খুঁজে পাওয়া গেল কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদক হিসেবে জ্যোতি বসুর শেষ সম্মেলনের ‘নিখোঁজ’ খসড়া ও রিপোর্ট৷ এ ছাড়াও ১৯৬৪ সালে পার্টির ভাঙনের ঠিক আগে ও পরে তাঁর কিছু মম্তব্য– যা আগে পাওয়া যায়নি তাও৷ পঞ্চাশের দশকের মাঝ বরাবর থেকে আম্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্তালিন-মাও দ্বন্দ্ব ও এবং ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ নিয়ে যখন তাত্ত্বিক বিভেদ পার্টি নেতৃত্বের ব্যক্তি বিভেদে দাঁড়িয়েছে, ১৯৬১ সালের বর্ধমান সম্মেলনে জ্যোতিবাবু পার্টি সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন শেষ বারের মতো৷ এর পর ৬২ সালে নির্বাচনে কমিউনিস্ট জননেতা জ্যোতি বসুর আত্মপ্রকাশের পরে তাঁকে আর সম্পাদকের দায়িত্বে দেখা যায়নি৷ পার্টি ভাঙার প্রস্তুতি হিসেবে ৬১ সালের বর্ধমান সম্মেলনে ভবিষ্যৎ সি পি আইয়ের রুশ লাইনের জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমর্থক নেতা-প্রতিনিধিদের সঙ্গে মাওয়ের দিক ঘেঁষা ভবিষ্যৎ সি পি এমের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমর্থকদের বিতর্ক চলেছিল৷ এ রাজ্যে ভবিষ্যৎ সি পি এম সমর্থকেরা ছিলেন দলে ভারী৷ তাই, রাজ্য পার্টির সম্পাদক হন কট্টরপম্হী বলে পরিচিত প্রমোদ দাশগুপ্ত৷ ১৩টি খণ্ডে কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসের লেখক ও সি পি আইয়ের ঐতিহাসিক টিমের প্রধান সম্পাদক ভানুদেব দত্ত মনে করেন বহু দিনের সংসদীয় রাজনীতির আগে জ্যোতিবাবু যে এক সময় পার্টির সাংগঠনিক নেতা ছিলেন সাধারণ মানুষ তো বটেই বহু বর্তমান পার্টি সদস্য তা জানেন না৷ নিশ্চয় তিনি সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারীও ছিলেন কারণ, পরবর্তী ৬২ সালের নির্বাচনে পার্টি দারুণ জনসমর্থন পেয়েছিল৷ দলিলটি খুঁজে পাওয়ায় সে ইতিহাস জানা যাবে৷ কিন্তু, ভাগাভাগির আগে পার্টির সেই সংক্রাম্তির সময়ে জ্যোতিবাবু বিদায়ী সম্পাদকের জবাবি ভাষণে কী বলেছিলেন তা উদ্ধার করা যায়নি৷ কারণ, কমিউনিস্ট পার্টিগুলি বেআইনি সময়ের ঐতিহ্য মেনে মিনিটস্ বুক এখনও গোপন রাখে৷ এমনকী উদার বলে কথিত সি পি আইও৷ এ বিষয়ে দলের এক মুখপাত্র জানান, ‘আমরা সরকারি মহাফেজখানা চালাই না যে গোপনীয়তার মেয়াদ শেষ হলে নিজেরাই ফাঁস করে দেব৷ কারণ, মিনিটস্ বই গোপন রাখা কমিউনিস্ট পার্টির দায়বদ্ধতা৷’ পুড়িয়ে দিলে তো আরও গোপন থাকে, এমন প্রশ্নে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘এর উত্তর আমার জানা নেই৷’ ভানুবাবু জানান, সি পি এমের উদ্যোগে প্রয়াত অনিল বিশ্বাস সম্পাদিত যে পার্টির ইতিহাস প্রকাশিত হয় তাতে এই সম্মেলনের রিপোর্টটি নেই৷ কিন্তু ভানুবাবু এ অমূল্য দলিলটি হঠাৎই খুঁজে পান সি পি এম নিয়ন্ত্রিত মুজফফ্র আহমেদ লাইব্রেরি থেকেই৷ এ জন্য অবশ্য তিনি সি পি এম নেতৃত্বকে ও লাইব্রেরির প্রধান প্রদোষ বসুকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন৷ অবশ্য ওই সম্মেলনে এমন অনেক নেতা এমন কথা বলেন যা পরে তাঁরা বদলেছিলেন বলে উভয় পার্টির নেতৃত্ব তা গোপন করে রাখার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন তা ভানুবাবু অস্বীকার করেননি৷ তবে পার্টি ভাগাভাগির সময়ে অফিস ভাগাভাগিতেও তা হারিয়ে গিয়ে থাকতে পারে৷ শেষ সম্পাদকের বয়ানে দেখা যাচ্ছে জ্যোতিবাবু পার্টির ঐক্য রক্ষার আবেদন জানাচ্ছেন৷ ভানুবাবুর পার্টি ইতিহাসের ১৩তম খণ্ডে পার্টি ভাঙার আগে পরে ৬ মাসে জ্যোতিবাবুর এই ভূমিকা নিয়ে এক নাটকীয় বৈঠকের কথা আছে৷ বৈঠকটি বসেছিল দিল্লিতে জ্যোতিবাবু ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর লন্ডন ভারতীয় চক্রের বন্ধু বিখ্যাত সি পি আই সাংসদ ভূপেশ গুপ্তের বাংলোয়৷ সেখানে অন্যদের মধ্যে ভূপেশবাবুর আমন্ত্রিত ছিলেন রাজেশ্বর রাও, প্রমোদ দাশগুপ্ত, সুরজিৎ ও জ্যোতিবাবু৷ সেখানে জ্যোতিবাবু পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য চেয়ারম্যান ডাঙ্গে-সহ গোটা কর্মসমিতি ছযেখানে ডাঙ্গেপম্হী বলে যাঁরা কথিত তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠগ্গ বাতিল করে নতুন নেতৃত্ব গড়ে সম্মেলনে যেতে বলছেন৷ প্রমোদবাবু ও সুরজিৎ তা সমর্থন করেন৷ কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু ভূপেশ গুপ্ত, যিনি জ্যোতিবাবুর সঙ্গেই থাকবেন এমন রটনা ছিল, এখানে তার বিরোধিতা করেন৷ ভানুবাবুর পার্টি ইতিহাসে আছে, রাজেশ্বর রাও তখন রহস্য করে বলেন ‘আদর্শগত ভাবে ভূপেশবাবু কোথায় আছেন জানি না তবে সংগঠনে তিনি আমাদের সঙ্গে৷’ আমৃত্যু ভূপেশবাবু সি পি আইয়ের সঙ্গে ও জ্যোতিবাবু সি পি এমের সঙ্গে ছিলেন৷
http://www.aajkaal.net/09-08-2014/cat/2/bangla/
|
No comments:
Post a Comment