Tuesday, August 5, 2014

তাপস গায়েনের কবিতা: ঈশ্বরের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত কবি

তাপস গায়েনের কবিতা: ঈশ্বরের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত কবি

তাপস গায়েন | ৫ আগস্ট ২০১৪ ৭:৪১ অপরাহ্ন
এফিটাফ:
আমরা যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে করি নি অবিশ্বাস, অধিকন্তু ঘুম এবং জাগরণের মাঝে বাকরুদ্ধ হয়ে নিশ্চিহ্ন হবার আগে সুতীব্র চিৎকারে জেগে উঠি, তারা অন্তত অনুভবে জেনেছি শক্তির গতি, স্থিতি, আর তার ব্যাপ্তি । মধ্যরাতে শুনেছি ফুলের প্রলাপ, কিন্তু জানি নি কৃষ্ণচূড়া কিংবা রক্তজবা কিংবা কদমের অন্তরের আখ্যান ; দেখেছি মৃদুমন্দ বাতাসে শাপলার বিলে দোল খায় ফড়িং এবং জেনেছি কোনো এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে ছিল বুদ্ধের মাথার উপরে সপ্তসর্পের আচ্ছাদন ; এইসব রূপ, বোধকরি, নিতান্তই শক্তির বিন্যাস !
উন্মাদ আশ্রম এখনও বহুদূরে, আরও দূরে গর্জনশীল নদী, তারও থেকে অধিকতর দূরত্বে শুয়ে আছে নক্ষত্রখচিত মহাকাশ, সেইখানে দর্পণের সম্মুখে কি দাঁড়িয়ে আছেন কোনো এক ঈশ্বরী ? জানি এইসব প্রশ্ন অবান্তর ! তবু ভাবি, ইবলিশ নিশ্চয় তাঁরই প্রকাশ, নতুবা অপূর্ণ থেকে যান ঈশ্বর, যেভাবে ক্লান্ত এই মহানগরীর সাথে অবিভাজ্য সত্তায় ঘুম আর জাগরণের মধ্যে নিরন্তর ঘুমিয়ে আছি আমি ; অনুক্ষণ জেগে থাকি আমি ।
পাশের ফ্লাট থেকে ভেসে আসে যশপ্রার্থী মিউজিশিয়ানের সঙ্গীত, আর অন্তহীন নারীকন্ঠের ধ্বনি ! সারাদিনের কোলাহলে ধেয়ে আসে সাবওয়ের শব্দ, পানশালার বুদ্বুদ; আর কোনো এক সন্ধ্যায় ফেলে আসা বেদেনীদের নৌকার বহরের স্মৃতি আর বিপুল তরঙ্গের মেঘনা নদী । এইসব আমাকে বিক্ষিপ্ত করে, করে ভ্রান্ত ; আমারই অবচেতনায় আমি ঘুমের মধ্যে সময়কে ফেরি করে ফিরি ; হৃদয়ে জেগেছে হাডসন নদী কিন্তু তথাগতকে এখনও দেখিনি ; ঘুম এবং জাগরণের মাঝে আমার অবচেতনায় কে এসে আমাকে জাপ্টে ধরে, আমি জানি না সেই শক্তির আকৃতি ! আমি চিৎকার করে উঠি; কিন্তু নিরন্তর আমি আমার দ্বন্দ্ব অক্ষুণ্ণ রেখেছি ! ভাবি, আমরা কী জীবীভূত কালের ঈশ্বরী (= কালী) হয়ে মহাশূন্যতার উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছি ?
আজও অসমাপ্ত হয়ে আছে এই দ্বন্দ্বযুদ্ধ । জানি এক রাতে, অন্ধকারের সাথে, ইবলিশের সাথে, ঈশ্বরের সাথে এই রণে পরাস্ত হব আমি ! উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো ব্যস্ত হবে এই মহানগরী ; সকাল গড়িয়ে আসবে দুপুর ; হবে সন্ধ্যা ; ভীড় জমে উঠবে পানশালায়, কিন্তু কেউ জানবে না,
“এইখানে শুয়ে আছে
ঈশ্বরের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত কবি ।”
চক্রবূহ্যে অভিমন্যু [১১]
ঘুম এবং জাগরণের মাঝে বিশৃঙ্খল জল এবং তার থেকে উদ্ভুত সময়ের মধ্যে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জানি নি কোনো ফুলের নাম, শুধু দেখেছি ফুলের বিন্যাস ; মৃদু আঘাতে ব্যাপ্ত হয়ে উঠে ফুল, প্রজাপতির প্রসারিত পাখা ধরে রাখে মহাগঙ্গা, আর জেগে ওঠে এই বনস্পতি ! সুউচ্চ পাহাড়ের মতো সাঁকো পাড়ি দিতে গিয়ে দেখি, মধ্যসমুদ্রে বিভাজিত সে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র গভীরে জাহাজের পাটাতনে আমি দোদুল্যমান ; এই দৃশ্যে দৃশ্যমান এবং এই দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরিত হয়েছি আমি বহুবার । আমি যদি আমি নই, তবে ঘুম ও জাগরণের মাঝে কে আমাকে ঠেলে দেয় যুদ্ধক্ষেত্রে ? ইতিহাস কেনো আজও সাক্ষ্য দেয় কিশোর যোদ্ধার মৃত্যু ? কে আমাকে এই অস্থির স্বপ্নসত্যে জাগিয়ে রাখে ?
আমরা যাদের প্রকৃত বীর বলে জেনেছি, তারাও যুদ্ধশেষে ফিরে আসেন মাতৃক্রোড়ে, নক্ষত্রের মতোই বীরের শরীর নশ্বরতায় বিদ্ধ । তাঁদের বীরত্ব নয়, শেষাবধি তাঁদের নশ্বরতাই দিয়েছে জীবনের সম্পূরক ধ্বনি । তীরবিদ্ধ হবেন একিলিস, শরশয্যায় শায়িত হবেন ভীষ্ম, তাঁদের মৃত্যুতে আমি আমার কান্না উহ্য রাখতে পেরেছি, কিন্তু সুপরিকপ্লিতভাবে যখন অবরুদ্ধ জনপদে শিশুদের হত্যা করা হয়, তখন আমি চিৎকার করে উঠি, কিন্তু অদৃশ্যমান হাত তখন আমাকেই হত্যায় হয় উদ্যত ! আমি পালিয়ে যেতে চাই, কিন্তু কিম্ভুত অবয়বের এক বালক আমাকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখে । ঘুম এবং জাগরণের মাঝে মৃত মানুষেরা আমার সাথে কৌতুকে মেতে ওঠে ! আমার ঘড়ির কাঁটা তখন নিশ্চল দাঁড়িয়ে যায় ।
মধ্যরাত অতিক্রমী আমি গির্জার ঘন্টির শব্দে জেগে উঠি । মনে হয় আমি ফিরে গেছি আমার প্রথম যৌবনে, মাতামেরীর সন্তানের সাথে এসে পৌঁছে গেছি কোনো এক সেবাদাসীর আশ্রমে ; তাঁর মুখ থেকে আমরা একইসাথে অন্নগ্রহণ করি ! দেখেছি অবরুদ্ধ জনপদে শত্রুর হাতে নারী এবং শিশুদের মৃত্যু । এরই মধ্যে কোনো এক সন্ধ্যায় ম্যাগী, যীশু, আর আমি নিজেদেরকে লেপ্রসির রোগী বলে সনাক্ত করেছি এবং আমাদেরকে অপবিত্র এবং পাপী বলে জেনেছি !

আজও প্রবাহিত মহানদী গঙ্গা, তাইগ্রীস, আর জর্ডান । এই নদীসমূহের তীরে আজও জেগে ওঠে যুদ্ধক্ষেত্র, যেমন জেগেছিল কুরুক্ষেত্র আর কারবালা আর গাজা । মৃত্যু হবে শিশু এবং কিশোরের, যেভাবে হয়েছে মৃত্যু বালকযোদ্ধা অভিমন্যুর । প্রভু যীশু, আমার নিঃশ্চুপতায় আজও আমি রয়ে গেছি পাপী, সভ্যতার লেপ্রসি নিয়ে মধ্যম্যানহাটানে দাঁড়িয়ে রয়েছি । কিন্তু কোথায় সমাধি পাবে এইসব দুগ্ধপোষ্য শিশু, যখন শত্রুর গোলাবারুদে পুড়ে যায় শস্যক্ষেত্র আর জলপাইবৃক্ষ !
ঘুম এবং জাগরণের মাঝে আজ জন্ম হচ্ছে সময়ের । ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হবার আগে হে পরাক্রমশালী সৈনিক, “হত্যা করো আমাকে, ধীরে এই জলপাই বৃক্ষের নীচে, কবি লোরকার সাথে…।”

http://allbanglanewspapers.com/bdnews24-bangla/

No comments:

Post a Comment