নৌ নিরাপত্তা হুমকির মুখে
০ চলছে ফিটনেসবিহীন নৌযান
০ ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা
০ অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার
০ ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা
০ অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার
রাজন ভট্টাচার্য ॥ নিরাপত্তাহীন দেশের নৌ- যোগাযোগ খাত। সর্বশেষ তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে পদ্মায় ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ও ছিল ফিটনেসবিহীন নৌযান। এই ঘটনা আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেল নৌপথে যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি কোন পর্যায়ে। জানা গেছে, ৫০ হাজার অবৈধ নৌযানের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। ফিটনেস ছাড়াই চলছে ৮০ ভাগ নৌযান। ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ঘটছে ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা। গঠন করা হয়নি নৌপুলিশ। নিরাপদ নৌপথের জন্য ৬ বছরেও মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। দুই দশকে সাড়ে ৬০০ বেশি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। চার দশকে নৌদুর্ঘটনার মারা গেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে মাত্র পাঁচটি। অভিযুক্তদের শাস্তি হয়নি। নৌদুর্ঘটনার কারণে উদ্বাস্তু হয়েছে সাড়ে ৬০০ পরিবার। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্মাণ হচ্ছে নৌযান। সারাদেশে মেরিন কোর্ট একটি। দুর্ঘটনার মামলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। সব মিলিয়ে অরক্ষিত অবস্থায় চলছে দেশের নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা।
রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন ৫০ হাজার ॥ রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন ৫০ হাজার নৌযানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পণ্যবাহী রয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশই বালুবাহী। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে- অনেক দুর্ঘটনার জন্য বালুবাহী নৌযানই বেশি দায়ী। ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুরের মতলব যাওয়ার পথে মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে নিমজ্জিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সারস। এটি মিথিলা ফারজানা নামের বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ডুবে যায়। এতে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
২০১২ সালের ১২ মার্চ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে নিমজ্জিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি শরীয়তপুর-১। এই দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা হয় ১৪৭টি লাশ। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত দোতলা লঞ্চটির মাস্টার ও ড্রাইভারের নাম লঞ্চমালিক নিজেই বলতে পারেননি। রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন নৌযানে সনদধারী দক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার আছেন কিনা- তা কর্তৃপক্ষের অজানা থেকে যাচ্ছে, আবার যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো অবকাঠমোগতভাবে উপযুক্ত কিনা তাও জানা যাচ্ছে না। নদীবন্দরের কোন টার্মিনাল বা লঞ্চঘাট থেকে নৌযান ছাড়ার আগে এসব দেখভালের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর অধীনে প্রণীত বিধি অনুযায়ী, নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ এবং মাস্টার ও ড্রাইভারের সনদ যাচাই এবং যাত্রীসংখ্যা গণনার পরই সেটি ছাড়ার অনুমতি দেয়ার (ভয়েজ ডিক্লারেশন) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর এবং নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক (নৌ-নিট্রা) বিভাগের।
কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্দর কর্মকর্তা ও ট্রাফিক ইনস্পেক্টররা (টিআই) এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না। ২০১২ সালের ১২ মার্চ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে দুর্ঘটনাকবলিত এমভি শরীয়তপুর-১ লঞ্চটি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝাই ছিল অথচ সরকারী তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বিআইডব্লিউটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়ী করা হয়নি। ফলে প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তির আওতার বাইরে রয়ে গেছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৪৭টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৮৭ জনের প্রাণহানি ও ৭০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও মাত্র ২-৩টি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।
দুই দশকের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ॥ ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে ৬৫৬টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ২৯০ জন। এছাড়া এসব দুর্ঘটনায় এক হাজার ২৩৬ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তবে, এই তথ্যের সঙ্গে সরকারী পরিসংখ্যানের ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। সরকারী হিসেবে, গত দুই দশকে ৩৮৭টি দুর্ঘটনায় ২,৭৭২ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৫৪৪ জন। আর নিখোঁজের সংখ্যা ৫৩৩।
নৌযানের সরকারী হিসাব ॥ ২০১০-এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সেক্টরে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা ১২ হাজার ২৭৫। এর মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান দুই হাজার ১৮৮টি। ২০০৯ ও ২০০৮-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ১৬২ ও দুই হাজার ১২২। সরকারী এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যাত্রীবাহী নৌযান ২০০৯ সালে ৪০টি এবং ২০১০ সালে ২৬টি বেড়েছে। কিন্তু বার্ষিক সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) করা হয়েছে ২০১০ সালে ৮২১টি, ২০০৯ সালে ৭৫৩টি এবং ২০০৮ সালে ৭৯২টি। তিন বছরে সার্ভে করা যাত্রীবাহী নৌযানের সংখ্যা দুই হাজার ৩৬৬ অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর ৭৮৯টি যাত্রীবাহী নৌযানের বার্ষিক সার্ভে বা ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে।
জেনারেল শিপিং স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ অনুযায়ী, ফিটনেসবিহীন যাত্রীবাহী লঞ্চ-ট্রলারের সংখ্যা এক হাজার ৩৬৯। তবে ২০১০ সালে নৌ-সচিবকে লেখা খোদ ডস মহাপরিচালকের পত্রে উল্লেখিত তথ্য তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে চলাচলরত মোট ৩৫ হাজার নৌযানের মধ্যে ১২ হাজার যাত্রীবাহী। ডস থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১২ হাজারের মধ্যে ডসের রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত দুই হাজার ১৮৮টি, যার মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ৭৮৯টি নৌযান ফিটনেস সনদ নিয়ে চলাচল করছে।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় ॥ নৌপথে যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক সুস্পষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে যেমন : দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কোন বিশেষ সংকেত থাকলে নৌযান চলাচল করতে পারবে না। নির্দেশনা রয়েছে, কি ধরনের সতর্কাবস্থায় নৌযান চলাচল করতে পারবে তারও। যাত্রীবাহী কোন লঞ্চে অতিরিক্ত মালামাল বহন করা যাবে না। প্রতিটি নৌযানেই থাকতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট ও বয়া। প্রতিটি নৌযান সাদা দড়ি দিয়ে হাল্কা কিছু বেঁধে রাখতে হবে। যাতে কোন কারণে নৌযান বা লঞ্চ নিমজ্জিত হলে তার সন্ধান খুঁজে পেতে সহজ হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নেভিগেশন লাইট, রুট পারমিটসহ সব ধরনের কাগজপত্র নৌযানে রাখতে হবে। সর্বোপরি নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার, ড্রাইভার বা সারেং দিয়ে নৌযান চালাতে হবে।
এছাড়াও নির্দেশনা রয়েছে রাতে বালিবাহী, ইটবাহী ও মাটিবাহী ট্রলার, ড্রেজার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা না চলাচল করার। লঞ্চ মালিকদের অভিযোগ- নৌপথে প্রয়োজনীয় বয়া, বিকন বাতি ও মার্ক নেই। দিনে সহজে চলাচল করতে পারলেও রাতে নৌযানগুলোকে চলতে হয় আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। চালকদের অনিয়মতান্ত্রিক নৌযান পরিচালনারোধে নেই কোন মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে না। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নেই রিভার পুলিশও। পোর্ট অফিসারদের লঞ্চ বা নৌযান থেকে জরিমানা আদায় বা দোষী নৌযানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিচারকার্য পরিচালনার জন্য দেয়া হয়নি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা। ফলে তারা অভিযান পরিচালনা করলেও শাস্তি নিশ্চিত না করে শুধু মামলা গ্রহণ করে তার ধারা উল্লেখ করে মেরিন কোর্টে পাঠিয়ে দেন। ওই কোর্টই দোষী লঞ্চ ও সারেংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। সারাদেশে এই মেরিন কোর্ট আবার মাত্র একটি। সেখানে সর্বদাই জট লেগে থাকে কয়েক হাজার মামলার। নৌ, সড়ক ও রেলখাত রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আশীষ কুমার দে জনকণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক নেতাসহ অনেক মন্ত্রী, এমপি নৌযানের মালিক হওয়ায় অনেক সময়ই এদের অনৈতিক প্রভাবে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবে নৌ-আদালতের বিচারাধীন মামলার রায় পর্যন্ত কার্যকর করা যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কাগজে কলমে নৌ-নিরাপত্তা ॥ ঈদ-উল-ফিতরের আগে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছিলেন, বর্ষা মৌসুমে দুর্ঘটনা এড়াতে ঈদপরবর্তী আরও সাত দিন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া রুটে ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় বিশেষ তদারক দল কাজ করবে। যাতে কোন লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন করতে না পারে। তদারক দল সেসব লঞ্চের লোকদের শক্ত হাতে দমন করবে। সোমবার মাওয়ায় মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটার আগে মাওয়া বা অপর পারের কাওড়াাকান্দিতে (মাদারীপুর) কোন তদারক দল ছিল না। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনবলের কারণেও অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঠেকানো যাচ্ছে না। আর তদারক দল কেন থাকেনি, তা তিনি দেখবেন। যেসব মালিকের লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বহন করেছে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।
নৌযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শাজাহান খান অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছিলেন, সমুদ্র পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনবলকাঠামো বাড়ানো হবে। লঞ্চের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ে বাস্তব জরিপকাজের জন্য জরিপকারকের সংখ্যা ২১ জন করা হবে। বর্তমানে জরিপকারকের স্থায়ী পদে আছেন মাত্র তিনজন। কথা ছিল, নৌ-দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে নিয়মিত তদারকির জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র ২০ জন উপপরিচালককে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হবে। কোন প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেছি। আসলেই তিন বছর ধরে আমি চেষ্টা করছি। গত বছর ঈদ-উল-ফিতরের আগে নৌব্যবস্থাপনাবিষয়ক সভায় মন্ত্রী বলেছিলেন, বিভিন্ন লঞ্চ দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। নৌমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিভিন্ন নৌযানের নকশাগুলো পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো রিসার্স এ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে (বিআরটিসি) পাঠানো হবে। বাস্তবে তা হয়নি।
ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা ॥ নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন জোটের ২০০৬ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য যত নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় ৭০ ভাগই ঘটেছে ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে। লঞ্চের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ড্রাফট (পাটাতন হতে নিচের দিকের গভীরতা) ও উচ্চতা চারটি বিষয় একে অন্যের সঙ্গে আনুপাতিক বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পৃক্ত। যখন কোন লঞ্চের যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য খেয়ালখুশিমতো দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বাড়ানো হয় তখনই লঞ্চটি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ তখন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বাড়ানো হলেও ড্রাফট বাড়ানো সম্ভব হয় না। যখন কোন নৌযানের ড্রাফট তার উচ্চতার তুলনায় আনুপাতিক হারে কমে যায়, তখন সামান্য ঝড়ো বাতাসে এটি কাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া লঞ্চের ভেতরে যে হুড বা খোল থাকে তার অপব্যবহারের ফলেও চলন্ত পথে লঞ্চগুলো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। লঞ্চের খোলের ভেতরটি থাকে ফাঁপা, এখানে মালপত্র রেখে ঢাকনা ভাল করে বন্ধ করে দিলে ভেতরে বাতাস আটকে থাকে এবং তা লঞ্চটিকে পানির ওপর ভেসে থাকতে সহায়তা করে। কিন্তু দেখা যায়, অতিরিক্ত মালবোঝাই করার জন্য প্রায়ই এ খোলের ঢাকনা খুলে রাখা হয় এবং লঞ্চের পাটাতনে বা ডেকের ওপরও অবাধে মালপত্র রাখা হয়।
চার দশকে দশ সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু ॥ চার দশকে দেশে নৌদুর্ঘটনায় দশ সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও মাত্র ৫টির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বাকি ৯৯ ভাগ প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখেনি। আবার প্রকাশিত তদন্ত কমিটির সুপারিশও কার্যকর হয়নি। এসব দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ২০০টি মামলা নিষ্পত্তি হলেও অভিযুক্ত কারোরই শাস্তি হয়নি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে নৌদুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে বহুল আলোচিত নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রকল্পটি দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রায় ৪০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ফাইলটি অজানা কারণে কয়েক বছর ধরে লাল ফিতায় আটকে আছে। ১৯৭১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত ৪৩ বছরে নৌদুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১০ হাজার ৩১৬ জন যাত্রীর। এর মধ্যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী শতকরা ৮০ ভাগ নৌযানেরই ফিটনেস নেই বলে ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণসমূহ ॥ নৌপথে দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত ১০টি কারণ চিহ্নিত করেছে নৌ, সড়ক ও রেলখাত রক্ষা জাতীয় কমিটি। গবেষণায় বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়ন ও অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে নৌযান নির্মাণ দুর্ঘটনার কারণ। এছাড়াও রয়েছে- অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস (বার্ষিক সার্ভে) প্রদান, অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার (চালক) নিয়োগ, ওভারলোডিং (অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাই), অবৈধ নৌযান চলাচল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, নৌপথে দিকনির্দেশক বিকন ও বয়াবাতি না থাকা, নাব্য সঙ্কট ও ডুবোচর, নৌপথে কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখা ইত্যাদি, আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
অকার্যকর নৌপরিবহন ব্যবস্থাপনা ॥ অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনাই নৌদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করে উপকূলীয় এলাকায় কর্মরত ১৬টি সংগঠন। সম্প্রতি লঞ্চ দুর্ঘটনা নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনাকে নৌদুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি দেশের নৌপথগুলোকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্য দায়িত্বে অবহেলাকারী, দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তা এবং দোষী মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
১৬ সংগঠনের অন্যতম সংগঠক মোঃ মজিবুল হক মনির বলেন, পিনাক-৬ ডুবে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয়। পিনাক-৬ লঞ্চের চলাচল অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, এর যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল ৮৫ অথচ বহন করছিল তিন শতাধিক। পদ্মায় ২ নম্বর সতর্কসংকেত দেখানো অবস্থায় ৬৫ ফুটের কম দৈর্ঘের লঞ্চ চলাচল নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পিনাকের দৈর্ঘ্য ছিল ৫২ ফুট।
স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন। অনেক তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমাও দেয় না। দুর্ঘটনার তদন্তে প্রায়ই উঠে আসে মালিক-চালক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা-গাফিলতির কথা। কিছু কিছু মামলাও হয়, কিন্তু কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বললেই চলে। নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব আমিনুর রসূল বাবুল বলেন, যারা ভুলত্রুটিপূর্ণ নকশার লঞ্চ চলাচলে সহায়তা করে সেইসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোস্ট ট্রাস্টের মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে এবং একটি দুর্ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। দেশে ডুবুরি আছেন মাত্র ২৫ জন, তাও আবার তারা পূর্ণকালীন নন। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সম্পৃক্ত করে তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতা নেয়া প্রয়োজন।
উদ্বাস্তু হয়েছে ৬৫৬টি পরিবার ॥ দুর্ঘটনাকবলিত ১০টি লঞ্চের ওপর দীর্ঘ অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অন্তত ২২টি পরিবারের একাধিক সদস্য ওইসব লঞ্চে ছিলেন। দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ১২টি পরিবারের দুই বা সর্বোচ্চ আটজন পর্যন্ত সদস্য মারা গেছেন। যাদের মধ্যে ১০ জন ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবারের কর্তাব্যক্তির অকালমৃত্যুর কারণে ওইসব নিম্নবিত্ত পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। স্ত্রী হয়েছেন স্বামীহারা, পিতৃহারা সন্তানরা লেখাপড়া ছেড়ে নাম লিখিয়েছে শিশুশ্রমিক কিংবা ছিন্নমূল শিশু-কিশোরের তালিকায়। এ রকম করুণ পরিণতির শিকার বহু পরিবার জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য কোন শহরে। এই হিসেবে গত দুই দশকের লঞ্চ দুর্ঘটনায় অন্তহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে ৬৫৬টি পরিবার।
রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন ৫০ হাজার ॥ রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন ৫০ হাজার নৌযানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পণ্যবাহী রয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশই বালুবাহী। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে- অনেক দুর্ঘটনার জন্য বালুবাহী নৌযানই বেশি দায়ী। ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুরের মতলব যাওয়ার পথে মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে নিমজ্জিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সারস। এটি মিথিলা ফারজানা নামের বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ডুবে যায়। এতে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
২০১২ সালের ১২ মার্চ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে নিমজ্জিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি শরীয়তপুর-১। এই দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা হয় ১৪৭টি লাশ। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত দোতলা লঞ্চটির মাস্টার ও ড্রাইভারের নাম লঞ্চমালিক নিজেই বলতে পারেননি। রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন নৌযানে সনদধারী দক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার আছেন কিনা- তা কর্তৃপক্ষের অজানা থেকে যাচ্ছে, আবার যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো অবকাঠমোগতভাবে উপযুক্ত কিনা তাও জানা যাচ্ছে না। নদীবন্দরের কোন টার্মিনাল বা লঞ্চঘাট থেকে নৌযান ছাড়ার আগে এসব দেখভালের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর অধীনে প্রণীত বিধি অনুযায়ী, নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ এবং মাস্টার ও ড্রাইভারের সনদ যাচাই এবং যাত্রীসংখ্যা গণনার পরই সেটি ছাড়ার অনুমতি দেয়ার (ভয়েজ ডিক্লারেশন) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর এবং নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক (নৌ-নিট্রা) বিভাগের।
কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্দর কর্মকর্তা ও ট্রাফিক ইনস্পেক্টররা (টিআই) এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না। ২০১২ সালের ১২ মার্চ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে দুর্ঘটনাকবলিত এমভি শরীয়তপুর-১ লঞ্চটি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝাই ছিল অথচ সরকারী তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বিআইডব্লিউটিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়ী করা হয়নি। ফলে প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তির আওতার বাইরে রয়ে গেছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৪৭টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৮৭ জনের প্রাণহানি ও ৭০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও মাত্র ২-৩টি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে।
দুই দশকের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ॥ ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে ৬৫৬টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ২৯০ জন। এছাড়া এসব দুর্ঘটনায় এক হাজার ২৩৬ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তবে, এই তথ্যের সঙ্গে সরকারী পরিসংখ্যানের ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। সরকারী হিসেবে, গত দুই দশকে ৩৮৭টি দুর্ঘটনায় ২,৭৭২ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৫৪৪ জন। আর নিখোঁজের সংখ্যা ৫৩৩।
নৌযানের সরকারী হিসাব ॥ ২০১০-এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সেক্টরে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা ১২ হাজার ২৭৫। এর মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান দুই হাজার ১৮৮টি। ২০০৯ ও ২০০৮-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ১৬২ ও দুই হাজার ১২২। সরকারী এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যাত্রীবাহী নৌযান ২০০৯ সালে ৪০টি এবং ২০১০ সালে ২৬টি বেড়েছে। কিন্তু বার্ষিক সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) করা হয়েছে ২০১০ সালে ৮২১টি, ২০০৯ সালে ৭৫৩টি এবং ২০০৮ সালে ৭৯২টি। তিন বছরে সার্ভে করা যাত্রীবাহী নৌযানের সংখ্যা দুই হাজার ৩৬৬ অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর ৭৮৯টি যাত্রীবাহী নৌযানের বার্ষিক সার্ভে বা ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে।
জেনারেল শিপিং স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ অনুযায়ী, ফিটনেসবিহীন যাত্রীবাহী লঞ্চ-ট্রলারের সংখ্যা এক হাজার ৩৬৯। তবে ২০১০ সালে নৌ-সচিবকে লেখা খোদ ডস মহাপরিচালকের পত্রে উল্লেখিত তথ্য তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে চলাচলরত মোট ৩৫ হাজার নৌযানের মধ্যে ১২ হাজার যাত্রীবাহী। ডস থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১২ হাজারের মধ্যে ডসের রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত দুই হাজার ১৮৮টি, যার মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ৭৮৯টি নৌযান ফিটনেস সনদ নিয়ে চলাচল করছে।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় ॥ নৌপথে যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কর্তৃক সুস্পষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে যেমন : দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কোন বিশেষ সংকেত থাকলে নৌযান চলাচল করতে পারবে না। নির্দেশনা রয়েছে, কি ধরনের সতর্কাবস্থায় নৌযান চলাচল করতে পারবে তারও। যাত্রীবাহী কোন লঞ্চে অতিরিক্ত মালামাল বহন করা যাবে না। প্রতিটি নৌযানেই থাকতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট ও বয়া। প্রতিটি নৌযান সাদা দড়ি দিয়ে হাল্কা কিছু বেঁধে রাখতে হবে। যাতে কোন কারণে নৌযান বা লঞ্চ নিমজ্জিত হলে তার সন্ধান খুঁজে পেতে সহজ হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নেভিগেশন লাইট, রুট পারমিটসহ সব ধরনের কাগজপত্র নৌযানে রাখতে হবে। সর্বোপরি নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার, ড্রাইভার বা সারেং দিয়ে নৌযান চালাতে হবে।
এছাড়াও নির্দেশনা রয়েছে রাতে বালিবাহী, ইটবাহী ও মাটিবাহী ট্রলার, ড্রেজার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা না চলাচল করার। লঞ্চ মালিকদের অভিযোগ- নৌপথে প্রয়োজনীয় বয়া, বিকন বাতি ও মার্ক নেই। দিনে সহজে চলাচল করতে পারলেও রাতে নৌযানগুলোকে চলতে হয় আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। চালকদের অনিয়মতান্ত্রিক নৌযান পরিচালনারোধে নেই কোন মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে না। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নেই রিভার পুলিশও। পোর্ট অফিসারদের লঞ্চ বা নৌযান থেকে জরিমানা আদায় বা দোষী নৌযানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিচারকার্য পরিচালনার জন্য দেয়া হয়নি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা। ফলে তারা অভিযান পরিচালনা করলেও শাস্তি নিশ্চিত না করে শুধু মামলা গ্রহণ করে তার ধারা উল্লেখ করে মেরিন কোর্টে পাঠিয়ে দেন। ওই কোর্টই দোষী লঞ্চ ও সারেংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। সারাদেশে এই মেরিন কোর্ট আবার মাত্র একটি। সেখানে সর্বদাই জট লেগে থাকে কয়েক হাজার মামলার। নৌ, সড়ক ও রেলখাত রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আশীষ কুমার দে জনকণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক নেতাসহ অনেক মন্ত্রী, এমপি নৌযানের মালিক হওয়ায় অনেক সময়ই এদের অনৈতিক প্রভাবে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবে নৌ-আদালতের বিচারাধীন মামলার রায় পর্যন্ত কার্যকর করা যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কাগজে কলমে নৌ-নিরাপত্তা ॥ ঈদ-উল-ফিতরের আগে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছিলেন, বর্ষা মৌসুমে দুর্ঘটনা এড়াতে ঈদপরবর্তী আরও সাত দিন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া রুটে ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় বিশেষ তদারক দল কাজ করবে। যাতে কোন লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন করতে না পারে। তদারক দল সেসব লঞ্চের লোকদের শক্ত হাতে দমন করবে। সোমবার মাওয়ায় মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটার আগে মাওয়া বা অপর পারের কাওড়াাকান্দিতে (মাদারীপুর) কোন তদারক দল ছিল না। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনবলের কারণেও অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঠেকানো যাচ্ছে না। আর তদারক দল কেন থাকেনি, তা তিনি দেখবেন। যেসব মালিকের লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বহন করেছে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।
নৌযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শাজাহান খান অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছিলেন, সমুদ্র পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনবলকাঠামো বাড়ানো হবে। লঞ্চের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ে বাস্তব জরিপকাজের জন্য জরিপকারকের সংখ্যা ২১ জন করা হবে। বর্তমানে জরিপকারকের স্থায়ী পদে আছেন মাত্র তিনজন। কথা ছিল, নৌ-দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে নিয়মিত তদারকির জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র ২০ জন উপপরিচালককে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হবে। কোন প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেছি। আসলেই তিন বছর ধরে আমি চেষ্টা করছি। গত বছর ঈদ-উল-ফিতরের আগে নৌব্যবস্থাপনাবিষয়ক সভায় মন্ত্রী বলেছিলেন, বিভিন্ন লঞ্চ দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। নৌমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিভিন্ন নৌযানের নকশাগুলো পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো রিসার্স এ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে (বিআরটিসি) পাঠানো হবে। বাস্তবে তা হয়নি।
ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ৭০ ভাগ দুর্ঘটনা ॥ নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন জোটের ২০০৬ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য যত নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় ৭০ ভাগই ঘটেছে ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে। লঞ্চের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ড্রাফট (পাটাতন হতে নিচের দিকের গভীরতা) ও উচ্চতা চারটি বিষয় একে অন্যের সঙ্গে আনুপাতিক বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পৃক্ত। যখন কোন লঞ্চের যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য খেয়ালখুশিমতো দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বাড়ানো হয় তখনই লঞ্চটি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ তখন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বাড়ানো হলেও ড্রাফট বাড়ানো সম্ভব হয় না। যখন কোন নৌযানের ড্রাফট তার উচ্চতার তুলনায় আনুপাতিক হারে কমে যায়, তখন সামান্য ঝড়ো বাতাসে এটি কাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া লঞ্চের ভেতরে যে হুড বা খোল থাকে তার অপব্যবহারের ফলেও চলন্ত পথে লঞ্চগুলো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। লঞ্চের খোলের ভেতরটি থাকে ফাঁপা, এখানে মালপত্র রেখে ঢাকনা ভাল করে বন্ধ করে দিলে ভেতরে বাতাস আটকে থাকে এবং তা লঞ্চটিকে পানির ওপর ভেসে থাকতে সহায়তা করে। কিন্তু দেখা যায়, অতিরিক্ত মালবোঝাই করার জন্য প্রায়ই এ খোলের ঢাকনা খুলে রাখা হয় এবং লঞ্চের পাটাতনে বা ডেকের ওপরও অবাধে মালপত্র রাখা হয়।
চার দশকে দশ সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু ॥ চার দশকে দেশে নৌদুর্ঘটনায় দশ সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও মাত্র ৫টির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বাকি ৯৯ ভাগ প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখেনি। আবার প্রকাশিত তদন্ত কমিটির সুপারিশও কার্যকর হয়নি। এসব দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ২০০টি মামলা নিষ্পত্তি হলেও অভিযুক্ত কারোরই শাস্তি হয়নি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে নৌদুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে বহুল আলোচিত নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধ প্রকল্পটি দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রায় ৪০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ফাইলটি অজানা কারণে কয়েক বছর ধরে লাল ফিতায় আটকে আছে। ১৯৭১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত ৪৩ বছরে নৌদুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১০ হাজার ৩১৬ জন যাত্রীর। এর মধ্যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী শতকরা ৮০ ভাগ নৌযানেরই ফিটনেস নেই বলে ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণসমূহ ॥ নৌপথে দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত ১০টি কারণ চিহ্নিত করেছে নৌ, সড়ক ও রেলখাত রক্ষা জাতীয় কমিটি। গবেষণায় বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়ন ও অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে নৌযান নির্মাণ দুর্ঘটনার কারণ। এছাড়াও রয়েছে- অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস (বার্ষিক সার্ভে) প্রদান, অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার (চালক) নিয়োগ, ওভারলোডিং (অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাই), অবৈধ নৌযান চলাচল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, নৌপথে দিকনির্দেশক বিকন ও বয়াবাতি না থাকা, নাব্য সঙ্কট ও ডুবোচর, নৌপথে কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখা ইত্যাদি, আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
অকার্যকর নৌপরিবহন ব্যবস্থাপনা ॥ অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনাই নৌদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করে উপকূলীয় এলাকায় কর্মরত ১৬টি সংগঠন। সম্প্রতি লঞ্চ দুর্ঘটনা নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনাকে নৌদুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি দেশের নৌপথগুলোকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্য দায়িত্বে অবহেলাকারী, দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তা এবং দোষী মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
১৬ সংগঠনের অন্যতম সংগঠক মোঃ মজিবুল হক মনির বলেন, পিনাক-৬ ডুবে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয়। পিনাক-৬ লঞ্চের চলাচল অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, এর যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল ৮৫ অথচ বহন করছিল তিন শতাধিক। পদ্মায় ২ নম্বর সতর্কসংকেত দেখানো অবস্থায় ৬৫ ফুটের কম দৈর্ঘের লঞ্চ চলাচল নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পিনাকের দৈর্ঘ্য ছিল ৫২ ফুট।
স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন। অনেক তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমাও দেয় না। দুর্ঘটনার তদন্তে প্রায়ই উঠে আসে মালিক-চালক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা-গাফিলতির কথা। কিছু কিছু মামলাও হয়, কিন্তু কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বললেই চলে। নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব আমিনুর রসূল বাবুল বলেন, যারা ভুলত্রুটিপূর্ণ নকশার লঞ্চ চলাচলে সহায়তা করে সেইসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোস্ট ট্রাস্টের মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে এবং একটি দুর্ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। দেশে ডুবুরি আছেন মাত্র ২৫ জন, তাও আবার তারা পূর্ণকালীন নন। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সম্পৃক্ত করে তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতা নেয়া প্রয়োজন।
উদ্বাস্তু হয়েছে ৬৫৬টি পরিবার ॥ দুর্ঘটনাকবলিত ১০টি লঞ্চের ওপর দীর্ঘ অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অন্তত ২২টি পরিবারের একাধিক সদস্য ওইসব লঞ্চে ছিলেন। দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ১২টি পরিবারের দুই বা সর্বোচ্চ আটজন পর্যন্ত সদস্য মারা গেছেন। যাদের মধ্যে ১০ জন ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবারের কর্তাব্যক্তির অকালমৃত্যুর কারণে ওইসব নিম্নবিত্ত পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। স্ত্রী হয়েছেন স্বামীহারা, পিতৃহারা সন্তানরা লেখাপড়া ছেড়ে নাম লিখিয়েছে শিশুশ্রমিক কিংবা ছিন্নমূল শিশু-কিশোরের তালিকায়। এ রকম করুণ পরিণতির শিকার বহু পরিবার জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য কোন শহরে। এই হিসেবে গত দুই দশকের লঞ্চ দুর্ঘটনায় অন্তহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে ৬৫৬টি পরিবার।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment