Thursday, July 3, 2014

উদ্ভিদ যেভাবে ফুল ফোটানোর সময় নির্ধারণ করে

উদ্ভিদ যেভাবে ফুল ফোটানোর সময় নির্ধারণ করে
এনামুল হক
উদ্ভিদের সফল প্রজনন তথা বংশবিস্তারের জন্য ফুল ফোটানোর সঠিক সময়টা নির্ণয় করতে পারা একান্তই গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে মলিকুল পর্যায়ের বেশ কিছু ঘটনা পরম্পরা, উদ্ভিদের দেহঘড়ি এবং সূর্যরশ্মি যুক্ত।
ফুল কখন ফোটে? আর গাছেরাই বা কি করে জানে কখন ফুল ফোটাতে হবে? গত ৮০ বছর ধরে এই ধাঁধা চলে আসছে। আজ বিজ্ঞানীদের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে, তারা ঐ ধাঁধার শেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু সুস্পষ্টভাবে নির্ণয় করতে পেরেছেন।
ফুল কিভাবে ফোটে বোঝার জন্য এই গবেষণায় অতি সাধারণ ধরনের উদ্ভিদকে ব্যবহার করা হয়েছে। সেটি হলো এরাবিডোপসিস। সেই গবেষণা থেকে আরও ভালভাবে বোঝা যাবে কিভাবে সে একই জিন ধান, গম ও বার্লির মতো ফসল হিসেবে জন্মানো আরও জটিল উদ্ভিদের বেলায়ও কাজ করে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাকাতো ইমাইজুমি ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা যদি ফুল ফোটানোর সময়টা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাহলে ফুল ফোটানো ত্বরান্বিত বা বিলম্বিত করে ফসলের ফলন কমাতে বা বাড়াতে পারা সম্ভব। কৌশলটা জানতে পারলে সে কৌশলকে কাজে লাগানোর উপায়ও আয়ত্ত করা যায়। খাদ্য-ফসলের পাশাপাশি জৈব জ্বালানির জন্য জন্মানো উদ্ভিদের ফলনও সেই কৌশলের সাহায্যে বাড়িয়ে তোলা যেতে পারে।
ইসাইজুমি বলেন, আমরা যে এফকেএফআই ফটোরিসেপ্টার নিয়ে কাজ করছি সেটি প্রতিদিন শেষ বিকেলে প্রকাশ পায় এবং উদ্ভিদের সারকাডিয়ান ক্লক বা দেহঘড়ি দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। দিন ছোট থাকার সময় এই প্রোটিনটি প্রকাশ পেলে তা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে না। কারণ পড়ন্ত বিকেলে সক্রিয় হয়ে ওঠার মতো আলো প্রোটিনটি পায় না। দিন যখন লম্বা থাকে সে সময় এই প্রোটিনটি প্রকাশ পেলে ফটোরিসেপ্টরের পক্ষে দিনের আলোকে কাজে লাগানো এবং ফুলফোটানোর ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলা সম্ভব হয়। বলা বাহুল্য, ফুল ফোটানোর সেই প্রক্রিয়ায় ‘ফ্লাওয়ারিং লোকাস টি’ নামে আরেকটি প্রোটিন যুক্ত থাকে। সারকাডিয়ান ক্লক বা দেহঘড়ি ফুল ফোটানোর নির্দিষ্ট ফটোরিসেপ্টরের সময়কালকে নিয়ন্ত্রণ করে। এভাবেই উদ্ভিদ দিনের দৈর্ঘ্যরে পার্থক্য বুঝতে পারে।
বছরের নির্দিষ্ট সময় ফুলের গাছের পাতায় ‘ফ্লাওয়ারিং লোকাস টি’ নামে এক ধরনের প্রোটিন উৎপন্ন হয় যা ফুল ফোটানোর কাজে উদ্দীপনা যোগায়। প্রোটিনটি উৎপন্ন হবার পর সেটি গাছের পাতা থেকে প্রান্তিক কুঁড়ি পর্যন্ত পরিবাহিত হয়। প্রান্তিক কুঁড়ি হলো উদ্ভিদের সেই অংশ যেখানে কোষগুলো অপৃথকীকৃত অবস্থায় থাকে। তার অর্থ ওগুলো পাতাও হতে পারে নয়ত ফুল হতে পারে। প্রান্তিক কুঁড়িতে পৌঁছে প্রোটিনটি আণবিক পর্যায়ের পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে এবং এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কোষগুলোকে ফুলে পরিণত হবার পথে পাঠিয়ে দেয়।
দিনের দৈর্ঘ্য বা স্থায়ীত্বকালের পরিবর্তন ঘটলে অনেক প্রাণী বুঝতে পারে যে মৌসুমের পবিরর্তন আসছে। অনেক আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের কাছে ব্যাপারটা জানা যে, যে দিবসের দৈর্ঘ্যরে পরিবর্তন পরিমাপের জন্য উদ্ভিদরা সময়ের হিসাব রাখার এক অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে কাজে লাগায় যাকে বলা হয় ‘সারকাডিশন ক্লক’। একে দেহঘড়িও বলা যেতে পারে। দেহঘড়ি মানুষ, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা জুড়ে জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর সমলয় করে বা সময়ের সামঞ্জস্যবিধান করে।
ইসাইজুমি ও তার সহকর্মীরা গবেষণা করে একটি প্রোটিন চিহ্নিত করতে পেরেছেন যার নাম দেয়া হয়েছে এফকেএফআই। উদ্ভিদ যে ব্যবস্থার মাধ্যমে মৌসুমের পরিবর্তন বুঝতে পারে কখন ফুল ফোটাতে হবে, জানতে পারে এই প্রোটিনটি তাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে গবেষকরা মনে করেন। এফকেএফআই প্রোটিনটি একটি ফটো রিসেপ্টর অর্থাৎ এটি সূর্যের আলোয় সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এই ব্যবস্থায় প্রজননের সময় কম থাকলে উদ্ভিদের ফুল ফোটে না। যেমন চরম শীতের সময় যখন দিন হয় বেশ ছোট এবং রাত হয় বেশ বড়। আরাভিডোপসিস নামে সরিষা পরিবারের এক ছোট উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা চালাতে গিয়ে এই তথ্যটি উন্মোচিত হয়েছে। জিনেটিক গবেষণায় প্রায়শই এই উদ্ভিদকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গবেষণালব্ধ তথ্যাবলীর দ্বারা আরাবিডোপসিস ফুল ফোটার ব্যবস্থার গাণিতিক মডেলের ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতাই প্রমাণিত হলো। মডেলটির উদ্ভাবক এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক এন্ড্রু মিলার।
মিলার বলেন, ‘উদ্ভিদের দিনের দৈর্ঘ্য মাপার সেন্সরটি কিভাবে কাজ করে তা বোঝার ব্যাপারে এই গাণিতিক মডেলটি যথেষ্ট সহায়ক। কাজের সেই নিয়মসূত্রটি ধান, গমের মতো অন্যান্য ফসলী উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দিনের আলোর এই প্রভাব শুধু চাষাবাদে নয়, জীবজগতের প্রজননের ওপরও এসে পড়ে। সেজন্যই দেখা যায় যে, ডিমপাড়া মুরগির খামার ও মাছের খামারে আলো নিয়ন্ত্রণের একটা ব্যবস্থা থাকে। তবে উদ্ভিদের ক্ষেত্রে আলোর সঙ্গে যুক্ত প্রোটিনটিকে যেমন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে প্রাণীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রোটিনটিকে এখনও পর্যন্ত ঠিকমত বুঝে উঠতে পারা সম্ভব হয়নি।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment