Wednesday, July 2, 2014

ভুল বোঝাবুঝি থেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের তাণ্ডব

ভুল বোঝাবুঝি থেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের তাণ্ডব
বদরুদ্দোজা সুমন
প্রকাশ : ০৩ জুলাই, ২০১৪
রোগীর চিকিৎসা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ২০ এপ্রিল ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন চিকিৎসকরা। ঘটনার সময় ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কমপক্ষে ১০ সাংবাদিককে পিটিয়েছেন তারা। চিকিৎসক ও গণমাধ্যমকর্মীদের পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মারামারি এবং সহিংসতার নেপথ্যে প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোগীর অ্যাটেনডেন্টকে সামনে রেখে কিছুটা উত্তেজক পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। রোগী মোঃ আবিদ আলী আকাশের ভাই রোজ কর্তব্যরত চিকিৎসককে চড় দিলে হাসপাতালে হট্টগোল বেধে যায়। এ খবর শুনে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তখন ইন্টার্নরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদেরও সমালোচনা করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মিডিয়ার কর্মীরাও যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ নেন নাই। ২০ এপ্রিল রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় এ সময়ে হাসপাতালের সেবাকাজ কার্যত বন্ধ ছিল। এরপরও কয়েকদিন ডাক্তারদের কর্মবিরতিতে অচল ছিল রামেক হাসপাতাল।
তদন্ত কমিটি রামেক হাসপাতালে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে তথ্য সেল গঠন, দর্শনার্থী গমনাগমনের সময় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, অ্যাটেনডেন্টের সামনে রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করাসহ মোট ১২টি সুপারিশ করেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। তাদের জন্য কোনোরকম শাস্তির সুপারিশও প্রতিবেদনে নেই।
কমিটির সদস্যরা ১০ সাংবাদিক ও চার চিকিৎসকসহ মোট ১৮ জনের সাক্ষ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোঃ আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিটি রাজশাহীতে গিয়ে তদন্তকাজ পরিচালনা করে। কমিটিতে সাংবাদিক এবং চিকিৎসক প্রতিনিধিও ছিলেন। কমিটি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সহিংসতা ও সাংবাদিক পেটানোর ঘটনার সত্যতা পেয়েছে।
এদিকে রামেক হাসপাতাল সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, সহিংসতা চলাকালে যেই ব্যাচ হাসপাতালে ছিল তাদের কোর্স শেষ হয়ে গেছে। ওই ব্যাচের চিকিৎসকদের সবাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সনদও নিয়ে গেছেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল ও সুপারিশ সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে জানেন। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০ এপ্রিল রাতে প্রায় দুশ চিকিৎসক কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর ভয়ানক আক্রমণ চালিয়েছিলেন। আহত হওয়া সাংবাদিকরা তদন্ত কমিটির কাছে প্রদত্ত সাক্ষ্যে বলেছেন, ওই রাতে হাসপাতাল করিডোরে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের যাকে যেখানে পাওয়া গেছে সেখানেই পেটানো হয়েছে। এমনকি নারী চিকিৎসকরাও হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের অনেকে সাংবাদিকদের অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছেন।
জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আসম বরকত উল্লাহ বুধবার বিকালে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, গণমাধ্যমে খবর মারফত আহতদের চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ এবং নষ্ট হওয়া ও খোয়া যাওয়া সামগ্রীর ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুপারিশ সম্পর্কে জেনেছি। তবে মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু জানানো হয়নি। প্রতিবেদনে প্রদত্ত ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ২০ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে হাসপাতালের ১৩নং ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী মোঃ আবিদ আলী আকাশকে চিকিৎসা দেয়া নিয়ে বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত হয়। রোগীর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু মিডিয়ায় তা প্রচারিত হয়। তদন্ত কমিটি বলেছে, প্রকৃতপক্ষে রোগী মারা যায় নাই। কমিটির সদস্যরা রোগী ও তার মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তদন্ত কমিটি ঘটনার সময় ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ডা. সুব্রত মণ্ডলসহ চারজন ডাক্তারের সাক্ষ্য নিয়েছে। অন্য তিনজন হলেন ডা. তমা সরকার, ডা. ফাহমিদা আলী সোমা এবং ডা. কামরুল হাসান মিঠু। ডা. সুব্রত কমিটিকে জানান, তিনি নিউরো সাইকিয়াট্রিক ডিসঅর্ডার-এর রোগীর হিস্টোরিয়া দেখভাল করার জন্য চোখের ওপরের অংশে চাপ দিয়েছিলেন। তখন রোগী লাফিয়ে ওঠে। এটি দেখে রোগীর ভাই বাম গালে চড় মেরেছেন। ডা. তমা সরকার ওই সময় একই ওয়ার্ডে ডিউটিরত ছিলেন। চিকিৎসকরা অবশ্য বলছেন, এ ধরনের রোগী চিকিৎসা দেয়ার সময় বিভিন্ন উপায়ে হালকা আঘাত করে তার সেন্সসহ অন্যান্য ইন্দ্রিয় সচল আছে কিনা সেটা যাচাই করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রোগী মারা গেছে কী যায়নি সেটা নিয়ে চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের মধ্যে বচসা হয়েছে। ডা. কামরুল হাসান মিঠু তদন্ত কমিটিকে জানান, সাংবাদিকদের কয়েকজন তাকে ধরে ফেলে। হট্টগোলের মধ্যে কেউ তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। এতে তিনি অচেতন হয়ে যান।
এদিকে সাক্ষ্যদাতা সাংবাদিকরা তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, ডা. সুব্রত ও ডা. তমা অন্য ইন্টার্ন ডাক্তারদের জড়ো করেছেন। এরপরই হামলা হয়েছে। চিকিৎসকরা অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তদন্ত কমিটির কাছে যেসব সাংবাদিক সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা হলেন- চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের আবরার শাঈর, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির মঈনুল হাসান জনি, কালের কণ্ঠের সালাহ উদ্দিন, দৈনিক সানশাইনের রহিদুল ইসলাম, চ্যানেল নাইনের রকিবুল হাসান ও আকরামুল হাসান মিল্লাত, এটিএন নিউজের মাহফুজুর রহমান, মাছরাঙা টিভির গোলাম রব্বানী, যমুনা টিভির জাবীদ অপু এবং রাজশাহী ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ। কমিটিতে সাক্ষীদাতা ১৮ জনের বক্তব্য প্রতিবেদনে সন্নিবেশিত আছে।
রামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, একজন সাংবাদিক লাঠি নিয়ে এক চিকিৎসককে আঘাত করার ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তিনি জানান, চিকিৎসক পরীক্ষা করার জন্য রোগীর গালে ও শরীরে জোরে জোরে আঘাত করলে রোগীর ভাই উত্তেজিত হয়ে চিকিৎসককে চড় দিয়েছেন। পরে তিনি স্বীকার করেন এটা করা ঠিক হয়নি এবং এজন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
- See more at: http://www.jugantor.com/news/2014/07/03/118135#sthash.slbWrY28.dpuf

No comments:

Post a Comment