ভূমিদস্যুদের কবলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সরকারী ভূমি অফিসের চরম দুর্নীতি এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতি স্থানীয় ভূমিদস্যুদের প্রতিপক্ষমূলক আচরণের কারণে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা বেড়েই যাচ্ছে। ভূমি জবরদখলকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েই যাচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ১০৬টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবার আক্রান্ত হয়েছে। হতাহত হয়েছেন ৪২ জন। এই তথ্য জানিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা না করলে বিপন্ন এই জনগোষ্ঠীকে আর রক্ষা করা যাবে না।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ ঘোষণা করে। এর পর ১৯৯৫ সাল থেকে দিনটি পৃথিবীব্যাপী উদযাপন করা হয়। প্রতিবছর জাতিসংঘ দিনটি উপলক্ষে একটি থিম বা স্লোগান ঠিক করে দেয়। এ বছরের থিম- ‘মানুষের মাঝে দূরত্ব কমাতে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’ মানুষে মানুষে দূরত্বের অন্যতম প্রধান কারণ স্বার্থের সংঘাত। আদিবাসীদের অস্তিত্ব সঙ্কটের মূল কারণ জমি নিয়ে সহিংসতা এবং বিরোধ। আর এই বিরোধেই শুরু হয় সংঘাত।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে জমি বিক্রি করলে ভূমি অফিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে, না হয় বিক্রি করতে পারবে না। এমন আইনের কারণে বাধ্যবাধকতায় পড়ে যায় ভূমি কেনাবেচার বাণিজ্য। ভূমি জরিপের সময় দুর্নীতি ও ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয় এবং ঘুষ না দিলে জমি খাস করে দেয়া হয়। ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’ আইনের আশ্রয়ও পায় না। এমনকি মামলায় জয়ী হলেও জমির দখল বুঝে না পাওয়ায় বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। যুগের পর যুগ মামলা চালাতে গিয়ে আরও জমিজমা হারায় তারা এবং এক সময় নিঃস্ব হয়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়। ভূমিদস্যুদের চাপে আক্রান্ত হয় নিরীহ জনগণ। আর এই জটিলতার মধ্যে জমি বেচাকেনা নিয়ে ঘটে যাচ্ছে হতাহতের ঘটনা। সারা দেশে এমন অনেক ঘটনায় আদিবাসী দিবসে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রশ্ন-ভূমি নিয়ে বিপন্ন অস্তিত্ব -এই আতঙ্ক আর কতদিন?
ভূমি হারানোর আশঙ্কায় বারবার ভূমিচ্যুত হতে হতে অস্তিত্বহীন হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এই বক্তব্য উঠে এসেছে আদিবাসী দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে। সম্মিলিত উদ্যোগে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে বলে জানালেন বিশেষজ্ঞরা। প্রজাস্বত্ব আইন বলবত থাকার পরও এর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং দীর্ঘদিন জেলা প্রশাসনে কোন ‘আদিবাসী’ বিষয়ক অফিসার না থাকার কারণে জটিলতা আরও বেড়েছে।
গত ৩০ মে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা খাসিয়াদের জমি দখল করার উদ্দেশ্যে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার খাসিয়াদের গ্রাম নাহারপুঞ্জির ৭৯টি খাসিয়া পরিবারের ওপর আক্রমণ করে। গত ৯ মে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলা চালিয়ে অন্তত ৭ নারীসহ ১১ জনকে আহত করা হয়।
গত ২ আগস্ট শনিবার দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার কুশদহ ইউনিয়নের বড় কচুয়া গ্রামের টুুডু সরেন খুন হন। পরের দিন ৩ আগস্ট তার বড় ছেলে রবীন্দ্রনাথ সরেন বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার ওসি মোঃ আমিনুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, কুশদহ ইউনিয়নের বড় কচুয়া গ্রামের সাঁওতাল গোত্রের টুডু সরেনের পরিবারে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত ষাট বছরে সরেন পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তিকে হত্যা করা হলো।
পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) জনকণ্ঠকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে পাহাড়ী-বাঙালী স্থায়ী ‘অধিবাসীদের’ উচ্ছেদ করে বর্তমানে বিজিবি, সামরিক বাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, সংরক্ষিত বন ঘোষণা, সেটেলারদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণের নামে ভূমি অধিগ্রহণ এবং বহিরাগত ভূমিগ্রাসীদের ভূমি জবরদখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এক সময়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সমাজে আইন-কানুন-সাহিত্য সবকিছু আক্ষরিক অর্থেই মৌখিক এবং অলিখিত ছিল। ভূমি ও বনের ওপর মানুষের স্বতঃসিদ্ধ অধিকার ছিল ঐতিহ্যগত। অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির প্রবীণ নেতা বিল নেদজি এলডার বলেছিলেন , “ভূমিই আদিবাসীদের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু, ভূমি আমাদের ঠিকানা। ভূমি জীবনের প্রতীক। এই ভূমি আমাদের আমরাও ভূমির। ভূমিতে আমরা বিশ্রাম নেই। আমরা ভূমি থেকে এসে আবার ভূমিতেই ফিরে যাই।” এই লেখার ওপর ভিত্তি করেই ২০০৩ সালের মে মাসে জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরাম আদিবাসী অধিকার বিষয়ক একটি বইতে উল্লেখ করেছে আদিবাসীদের কাছে ভূমিই জীবন, ভূমিই তাদের অস্তিত্ব। আর তাই বারবার সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে। ভেরিয়ান এলুইন তার ‘আদিবাসী জগত’ বইতে লিখেছেন, পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জাতীয় স্বার্থে যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাহাড় ও অরণ্যেও মানুষের স্বার্থে। আমরা পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে পারি আদিবাসীদের অনেক কিছু দিতে পারি আমরা। আবার তাদেরও অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেবার মতো।”
কুশদহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার বলেন, গত চার দশকের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমাদের আন্তরিক চেষ্টার কারণে এসব এলাকায় আদিবাসীদের দখলে এখনও কিছু জমি আছে। কিছু জমি বেচাকেনার মামলার কারণে জটিলতায় আছে। এই এলাকায় ৩৪ বছরের চেয়ারম্যান ছিলেন মো. দেলোয়ার। মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার এখন জাতীয় পার্টির নেতা। তিনি জানান, এবার বিএনপি ইউনিয়ন সভাপতি আজিজুল হক কুশদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
এই এলাকায় জমিজমার দখল নিয়ে ব্যাপক জটিলতার সঙ্কট রয়েছে জানিয়ে মো. আমিনুল ইসলাম জানান, যদিও জমিজমা ওদেরই, তবু অনেকেই তাদের জমি দখল করে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে টুডু জমি বিক্রি করার অঙ্গীকার করে টাকা নিয়েছে। পরবর্তীতে জমিও দেয়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন তথ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি বলে জানান দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম। টুডু সরেন হত্যার দায়ে ৮ জনকে আসামি করা হলেও টুডুর মূল ঘাতক গাফফারের স্ত্রী হাওয়াবিবিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার স্বামী ডা. গাফ্ফার পলাতক।
এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, টুডু সরেন বিতর্কিত লোক। স্থানীয় মুসলমানেরা আক্রান্ত হন তাদের তীর ধনুকে। ১৮ এপ্রিল ২০০৯ জমিজমার বিরোধে এলাকার এমদাদ এবং আজিজুল নিহত হয়। সেই হত্যা মামলায় টুডু এবং তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ সরেনকে আসামি করা হয়। ২ আগস্ট টুডু সরেন খুন হলেন।
১৯৬৫ সালের দিকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নে তাদের জমি আত্মসাত করে টুুডুর বাবা ফাগু সরেনকে হত্যা করা হয়। তিনি নিরীহ ছিলেন। তার বড় ভাই গোসাই সরেনও খুন হয়েছেন। এই তিনটি হত্যাকা- ঘটেছে গেলো শতক থেকে এই শতকে প্রায় ছয় দশকে। তিনটি ঘটনার পেছনেই রয়েছে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ।
টুডু সরেনের পুত্র রবি সরেন বলেন, আমার ঠাকুরদাদা ফাগু সরেন এই জমিজমার বিরোধেই খুন হয়েছিলেন ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে। জেঠা (বড় চাচা) গোসাই সরেন খুন হন ২০১১ সালে। নিহত টুডু সরেনের ছোট ভাই সুনিরাম সরেন বলেন, তার বাবা খুন হওয়ার পর একটি মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু বড় ভাই গোসাই সরেন খুন হওয়ার পর মামলা করারও সাহস পাননি তারা। বড় কচুয়া মৌজায় তাদের বাবা ফাগু সরেনের ৩৩ একর ১৮ শতক জমি ছিল। বাবা-দাদার আমল থেকে পাওয়া ওই জমি ভোগদখল করে চাষাবাদ করে আসছিলেন তারা। বাবা ফাগু সরেনের সঙ্গে প্রতিবেশী মহির উদ্দিনের ভাল সম্পর্ক ছিল। সেই সুযোগ নিয়ে মহির উদ্দিন গোপনে ওই জমির ১০ একর ১১ শতক রেকর্ড নিজের নামে করে নেন। পরে বাবা জানতে পেরে জমি উদ্ধারে দেন-দরবার করায় তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। তখন মহিরসহ তার লোকজনের নামে মামলা করা হয়েছিল। মামলা চালিয়ে যাওয়ার মতো সাহস করতে না পারায় আসামিরা খালাস পেয়ে গেছে। গোসাই সরেন হত্যার পর মামলা করারই সাহস পাননি তারা। তবে টুডু সরেন হত্যার পর মামলা করে এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে জানান, ২ আগষ্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে হিলিডাঙ্গা বাজার থেকে টুডু বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাজারের কাছের ব্রিজ পার হয়ে খালিশপুর গ্রামের ৫০ গজ চলে আসার পর দেখা যায় ডা. গোফ্ফার, আজাহার, দেলোয়ার, আলিম, সুমন, স্বপন, শাকিলসহ পরিচিত কয়েকজন টুডুদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। টুডু তাদের কাছাকাছি দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আজাহার ও গোফ্ফার টুডুর সাইকেল ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এ সময় টুডুকে দেশীয় ধারালো অস্ত্রে মারাত্মক জখম করে তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকলে আমি দৌড়ে পালিয়ে চিৎকার করতে থাকি। আমার চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এলে টুডুকে উদ্ধার করে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আফতাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আবদুল মান্নান জানান, ঘটনার খবর পেয়েই সেখানে যাই আমরা।
গাফ্ফারের বাড়িতে আসামিদের না পেয়ে তার স্ত্রী হাওয়া বিবিকে গ্রেফতার করা হয়। আসামি গ্রেফতার করার পর পার্শ্ববর্তী বিরামপুর, রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৫টির মতো অভিযান চালানো হয়েছে। গাফ্ফারসহ অন্য আসামিদের বাড়ির লোকজন বাড়িতে তালা লাগিয়ে পালিয়ে গেছে। আসামিরা যেন ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারে, তা বিভিন্ন ব্যাংকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। টুডু সরেনের বড় ছেলে মামলার বাদী রবি সরেন বলেন, আসামিরা পলাতক অবস্থা থেকেই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ছয়-সাতজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। রবি সরেন বলেন, এরই মধ্যে মামলার তিন নম্বর আসামি মো. দেলোয়ার হোসেন আমাদের পরিচিত লোকজনের মোবাইলে হুমকি দিয়ে বলছে, আমরা আর ক’দিন জেলে থাকব? জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর দেখাব এর পর কার সিরিয়াল আছে। হুমকি-ধমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন রবির মা, দাদি এবং ছোট ভাইবোনেরা। রবি বলেন, খুনোখুনি তো কম হয়নি। ভূমিলোভী চক্র জোরপূর্বক জমি দখল ও জাল দলিল তৈরি করে ‘আদিবাসীদের’ উচ্ছেদ করছে। জমিজমা সংক্রান্ত আইন-কানুন, খারিজ, খাজনা, কাগজপত্র তৈরি ও সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে ‘আদিবাসীদের’ মধ্যে রয়েছে সচেতনতার অভাব।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ ঘোষণা করে। এর পর ১৯৯৫ সাল থেকে দিনটি পৃথিবীব্যাপী উদযাপন করা হয়। প্রতিবছর জাতিসংঘ দিনটি উপলক্ষে একটি থিম বা স্লোগান ঠিক করে দেয়। এ বছরের থিম- ‘মানুষের মাঝে দূরত্ব কমাতে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’ মানুষে মানুষে দূরত্বের অন্যতম প্রধান কারণ স্বার্থের সংঘাত। আদিবাসীদের অস্তিত্ব সঙ্কটের মূল কারণ জমি নিয়ে সহিংসতা এবং বিরোধ। আর এই বিরোধেই শুরু হয় সংঘাত।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে জমি বিক্রি করলে ভূমি অফিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে, না হয় বিক্রি করতে পারবে না। এমন আইনের কারণে বাধ্যবাধকতায় পড়ে যায় ভূমি কেনাবেচার বাণিজ্য। ভূমি জরিপের সময় দুর্নীতি ও ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয় এবং ঘুষ না দিলে জমি খাস করে দেয়া হয়। ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’ আইনের আশ্রয়ও পায় না। এমনকি মামলায় জয়ী হলেও জমির দখল বুঝে না পাওয়ায় বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। যুগের পর যুগ মামলা চালাতে গিয়ে আরও জমিজমা হারায় তারা এবং এক সময় নিঃস্ব হয়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়। ভূমিদস্যুদের চাপে আক্রান্ত হয় নিরীহ জনগণ। আর এই জটিলতার মধ্যে জমি বেচাকেনা নিয়ে ঘটে যাচ্ছে হতাহতের ঘটনা। সারা দেশে এমন অনেক ঘটনায় আদিবাসী দিবসে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রশ্ন-ভূমি নিয়ে বিপন্ন অস্তিত্ব -এই আতঙ্ক আর কতদিন?
ভূমি হারানোর আশঙ্কায় বারবার ভূমিচ্যুত হতে হতে অস্তিত্বহীন হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এই বক্তব্য উঠে এসেছে আদিবাসী দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে। সম্মিলিত উদ্যোগে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে বলে জানালেন বিশেষজ্ঞরা। প্রজাস্বত্ব আইন বলবত থাকার পরও এর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং দীর্ঘদিন জেলা প্রশাসনে কোন ‘আদিবাসী’ বিষয়ক অফিসার না থাকার কারণে জটিলতা আরও বেড়েছে।
গত ৩০ মে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা খাসিয়াদের জমি দখল করার উদ্দেশ্যে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার খাসিয়াদের গ্রাম নাহারপুঞ্জির ৭৯টি খাসিয়া পরিবারের ওপর আক্রমণ করে। গত ৯ মে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলা চালিয়ে অন্তত ৭ নারীসহ ১১ জনকে আহত করা হয়।
গত ২ আগস্ট শনিবার দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার কুশদহ ইউনিয়নের বড় কচুয়া গ্রামের টুুডু সরেন খুন হন। পরের দিন ৩ আগস্ট তার বড় ছেলে রবীন্দ্রনাথ সরেন বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার ওসি মোঃ আমিনুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, কুশদহ ইউনিয়নের বড় কচুয়া গ্রামের সাঁওতাল গোত্রের টুডু সরেনের পরিবারে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত ষাট বছরে সরেন পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তিকে হত্যা করা হলো।
পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) জনকণ্ঠকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে পাহাড়ী-বাঙালী স্থায়ী ‘অধিবাসীদের’ উচ্ছেদ করে বর্তমানে বিজিবি, সামরিক বাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, সংরক্ষিত বন ঘোষণা, সেটেলারদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণের নামে ভূমি অধিগ্রহণ এবং বহিরাগত ভূমিগ্রাসীদের ভূমি জবরদখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এক সময়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সমাজে আইন-কানুন-সাহিত্য সবকিছু আক্ষরিক অর্থেই মৌখিক এবং অলিখিত ছিল। ভূমি ও বনের ওপর মানুষের স্বতঃসিদ্ধ অধিকার ছিল ঐতিহ্যগত। অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির প্রবীণ নেতা বিল নেদজি এলডার বলেছিলেন , “ভূমিই আদিবাসীদের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু, ভূমি আমাদের ঠিকানা। ভূমি জীবনের প্রতীক। এই ভূমি আমাদের আমরাও ভূমির। ভূমিতে আমরা বিশ্রাম নেই। আমরা ভূমি থেকে এসে আবার ভূমিতেই ফিরে যাই।” এই লেখার ওপর ভিত্তি করেই ২০০৩ সালের মে মাসে জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরাম আদিবাসী অধিকার বিষয়ক একটি বইতে উল্লেখ করেছে আদিবাসীদের কাছে ভূমিই জীবন, ভূমিই তাদের অস্তিত্ব। আর তাই বারবার সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে। ভেরিয়ান এলুইন তার ‘আদিবাসী জগত’ বইতে লিখেছেন, পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জাতীয় স্বার্থে যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাহাড় ও অরণ্যেও মানুষের স্বার্থে। আমরা পরস্পরকে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে পারি আদিবাসীদের অনেক কিছু দিতে পারি আমরা। আবার তাদেরও অনেক কিছু আছে, যা আমাদের দেবার মতো।”
কুশদহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার বলেন, গত চার দশকের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমাদের আন্তরিক চেষ্টার কারণে এসব এলাকায় আদিবাসীদের দখলে এখনও কিছু জমি আছে। কিছু জমি বেচাকেনার মামলার কারণে জটিলতায় আছে। এই এলাকায় ৩৪ বছরের চেয়ারম্যান ছিলেন মো. দেলোয়ার। মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার এখন জাতীয় পার্টির নেতা। তিনি জানান, এবার বিএনপি ইউনিয়ন সভাপতি আজিজুল হক কুশদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
এই এলাকায় জমিজমার দখল নিয়ে ব্যাপক জটিলতার সঙ্কট রয়েছে জানিয়ে মো. আমিনুল ইসলাম জানান, যদিও জমিজমা ওদেরই, তবু অনেকেই তাদের জমি দখল করে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে টুডু জমি বিক্রি করার অঙ্গীকার করে টাকা নিয়েছে। পরবর্তীতে জমিও দেয়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন তথ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি বলে জানান দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম। টুডু সরেন হত্যার দায়ে ৮ জনকে আসামি করা হলেও টুডুর মূল ঘাতক গাফফারের স্ত্রী হাওয়াবিবিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার স্বামী ডা. গাফ্ফার পলাতক।
এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, টুডু সরেন বিতর্কিত লোক। স্থানীয় মুসলমানেরা আক্রান্ত হন তাদের তীর ধনুকে। ১৮ এপ্রিল ২০০৯ জমিজমার বিরোধে এলাকার এমদাদ এবং আজিজুল নিহত হয়। সেই হত্যা মামলায় টুডু এবং তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ সরেনকে আসামি করা হয়। ২ আগস্ট টুডু সরেন খুন হলেন।
১৯৬৫ সালের দিকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নে তাদের জমি আত্মসাত করে টুুডুর বাবা ফাগু সরেনকে হত্যা করা হয়। তিনি নিরীহ ছিলেন। তার বড় ভাই গোসাই সরেনও খুন হয়েছেন। এই তিনটি হত্যাকা- ঘটেছে গেলো শতক থেকে এই শতকে প্রায় ছয় দশকে। তিনটি ঘটনার পেছনেই রয়েছে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ।
টুডু সরেনের পুত্র রবি সরেন বলেন, আমার ঠাকুরদাদা ফাগু সরেন এই জমিজমার বিরোধেই খুন হয়েছিলেন ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে। জেঠা (বড় চাচা) গোসাই সরেন খুন হন ২০১১ সালে। নিহত টুডু সরেনের ছোট ভাই সুনিরাম সরেন বলেন, তার বাবা খুন হওয়ার পর একটি মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু বড় ভাই গোসাই সরেন খুন হওয়ার পর মামলা করারও সাহস পাননি তারা। বড় কচুয়া মৌজায় তাদের বাবা ফাগু সরেনের ৩৩ একর ১৮ শতক জমি ছিল। বাবা-দাদার আমল থেকে পাওয়া ওই জমি ভোগদখল করে চাষাবাদ করে আসছিলেন তারা। বাবা ফাগু সরেনের সঙ্গে প্রতিবেশী মহির উদ্দিনের ভাল সম্পর্ক ছিল। সেই সুযোগ নিয়ে মহির উদ্দিন গোপনে ওই জমির ১০ একর ১১ শতক রেকর্ড নিজের নামে করে নেন। পরে বাবা জানতে পেরে জমি উদ্ধারে দেন-দরবার করায় তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। তখন মহিরসহ তার লোকজনের নামে মামলা করা হয়েছিল। মামলা চালিয়ে যাওয়ার মতো সাহস করতে না পারায় আসামিরা খালাস পেয়ে গেছে। গোসাই সরেন হত্যার পর মামলা করারই সাহস পাননি তারা। তবে টুডু সরেন হত্যার পর মামলা করে এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে জানান, ২ আগষ্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে হিলিডাঙ্গা বাজার থেকে টুডু বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাজারের কাছের ব্রিজ পার হয়ে খালিশপুর গ্রামের ৫০ গজ চলে আসার পর দেখা যায় ডা. গোফ্ফার, আজাহার, দেলোয়ার, আলিম, সুমন, স্বপন, শাকিলসহ পরিচিত কয়েকজন টুডুদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। টুডু তাদের কাছাকাছি দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আজাহার ও গোফ্ফার টুডুর সাইকেল ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এ সময় টুডুকে দেশীয় ধারালো অস্ত্রে মারাত্মক জখম করে তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকলে আমি দৌড়ে পালিয়ে চিৎকার করতে থাকি। আমার চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এলে টুডুকে উদ্ধার করে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আফতাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আবদুল মান্নান জানান, ঘটনার খবর পেয়েই সেখানে যাই আমরা।
গাফ্ফারের বাড়িতে আসামিদের না পেয়ে তার স্ত্রী হাওয়া বিবিকে গ্রেফতার করা হয়। আসামি গ্রেফতার করার পর পার্শ্ববর্তী বিরামপুর, রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৫টির মতো অভিযান চালানো হয়েছে। গাফ্ফারসহ অন্য আসামিদের বাড়ির লোকজন বাড়িতে তালা লাগিয়ে পালিয়ে গেছে। আসামিরা যেন ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে না পারে, তা বিভিন্ন ব্যাংকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। টুডু সরেনের বড় ছেলে মামলার বাদী রবি সরেন বলেন, আসামিরা পলাতক অবস্থা থেকেই হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ছয়-সাতজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। রবি সরেন বলেন, এরই মধ্যে মামলার তিন নম্বর আসামি মো. দেলোয়ার হোসেন আমাদের পরিচিত লোকজনের মোবাইলে হুমকি দিয়ে বলছে, আমরা আর ক’দিন জেলে থাকব? জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর দেখাব এর পর কার সিরিয়াল আছে। হুমকি-ধমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন রবির মা, দাদি এবং ছোট ভাইবোনেরা। রবি বলেন, খুনোখুনি তো কম হয়নি। ভূমিলোভী চক্র জোরপূর্বক জমি দখল ও জাল দলিল তৈরি করে ‘আদিবাসীদের’ উচ্ছেদ করছে। জমিজমা সংক্রান্ত আইন-কানুন, খারিজ, খাজনা, কাগজপত্র তৈরি ও সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে ‘আদিবাসীদের’ মধ্যে রয়েছে সচেতনতার অভাব।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment