যত দাঁড়িয়ে। বর্তমানের সঠিক মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার উচিত অতীতের মুখোমুখি হওয়া। প্রবীণ কবি সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম গভীর আগ্রহ নিয়ে পাঠ করা। আশা করি, সমকালীন তরুণদের মধ্যে একদিন নিষ্ঠাবান সাহিত্যসাধক ও গবেষকদের আবির্ভাব হবে। তাঁরা ফেলে আসা সময়ের সাহিত্যকর্ম গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়বেন। তখন হয়ত কবি আবুল হোসেনের কবিতা, আত্মজীবনী ও অন্যান্য গদ্য পাঠ করে তাদের চিন্তা ও চেতনায় ব্যতিক্রমী বোধের সঞ্চার হবে।
॥ ৪ ॥
আজ থেকে প্রায় সত্তর বছরের বেশি সময় আগে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত আবুল হোসেনের একটি কবিতা পড়ে বিস্মিত হয়েছি। বাংলা সাহিত্যে এমন প্রাণবন্ত প্রেমের কবিতা বাস্তবিকই দুর্লভ। যথাযথ শব্দ ব্যবহার ও স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ এই কবিতাকে একটি আশ্চর্য সাফল্য এনে দিয়েছে। ভাল কবিতা চেনার ক্ষেত্রে সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু যে অবিস্মরণীয় তার প্রমাণ আবার পেলাম। সেই সঙ্গে আমার মনে হয়েছে, এমন সর্বাঙ্গীণ সুন্দর কবিতা আমরা ক’জন লিখতে পারব? তবে সত্যিকার ভাল কবিতা সবসময়ই দুর্লভ। মহৎ কবিতার একটি বড় লক্ষণ হলো, তা সব সময় মনে হবে সদ্যলেখা বা তরতাজা। অবশ্য এ কথাটিও বুদ্ধদেব বসুর; সম্ভবত তিনি ইঙ্গমার্কিন কোন কবি-প্রবন্ধকারের লেখা থেকে তা অবলীলায় ধার করেছেন। যাহোক, এবার বহু বছর আগের সেই কবিতাটি পাঠ করছি:
‘তোমাকে চাই তোমাকে চাই ওগো দুর্লভা বল্লভা আমার
রূপ নয় সাজ নয়, সায়াহ্নের অন্ধকারে অস্পষ্ট আধো আধো
পরিচয় স্বপ্নের মতো, রহস্যনিবিড় বসন্তের লাবণ্যবিলাসে
তৃপ্ত দেহ আকাশে মেলে পাখা, সে প্রণয় আমার তো নয়।’
(মেহেদীর জন্য কবিতা)
এ কবিতাটি লেখার পর বহুদিন চলে গেছে। মৃত্যুর মাত্র চার বছর আগে প্রকাশিত কবির একটি বই পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম। এ বইয়ের কবিতাগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, তা বাইশ বছর বয়সের এক ডিজিটাল স্মার্ট অভিমানী তরুণের লেখা। বইটির নাম ‘যাবার আগে।’ প্রথম কবিতাটিই বৃষ্টি নিয়ে :
‘এসো বৃষ্টি, এসে ঝম ঝম করে আকাশ বাতাস
ভেঙে নামো শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জে, মাঠে ঘাটে
অলিগলি, সদর সড়কে। অসহ্য গরম আর
গুমোটে মানুষ মর মর, ঝিমোয় পশু পাখি;
গাছপালা, বাড়িঘর সারাদিন সেদ্ধ হয় রোদে।’
এমন সরল, স্মার্ট, অথচ এমন সুন্দর কবিতা আমি বহুকাল পড়িনি। শহীদ কাদরীর বিখ্যাত ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ নামের কবিতায় যথেষ্ট অতিকথন আছে; কিন্তু এই কবিতায় একটি শব্দও অতিরিক্ত নয়। শব্দ ব্যবহারের এমন মুনশিয়ানা বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় কবির মধ্যেই নেই। আমার ধারণা, নিদেনপক্ষে এদিক দিয়ে তিনি এজরা পাউন্ড ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সমতুল্য। আমার এ কথাটি কারও কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে; কিন্তু আমি আমার অন্তরের বিশ্বাস থেকে এ কথাটি উচ্চারণ করছি। ‘যাবার আগে’ এই বইটিতে মৌলিক কবিতার সঙ্গে কিছু বিখ্যাত বিদেশী কবির কবিতার তরজমা রয়েছে। এসব কবিতা পড়ে আমার এক বারও মনে হয়নি এগুলো অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করা। মনে হয়েছে একটি মহৎ কবিতা থেকে যেন অন্য একটি মহৎ কবিতার জন্ম হয়েছে। রবার্ট ফ্রস্টের চার লাইনের যে কবিতাটির অনুবাদ করেছেন আবুল হোসেন, সেটাকে আমি অবশ্যই একটি মহৎ সুন্দর মৌলিক কবিতার মর্যাদা দেব:
‘তোমাকে নিয়ে যে ছোটখাটো তামাশা করেছি
ক্ষমা করো হে বিধাতা;
আমাকে নিয়ে তোমার যে বিরাট ঠাট্টা
ক্ষমা করে দেব আমিও তা।’
(তুমি ও আমি)
কবি আবুল হোসেন পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয়ার পর খুব বেশি সময় যায়নি; কিন্তু ইতোমধ্যে এই মহৎ কবি ও মানুষের মূল্যায়ন শুরু হয়ে গেছে। হারমান হেইস বলেছিলেন, মৃত্যু মানেই শেষ নয়, মৃত্যু জীবনের অন্য এক রূপান্তর। আমার ধারণা, সারাজীবনের অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ শেষে এই কবির অভিযাত্রা এক পার্থিব জগতের দিকে। তবে সে জগৎ বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের নয়; তা সকল মানুষের। কবি আবুল হোসেন ছিলেন সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে এক কল্যাণকামী মানুষ। এ বিস্ময়ের জগৎ ছেড়ে তিনি চলে গেছেন অন্য এক মহাবিস্ময়ের দিকেÑ যা আমরা জানি না, যা আমরা বুঝি না।
॥ ৫ ॥
এই মহৎ কবির মহাপ্রয়াণের পর আমার ভাবতে ভাল লাগছে, গত তিরিশ বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আমি তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলাম। তিনি যেমন যুক্তিবাদী, শিক্ষিত ও ভাল মানুষ ছিলেন; তেমনই আমি তাঁর মতো সুখী ও ভাগ্যবান মানুষ খুব কম দেখেছি। যা পাননি তা নিয়ে কখনও হাহুতাশ করেননি বরং এ সুদীর্ঘজীবনে যা পেয়েছেন তা নিয়ে গভীর সুখ ও তৃপ্তিবোধ করেছেন। যতবারই তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় বসেছি, তিনি কথা প্রসঙ্গে অনেকবার বলেছেন, তাঁর সমগ্র জীবন বড় আনন্দে কেটেছে। বলতেন, ‘বড় আনন্দে আমি জীবনটা কাটিয়েছি’। এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের সুখের কথা বলতে খুব কম লোককেই দেখেছি। এদিক দিয়ে তাঁর মতো একমাত্র দেখেছি পরলোকগত স্পীকার হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীকে। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁর সাতাশ নম্বর রোডের বাড়িতে তিনি আমাকে একবার উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এত কিছু পেয়েছি, জীবনে এত সুখ, শান্তি ও সম্মান পেয়েছি যে, আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’ তারপর একমাত্র আবুল হোসেনের মধ্যে দেখেছি, পরিপূর্ণ সুখী জীবনের স্বীকারোক্তি। আসলে ভাগ্যবানও বটে। ধানমণ্ডি আবাহনী মাঠের পাশে ‘সাহানা’ নামের বাড়িতে যতবার গিয়েছি, ততবার দেখেছি পুত্র-কন্যা ও পুত্রবধূরা সর্বদা তাঁর সুখ ও শান্তি নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত। এমন ভাল ও দায়িত্বশীল পুত্র-কন্যা ও পুত্রবধূ পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যায়। সব দিক দিয়ে কবি আবুল হোসেন ছিলেন একজন পরিপূর্ণ সুখী মানুষ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। আমি কখনোই তাঁকে দুর্নীতি করতে বা অসাধু পন্থা অবলম্বন করতে দেখিনি। বলতেন, ‘সব সময় নিজের কাজ করে যাবে। কিন্তু কখনও অন্যায় করবে না। কেউ শত্রুতা করলে দূরে সরে থাকবে, সাবধানে থাকবে। কিন্তু তুমি তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করবে না। দরকার হলে তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করবে। পারলে ক্ষমা করে দেবে।’
কবি আবুল হোসেনের প্রিয় কবি ছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট। বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রিয় উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা।’ এর পরই ছিল শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সেরা কবি। তবে তিনি প্রায়ই বলতেন, গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে দুই বাংলায় কোন ভাল কবিতা, গল্প বা উপন্যাস রচিত হয়নি। মনে মনে সর্বদা একটি ক্লাসিক জগতে বিচরণ করতেন। রুচির একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিচে নামতে চাইতেন না। সুস্থিরতা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বড় গুণ। স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন, তাঁর নামেই বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘সাহানা’। ধানমণ্ডির ‘সাহানা’ নামের এই বাড়িতে কতবার গেছি; যতবার গেছি, গভীর শান্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরে এসেছি। কবি আবুল হোসেনের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন কবি শামসুর রাহমান ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। এদের মৃত্যুতে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। আমাকে বেশ কয়েকবার বলেছেন, ‘এখনকার সাহিত্যে প্রতিভাবান কাউকেই দেখছি না। তবে এ অন্ধকারের অবসান একদিন নিশ্চয়ই হবে। সত্যিকারের প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকের আগমন আবার হবে এ দেশে।’ তবে দেশের দুরবস্থার জন্য তিনি নীতিহীন রাজনীতিকদের বেশি দায়ী করতেন।
মানুষের চিরতরে চলে যাওয়া নিয়ে কবি আবুল হোসেন একটি অনবদ্য কবিতা লিখেছেন :
‘যে যাবার সে-ই শুধু যায়।
পড়ে থাকে বিষয়-আশয়
ঘরবাড়ি সহায়-সম্বল
বন্ধুবান্ধব স্ত্রী ছেলেমেয়ে।
একবারও কারও মনে হয়
না কখনো তাঁরাও যখন
যাবেন, তাঁদের পথ চেয়ে
থাকবে না কেউ তো দাঁড়িয়ে।’
(যে যায় সেই শুধু যায়)
কবির এ কথাগুলো হয়ত সত্য। কিন্তু তা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কবির বিদায়ে আমার মনে হয়েছে, আমরা সবাই একদিন চলে যাব। কিন্তু এমন সৃজনশীল, শান্তিপূর্ণ ও সফল জীবন কাটানোর সৌভাগ্য ক’জনার হবে?
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment