সাঁতার জানতেন না শুভঞ্জিতা৷ রোগা হবেন বলে মাস তিনেক আগে সাঁতারে ভর্তি হয়েছিলেন৷ কীভাবে হাওড়ার ওই রিসর্টের সুইমিং পুলের অল্প জলে তিনি ডুবে গেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে গড়িয়ার শ্রীরামপুর রোডের কানুনগো পার্কের বাড়িটিতে৷ কাছেই পৈতৃক বাড়ি থাকা সত্ত্বেও এই বাড়িতে ৬ মাস পেয়িং গেস্ট হিসেবে উঠে এসেছিলেন৷ এক বান্ধবীর মাধ্যমে এখানে থাকতে আসেন৷ সেই বান্ধবীও এই বাড়িতেই পেয়িং গেস্ট থাকেন৷ শুভঞ্জিতা বাড়ির কর্ত্রীকে বলেছিলেন স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলছে তাই পড়াশুনোর জন্য এখানে থাকবেন৷ তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন ঠাকুমা৷ শুভঞ্জিতার রুম পার্টনার প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য৷ খুব তাড়াতাড়ি দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে৷ মাঝেমধ্যে দু’জনে রাতের পার্টিতে যেতেন৷ শুভঞ্জিতার গৃহকর্ত্রী সোমা রায় জানালেন, ‘প্রিয়াঙ্কা একটি বেসরকারি সংস্হায় চাকরি করে৷ বাড়ি তারকেশ্বরে৷ টাইফয়েডের জন্য মাসখানেক এখানে ছিল না৷ গত শুক্রবারই প্রিয়াঙ্কা ফিরে আসে৷ ওর সঙ্গেই মাঝেমধ্যে পার্টিতে যেত শুভঞ্জিতা৷ রবিবার দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে দু’জনে ‘ফ্রেন্ডশিপ পার্টি’-তে যাবে বলে একসঙ্গে বের হয়৷ বলে গিয়েছিল রাতে ফিরে খাবে৷ আগের দিন ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডও কিনে রেখেছিল৷’ যদিও পুলিসকে প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, আমরা ভাল বন্ধু ছিলাম৷ ও আমার সঙ্গে যায়নি৷ অন্য কয়েকজনের সঙ্গে ওখানে গিয়েছিল৷ খাবার, ড্রিঙ্কসের কাউন্টার ছিল৷ আমি ওখানে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম৷ হঠাৎ ঘোষণা শুনি কেউ সুইমিং পুলে পড়ে গেছে৷ গিয়ে দেখি পরিচিত কয়েকজন একটি মেয়েকে তুলছে৷ টি-শার্ট দেখে চিনতে পারি ও শুভঞ্জিতা৷ প্রিয়াঙ্কার বক্তব্যের সঙ্গে পেয়িং গেস্ট বাড়ির কর্ত্রীর বক্তব্যে অমিল হওয়ায় পুলিস তা খতিয়ে দেখছে৷ পুলিসের বক্তব্য, একই বাড়িতে দুই বন্ধু থাকতেন, গৃহকর্ত্রী বলেছেন একই সঙ্গে বেরিয়ে ছিলেন তাঁরা৷ তা হলে প্রিয়াঙ্কা কেন বলছেন শুভঞ্জিতা তাঁর সঙ্গে যাননি৷ অথচ, দু’জনেই একই পার্টিতে ছিলেন! তা হলে আর কারা তাঁদের সঙ্গে ছিল? তাঁদের নাম, পরিচয় জানার চেষ্টা করা হচ্ছে৷ দু’জনের মোবাইল ফোনের কল লিস্টও খতিয়ে দেখছে পুলিস৷ পেয়িং গেস্ট বাড়ির কর্ত্রী সোমা রায় বলেন, দুপুরে ওরা বের হয়েছিল৷ সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ প্রিয়াঙ্কা ফোন করে বলে শুভঞ্জিতা ডুবে গেছে৷ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি৷ তিনি বলেন, কিছুদিন আগেই রোগা হবে বলে সাঁতার শিখতে ভর্তি হয়েছিল! অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর মেয়ের সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল শুভঞ্জিতার৷ তার মৃত্যুর খবরে একাদশ শ্রেণীর পড়ুয়া সেই মেয়ে কেঁদে কেটে সারা৷ মাঝেমধ্যে পছন্দের খাবার রান্নায় হাত লাগাত শুভঞ্জিতা৷ খেতে খুব ভালবাসত৷ কিন্তু বাড়ির কথা কিছুই বলত না৷ শুধু বলত শাশুড়ি খুব ভালবাসে৷ স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না৷ তাই বিচ্ছেদ চায়৷ স্বামী এসে বিরক্ত করবে তাই ঠাকুমার কাছে না থেকে এখানে পেয়িং গেস্ট থাকতে এসেছে৷ তার আচরণে উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল না৷ পড়াশুনো করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দূরসঞ্চার শিক্ষার মাধ্যমে বি সি এ পড়তে ভর্তি হয়েছিল৷ ব্যাঙ্কে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল৷ মাঝেমধ্যে ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করতে যেত৷ বাকিটা মোবাইল আর ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে বন্দী করে রাখত৷ এখানে যারা থাকে সবাই পড়ুয়া৷ তাদের থেকে শুভঞ্জিতা নিজেকে একটু আলাদা করে রাখলেও প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে এক ঘরে থাকার কারণেই গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল৷ বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলে শুধু বলত ছোটবেলায় মারা গেছেন৷ কাছেই পাটুলির কানুনগো পার্কে শুভঞ্জিতাদের পৈতৃক তিনতলা বাড়ি৷ সেখানে জ্যাঠা, জ্যাঠতুতো দাদারা কেউ এ নিয়ে কথা বলতে চাননি৷ বাড়ির ভেতর থেকে তালা দেওয়া৷ বিয়ের আগে শুভঞ্জিতা এখানেই থাকতেন৷ প্রতিবেশী পার্থ দাস জানালেন, এটা শুভঞ্জিতার ঠাকুরদার বাড়ি৷ তাঁদের আদরের মৌ (শুভঞ্জিতার ডাকনাম) ছোট থেকে একটু একরোখা৷ বছর কুড়ি আগে তার মা আত্মহত্যা করেছিলেন৷ সাত-আট বছর আগে বাবা সামনের পুকুরে চায়ের কাপ ধুতে গিয়ে ডুবে মারা গিয়েছিলেন৷
|
No comments:
Post a Comment